জাতীয় সরকারও হতে পারে শেষ ভরসা

এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী
নির্বাচনকালীন সরকার পদ্ধতি নিয়ে প্রধান দুই দল বা জোটের অবস্থান বিপরীত মেরুতে। ওদিকে এগিয়ে আসছে পরবর্তী সংসদ নির্বাচনের দিন। রাজনৈতিক পরিস্থিতি দিনকে দিন উত্তপ্ত হচ্ছে। এই অবস্থায় করণীয় কী? এসব প্রশ্নে কালের কণ্ঠের মুখোমুখি হয়েছিলেন বিকল্পধারা বাংলাদেশের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আলী হাবিব ও মোশাররফ বাবলু

কালের কণ্ঠ : কোনদিকে যাচ্ছে দেশ? সহিংস রাজনীতির পথে হাঁটছে? বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
বদরুদ্দোজা চৌধুরী : দেশ নিশ্চিতভাবেই সংঘর্ষের দিকে যাচ্ছে। সহিংসতার পথেই যাচ্ছে। সংঘর্ষ শুরু হয়ে গেছে। দিন যত গড়াবে, তত বেশি সংঘাতের দিকে যাবে। এক পর্যায়ে এটা গৃহযুদ্ধের দিকেই যাবেম- এমন ভয় পাচ্ছি। এভাবেই যদি চলতে থাকে তাহলে আমি শঙ্কিত হচ্ছি। শঙ্কার যথেষ্ট কারণ আছে।

কালের কণ্ঠ : গৃহযুদ্ধের কথা বললেন আপনি। তার নমুনা কী দেখছেন আপনি?
বদরুদ্দোজা চৌধুরী : নমুনা অনেক আছে। কালই জামায়াতকে নিষিদ্ধ করুন। পর দিনই তারা পথে নেমে যাবে। জামায়াত নিষিদ্ধ করার অনেক যুক্তি হয়তো সরকারের কাছে আছে। কিন্তু বন্ধ করলে তারা তাদের অস্তিত্বের লড়াই শুরু করবে, আন্দোলনে যাবে। জামায়াতের একটি ভোট ব্যাংক আছে। আজ জামায়াত নিষিদ্ধ করা হলে, সব ভোট বিএনপির পকেটে চলে যাবে। জামায়াতি ভোট অন্তত আওয়ামী লীগ পাবে না। এই বিষয়টি আওয়ামী লীগের কাছেও স্পষ্ট। এ কারণেই সরকার এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বা নিচ্ছে না।

কালের কণ্ঠ : এর অর্থ কি এই দাঁড়ায় যে ভোটের কথা চিন্তা করেই সরকার জামায়াতের সঙ্গে একটা আপস-রফায় যেতে চায়?
বদরুদ্দোজা চৌধুরী : যেতেও পারে, না-ও যেতে পারে। ওতে আমাদের কিছু এসে যায় না। কিন্তু ব্যাপারটা যদি আমাদের ক্ষেত্রে হতো, তাহলে আমি অবশ্যই ভোটের রাজনীতি মাথায় রাখতাম। জামায়াত নিষিদ্ধ করলে আমার ভোটের লাভ হবে, কি হবে না, সেটা আমরা চিন্তা করতাম। আগে ভোটের অঙ্ক হিসাব করতে হবে। অনেক বিষয় নিয়ে ভাবতে হবে। এখন যে সহিংসতা ঘটছে, জামায়াত নিষিদ্ধ করলে তার অবস্থা কী দাঁড়াবে সেটা ভাবতে হবে। ভাবতে হবে অর্থনীতি নিয়েও। কাজেই এই সংকটময় রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া সরকারের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। ধরা যাক, জামায়াত আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেল। তা হলে কী হবে? প্রতি দিন আমাদের অর্থনীতির ওপর আঘাত আসবে। সরকার নির্বাচন করতে গেলে সেই নির্বাচন বাধাগ্রস্ত হবে। আমার ধারণা, এসব বিষয় সরকারের বিবেচনায় আছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে ভাবছেন। না ভেবে তিনি পারেন না। দেশ চালাতে হলে অনেক বিষয় ভাবতে হয়, বিবেচনা করতে হয়। আবেগ দিয়ে অনেক কিছু হয়তো করা যায়, দেশ চালানো যায় না।

