সন্জীদা খাতুন – তাঁর সাঙ্গীতিক অভিযাত্রা

sanjidaমফিদুল হক
যেসব গুণীজন অবদান রচনা করেন জীবনের নানা ক্ষেত্রে, সদা সকল কাজে থাকেন পরম নিষ্ঠাব্রতী, গড়ে তোলেন সাফল্যের বিভিন্ন সাম্রাজ্য, সঙ্গতভাবেই হয়ে ওঠেন শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার উপলক্ষ, প্রতি ক্ষেত্রে তাঁদের মনে হবে একমেবাদ্বিতীয়ম, পরিণামে একক পরিচয়ের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায় তাঁদের অন্যতর কীর্তি ও অবদান, তাঁরা বিবেচ্য হন খণ্ডিতভাবে, তাঁদের পূর্ণতার মধ্য দিয়ে পাওয়া আমাদের বুঝি আর হয়ে ওঠে না। আমাদের খুব কাছের মানুষ, প্রাণের মানুষ, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মানুষ সন্জীদা খাতুনের জীবন-পরিক্রমণের আশি বছর পূর্ণ হওয়ার লগ্নে মনে জাগে এমন অনেক ভাবনা। তিনিও বহুগুণে গুণান্বিতা, বহু কর্মে সমর্পিতা। যদি বলা হয় সন্জীদা খাতুন কোন্ পরিচয়ে আমাদের কাছে প্রতিভাত হয়েছেন, তবে অনেকে অনেক কথা বলবেন এবং দেখা যাবে প্রত্যেক ক্ষেত্রে তিনি স্বকীয়তায় উজ্জ্বল, সৃজনশীলতায় মুখর এবং মানুষের ভেতরকার মানবসত্তার জাগরণ ঘটাতে উন্মুখ ও কর্মময়। সন্জীদা খাতুনের কৃতির মূল্যায়নে তাই সমস্যা থেকে যায় অনেক। কোন্ রূপে তিনি আমাদের সামনে উদ্ভাসিত সেটা বলতে গিয়ে গানের মানুষ, রবীন্দ্রসঙ্গীতের সাধক, শিক্ষক ও প্রচারক হিসেবে তাঁর কথাই বেশি উচ্চারিত হয়। কিন্তু কোন্ ধরনের গায়ক তিনি, কেমনই-বা তাঁর শিক্ষণের রূপ ও প্রকৃতি এমন জিজ্ঞাসার জবাব দিতে অনেকেই দ্বিধান্বিত হবেন।


গায়ক বা শিক্ষক হিসেবে স্মরণীয় অনেক গুণী শিল্পী রয়েছেন, কিন্তু আজীবন গানের শিক্ষাদান করে চলেছেন, সঙ্গীত বিদ্যায়তনের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে অদ্যাবধি প্রায় পঞ্চাশ বছরজুড়ে এর সকল কর্মের কাণ্ডারি হয়ে রয়েছেন অথচ সঙ্গীতকে কখনও পেশা বা অর্থাগমের অবলম্বন হিসেবে গ্রহণ করেননি, এমন উদাহরণ বিশেষ নেই। গান কখনও তাঁর ক্ষেত্রে জীবিকা হয়ে ওঠেনি, হয়েছে জীবনের অবলম্বন। এই যে বছরের পর বছর ধরে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের সঙ্গীত-শিক্ষা দিয়ে চলেছেন, শ্রেণীকক্ষে এবং এর বাইরে নিষ্ঠাব্রতীদের বিশেষভাবে আপন গৃহকোণে, গুরুমুখী বিদ্যার তপোবন আদর্শের আধুনিক রূপায়ণ ঘটিয়ে, তার বেলা আমরা কী বলবো! এ-তো গেল শিক্ষকতার ধরন বা কাঠামোগত দিক, সেখানে তাঁর সঙ্গে তুলনা টানবার মতো আর বিশেষ কাউকে পাওয়া যাবে না। এর বাইরেও প্রশ্ন থেকে যায় সঙ্গীতের কোন্ বোধ তিনি সঞ্চার করতে চেয়েছেন শিক্ষার্থীর অন্তরে, কীভাবে