সিরাজদিখানে ৪ শতাধিক নারী-পুরুষ গ্রাম ছাড়া, গড়ে উঠেছে লঙ্গরখানা

sirajdikhan sangমুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখান উপজেলার বালুরচর ইউনিয়নের মোল্লাকান্দি ও দোসরপাড়া গ্রামের আওয়ামীলীগের দু’গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে একই গোষ্ঠীয় ১৭ পরিবারের বসতভিটে এখন ধ্বংসস্তুপে পরিনত হয়েছে। তাদের ঘরের ভেতরের সহায়-সম্বল যা ছিল-সবই আগুনে পুড়েছে। বিতাড়িত হওয়ার পর শুক্রবার পর্যন্ত ১৬ দিনেও বসতবাড়িতে যেতে পারেনি। নিজ বসতভিটেতে নতুন করে বসতঘর তোলাও সম্ভব হয়নি ওই ১৭ পরিবারের। কেননা- আগুনে সর্বস্বান্ত ১৭ পরিবারের নারী-পুরুষসহ বালুচরের ৪ শতাধিক আ’লীগ নেতাকর্মী গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। পালিয়ে পাশের গ্রাম আকবর নগরে গড়ে তুলেছেন লঙ্গরখানা। বিতাড়িতরা সারিবদ্ধ ভাবে খাবার সংগ্রহ করে ক্ষুধা নিবারন করছেন তারা। আপন বসতভিটে থেকে বিতাড়িত শত শত নারী-পুরুষ অন্যত্র আশ্রয়ে দিনযাপন করছেন।

সিরাজদীখান উপজেলার বালুরচর বাজারের টেন্ডার, আধিপত্য ও ইউপি নির্বাচনের বিরোধের জের ধরে ২৮ ফেব্রুয়ারি বালুরচর ইউনিয়ন আ’লীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে টেটাবিদ্ধসহ অর্ধশতাধিক নারী পুরুষ আহত ও ৮টি বসতঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে মোল্লাকান্দি ও দোসরচর গ্রামের আ’লীগের আলেক চানঁ মুন্সীর পক্ষের ৪’শতাধিক নারী-পুরুষ গ্রাম থেকে বিতাড়িত হয়ে পাশের আকবরনগর গ্রামে স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নেয়। এরপর থেকে প্রতিদিনই খাবারের আয়োজনসহ জামা কাপড় দিয়ে সাহায্য করে যাচ্ছে স্বজনরা।

সরেজিমনে ঘুরে জানা গেছে, বালুরচর ইউনিয়নের আকবরনগর গ্রামে ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি আলেক চানঁ মুন্সীসহ তার প্রায় ৪’শ নারী-পুরুষ সমর্থক মুখে দুশ্চিন্তার ছায়া ও ক্ষোভ নিয়ে বিতাড়িত দিনযাপন করছেন। ইচ্ছা থাকলেও প্রতিপক্ষের হামলার ভয়ে গত ১৬ দিন ধরে নিজ বাড়িতে যেতে না পারায় পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে দেওয়া বসতঘরের ধ্বংসস্তুুপ এখনও একই অবস্থায় রয়েছে বলে জানালেন ক্ষতিগ্রস্থরা। বিতাড়িত নারী-পুরুষ পাশের আকরবনগর গ্রামের মাহমুদ আলী গাজীর বাড়ির ওঠানে সারিবদ্ধ ভাবে থালা নিয়ে দুপুরে খাবার সংগ্রহ করে ক্ষুধা নিবারন করছেন। গত দুই সপ্তাহ ধরে প্রতিদিনই খাবারের আয়োজন করা হচ্ছে বলে জানালেন বালুরচর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান শহর আলী। তিনি জানান, আকবরনগর গ্রামের হাজী আব্দুল মোতালেব, রূপচানঁ মিয়া, মুক্তার হোসেন, কেওয়াজ আলী মাদবর, রহিম হাজীসহ বিতাড়িতদের স্বজনরা নিজ খরচে এ খাবার আয়োজন করছেন। আকবরনগর গ্রামের আব্দুর রব, মোহাম্মদ ঢালী ও আবু তাহেরের সঙ্গে কথা হলে তারা সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, গ্রাম থেকে বিতাড়িত লোকজন প্রতিদিন আকবরনগর ট্রলার ঘাটেই অবস্থান করছেন। স্বজনসহ বিভিন্ন বাড়িতে তারা এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন।