কালের কণ্ঠ : এই সাংঘর্ষিক পরিস্থিতিতে সরকারের ভূমিকা ও সরকারি দলের আচরণ নিয়ে কিছু বলুন।
বদরুদ্দোজা চৌধুরী : আমার মনে হয়, সরকারের কাছে সময় এখন অনেক মূল্যবান। যে কাজটি সরকার অনেক আগে করতে পারত, তা করেনি। সরকারের প্রথম দায়িত্ব ছিল বিরোধী দলকে আলোচনার টেবিলে আনা। সরকার সে কাজটি করতে পারেনি। স্পিকারের দায়িত্ব ছিল বিরোধী দলকে সংসদে আনা। সম্ভব হয়নি। বিরোধী দলের কাছে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা তুলে ধরতে পারেনি। সরকারের ভূমিকা বা সরকারি দলের আচরণ নিয়ে বললে বলতে হবে, কারো ভূমিকা সঠিক নয়। আলোচনার পথ খোলা রাখতে হবে। স্পিকার নিজেই তো একটা ভূমিকা রাখতে পারতেন। অবশ্য স্পিকারকে ভূমিকা রাখতে দেওয়া হচ্ছে কি না, সেটাও একটা প্রশ্ন। যেকোনোভাবে বিরোধী দলকে সংসদে হাজির রাখতে হবে। আর আমাদের এখানে ঘটছে তার উল্টো। বিরোধী দলকে সংসদের বাইরে রাখার সব কৌশল করা হচ্ছে। আমি বিষয়টিকে তিন ভাগে ভাগ করতে চাই। রাজনীতি সংসদের ভেতরে, রাজনীতি প্রশাসনের মাধ্যমে, রাজনীতি দলের মাধ্যমে। এখন একটা একটা করে বিবেচনা করতে হবে, শত ভাগ কাজ কি সরকার করতে পেরেছে?

কালের কণ্ঠ : প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকা কী মনে হচ্ছে?
বদরুদ্দোজা চৌধুরী : এখানে আরেকটি প্রশ্ন আছে। বিরোধী দলকে তার ভূমিকা পালন করতে দেওয়া হচ্ছে কি না! সংসদে বিরোধী দলকে তো কথাই বলতে দেওয়া হয় না। কথা বলতে গেলেই আক্রমণ করা হয়। প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধে কথা বলা হয়। জঘন্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়। কাজেই বিরোধী দল সংসদে টিকতে পারেনি। টিকতে দেওয়া হয়নি। বিরোধী দলকে সংসদ থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য করা হয়েছে।

কালের কণ্ঠ : সংসদে যখন কোনো ভূমিকা নেওয়া যায়নি, তখন সংসদের বাইরেও তো মীমাংসার একটা উদ্যোগ নেওয়া যেত।
বদরুদ্দোজা চৌধুরী : সংসদে গালিগালাজ করা হয়, এর চেয়ে খারাপ আর কী হতে পারে? সংসদের ভেতরে-বাইরে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সরকারি দল বা সরকার উদ্যোগী না হলে বিরোধী দল উদ্যোগী হতে পারে- এমন কথা উঠতে পারে। বিরোধী দল অনেকবার উদ্যোগ নিয়েছে। সংসদে যেসব কথাবার্তা হয়, শুনলে খারাপ লাগে। বলা হতে পারে, বিরোধী দল জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে সংসদে যেতে পারে। ধরে নেওয়া যাক, গেল। তার পর কী হবে? সেই একই কাণ্ড শুরু হবে। দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, এই সংসদকে একদলীয় সংসদ করা হয়েছে।

