ঘৃণার বীজ ও গণহত্যার বিষবৃক্ষ

মফিদুল হক
সম্প্রতি ছায়ানটের পক্ষ থেকে সংবাদপত্রের পাতা ঘেঁটে সাংস্কৃতিক সংবাদের তত্ত্ব-তালাশ করা হচ্ছে এবং পুরনো পত্রিকা পর্যালোচনার শ্রমসাধ্য কাজটি করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক রেজিনা বেগম। তাঁর সুবাদে আমরা দেখতে পেলাম ১৯৬৩ সালের মাঝামাঝি দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক ছোট্ট সংবাদ। “এতদিনে ‘বাঙালি’ মানুষ হইল” শিরোনামের সংবাদে বলা হয়েছে :

“গতকল্য (সোমবার) লাহোর হইতে পি.পি.এ পরিবেশিত এক খবরে বলা হয় যে, পূর্ব পাকিস্তান সরকারের আপত্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করিয়া পাক-ভারত উপমহাদেশের প্রথম উর্দু অভিধান ‘ফিরোজ-উল-লুবাব’-এর প্রকাশক ফিরোজ সন্স উক্ত অভিধানের অংশবিশেষ বাদ দিয়া কিছু নতুন অংশ যোগ করিয়াছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, ফিরোজ সন্স প্রকাশিত উক্ত অভিধানে ‘বাঙাল’ শব্দের অর্থ লেখা ছিল ‘বাঙাল আগার আদমি হো তো প্রেত ক’হু কিসকো।’ দৈনিক ইত্তেফাকে এই তথ্য প্রকাশিত হইবার পরে প্রদেশের সুধীমহলে এ-ব্যাপারে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হইয়াছিল।”

সংক্ষিপ্ত সংবাদ, তবে নাটকীয়তা আছে অনেক, সংক্ষুব্ধ বোধ করবার কারণও রয়েছে নিন্দিত জাতিসত্তার, কিন্তু তার চেয়ে বড় প্রশ্ন কেন এমনটা লেখা হলো, এর পেছনে কাজ করেছে কোন্ মানস? খুব তলিয়ে না দেখেও বলা যায়, এই মানস হচ্ছে অপর জাতিসত্তা সম্পর্কে অজ্ঞতা ও অসহিষ্ণুতার প্রকাশ, অপরকে না-জানা থেকে সঞ্চারিত তাচ্ছিল্যের মনোভাব এবং এর মধ্য দিয়ে যা প্রকাশ পায় তা প্রকৃত অর্থে নিজ অজ্ঞতা ও কূপম-ূকতা। অভিধানে যে এমন ব্যাখ্যা স্থান পেতে পারে এবং বহাল থাকতে পারে দিব্যি সেটা এ-ও প্রকাশ করে যে, সেই ভাষাগোষ্ঠীর শিক্ষিত ও অগ্রণী গোষ্ঠীর মানসে চেতনাগত বিভ্রান্তি অনেক গভীর।