তিনি মূর্ত করে তোলেন গানের ভাবরূপ এবং সেই ভাবসম্পদে স্নাত করেন সঙ্গীত শিক্ষার্থীদের। এখানে গানের বাণী, সুর, গায়কী, রবীন্দ্রসঙ্গীতের বিশুদ্ধতা এমত অনেক দিকের সঙ্গে মিলেমিশে থাকে বাঙালির বিশেষভাবে তাঁর স্বদেশের মানুষের জীবনে, রবীন্দ্র-পরবর্তী যুগে, গান কীভাবে জাতির প্রাণ আলোড়িত করতে পেরেছে এবং প্রতিষ্ঠা পেয়েছে অন্তরে সেসব বাস্তবতা। এই অভিযাত্রার সাংস্কৃতিক সূচনাবিন্দু যদি ধরি বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি, তবে সাঙ্গীতিক যাত্রাক্ষণ হিসেবে আমরা চিহ্নিত করতে পারি উনিশ শো একষট্টি সালের রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষকালকে যখন কণ্ঠে গান তুলে নেওয়া ও সমস্বরে সম্মিলিতভাবে নিবেদিত হওয়ার মধ্য দিয়ে আরেক জাগরণ স্পর্শ লাভ করল বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠী।

পাকিস্তান আমলে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধাচরণের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কোন্ পরিস্থিতিতে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালিত হয়েছিল তা’ আমরা জানি। ঢাকাতে ব্যাপকভিত্তিক তিনটি প্রস্তুতি কমিটি গঠিত হয়েছিল এবং আয়োজনে ভিন্নতা থাকলেও উদ্যোক্তাদের মধ্যে সৌহার্দ্য বজায় ছিল পুরোপুরি। সুফিয়া কামালের পৌরহিত্যে গঠিত কমিটিতে ছিলেন সন্জীদা খাতুন, ওয়াহিদুল হক, সিধু ভাই, আহমেদুর রহমান, ছানা-মানিক ও আরও অনেকে। উদযাপন শেষে কমিটির কার্যকাল সমাপ্ত হয়ে গেলেও একটির ক্ষেত্রে নটে গাছটি মুড়ালো না, গোয়েন্দা-চক্ষু এড়িয়ে নিভৃত আলোচনায় সুবিধা হবে ভেবে তাঁরা মিলিত হয়েছিলেন জয়দেবপুরের শালবনে এবং বাঙালি সংস্কৃতির গীতনৃত্যরূপ উপস্থাপন ও শান্তিনিকেতনের আদলে প্রকৃতিসংলগ্ন ঋতুবন্দনা ও বৈশাখী উৎসব প্রবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে জন্ম লাভ করে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ‘ছায়ানট’। ছায়ানট তার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বাঙালিত্বের একটি আদল প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হয় এবং সঙ্গীতের ক্ষেত্রে প্রবর্তন করে উচ্চ আদর্শ। এই পথচলার সূত্রে সবাই গভীরভাবে অনুধাবন করেন সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে বাঙালিত্বের স্বরূপ সন্ধানের কাজ অগ্রসর করে নিতে হলে নতুন শিল্পী তৈরি করতে হবে অনেকানেক। সেই লক্ষ্যে ১৯৬৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ছায়ানট সঙ্গীত বিদ্যায়তন। কেবল সঙ্গীতচর্চা নয়, ছায়ানট