কালের কণ্ঠ : দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার চেষ্টা হয়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা হয়েছে। তাদের বাড়িঘর-উপাসনালয় পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আপনার নিজের জেলাতেও এমন ঘটনা ঘটেছে। সংখ্যালঘুদের ওপর এই আক্রমণ কেন?
বদরুদ্দোজা চৌধুরী : আমার সন্দেহ, একটি চিহ্নিত মহল এ কাজটি করিয়েছে। কিন্তু আমি মনে করি, সন্দেহের তীর জামায়াত-শিবিরের দিকে। বিষয়টা খুব স্পষ্ট। যদি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হয়, সরকারের কী লাভ? যদি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হয়, বিরোধী দলের কী লাভ? বিষয়টিকে এভাবে দুই ভাগে ভাগ করতে হবে। আরো বিষয় আছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে কী লাভ! নির্বাচনে ভোটের কী লাভ? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেলেই এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া যাবে। যা ঘটেছে, তাতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হয়নি, হিন্দুদের ওপর অত্যাচার করা হয়েছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের প্রশ্ন উঠলে বলব, সেটা আর কোনো দিন হবে না। পাকিস্তান আমলে যা হওয়ার হয়ে গেছে। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ বাংলাদেশের মুসলমানসমাজ অত্যন্ত সহনশীল। এর নেপথ্যের রাজনৈতিক কারণটা দেখতে হবে। হ্যাঁ, একটা গোলযোগ লাগিয়ে দিতে পারলে তার প্রভাব বিচারের ওপর পড়বে। আন্তর্জাতিক মহল থেকে প্রশ্ন উঠবে, এটা আমার ধারণা।

কালের কণ্ঠ : আক্রান্ত হয়েছে পুলিশও। দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিহত হয়েছেন সাত পুলিশ সদস্য। পুলিশ হত্যার বিষয়টিকে কিভাবে দেখছেন?
বদরুদ্দোজা চৌধুরী : দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশ সদস্যরা নিহত হয়েছেন- এটা খুবই খারাপ কথা। আগেও যে এমন ঘটনা ঘটেনি, তা নয়। তবে আমি মনে করি, এ জাতীয় ঘটনা খুবই নিন্দনীয়। এই যে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে, এর দায়িত্ব কে বহন করবে? বিরোধী দল কি এই দায়িত্ব নেবে? নিশ্চয়ই বিরোধী দলের একটা দায়িত্ব আছে। সরকারের কি কোনোই দায়িত্ব নেই? মানুষের ওপর যেভাবে গুলি করা হয়েছে, তাতে তো প্রশ্ন ওঠে, কাউকে কি পাখি মারার প্রশিক্ষণে পাঠানো হয়েছিল? এভাবে তো চলতে পারে না। ব্যাখ্যা প্রয়োজন। ব্যাখ্যা দিতে হবে।

কালের কণ্ঠ : বিএনপি অফিসে পুলিশের অভিযান সম্পর্কে কিছু বলুন।
বদরুদ্দোজা চৌধুরী : এ ঘটনা তো আমরা সবাই সংবাদমাধ্যমে প্রত্যক্ষ করেছি। তালাবদ্ধ ঘরে লাথি মেরে, লোহার রড দিয়ে আঘাত করে দরজা ভাঙা হয়েছে। এই অধিকার কে দিয়েছে? সরকার বলতে পারে, বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন তারাও একই ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছিল। তা করুক না। বিএনপির সঙ্গে তা হলে বর্তমান সরকারের পার্থক্য কোথায়? প্রশ্নটা আজ গণতন্ত্রের। বিএনপি অফিসে পুলিশের এই অভিযান গণতন্ত্রকে কঠিন এক প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। হিটলারের মতো দলে দলে লোক ধরে নিয়ে যাওয়া হলো। এসব দেখলে আতঙ্ক হয়। রাজনীতি করতেও ভয় লাগে। আচ্ছা বেশ ধরে নিয়ে যাওয়া হলো; তিনজনকে আবার ছেড়ে দেওয়া হলো। যদি তাঁদের কোনো অপরাধ না থাকে তাহলে ধরা হলো কেন? পুরো ঘটনাটাই যে উদ্দেশ্যমূলক ছিল, তা বুঝতে কষ্ট হয় না। সরকারের এই অসাধু উদ্দেশ্য আমি সমর্থন করতে পারি না। বিএনপি অফিসে পুলিশের যে অভিযান, এটা গণতন্ত্রের জন্য শুভ হবে না। এটা অগ্রহণযোগ্য।

