আমরা চাই শান্তি ও স্বস্তির বাংলাদেশ

ইমদাদুল হক মিলন
একজন নিম্ন আয়ের সবজিচাষি পৈতৃক সূত্রে পাওয়া তাঁর সামান্য জমিতে সবজি ফলিয়ে জীবন ধারণ করেন। সংসারে সন্তান-সন্ততি আর স্ত্রী। দেশে হরতাল চলছে, নৈরাজ্য চলছে। তার পরও পেটের দায়ে সবজি নিয়ে হাটে এসেছেন। এসে দেখেন যে সবজির দাম ২০-২৫ টাকা কেজি হওয়ার কথা, তার দাম নেমে এসেছে চার-পাঁচ টাকায়। কারণ দেশের বড় শহরগুলোতে যেতে পারছে না সবজি। দেশ অচল হয়ে আছে। কিন্তু যেটুকু সবজি তিনি হাটে নিয়ে এসেছেন, ওইটুকু সবজি চার-পাঁচ টাকা দরে বিক্রি করলে তাঁর বাড়িতে এক দিনের খাওয়াও জুটবে না। এই চিন্তায় অসহায় মানুষটির হার্ট অ্যাটাক করেছে ওই হাটেই। সবজি পড়ে রইল সবজির মতো, মানুষটি লাশ হয়ে গেলেন।
দেশের একজন মানুষের এই পরিণতির জন্য কে দায়ী?

গত এক-দেড় মাসে বাংলাদেশে একশর ওপর মানুষ পুলিশের গুলিতে আর রাজনৈতিক সহিংসতায় মৃত্যুবরণ করেছে। সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে ব্যাপক লুটপাটের পর আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মন্দির ধ্বংস হয়েছে, প্রতিমা ভাঙা হয়েছে। নিঃস্ব করে দেওয়া হয়েছে মানুষগুলোকে। দেশের বিভিন্ন স্থানে বহু সংখ্যালঘু পরিবার খোলা আকাশের নিচে রাত কাটিয়েছে।

কেন এই অবস্থা দেশের? এই বাংলাদেশ কি আমরা চেয়েছি?

রাজধানীর সবচেয়ে বড় নিত্যপণ্যের বাজার পুরান ঢাকার মৌলভীবাজার। সেখানকার ব্যবসায়ী সমিতির এক কর্তাব্যক্তির কথা শুনলাম টেলিভিশনে। গভীর হতাশায় ভেঙে পড়া মুখ। কাতর গলায় বললেন, ‘যেখানে প্রতিদিন চার-পাঁচ শ কোটি টাকার লেনদেন হয়, সেখানে হরতালের জন্য চার-পাঁচ কোটি টাকার কেনাবেচাও হয় না। এভাবে চললে আমাদের মতো ছোট ছোট ব্যবসায়ীরা দেউলিয়া হয়ে যাবে। আমাদের সংসার অচল হয়ে যাবে। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করানো তো দূরের কথা, তিন বেলা খাবারও দিতে পারব না ঠিকমতো। কারণ এখানকার ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে লাখ লাখ মানুষ জড়িত। বেশির ভাগই খুদে ব্যবসায়ী।’


ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে এই অবস্থা চলছে দেশে! এভাবে কি একটা দেশ চলতে পারে? সারা পৃথিবী তাকিয়ে আছে বাংলাদেশের দিকে। কী হচ্ছে দেশটায়! একটি উন্নয়নশীল দেশ কেন নিজেদের দলীয় কোন্দলের কারণে এভাবে ধ্বংস করছে নিজেদেরকে! দেশের ১৬ কোটি মানুষ জিম্মি হয়ে গেছে। তাদের চারপাশে এখন শুধুই শূন্যতা, হতাশা, অস্থিরতা, নিরাপত্তাহীনতা, অনিশ্চয়তা। কী হবে দেশের? কী হবে দেশের মানুষগুলোর? কানসাট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি অফিস ধ্বংস করে দেওয়ার কারণে সেই অঞ্চলের ৬০ হাজার মানুষ এখন অন্ধকারে। দেশের মানুষ দেখতে পাচ্ছে ওই অঞ্চলের মানুষের মতো পুরো দেশই ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে গভীর থেকে গভীরতর এক অন্ধকারের দিকে। কোথাও কোনো আলো নেই। শুধুই অন্ধকার চারদিকে। দেশ পরিচালনায় যাঁরা আছেন, বিরোধী দলে যাঁরা আছেন, অন্যান্য রাজনৈতিক দলে যাঁরা আছেন, যাঁদের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে দেশের সাধারণ মানুষ, যাঁরা একটু সদিচ্ছা পোষণ করলেই বদলে যেতে পারে এই অবস্থা, তাঁরা কেউ এগিয়ে আসছেন না। প্রধান দুই দলের দুই নেতা একে অন্যকে দোষারোপ নিয়ে ব্যস্ত। দেশের স্বস্তি-শান্তির কথা ভাবছেন না। সাধারণ মানুষের অসহায়ত্বের কথা ভাবছেন না। একজন বলছেন হত্যাকাণ্ডের দায় নিতে হবে বিরোধীদলীয় নেতাকে, আরেকজন বলছেন আরো কিছু প্রাণহানি হবে আন্দোলন করলে।

প্রাণহানির কথা শুনলে স্বস্তিতে থাকতে পারে দেশের কোনো মানুষ?

রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পের দুটি সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতারা বলেছেন, এই অবস্থা চলতে থাকলে বেসরকারি খাতে সর্ববৃহৎ কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী পোশাকশিল্পের অস্তিত্ব কোনোভাবেই ধরে রাখা সম্ভব হবে না।

এ তো ভয়ংকর সংবাদ! দেশ চারদিক থেকে ধ্বংস হতে চলেছে! বড়, মাঝারি, ছোট- সব শ্রেণীর ব্যবসায়ীরা পড়েছেন উৎকণ্ঠা-উদ্বেগে। সাধারণ মানুষের মতো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও পড়ে গেছে অনিশ্চয়তার মধ্যে! ঘন ঘন হরতালে পোশাকশিল্পের অস্তিত্ব থাকবে না, অন্য অনেক শিল্পেরই অস্তিত্ব থাকবে না।

এত দিন দেশ মোটামুটি দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলে বিভক্ত হয়েছিল। ফেব্রুয়ারি থেকে এই বিভক্তি অন্যদিকে মোড় নিয়েছে। দেশের এক শ্রেণীর তরুণের সঙ্গে মতবিরোধে জড়িয়ে পড়েছেন দেশের এক শ্রেণীর আলেম-ওলামাও। তরুণদের কাউকে কাউকে নাস্তিক বলছেন আলেমরা। তরুণরা বলছেন, ঢালাওভাবে এ রকম মন্তব্য করা ঠিক না, ইত্যাদি ইত্যাদি।


এ এক ভয়াবহ প্রবণতা! বাংলাদেশ ধর্মপ্রাণ মানুষের দেশ। ধর্ম নিয়ে কোনো রকমের বাড়াবাড়ি দেশের মানুষ সহ্য করবে না, অন্যদিকে ধর্ম নিয়ে কোনো বিরূপ মন্তব্যও কেউ মেনে নেবে না। আর রাজনীতির নামে ধর্মকে ব্যবহার করে ফায়দা লোটার চেষ্টাও ভালো হবে না। এই মুহূর্তে দেশের কোথায় কী হচ্ছে, তরুণরা কী করছেন, আলেম-ওলামারা কী করছেন, কী ভাবছেন আমরা সবাই কমবেশি তা জানি। যে তরুণরা একটি বিশেষ বিষয় নিয়ে আন্দোলন করছেন, তাঁরা আমাদেরই সন্তান এবং এ কথা মানতেই হবে বাংলাদেশের বহু গৌরবের ইতিহাস সৃষ্টি করছেন তরুণরা। তরুণরা ভাষার জন্য বুকের রক্ত দিয়েছেন, তরুণরা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। তরুণরা জাতির সবচেয়ে বড় শক্তি। তরুণদের শক্তি আর স্বপ্নই একটি দেশকে এগিয়ে নেয়। সুতরাং তরুণদের অপমান করা, ঢালাওভাবে নাস্তিক অপবাদ দেওয়া যেমন অনুচিত, তেমনি তরুণদেরও ধর্মের প্রতি শতভাগ শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। আমি বলছি না তাঁরা ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নন, অবশ্যই শ্রদ্ধাশীল। আজকের তরুণ শ্রেণীর একটি বড় অংশ নিয়মিত ধর্মচর্চা করে, নামাজ পড়ে। জুমার দিন মসজিদ উপচে রাস্তায় চলে আসে নামাজি মানুষের ঢল। তাদের মধ্যে বহু তরুণ আমি দেখেছি। তরুণদের একটি প্রবণতা দেশের মানুষ পছন্দ করেছে, ‘হেফাজতে ইসলাম’-এর সঙ্গে তাঁরা আলোচনায় বসার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সংগঠনটি তাঁদের প্রস্তাব নাকচ না করে দিলে মানুষ খুশি হতো, দেশ উপকৃত হতো।

পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণ হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ‘বিদায় হজ’-এর ভাষণ। সেই ভাষণে তিনি ঘোষণা দেন, ‘আজ তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্ম পরিপূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার কল্যাণ কামনার সমাপ্তি করলাম ও ইসলামকে তোমাদের ধর্ম হিসেবে অনুমোদন করলাম’ (৫:৫)। ইসলাম অনুসারী একজন মুসলিম শান্তিতে আত্মস্থ হয়। ধর্ম-বর্ণ-গোত্র, ঐশ্বর্য-আভিজাত্য মনে না রেখে ভেদাভেদ ভুলে শান্তিতে আবদ্ধ হয়ে জীবন যাপন করে। হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর বিদায় হজের ভাষণে সার্বিক মূল্যবোধকে সামনে রেখে, ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি না করে মধ্যপন্থা অবলম্বনের উপদেশ দিয়েছেন (মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ‘যার যা ধর্ম’ পৃষ্ঠা ১০১)।

হে আল্লাহ, পরম করুণাময়, আমাদের দেশ এবং দেশের মানুষকে হেফাজত করো। দেশের মঙ্গল করো, মানুষের মঙ্গল করো, দেশ শান্তিময় করো। রাজনৈতিক হানাহানি বন্ধ করে আমাদের দাও সুখ-সমৃদ্ধির বাংলাদেশ, শান্তির বাংলাদেশ। রাজনৈতিক সমঝোতার মধ্য দিয়ে মানুষের মনে যেন ফিরে আসে স্বস্তি। আর একজন মানুষও যেন সহিংসতার শিকার না হয়, মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করো রাব্বুল আলামিন।

কালের কন্ঠ