নিজেকে যুক্ত করে আরও নানাধর্মী কর্মকাণ্ডে, দাঙ্গা প্রতিরোধ, দুর্গত ত্রাণ থেকে শুরু করে বাঙালির সংস্কৃতি সম্মেলনের আয়োজন_ এমনি বিচিত্রমুখী তৎপরতায় ছায়ানট হয়ে ওঠে ষাটের দশকে বাঙালি জাতির সত্তানুসন্ধানের প্রধান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। ক্রমে ক্রমে এই কর্মকাণ্ডের ভরকেন্দ্র হয়ে ওঠেন ওয়াহিদুল হক-সন্জীদা খাতুনের যুগল জীবনসাধনা, বহিরঙ্গে যদি থাকে ওয়াহিদুল হকের বড় ভূমিকা তো অন্তরঙ্গে বিশেষ ভূমিকা নেন সন্জীদা খাতুন।

এই যে সঙ্গীত হয়ে উঠল জাতির জাগরণ ও প্রতিরোধের বড় অবলম্বন, এমন প্রতিরোধের একদিকে ছিল ব্যক্তিগত মাত্রা, অনেক সাধনার মধ্য দিয়ে সঙ্গীতের দক্ষতা আয়ত্তে আনা এবং যূথবদ্ধভাবে সেই দক্ষতার সুরস্পর্শে অপরকে আলোড়িত, সচকিত ও জাগ্রত করা। অন্যদিকে এমন বিশাল পটভূমিকায় সঙ্গীতের যে পাঠ তাঁর অন্তর্মুখী গভীর আরেক মাত্রা উন্মোচিত হয় সন্জীদা খাতুনের প্রশিক্ষণ-ধারায়, যখন গানের বাণীর নিবিড় পাঠদান করেন তিনি, প্রতিটি কথার ব্যঞ্জনা বিশ্লেষণ করেন বিশদ, সুরতালের সকল দিক বারবার গেয়ে ও গাইয়ে বুঝিয়ে দেন শিক্ষার্থীকে, সুরের ছোঁয়ায় কীভাবে নতুন অর্থময়তা পায় বাণী, উপলব্ধির তৃতীয় আরেক স্তরে নিয়ে যায় আমাদের, হাজির করেন তার অসাধারণ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ। প্রাজ্ঞ এসব উপলব্ধি তিনি অর্জন করেছেন তাঁর সাহিত্য-সাধনা ও উচ্চতর গবেষণা দ্বারা যেখানে বাংলা কাব্যগীতি বিশ্লেষণ ও রবীন্দ্রসঙ্গীতের ভাবসম্পদ উন্মোচনে বিশ্বভারতীর সর্বোচ্চ ডিগ্রি ও ডক্টরেট সম্মাননা তাঁর লভ্য হয়। ক্রমান্বয়ে তিনি প্রবেশ করেন বাণীর পাঠগ্রহণের আরও গভীরে। তাঁর উচ্চতর গবেষণার অবলম্বন হয় ধ্বনির স্বকীয়তা অনুধাবন, আদিতে ছিল যে শব্দ তিনি যেন সুরধ্বনির সেই আদিম সত্তা অনুভব করতে সচেষ্ট হন এবং সেই প্রয়াস ভাষাতত্ত্ব ও সাহিত্যবিচারে বয়ে আনে নতুন মাত্রা। ফলে সন্জীদা খাতুনের সঙ্গীত পাঠদানে ভেতর-বাহিরের এমন নিবিড় সংযোগ ফুটে ওঠে যার তুলনা আর বিশেষ মিলবে না, কেননা এই বোধ তিনি অর্জন করেছেন দীর্ঘ জীবনসাধনার মধ্য দিয়ে, একা ও সম্মিলিতভাবে, আপন সমাজ ও স্বদেশের মুক্তি আয়োজনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে।

