বিজয় চাই

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
পরাধীনতার আপদ আছে, বিপদও আছে। তার আগের প্রশ্ন অবশ্য আমরা কোন পরাধীনতার কথা বলছি। একটা পরাধীনতা হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদের। সে খুব বড় ব্যাপার। তার কথাটাই ধরা যাক। সাম্রাজ্যবাদ আমাদের জন্য এক সময় খুবই প্রত্যক্ষ ছিল। একবারে সামনা-সামনি দেখা যেত যে লালমুখো গোরারা শাসন করছে। সঙ্গে চাকর-বাকর ছিল। এখন নেই। সাম্রাজ্যবাদ এখন দূরে সরে গেছে। কিন্তু এখনো তো সে-ই শাসন করছে। ঋণ দেয়, আবদ্ধ করে জালে। ওয়ার্ল্ডব্যাংক আছে, আছে আইএমএফ, রয়েছে এনজিও। সাম্রাজ্যবাদ যখন সামনাসামনি ছিল, তখন তাকে দুটো ঢিল হলেও ছোঁড়া যেত, এখন তো সে দূরে রয়েছে, তাকে দেখাই যায় না, তার বিরুদ্ধে দাঁড়াব কী করে? দেখা জিনিস মিত্র হলেও ঘন ঘন দেখার বিরক্তিতে শত্রুর মতো ঠেকে, আর অদেখা শক্তি যখন শত্রুতা করে, তখনো মনে হয় অলৌকিক; যেহেতু অত্যন্ত রহস্যময়, তাই মিত্রই হবে।

যখন ইংরেজের অধীনে ছিলাম, তখন আর শোষণটা তেমন দেখতাম না, মনে করতাম অনেক কিছু পাচ্ছি আমরা। শিক্ষাদীক্ষা, শিল্পকলা, যন্ত্রপাতি- সবই তো ইংরেজের দেওয়া। দুটোই ছিল বিভ্রম। ইংরেজ অর্থনৈতিকভাবে শোষণ করে নিঃশেষ করে দিয়েছে। আবার সাংস্কৃতিকভাবে উন্নত করার যে আচ্ছাদন খাড়া করেছিল, তার আড়ালে অবনত করে রেখে দিয়ে গেছে আমাদের।

সাংস্কৃতিক অবনতি অত্যন্ত মারাত্মক বস্তু। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ আমাদের শিক্ষাদীক্ষা যা-ই দিক, ভেতরে ভেতরে যে আত্মসমর্পণ করতে শিখিয়ে দিয়ে গেল, সেই ক্ষতির পরিমাপ করব কী দিয়ে? সাম্রাজ্যবাদ ওই কাজটা করে। নির্ভরশীলতা শেখায়, আত্মবিশ্বাস কেড়ে নেয়। এর ফল তো আমরা দেখতেই পাই। বারবার স্বাধীন হচ্ছি, কিন্তু তবু স্বাধীন হচ্ছি না, পরাধীনতা রয়েই যাচ্ছে।

বাংলাদেশ আজকে অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় অধিক পরিমাণে সাম্রাজ্যবাদনির্ভর। আর এই নির্ভরতাকেই সাংস্কৃতিকভাবে আমরা মনে করছি গৌরবের ঘটনা। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটেছে, তার ফলে সাম্রাজ্যবাদ আজ যেন নব যৌবন লাভ করেছে, বিশ্ব আজ একই বিশ্ব, সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী যুদ্ধ; পালের গোদা মার্কিনসহ দুনিয়ার সব সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ছিল এই যুদ্ধে আমাদের বিরুদ্ধে, কিন্তু আজ দেখছি ওই যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে যে আওয়ামী লীগ, সেও তার সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থান সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হস্তে সাম্রাজ্যবাদের অনুগ্রহলাভে ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। এই যে সরে আসা, এর সাংস্কৃতিক তাৎপর্য মোটেই সামান্য নয়। এর অর্থ হচ্ছে আত্মসমর্পণ। মুক্তিযুদ্ধ ছিল বিজয়ের যুদ্ধ, তার নেতৃত্ব যদি আত্মসমর্পণ করে, তবে ভরসা করার জায়গা কতটা আর বাকি থাকে আমাদের জন্য।

এমনকি যুদ্ধের সময়ও তো দেখেছি আমরা, পরনির্ভরশীলতা কেমন উৎকটভাবে প্রকাশ পেয়েছে বারবার। অনেকেই আমরা চেয়েছি অন্যরা দ্রুত স্বীকৃতি দিক আমাদের, স্বীকৃতি দিয়ে ভারত ঢুকে পড়ুক বাংলাদেশে, শাস্তি দিক পাকিস্তানিদের। মুক্তির যুদ্ধকেও অন্যের যুদ্ধে পরিণত করার যে আকাঙ্ক্ষা, সেটা দীর্ঘকাল পরাধীন থাকার কারণেই গড়ে উঠেছে।