এখন, ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে, আমরা দেখব বিভ্রান্তির চোরাবালির ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছিল বেশ আগে থেকেই এবং দ্বিজাতি-তত্ত্বের সাম্প্রদায়িক বোধ সেই চোরাবালিতে টেনে নিয়ে চলেছিল বিশাল জনগোষ্ঠীকে। ফলে এটাও লক্ষণীয়, বাঙালী জাতিকে গালমন্দ করবার সময় উর্দু ভাষার নিয়ন্ত্রক এই গোষ্ঠী বাঙালী বলতে প্রকারান্তরে হিন্দুদেরই বুঝেছিলেন এবং পরিচয় দিয়েছিলেন চরম সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের। বাংলার মুসলমান, হাজার বছর ধরে যে ভাষা-সংস্কৃতির মধ্যে তারা লালিত, তাদের জাতিসত্তা সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণাও অভিধান-প্রণেতাদের ছিল না, বরং ছিল জাতিসত্তা বিষয়ে বিকৃত বিবেচনা। এই মনোভাব মরহুম পাকিস্তান রাষ্ট্র আগাগোড়া বহন করে চলেছিল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার স্বল্পকাল পর, ১৯৪৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর কার্জন হলে আয়োজিত সাহিত্য সম্মেলনে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ অমোঘ সত্যোচ্চারণ করেছিলেন যে, আমরা বাঙালী সেটা টিকি, দাড়ি, পৈতা বা টুপি দিয়ে ঢেকে রাখার জো নেই। তিনি বলেছিলেন, “আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বড় সত্য আমরা বাঙালী। এটি কোনো আদর্শের কথা নয়, এটি এক বাস্তব কথা। মা প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারায় ও ভাষায় বাঙালিত্বের এমন ছাপ মেরে দিয়েছেন যে, মালা-তিলকে টিকি কিংবা টুপি-লুঙ্গি-দাড়িতে ঢাকার জো নেই।” এই সভায় সভাপতিত্ব করছিলেন মুসলিম লীগ সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী হবীবুল্লাহ বাহার, তিনি ছিলেন সম্মেলনের অন্যতম উদ্যোক্তা ও অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি। উপস্থিত অবাঙালী স্বাস্থ্য-সচিব ফজলি আহমেদ ভালোই বুঝেছিলেন বক্তব্যের জোর এবং দিশা হারিয়ে অত্যন্ত অশোভনভাবে সভাপতির নির্দেশ উপেক্ষা করে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র নিন্দাবাদ করে বক্তব্য প্রদান করেন। পরে মন্ত্রী তাঁর সচিব সম্পর্কে কেন্দ্রে অভিযোগ উত্থাপন করলে তাঁকে স্বাস্থ্য দফতর থেকে সরিয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দফতরের দায়িত্ব দেয়া হয় এবং তিনি চট্টগ্রামের এক চরম দক্ষিণপন্থী তথাকথিত মাওলানার মাধ্যমে আরবি হরফে বাংলা লেখার আন্দোলন শুরুর ব্যর্থ প্রয়াস নেন। এই ঘটনায় আমরা যেমন এক আদর্শগত বিরোধ দেখি, দেখি জাতিসত্তার অস্বীকৃতি, তেমনি আরেক বাস্তব হলো পূর্ব বাংলায় মুসলিম লীগের সরকার গঠিত হলেও প্রশাসনের ওপর চেপে বসেছিল অবাঙালী ব্যক্তিরা, যারা কেবল গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনই পরিচালনা করছিলেন না, এদেশের মুখ্য সচিব অবাঙালী আজিজ আহমদের মাধ্যমে প্রশাসনের ওপর তাদের কর্তৃত্ব ছিল প্রায় নিরঙ্কুশ। এমন কি তাঁরা কোনোভাবেই মন্ত্রীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে সম্মত ছিলেন না এবং মন্ত্রীরা সেই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাতেও ছিলেন অপারগ।

১৯৪৮ সালে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র বক্তব্য তো ছিল এক সাংস্কৃতিক ঘোষণা, পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবে এই দ্বন্দ্ব প্রকটভাবে প্রকাশ পায় ১৯৪৮ সালেই, ব্যবস্থাপক সভার করাচি অধিবেশনে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উত্থাপিত উর্দুর পাশাপাশি বাংলার সমমর্যাদার দানের প্রস্তাবে। বলা বাহুল্য, সেই প্রস্তাব নাকচ হয়ে যায় অনতিবিলম্বে, যদিও বাংলা ভাষাভাষি ছিল পাকিস্তানের জনসংখ্যার ৫৬ শতাংশ মানুষ আর উর্দু মাতৃভাষা ছিল মাত্র ৬ শতাংশ অধিবাসীর। কিন্তু বাস্তবের দিকে চোখ ফিরিয়েই তো পাকিস্তানের যাত্রা আর তাই আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব উপেক্ষা করে চলল পাকিস্তানি রাষ্ট্র, সেখানে বাঙালীর প্রতি উপেক্ষা ও বাঙালীর অধিকারের অস্বীকৃতি চলেছিল হাতে হাত ধরে।