নিজ গ্রাম-বসতভিটে থেকে বিতারিত বালুরচর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি আলেক চানঁ মুন্সী অভিযোগ করে বলেন, ইউপি চেয়ারম্যান আবু বক্কর সিদ্দিক ও আ’লীগ নেতা নামির মোল্লার নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা বসতবাড়ি ভাংচুর, লুটপাট ও আগুনে পুড়িয়ে দিয়েও ক্ষ্যান্ত হয়নি। বর্তমানে গ্রামে প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে মহড়া অব্যাহত রেখেছে। তিনি অভিযোগ করেন, স্থাণীয় সংসদ সদস্য ও পুলিশের কাছ থেকে কোন সহযোগিতা না পাওয়ায় নিজ বাড়িতে যেতে পারছে না শত শত নারী পুরুষ। আগুন দিয়ে বসতঘর পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় জড়িতরা রয়েছে বহাল তবিয়তে। পুলিশ তাদের গ্রেফতার করছে না।

আ’লীগ নেতা হালিম মুন্সী জানান, ঘটনার দিন বসতবাড়িতে আগুন দিতে ৬০ লিটার পেট্রোল ব্যবহার করেছে প্রতিপক্ষরা। ভাংচুর, লুটপাট ও বসতঘরে অগ্নিসংযোগ করে ৭১’র পাকহানাদারদের হার মানিয়েছে তারা। তিনি জানান, ঘটনার পর থেকে গ্রাম থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর প্রতিপক্ষরা মোল্লাকান্দি ও দোসরচর গ্রামে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করে তুলেছে। বর্তমানে তারা জমিতে রোপন করা আলু উত্তোলন করে লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। এক সপ্তাহে তারা ১০ একর জমির আলু লুট করে নিয়ে গেছে।
sirajdikhan sang
অন্যদিকে মোল্লাকান্দি ও দোসরচর গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, ক্ষতিগ্রস্থ পরিবার গুলোর শুন্য বসতভিটে মাটিতে রয়েছে কেবল ধ্বংস স্তুপের চিহ্ন। আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ায় আ’লীগ সমর্থিতদের ১২ টি বসতঘর জুড়ে ছাঁইভস্মের ধ্বংস স্তুপে পড়ে আছে। ওই ধ্বংসস্তুপে আবারও বসত ঘর নির্মান করতে এখনও ব্যবস্থা নিতে পারেনি আ’লীগ সমর্থিত পরিবারগুলো।

কান্নাজড়িত কন্ঠে গৃহবধুরা জানান, বর্তমানে প্রতিপক্ষের লোকজন ঘর প্রতি লাখ লাখ টাকা চাদাঁ দাবি করছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে বলে যাচ্ছে, দাবি করা টাকা না দিলে রাতে এসে যুবতী মেয়েদের তুলে নিয়ে যাওয়ার হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। এ কারনে দিনের বেলায় গৃহবধু, যুবতী ও কিশোরী মেয়েরা রাতের বেলায় অন্যত্র গিয়ে নিরাপদে রাতযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন বলেও জানিয়েছেন তারা।


এদিকে, একাধিক সাংবাদিকরা মোল্লাকান্দি ও দোসরচর গ্রামে যাওয়ার পর ইউপি চেয়ারম্যান আবু বক্কর সিদ্দিক ও আ’লীগ নেতা নাসির মোল্লার অর্ধশতাধিক সমর্থক গ্রামে অবস্থান নিয়ে প্রতিপক্ষ আ’লীগ নেতা আলেক চানঁ মুন্সীর বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।

এছাড়া ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের মহিলারা যাতে কিছু বলতে না পারে সে জন্য তাদের লোকজন কয়েকটি গ্রুপে ভাগ হয়ে সাংবাদিকদের পিছু পিছু ঘোরাফেরা করে মহিলাদের চোখ রাঙিয়ে ভয়ভীতি দেখান।

বালুরচর ইউনিয়ন আ’লীগের সহ সভাপতি নাসির মোল্লা জানান, আ’লীগ নেতা আলেক মুন্সী সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ীদের গডফাদার। তার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে গ্রামবাসী একত্রিত হয়ে তাদের গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে।

এ প্রসেঙ্গ সিরাজদিখান থানার অফিসার্স ইনচার্জ (ওসি) শেখ মাহবুবুর রহমান বলেন, সংঘর্ষ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় থানায় পাল্টাপাল্টি মামলা রুজু হয়েছে। আসামিদের গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। তিনি আরো জানান, ঘটনার পর থেকে আলেক চানঁ মুন্সীর সমর্থক নারী পুরুষ গ্রাম থেকে বিতাড়িত এ বিষয়টি থানা-পুলিশ অবগত নয়। এ ঘটনায় অভিযোগ করলে আইনগত যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

টাইমস্ আই বেঙ্গলী