কালের কণ্ঠ : শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ, তরুণ প্রজন্মের এই বিক্ষোভ, এটাকে আপনি কিভাবে দেখছেন।
বদরুদ্দোজা চৌধুরী : শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ যখন শুরু হয়েছিল, বাংলাদেশের সব মানুষের সঙ্গে আমরাও খুব আশান্বিত হয়েছিলাম এই ভেবে যে তরুণ প্রজন্ম একটা দায়িত্ব গ্রহণ করল। অবশ্যই আশাপ্রদ ঘটনা। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই দেখা গেল, সব কিছুই হচ্ছে পুলিশ প্রোটেকশনের ভেতরে। তখন বুঝতে বাকি থাকল না, এরা সরকারের বিরুদ্ধে কিছু করবে না। বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে গেল। সরকারের সব ধরনের সহযোগিতা সেখানে দেওয়া হয়েছে। এমনকি পানি-খাবার ইত্যাদিও দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি কিন্তু সবার কাছেই পরিষ্কার। এটা ‘ওপেন সিক্রেট’। বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য, কয়েকজন মন্ত্রী সেখানে বক্তৃতা দিয়ে গেলেন। কিন্তু তার পরও বলি, ওরা আমাদের সন্তান। আমরা ওদের ওন করি। স্বাধীনতার মূলমন্ত্রের সঙ্গে তাদের অনেক কিছু মিলে যায়। আমরা তাদের সমর্থন করব। তার পরও বলি, ‘দে আর প্রোটেক্টেড বাই দ্য গভর্নমেন্ট, দে আর প্রোভাইডেড বাই দ্য গভর্নমেন্ট, দে আর নারিশ বাই দ্য গভর্নমেন্ট।’ আমি ওদের বিরুদ্ধে নই। কিন্তু বুঝে উঠতে চাইছি, ওরা কি সঠিক পথে আছে; নাকি পথচ্যুত করা হয়েছে।

শাহবাগ বিষয়ে বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়েও অনেক কথা হয়েছে। আমার মনে হয়, বিরোধী দল বিষয়টিকে দূর থেকে অবজার্ভ করেছে। রাজনীতিতে যখন কোনো ইস্যু হয়, কেউ ঝাঁপ দিয়ে পড়ে, কেউ অবজার্ভ করে। আমি নিজেও অবজার্ভ করতে ভালোবাসি। কিন্তু নতুন প্রজন্মের যে স্পিরিট, সেটাকে আমি দারুণভাবে সমর্থন করি। এত বড় একটা জমায়েত এত দিন ধরে হয়েছে, এটা কোনো রাজনৈতিক দল করতে গেলে বা করলে নাশকতা হতো। কিন্তু তারা সেদিকে যায়নি। তার পরও এই সমাবেশের দলীয়করণ হয়ে গেছে বলে আমি মনে করি।

কালের কণ্ঠ : বিরোধী দলের নেত্রী এই সমাবেশ নিয়ে যে মন্তব্য করেছেন, সে বিষয়ে কিছু বলবেন?
বদরুদ্দোজা চৌধুরী : তাঁর বক্তব্য আমি ওন করি না। তিনি বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতেন তাহলে বলতেন, অনেকে বলে থাকে ওখানে অনেক নাস্তিক আছে। আমি সাধারণভাবে মনে করি, কোনো ঢালাও মন্তব্য করা উচিত নয়।

কালের কণ্ঠ : যুদ্ধাপরাধীদের মামলার রায় দেওয়া শুরু হয়েছে। তিনজনের বিচার হয়েছে। আপনার মূল্যায়ন কী?
বদরুদ্দোজা চৌধুরী : আমার মূল্যায়ন খুব কঠিন ও শক্ত হবে। প্রথম যে রায়টি হয়েছে, সেখানে দেখা গেল ‘ইন-অ্যাবসেন্সিয়া’ ফাঁসি হয়েছে। অপরাধ প্রমাণিত হলে তো শাস্তি হবেই। দ্বিতীয় যে রায়টি হয়েছে সেই রায়ে আসামি যে খুশি হয়েছেন, সেটা তাঁর ‘ভি’ চিহ্ন দেখানো থেকেই তো প্রমাণিত হয়। ওই রায়ের পর ‘ফাঁসি চাই. ফাঁসি চাই’ বলে আন্দোলন শুরু হয়ে গেল। কিছু কিছু বিষয়ে আমাদের খুব খটকা লাগে। সাঈদীর দুই অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এখন যদি আপিলে বাতিল হয়ে যায়, তখন কী হবে? যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আমি চাই। প্রথম থেকেই চাই। কিন্তু একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া থাকতে হবে। এখানে ধারাবাহিকতা বিঘি্নত হয়েছে। মূল্যায়নের প্রশ্ন করলে আমি বলব, এটাকে আন্তর্জাতিক মানের বলা হয়, কিন্তু এই মান নিয়ে প্রশ্ন আছে।