বাঙালীকে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী সব সময়েই এক সন্দেহ ও অবিশ্বাস নিয়ে বিবেচনা করেছে। কেননা তারা বুঝেছিল ভাষা-সংস্কৃতিভিত্তিক জাতিসত্তার বাস্তবতা তাদের দ্বিজাতিতত্ত্বের ফানুস ফুটো করে দেয়ার শলাকা বহন করছে। এমন শলাকার মতোই তো বিঁধেছিল ফজলি আহমদের বুকে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর উচ্চারণ। ফলে একদিকে কূপম-ূকতা-সঞ্জাত তাচ্ছিল্যতা পাকিস্তানীরা বহন করেছে, অন্যদিকে ক্ষমতার দাপটে চেয়েছে বাস্তব পাল্টে দিতে। এর নানা ধরনের প্রকাশ আমরা দেখি, ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষ উদযাপন তাই তাদের মনে হয়েছিল পাকিস্তানি আদর্শবিরোধী কর্মকা-, এই উৎসব রোধ করতে সক্রিয় হয়েছিল বিভিন্নভাবে। ১৯৬৩ সালেই বোধ করি, ঢাকায় শিক্ষক-লেখক-বুদ্ধিজীবীদের সমাবেশে এদেশের সাধারণ মানুষদের ‘হাইওয়ান’ বা জন্তু বলেছিলেন ‘লৌহমানব’ সামরিক প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান এবং প্রতিবাদে দাঁড়িয়ে সুফিয়া কামাল বলেছিলেন যে, আম আদমি যদি হাইওয়ান হয়ে থাকে তবে তাদের প্রেসিডেন্ট বা সদরে-রিয়াসত হিসেবে আপনি হলেন সদরে-হাইওয়ান, পশুকুলধিপতি।

বাঙালীকে একদা প্রেততুল্য মনে হয়েছিল যে পাকিস্তানীদের তারা অভিধান সংশোধন করে নিলেও সেই মানস থেকে কখনও মুক্ত হতে পারেনি, বরং বাঙালী জাতিসত্তার প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ-পাত্র তারা দিনে দিনে পূর্ণ করে তুলেছিল এবং এরই চরম প্রকাশ ঘটেছিল ২৫ মার্চ ১৯৭১ সূচিত ইতিহাসের ভয়ঙ্কর গণহত্যাযজ্ঞে। নয় মাসজুড়ে বাংলার বুকে পাকবাহিনী যে নৃশংস বর্বরতা চালিয়েছিল তার পেছনে মতাদর্শের ভিত্তি তাদের খুঁজে ফিরতে হয়েছিল। কাগজে-কলমে এই ভিত্তি হিসেবে দেশের অখ-তা ও সার্বভৌমত্বের আপ্তবাক্য উচ্চারণ করা হয়, কিন্তু এর শেকড় থাকে অন্যত্র, অপর জাতির প্রতি ঘৃণায় এবং সেই ঘৃণা-তাড়িত হয়ে জাতীয় বাস্তবতা অনুধাবনে সমূহ ব্যর্থতা, যার প্রকাশ পাকিস্তানি সমরনায়ক তথা গণহত্যার হোতারা অনেকভাবে ঘটিয়েছেন।

বুদ্ধিজীবী হত্যার নায়ক মেজর জেনারেল রাও ফারমান আলীর কাছে বাঙালী, মনে হয়েছে, তিন ধরনের হয়ে থাকে, ভুখা বাঙালী, বাবু বাঙালী ও জাদু বাঙালী। অর্থাৎ বাঙালী চিরক্ষুধার্ত, হা-ভাতে, ব্রিটিশের কেরানিগিরিতে অভ্যস্ত বাবু তারা এবং বাঙালী নারী জানে জাদু, পুরুষদের সহজে করে ফেলে বশীভূত।

