সিঙ্গাপুর-সৌদি আরবে মুন্সীগঞ্জের শীতলপাটি

sital patyলাবলু মোল্লা: গ্রামের নাম পাইটাল পাড়া বা পাটিকর পাড়া। পাইটাল-মানে পাটি বুনোনের কারিগর, আর পাটিকরের-অর্থও পাটির কারিগর। তাই পাটি বুননের কারিগরদের গ্রামের নাম হয়েছে পাইটাল পাড়া। মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ি উপজেলার আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের মুন্সীগঞ্জ-শ্রীনগর সড়কের পাশে এক অজ পাড়াগায় এ পাইটাল পাড়া গ্রামটি অবস্থিত। এ গ্রামটি শিতল পাটির গ্রাম হিসেবে সারা দেশে পরিচিত। জনৈক বেচু সাধুর আশ্রম ঘিরে পাইটাল পাড়ার অবস্থান। এই ছোট্ট গ্রামটিতে রয়েছে ৫ শতাধিক পাইটালের ৭০ থেকে ৭৫টি পাইটাল পরিবার । এরা বেশির ভাগ যৌথ পরিবারে বসবাস করেন। প্রতিটি মানুষের জীবন ও জীবিকার এক মাত্র পথ এই পাটি বোনা। মুন্সীগঞ্জের শীতলপাটি যাচ্ছে দেশের নানা প্রান্তে। এমনকি সিঙ্গাপুর, সৌদি আরবেও মুন্সীগঞ্জের শীতলপাটি কিনে নিয়ে যান প্রবাসী বাঙালিরা।


দেখা গেছে, এখানে নারী-পুরুষ পাটি তৈরির কাজ করে চলেছেন। পারিশ্রমিকে নারী-পুরুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। বেতন বৈষম্যহীনতার এক উদাহরণ বলা চলে পাইটাল পাড়া। পুরুষের বেতী তোলা আর নারীর বুননের মধ্যদিয়ে একটি পাটি পূর্ণতা পায়। এভাবেই তৈরি হচ্ছে রকমারি পাটি। পাটি তৈরির ইতিহাস প্রায় ২০০ বছরের বলে জানালেন ৯২ বছর বয়সের পাইটাল সন্তোষ ভদ্র। হিন্দু সম্প্র্রদায়ের কায়স্থ গোষ্ঠীর নারী-পুরুষ পাটি তৈরির কাজ করেন।
sital paty
এই বৃদ্ধ বয়সে এখনো তিনি বেতী তোলেন। তার স্ত্রী শ্যামলা রানী ভদ্র তা দিয়ে বুনেন পাটি। সন্তোষ ভদ্রের ছেলে বিশ্বনাথ ভদ্র (৪০) বাবার কাছ থেকে কাজ শিখেছেন। ছেলের বউ পুষ্প রানী ভদ্র বুনন শিখেছেন শাশুড়ির কাছ থেকে। আলাপকালে সন্তোষ ভদ্র জানান, তার বাবা বেতী তোলতেন আর মা বুনন করতেন। সন্তোষের ঠাকুরদা-ঠাকুরমাও পাটি তৈরি করতেন তার ও পূর্ব পুরুষেরাও এ পেশাতেই ছিলেন। এখানে কেউ বউ হয়ে আসলে তাকেও বুনন কাজ করতে হয়।

তবে সন্তোষ ভদ্র আক্ষেপের সঙ্গে বলেন- এখন আর পাটি তৈরিতে পোষায় না। সাধারণ পাটি তৈরিতে যে টাকা খরচ হয় তার থেকে ৫০-৬০ টাকা লাভে বিক্রি করা যায়। একটি সাধারণ পাটি তৈরিতে ২/৩ দিন লেগে যায়। দিন-রাত মিলিয়ে একটি পাটিতে যখন মাত্র ৫০-৬০ টাকা পাওয়া যায় তখন এ কাজকে সুখের বলে মনে হয় না। পাটি তৈরির উপাদান হচ্ছে মুতরা। সিলেট থেকে পাটিকররা মুতরা কিনে আনেন। এক একটি পাটিতে ৪০ টাকার মুতরা দরকার। তার উপর বেতী তোলা ও বুননের পারিশ্রমিক যোগ দিলে আর লাভে থাকে না। তবুও পেশায় জড়িয়ে আছি।

সরকারিভাবে পাইটালদের পৃষ্ঠপোষকতার আবেদন জানালেন সন্তোষ ভদ্র। তিনি শঙ্কায় আছেন তার উত্তরসূরিরা পেশাকে ধরে রাখতে পারবেন কি না।হয়তো তারা চলে যাবে অন্য পেশায়। এমনই আকুতি জানালেন পাইটাল কেশব লাল (৭৬) ও তার স্ত্রী মায়া রানী (৬১)। জানা গেছে, একটি শীতল পাটি তৈরি করতে একজনের ৫-৬ দিন লেগে যায়। শীতল পাটির বেতী তোলায় একজন পুরুষ পারিশ্রমিক পান ৩০০ টাকা। আর নারীও পান ৩০০ টাকা। শীতল পাটি তৈরিতে ১০০ টাকার মুতরা দরকার হয়। সব মিলিয়ে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা খরচ হয় একটি শীতল পাটিতে। অথচ বাজারে পাটি বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায়।

তবে বড় আকারের একটি শীতল পাটি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করা যায়। এ ক্ষেত্রে ৫-৬ দিনে একটি চমৎকার শীতল পাটি তৈরি করার পর বিক্রিতে লাভ থাকে ২০০ টাকার মতো। বুননের সময় রঙ্গীন বেতীর মাধ্যমে শীতল পাটিতে অঙ্গ সজ্জার কাজ করেন নারীরা। এতে সুন্দর হয়ে উঠে পাটি। রঙ্গীন বেতী দিয়ে শীতল পাটিতে নানা নক্সা ও আঁকা হয়ে থাকে।

বাংলাদেশ প্রতিদিন