কালের কণ্ঠ : নির্বাচনকালীন সরকার পদ্ধতি নিয়েই মূলত রাজনৈতিক মেরুকরণ। তত্ত্বাবধায়ক না অন্তর্বর্তীকালীন- সমাধান কোন পথে?
বদরুদ্দোজা চৌধুরী : যদি আমি দেশের প্রধানমন্ত্রী হতাম, তাহলে আমি ভাবতাম প্রথম দায়িত্ব আমার। আমাদের দেশে সরকার ও বিরোধী দল দুই দিকে মুখ করে আছে। এ রকম পৃথিবীর অনেক দেশেই হয়। সমাধান কোথাও ঠেকে থাকেনি। বিরোধী দল হরতাল ডেকেছে। ডাকুক। আমাকে আমার দায়িত্ব পালন করতে হবে। আমি পরিষ্কার করেই বলছি, প্রধানমন্ত্রী ইচ্ছে করলে তাঁর দায়িত্ব আরো সূচারুভাবে পালন করতে পারতেন। ত্যাগ স্বীকার করতে হবে তাঁকে। আমিই রাজা, অতএব, আমি যাব না, এই মনোভাব ত্যাগ করতে হবে। তিনি তো স্পিকারকেও বলতে পারেন বিরোধী দলকে ডাকার জন্য।


আর নির্বাচনকালীন সরকার পদ্ধতি নিয়ে যদি কথা বলেন, তাহলে বলব এর চেয়ে সহজ কোনো কাজ নেই। যেটা ছিল না, সেটা যদি আনা যায়, যেটা ছিল সেটা যদি বাতিল করা যায়, তাহলে আবার ফেরা যাবে না কেন? একটা পরিবর্তন আনতে কত মিনিট সময় লাগে? একটা সংশোধনী লাগবে। শুধু বলতে হবে, ‘আগের স্থিতি অবস্থা বজায় থাকবে’।

কালের কণ্ঠ : এই যে সংলাপের কথা বলা হচ্ছে, সেই সংলাপ কেমন করে হতে পারে?
বদরুদ্দোজা চৌধুরী : প্রধানমন্ত্রী এমন একটা অবস্থান, একটা স্টেটমেন্ট দিলেই হয়ে যায়। জাতির উদ্দেশে তিনি একটা বক্তৃতা দেবেন। সেখানে তিনি দেশের অবস্থা তুলে ধরে বিরোধী দলের নেতাকে আলাপের জন্য বা সংলাপের জন্য আহবান জানাবেন। সেই সংলাপ যেকোনো জায়গায় হতে পারে। দেশেও হতে পারে, দেশের বাইরেও হতে পারে। সংসদের ভেতরে হতে পারে, সংসদের বাইরে হতে পারে।

কালের কণ্ঠ : নাকি ঐকমত্যের জাতীয় সরকারই হতে পারে আমাদের শেষ ভরসা?
বদরুদ্দোজা চৌধুরী : হতেই পারে। শেষ পর্যন্ত জাতীয় সরকারও হতে পারে শেষ ভরসা। কেমন হবে সেই জাতীয় সরকার, সেটাই প্রশ্ন। এমন হতে পারে সরকার ও বিরোধী দল থেকে সমানসংখ্যক নির্বাচিত সদস্য দেওয়া হলো। আর যাঁরা জাতীয় সরকারে থাকবেন তাঁরা এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন না। পরবর্তী সরকার মন্ত্রী হতে পারবেন না। প্রশ্ন উঠতে পারে, কে হবেন প্রধান? সে ক্ষেত্রে এক-একটা বৈঠকে এক-একজন সভাপতিত্ব করতে পারেন। কোনো সমস্যা হলে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে পরামর্শ করবেন। প্রধান বিচারপতির কাছে নিষ্পত্তির জন্য যাওয়া যেতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, জাতীয় সরকারের মেয়াদ কত দিন হবে? যত দিন নির্বাচন না হবে, তত দিন থাকবে জাতীয় সরকারের মেয়াদ।

কালের কণ্ঠ : আপনাকে ধন্যবাদ।
বদরুদ্দোজা চৌধুরী : আপনাদেরও ধন্যবাদ।

কালের কন্ঠ