নিছক গান পরিবেশন নয়, তিনি তো ব্রতী হয়েছেন আরও গভীর বিশ্লেষণে, যেখানে কেবল মাত্রা-ছন্দ-তাল ঠিক রাখা নয়, গানের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলতে মাত্রা-সম-ফাঁককে মূল্য দিয়ে চলবার কথাও বলেন। বলেন শ্বাসযতির যথাযথ বিন্যাসের গুরুত্ব, অর্থযতিমাফিক বিরাম দেওয়ার কথা, যখন গায়ককে কেবল সুরের ছন্দের ভাগ বজায় রেখে গাইলেই চলবে না, স্বরলিপিতে প্রাণ-প্রতিষ্ঠায় হতে হবে দক্ষ। আবার গানের কথা নিয়েও তিনি সূক্ষ্ম বিচারের নানা পরিচয় রেখেছেন, কথার সামান্যতম হেরফেরও তাই তার মনোযোগ কাড়ে। লিখেছেন অল্প বয়সে শৈল দেবীর গাওয়া ‘যেদিন সকল মুকুল গেল ঝরে সেদিন ডাকলে কেন গো এমন করে আমায়’ গানটি শুনে মুগ্ধ হওয়ার কথা। তিনি জানাচ্ছেন, ‘ঐ সুর ঐ বাণী মুদ্রিত হয়ে গেছে মনে। বড় হয়ে স্বরলিপি খুলে দেখি বাণী অংশে ‘সেদিন’ কথাটি নেই, গীতবিতানেও নেই ‘সেদিন’। মন মানতে চায় না। শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্রভবনে গিয়ে গীতমালিকার প্রথম খণ্ডের পুরনো সংস্করণের খোঁজ করলাম, দ্বিতীয় সংস্করণের মুদ্রিত রূপে ‘সেদিন’ পেয়ে গেলাম। আনন্দিত মনে তখন থেকে ‘যেদিন সকল মুকুল গেল ঝরে সেদিন …’ গাইতে পারছি।”

তাঁর কর্মের আরেক দিক ভাষা, সাহিত্য ও সঙ্গীত বিষয়ক গবেষণা ও মৌলিক বিভিন্ন গ্রন্থের প্রকাশ। রবীন্দ্রনাথের গানের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে তাঁর গায়কসত্তা ও অধ্যাপকসত্তার অপূর্ব সম্মিলন ঘটেছিল এবং তিনি যে অবস্থান থেকে এর নানা ব্যাখ্যা-বিশেল্গষণ-পর্যবেক্ষণ হাজির করেছেন সেখানে তাঁর সঙ্গে তুলনীয় রবীন্দ্রবিশেল্গষক বিশেষ মিলবে না। পর্যবেক্ষণের বিস্তার ও গভীরতার নিরিখে তাঁকে অনায়াসে আবু সয়ীদ আইয়ুব কিংবা শঙ্খ ঘোষের পাশাপাশি আমরা দাঁড় করাতে পারি, উভয়ে সন্জীদা খাতুনের শ্রদ্ধাভাজন গুণমুগ্ধ ঘনিষ্ঠজন বটে, আইয়ুব দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে রবীন্দ্রনাথের গান ও কবিতায় শ্রেয়োবোধ ও মৃত্যুচিন্তার নানা ছায়াপাত লক্ষ্য করেছিলেন, শঙ্খ ঘোষ কবিতার নিবিড় পাঠের সার্থক বিভিন্ন পরিচয় দিয়েছেন, তেমনিভাবে সুর-সঙ্গীতবোধ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের গান ও কবিতা বিশ্লেষণে সন্জীদা খাতুন বয়ে এনেছেন অন্যতর মাত্রা ।
তিনি সেই সঙ্গীতসাধক, আপন হতে বাহির হয়ে যিনি দাঁড়িয়েছেন বাইরে, বৈরী বিশ্বে, এবং আপনের সঙ্গে সংযুক্তি ঘটিয়েছেন বিশ্বলোকের। এই মিলনের সূত্রে যে মুক্তি-আকুতির বিকাশ সেটা তাঁর জীবন-সাধনাকে জীবনসংগ্রামের সঙ্গে মিলিয়ে তৈরি করেছে পৃথক সত্তা। ফলে সৃজনের ও কর্মের কত_না রূপেই তাঁকে আমরা পাই। রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের সুবাদে দেশের নানা প্রান্তে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে তিনি তুলে দেন গান, সঙ্গীতশিক্ষকদের নিয়ে পরিচালনা করেন প্রশিক্ষণ, ব্রতচারী আন্দোলনের পুনর্জাগরণে ব্রতী হন বিশ্বায়নের কালে জাতির স্বকীয়তা অনুধাবনের প্রয়াস হিসেবে।