এই যে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকার মনোভাব, এটি ধর্মবাদিতাকে উৎসাহিত করে, প্রতিহত করে বিজ্ঞানচর্চাকে। ধর্ম বিশ্বাস করে ভক্তিতে, বিজ্ঞান আস্থা রাখে যুক্তিতে। এরা দুই-ই বিপরীত আসলে। আমাদের দেশে রাজভক্তি প্রবল ছিল, রাজভক্তি ঈশ্বরভক্তিকে পুষ্ট করেছে। ভক্তি পাত্র-অপাত্র ভেদাভেদ মানে না, বড় কিছু দেখলেই তার কাছে অবনত হয়। শাসক ইংরেজ আমাদের যতই ভক্তি শিখিয়েছে, ততই পরোক্ষে বিজ্ঞানের পথ থেকে সরিয়ে দিয়ে ঠেলে দিয়েছে ধর্মের পথে।

সবচেয়ে বড় পরিহাস এখানে যে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আমাদের যে বিদ্রোহ, সেটিও আশ্রয় খুঁজেছে ধর্মের কাছে। ছোট ইংরেজের অত্যাচারের বিরুদ্ধে আমরা যেন দরখাস্ত করেছি বড় ইংরেজের কাছে, বড় ইংরেজও যখন দেখেছি ন্যায়বিচার করছে না, তখন যাব আর কার কাছে? দরখাস্ত পাঠিয়েছি তাই ঈশ্বরের দরবারে। তিনি যদি বাঁচান, তবেই বাঁচি। ঈশ্বরের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে লড়াই করব ভেবেছি মানুষের শয়তানির বিরুদ্ধে। আমাদের ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদটা ছিল বিধর্মী। তাই তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহকে ‘ধর্মযুদ্ধ’ হিসেবে পরিচালনা করার প্রবণতা দেখা গেছে।
সব মিলিয়ে ঘটনা দাঁড়িয়েছে এই যে হয় আমরা আত্মসমর্পণ করেছি ইংরেজের কাছে, নয়তো আত্মসমর্পণ করব না বলে রুখে দাঁড়িয়ে আশ্রয় খুঁজেছি ঈশ্বরের কাছে। আত্মসমর্পণ আসলে দুভাবেই ঘটেছে। বলাই বাহুল্য, আত্মসমর্পণ ধর্মভাবকে উৎসাহিত করে, বিজ্ঞানমনস্কতাকে মোটেই প্রশ্রয় দেয় না। এ জন্যই দেখা গেছে, এই উপমহাদেশে বিজ্ঞানী দেখা যায়, বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতিও ব্যবহৃত হয়; কিন্তু বিজ্ঞান পাওয়া যায় না। বিজ্ঞানমনস্কতা স্তব্ধ হয় সাম্রাজ্যবাদপুষ্ট ধর্মবাদিতার হাতে।

এই উপমহাদেশে রাজনীতিকে ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন করার কাজটা যে এত কঠিন হয়ে রয়েছে, তার পেছনেও রয়েছে সাম্রাজ্যবাদের শাসন। জাতীয়তাবাদ ছিল সাম্রাজ্যবাদবিরোধী। সেটাই হওয়ার কথা এবং তা যে ঘটেনি, তাও নয়। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদ মনে হয় কৌতুক করেছে জাতীয়তাবাদের সঙ্গে। সে তাকে ইহজাগতিক হতে দেয়নি, করে দিয়েছে ধর্মভিত্তিক এবং পরিণামে সাম্প্রদায়িক। হিন্দু ও মুসলমান দুই প্রতিবেশী দুই জাতি মনে করল নিজেদের, ভাগ করে ফেলল ভারতবর্ষকে এবং এখনো অবসান ঘটাতে পারল না সাম্প্রদায়িক রাজনীতির। ইংরেজের নীতি ছিল বিভক্ত করো ও শাসন করোর। সেটা প্রত্যক্ষ ব্যাপার। অপ্রত্যক্ষ কাজটা ছিল আরো গভীর। সেটা হচ্ছে ওই ধর্মনির্ভরতার সৃষ্টি। ইংরেজ আছে এবং মনে হয় থাকবেই। তাকে আমরা সরাব কী করে ঈশ্বরের সাহায্য ভিন্ন- এই মনোভাব দুই সম্প্রদায়কে পাঠিয়ে দিল দুই দিকে এবং তারা পরস্পরের প্রধান শত্রু হয়ে দাঁড়াল। বাস্তবিক প্রভুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে মানুষ অলৌকিক প্রভুর আশ্রয় খুঁজল এবং অন্ধকারে মানুষ হত্যা করল মানুষকে, স্বাধীন হতে গিয়ে আটকা পড়ে গেল ধর্মবিশ্বাসের হাতে।