জেনারেল নিয়াজীর কাছে মনে হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের মানুষেরা সজ্জন, তবে তাদের সর্বনাশ করেছে হিন্দু শিক্ষকেরা। তাঁর হিসেবে, প্রদেশের ২০ শতাংশ অধিবাসী হিন্দু এবং শিক্ষাক্ষেত্রে নিরঙ্কুশ আধিপত্য নিয়ে তারা মানুষের মগজ-ধোলাইয়ের কাজ করেছে। তিনি আত্মস্মৃতিতে লিখেছিলেন, “জনসংখ্যার ভিত্তিতে গঠিত ফেডারেল রাষ্ট্র কাঠামোতে যদি বাঙালীদের সংখ্যাগুরু প্রতিনিধিত্ব দেয়া হয় তবে তারা পরিণতিতে পশ্চিম পাকিস্তানীদের হটিয়ে দেবে, এমন আশঙ্কা তাদের ছিল। জনসংখ্যার বিশ শতাংশ যেখানে শিক্ষিত হিন্দু এবং জীবনের সর্বক্ষেত্রে তাদের আধিপত্য, তখন জাতীয় নীতি-নির্ধারণে তাদের নির্দেশনা রুখবে কে? বাঙালীরা সরকার গঠন করবে, কিন্তু মখমলের দস্তানার আবরণের আড়ালে কাজ করবে হিন্দুদের লৌহমুষ্টি।” এহেন মনোভাবপূর্ণ গোষ্ঠীর হাতে রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতা কুক্ষিগত হওয়ার পরিণতি আমরা দেখি ২৫ মার্চ গণহত্যাভিযান শুরুর পর পর ২৭ মার্চ ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে সেনা কমান্ডারদের স্টাফ কনফারেন্সে, যেখানে আলোচনা চলেছিল উদ্দাম ও উদভ্রান্ত, বর্বরদের হাতে নিয়ন্ত্রণহীন অপরিসীম সশস্ত্রক্ষমতা প্রদত্ত হলে কী হতে পারে তার পরিচয়বহ। এইসব আলোচনা থেকে উৎসারিত হয়েছে গোটা জাতি এবং বিশেষভাবে তার অন্তর্গত হিন্দু ধর্মগোষ্ঠী ও শিক্ষিত বুদ্ধিজীবীদের বিরুদ্ধে প্রবল আক্রোশ। এমন নৃশংস হত্যাভিযানে সমর্থন ও ইন্ধন জুগিয়েছে যে-মতাদর্শ তার প্রতিফলন মেলে এখানে। সম্মেলনে উপস্থিত পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার এ.আর. সিদ্দিকী পরে তাঁর স্মৃতিকথা, “ইস্ট পাকিস্তান : দ্য এ্যান্ড গেম”-এ লিখেছেন:

“ব্রিগেডিয়ার জিলানি লম্বা সময় নিয়ে বললেন বাঙালীদের মন জয় করবার জন্য মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ পরিচালনা বিষয়ে। তিনি বললেন, পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে সাংস্কৃতিক বিযুক্তির প্রক্রিয়া অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। সেজন্য বাংলা ভাষার হিন্দি হরফ পালটে উর্দু হরফ প্রবর্তন করতে হবে এবং বাংলার সংস্কৃতিতে যত হিন্দি প্রভাব আছে তা দূর করতে হবে। সরাসরি এই লক্ষে এগোবার এটাই উপযুক্ত সময়। বাঙালী জনসাধারণ নিয়ে তো তেমন সমস্যা নেই, তারা সরল খোদাভীরু মানুষ, সমস্যা হলো শিক্ষিত মধ্যবিত্ত গোষ্ঠীÑ শিক্ষক, আইনজীবী, বুদ্ধিজীবী (তাঁর মতে এদের অধিকাংশ হিন্দু), যারা রয়েছে সকল অনৈসলামী কর্মকা-ের পেছনে।

কমান্ডারদের সম্মেলনে এটাও বলা হয় যে, রেডিওতে রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্প্রচার অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। কিছুটা আলোচনার পর এক্ষেত্রে ধীরে এগোবার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ব্রিগেডিয়ার জিলানী মনে করেন, বাংলার সংস্কৃতির আরাধ্য দেবীকে আঘাত হানলে সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যাবে। বেশি স্বাধীনতা বাঙালীদের জন্য মঙ্গলজনক নয়। শত শত বছর ধরে তারা স্বাধীনতা পায়নি এবং স্বাধীনতা দিলে তারা সব গোল পাকিয়ে ফেলবে।”