উপমহাদেশজুড়ে, বাঙালির বিশ্বে, রবীন্দ্রসঙ্গীতের পরম্পরার নিরিখে সন্জীদা খাতুনের তুলনীয় কাউকে আমি খুঁজে পাই না। অনেক খ্যাতকীর্তি গায়ক-গায়িকা রয়েছেন, সঙ্গীতে অবদানের জন্য তাঁরা নমস্য, সামাজিক দায়মোচনে প্রয়োজনমাফিক তাঁরা কেউ কেউ এগিয়েও এসেছেন, কিন্তু এমন পরিপূর্ণভাবে রবীন্দ্রনাথের গান উপলব্ধি করে সমাজে ব্যাপকভাবে বিস্তার করতে তাঁর মতো কাজ আর কে করেছে। সঙ্গীতগুরু বিচারে তাঁর তুলনা খুঁজতে গিয়ে আগ্রহের সঙ্গে লক্ষ্য করি সন্জীদা খাতুনের সাঙ্গিতীক অবদান বিবেচনার একটি সূত্র রেখে গেছেন তাঁর গণিতজ্ঞ পিতা ডক্টর কাজী মোতাহার হোসেন। রবীন্দ্রসঙ্গীতের পরম্পরা শুদ্ধতা ও সৃজনশীলতা নিয়ে বহমান থাকতে পারে কিনা সেই বিবেচনাকালে তিনি একরৈখিক ভাবনা পরিহার করে যথার্থ বিজ্ঞানীর মতো প্রবাহের একটি সূত্র দাঁড় করিয়েছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, “আটঘাট বেঁধে যতই শিক্ষাদান বা শিক্ষাগ্রহণ করা হোক জনপ্রিয়তার ফলে মুখে মুখে এর [রবীন্দ্রসঙ্গীতের] পরিবর্তন বা বিকৃতি বেশিদিন ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। কিছুদিন পরে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ওস্তাদদের মধ্যেই পার্থক্য দেখা দেবে। তবে এতে অতিমাত্রায় ঘাবড়াবার কারণ নাই। আমার মনে হয় প্রতিভাবানেরা হাতে হাতে প্রবহমান সঙ্গীতসূত্র ঊধর্ে্ব ধরে রেখেছেন। কিন্তু টেলিগ্রাফের তারের মতো, খুঁটির মাথায় সূত্রটা সঠিক উচ্চতা রক্ষা করলেও একটু দূরে গিয়ে প্রাকৃতিক নিয়মেই তা নুয়ে পড়ে। পূর্ববর্তীদের খুঁটির খানিক সামনে রবীন্দ্রনাথ যেমন অপসৃয়মান সঙ্গীতসূত্রের এক প্রান্তে নতুন খুঁটি গেড়েছেন। ভবিষ্যতে আর একজন ‘প্রতিভা’ এসে নুয়ে-পড়া সূত্রের প্রান্ত আবার তুলে ধরবেন, তারপর আর একজন, তারপর আর একজন_এইভাবে অগ্রগামী সূত্র ওঠা-নামা করতে করতেই চলতে থাকবে। উন্নতির প্রবাহ তো চিরকাল এমনি করে ঢেউ খেতে খেতেই ছুটে চলে।”
সংখ্যাতত্ত্ববিদ পিতা ডক্টর কাজী মোতাহার হোসেন এটা জানলে খুশি হতেন যে তাঁর কন্যা ডক্টর সন্জীদা খাতুন রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রবহমানতার একটি খুঁটি হিসেবে আপন প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন, নুয়ে-পড়া সঙ্গীতসূত্র আবার প্রতিষ্ঠা করেছেন সঠিক উচ্চতায় এবং এভাবে রবীন্দ্রসঙ্গীতধারায় আগামীর মানুষদের স্নাত হওয়ার উপায় তৈরি করে গেছেন। এ যে আমাদের জন্য অনেক বড় এক পাওয়া।

সমকাল