আমরা তো এখন খুবই আধুনিক। কিন্তু সত্যি আধুনিক কি? আমরা কি ত্যাগ করেছি আত্মসমর্পণের নীতি, আমরা কি লালন-পালন করছি না সামন্তবাদী পিছুটানগুলোকে? সাম্রাজ্যবাদের অধীনে সামন্তবাদ লালিত-পালিত হয় খুব চমৎকারভাবে। যেমন হয়েছে এ দেশে। মানুষ যখন অভিমানী হয়ে পড়ে নিজের দোষ-গুণ সবকিছু নিয়েই, তখন সে বড়াই করতে শুরু করে। গুণ নিয়ে তো করেই, দোষ নিয়েও বড়াই করে। সাম্রাজ্যবাদের অধীনে সাংস্কৃতিক বিপর্যয়ের এই দিকটাও কম মর্মান্তিক নয়। যেমন কথাশিল্পী শরৎচন্দ্রের কথা ধরা যাক, যাঁর জন্ম হয়েছিল ১৮৭৬ সালে; বাঙালির করুণ হৃদয়ের অতুলনীয় রূপকার তিনি। তাঁর সাহিত্যে মেয়েরা সেবায় ও সংযমে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এবং কথায়ও পুরুষের চেয়ে অধিক পারদর্শী। কিন্তু যখন তিনি পারিবারিক সম্পর্কে ভক্তি ও আনুগত্যকে অতি উচ্চমূল্য দেন, যখন আদর্শায়িত করেন সংস্কার ও পরনির্ভরতাকে এবং পুরনো সংস্কারের প্রতি পক্ষপাতিত্বকে, তখন বোঝা যায় তাঁর পক্ষপাত সামন্তবাদী সংস্কৃতির প্রতি, আরো বোঝা যায় যে সাম্রাজ্যবাদ কত বড় ক্ষতি করে রেখে গেছে আমাদের। শরৎচন্দ্র তাঁর রাজনৈতিক চিন্তায় অত্যন্ত স্পষ্টরূপে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ছিলেন; কিন্তু সাংস্কৃতিক চিন্তায় সামন্তবাদবিরোধী ছিলেন না। আবারও আগের কথায় ফিরে যেতে হয়, সাম্রাজ্যবাদ বড়ই দুমুখো- একদিকে সে তার প্রতি আনুগত্য সৃষ্টি করে, অন্যদিকে যখন বিদ্রোহ জমে ওঠে তার নিজের বিরুদ্ধে, তখন সেই বিদ্রোহকে নিস্তেজ করে দেয় সামন্তবাদের দিকে তাকে ঠেলে দিয়ে। কোন দিকে যাব?

আরেকজন অসামান্য শিল্পী ছিলেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়; জন্ম তাঁর ১৮৯৪ সালে। তিনি খাঁটি বাঙালি ছিলেন হৃদয়ানুভূতিতে। তাঁর দরিদ্র ব্রাহ্মণরাও অত্যন্ত জীবন্ত হৃদয়ের কারণে; কিন্তু ওই যে তাঁর নায়ক-নায়িকারা তাঁরা তাঁদের উচ্চতার অভিমান নিয়ে অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয় বটে; কিন্তু উন্নত হতে পারে না। তাঁরা প্রকৃতিপ্রেমিক হয়; কিন্তু প্রকৃতির ওপরে ওঠা যে মানুষের সংস্কৃতির জন্য অপরিহার্য, সেই ধারণাকে মোটেই প্রশ্রয় দেয় না। আর ওই যে আমাদের অসাধারণ চলচ্চিত্রশিল্পী সত্যজিৎ রায়, রবীন্দ্রনাথের পর যিনি দ্বিতীয় শিল্পী বাঙালিকে বিশ্বে পরিচিত করার ক্ষেত্রে, তিনি যে বিভূতিভূষণের উপন্যাস নিয়েই প্রথম আত্মপ্রকাশ করেছিলেন, সে ঘটনাও তাৎপর্যহীন নয়। তাঁর ছবিতে কবিতা আছে, দারিদ্র্যের কবিতা। আমরা সেই কবিতা অবশ্যই পড়ব; কিন্তু তাকে কি চূড়ান্ত বলে মেনে নেব?

না, নেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। সংস্কৃতিকে সাম্রাজ্যবাদের হাত থেকে মুক্ত করতে হবে, মুক্ত করা চাই তাকে সামন্তবাদের হাত থেকেও। আমাদের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মধ্যে ওই দুই মুক্তির আকাঙ্ক্ষা একসঙ্গে মিলেছিল, একাধারে ছিল সে বিদেশি ভাষার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে; এবং বাংলা ভাষা বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা নয়, সে ভাষা বাংলা হরফে লেখা বলে অপবিত্র- এই সামন্তবাদী ধারণার বিরুদ্ধেও। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ওই পথটা ধরেই এগোনোর কথা ছিল। এগিয়েছিও। আমরা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করেছি। কিন্তু পরিপূর্ণরূপে এখনো স্বাধীন হইনি, কেননা এখনো আমরা সাম্রাজ্যবাদের হাতে বন্দি। আমাদের সামন্তবাদী প্রবণতাগুলো সাম্রাজ্যবাদের অধীনস্থতার কারণেই এত পুষ্ট।

লেখক : শিক্ষাবিদ

কালের কন্ঠ