এই ছিল বাঙালী জাতির প্রতি পাক সামরিকবাহিনীর নেতৃপর্যায়ের দৃষ্টিভঙ্গি এবং অস্ত্রের যথেচ্ছ প্রয়োগ দ্বারা তারা দেশে বয়ে আনে রক্তের বন্যা ও শেষাবধি প্রায় এক লক্ষ সদস্য-সংবলিত বাহিনীর বীর পুঙ্গবেরা চরম কাপুরুষের মতো আত্মসমর্পণ করে মুক্তিবাহিনীর শৌর্যের কাছে।
বাংলাদেশের গণহত্যা সংঘটনের পেছনে মতাদর্শগত ভিত্তি জুগিয়েছে দ্বিজাতি-তত্ত্বভিত্তিক জাতিগত অন্ধতা, বৈরিতা ও সহিংসতা। এর নানা প্রকাশ নানা সময়ে আমরা দেখেছি, সাম্প্রদায়িকতা হয়েছে গণহত্যার মানস পরিপুষ্টির বড় অবলম্বন, আর এই মনোভাব উস্কে দিয়েছে ঘৃণা প্রচারমূলক বিচিত্র ধরনের বক্তৃতা-বিবৃতি-ভাষণ। এক জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অপর জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে বিদ্বেষ ও ঘৃণা প্রচার অত্যন্ত বিপজ্জনক প্রবণতা। রাষ্ট্র ও ক্ষমতার প্রশ্রয় পেলে এই প্রবণতা ক্রমে দানবীয় হয়ে হিংস্র রক্তাক্ত আঘাত হানে, সংঘটন করে গণহত্যা, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণহত্যার বিচারের জন্য যে ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছে সেখানে বিচারকদের বড় দায়িত্ব হয়েছে গণহত্যার উদগাতা হিসেবে ‘হেট স্পিচ’-এর ভূমিকা উদঘাটন এবং ‘বিদ্বেষ প্রচারকদের’ চিহ্নিত করে দ-দান। এহেন অপরাধ আন্তর্জাতিক আইনে সশস্ত্র গণহত্যাকারীদের অপরাধের মতোই সমভাবে বিবেচনা করা হয়। প্রাক্তন যুগোশ্লাভিয়া ও রুয়ান্ডায় গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য বিদ্বেষ প্রচারকরাও সমভাবে দ-িত হয়েছে। নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালে ফাঁসির দ-প্রাপ্ত মুষ্টিমেয়জনের মধ্যে ছিলেন ‘হেট ক্যাম্পেইন’-এর নায়ক, নাৎসি পার্টির দলীয় সাপ্তাহিকের সম্পাদক, জোশেফ স্ট্রাইশার।

বাংলাদেশের ট্রাইব্যুনালেও গণহত্যায় উস্কানিদাতা ও সহায়তাকারীর ভূমিকা বারবার উঠে আসছে এবং এই অপরাধে চিহ্নিত হয়েছেন বেশ কয়েকজন অভিযুক্ত। আদালতে আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে চলবে বিচার, সমাজ সেখান থেকে আহরণ করবে শক্তি এবং অতীতে ঘৃণা প্রচারক অপরাধের জন্য দায়ীদের বিচার বর্তমানের জন্য করে তুলতে হবে প্রযোজ্য। সমাজ যেন ঘৃণার উৎসমুখগুলো বন্ধ করতে পারে, দ-িত করতে পারে দায়ী ব্যক্তিদের, সেটা নিশ্চিত করা জরুরী অসাম্প্রদায়িক উদার সহনশীল ও সম্প্রীতিময় বাংলাদেশ গড়বার জন্য। গণহত্যার ইতিহাসের অতীত থেকে তাই আমাদের শিক্ষা নেয়ার রয়েছে অনেক।

জনকন্ঠ