শত্রু তিনজন, মিত্র কে?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
জাতীয়তাবাদের শত্রু তিনজন; সম্প্রদায়, শ্রেণী ও রাষ্ট্র; মিত্র কে? মিত্র বলা যাবে অসংখ্য, কেননা মিত্র হচ্ছে সমগ্র জনগণ, যদি তারা মিত্র হয় পরস্পরের। সেক্ষেত্রে এও বলা যাবে সকলে মিলে ওই একজনই_ জনগণ। এবং আর কোনো মিত্রের প্রয়োজনও নেই। কিন্তু পার্থক্য আছে। শত্রুরা তৎপর। সম্প্রদায়, শ্রেণী ও রাষ্ট্র জাতি গঠনে বিরোধিতা করছে, প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এ ঘটনা আজকের নয়, অনেক দিনের। অন্যদিকে জনগণের মধ্যে যে মৈত্রীগত ঐক্য সেটা গড়ে ওঠা কঠিন। উঠতে চায় না, গড়ে উঠলেও দেখা যায় ভেঙে পড়ছে।

বাঁচার জন্য জাতীয়তাবাদ প্রয়োজন। জাতীয় ঐক্য আবশ্যক। শোষণ, নির্যাতন, বিভাজনের বিরুদ্ধ দাঁড়াবার জন্য। আন্তর্জাতিক নিষ্পেষণ প্রতিহত করার জন্য। বলা অন্যায় হবে না যে, আমরা এই লক্ষ্যেই কাজ করতে চেয়েছি। রাষ্ট্র ভেঙেছি, আবার গড়েছি। সবটাই জাতীয়তাবাদী প্রয়োজনে। ব্রিটিশের রাষ্ট্র ভেঙে পাকিস্তান হলো, কেননা আমরা প্রতিষ্ঠা করতে চাইলাম পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ। সেই রাষ্ট্র ভেঙে বাঙালি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন হলো কেননা ইতিমধ্যে আমরা বাঙালি জাতীয়তাবাদ আস্থাশীল হয়ে উঠেছিলাম। বাঙালি জাতীয়তাবাদ অবশ্য পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ থেকে স্বতন্ত্র। পাকিস্তানত্ব ব্যাপারটা ছিল কৃত্রিম, অস্বাভাবিক। সেখানে না ছিল ভাষার ঐক্য, না ভূগোলের কিংবা ইতিহাসের। সেই রাষ্ট্র ভেঙে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা একটি জাতীয়তাবাদী জনযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। বাঙালি জাতীয়তাবাদ স্বাভাবিক ও সুস্থ। এর অভ্যন্তরে ঐক্য রয়েছে ভাষার, ভূগোলের এবং ইতিহাসের।


কিন্তু আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে পেরেছি কি? পারি নি যে তার হাজারো প্রমাণ ও লক্ষণ পথে-ঘাটে, অফিসে-আদালতে, গৃহে-গৃহে, নগরে-বন্দরে বিদ্যমান। তিন শত্রুর শত্রুতার অবসান ঘটেনি। মিত্র পক্ষ অর্থাৎ জনগণ শক্তিশালী হবে মনে হয়েছিল। তারা মুক্তিযুদ্ধ করেছে। গণতান্ত্রিক অর্থাৎ শোষণমুক্ত ও সাম্যবাদী রাষ্ট্র গড়ে তুলবার জন্য সংগ্রাম করেছে। তারা নতুন রাষ্ট্র পেয়েছে ঠিকই, কিন্তু ঐক্য পায়নি।

জাতীয়তাবাদের সমালোচনা করারও কারণ রয়েছে। সঙ্গত কারণ। জাতীয়তাবাদ আগ্রাসী হতে পারে। হিটলার-মুসোলিনির তাণ্ডব যার দৃষ্টান্ত। এই আগ্রাসন বাইরে ঘরে, ভেতরেও ঘটে। দেশের ভেতরও সাম্রাজ্য গড়ে তোলা সম্ভব। জাতীয়তাবাদী সাম্রাজ্য। শ্রেণী শোষণকে আড়ালে ঠেলে দিয়ে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা খুবই সম্ভব_ জাতীয়তাবাদের নাম করে। আর ওটা তো খুবই সত্য যে, জাতি সাধারণত দুই ভাগে বিভক্ত_ ধনী ও গরিব। ধনী ও গরিবরা আসলে আলাদা জাতি, এক দেশে বাস করলেও, এক রাষ্ট্রের ভেতরে থেকেও।

কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এটাও তো সত্য যে, শ্রেণী-শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হলে জাতির অভ্যন্তরেই দাঁড়াতে হয় প্রথমে। ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে। জাতীয়তাবাদ হচ্ছে এই দাঁড়াবার ভূমি_ মানসিক এবং ভৌগোলিক। এখানে দাঁড়িয়েই বিদেশি শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ খাড়া করা যায়। এটিকে বলতে পারি গণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদ। এখানে সমগ্র জনগণ একটি জাতি, যার লক্ষ্য শ্রেণী-শোষণের অবসান ঘটানো। আর এই অবসান ভিন্ন জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা অসম্ভব বটে। এ হচ্ছে প্রগতিশীল। ফ্যাসিবাদী জাতীয়তাবাদ থেকে স্বতন্ত্র সে। বস্তুত এই জাতীয়তাবাদ শ্রেণী-আধিপত্যের প্রতিপক্ষ। এর প্রতিষ্ঠার জন্যই সংগ্রাম। আমাদের আদি সংবিধানের রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতির মধ্যে এই জাতীয়তাবাদের একটি সংজ্ঞা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিল। কিন্তু ওই মূলনীতিগুলোর কোনোটিই এখন আর অক্ষত অবস্থাতে নেই। ধর্মনিরপেক্ষতার তো উচ্ছেদই ঘটানো হয়েছিলো।
বড় দুই দলের উভয়েই, নিজেদেরকে যারা জাতীয়তাবাদী বলে থাকে, ভোট চাইবার সময় ধর্মকে ব্যবহার করে। কেউ বেশি, কেউ কম; কেউ আক্রমণাত্মক রূপে, কেউ আত্মরক্ষার ভঙ্গিতে। ব্যবধানটা অসত্য নয়। কিন্তু ধর্মের ব্যবহার অনেক বেশি মর্মান্তিক ও ক্ষতিকর সত্য। রাষ্ট্রীয়ভাবে গণমাধ্যমে, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ধর্মকে নিয়ে আসা হচ্ছে। আনার কথা ছিল না। বাঙালি জাতীয়তাবাদ কিছুতেই যথার্থ হবে না যদি না সে ধর্মনিরপেক্ষ হয়।

রূপক হিসাবে দেখতে গেলে বলা সম্ভব যে, বাঙালির জন্য জাতীয়তাবাদের ব্যাপারটা হচ্ছে পিতার বিরুদ্ধে মাতার সংগ্রাম। পিতা হচ্ছে রাষ্ট্র, মাতা সমাজ। পিতা বহিরাগত, মাতা স্বদেশী। পিতা কর্তৃত্ব করে, মাতা করে স্নেহ। পিতা অন্যভাষাও জানে, কিন্তু মাতার ভাষা বাংলাই। মাতা, মাতৃভাষা এবং মাতৃভূমি_ এ তিনের প্রতি বাঙালির শ্রদ্ধা-ভক্তি খুবই প্রবল। কিন্তু তুলনা এক জায়গায় এসে থেমে যায়। সেটি এই যে, মাতা স্নেহশীল ঠিকই, আবার সংকীর্ণও। এই মা বাঙালিকে যতটা বাঙালি করেছে ততটা মানুষ করেনি। আর আছে পক্ষপাতিত্ব। মায়ের পক্ষপাতিত্বের দরুন সন্তানেরা ভাগ হয়েছে দুই সম্প্রদায়ে, এবং দাঙ্গা-লড়াই করেছে।

সকলের মাতৃভাষা বাংলা হবার কথা। কিন্তু তা হয়নি। অতীতের কথা বাদ থাক, বর্তমানেও সকলের ভাষা যে বাংলা তা নয়। উচ্চবিত্ত মহলে এবং রাষ্ট্রীয় কাজকর্মে ইংরেজির ব্যবহার কমছে না, বাড়ছে বরঞ্চ। বাংলাই মূলধারা কিন্তু এখনও শতকরা ষাটজন বাঙালি অক্ষরজ্ঞানবর্জিত। তাদের জীবনে বাংলা ভাষা বলতে যা বোঝায় তা নেই, আছে আঞ্চলিক ভাষা। পাশাপাশি চলে আরবির চর্চা। বিশেষ করে মাদ্রাসায়।

রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতি ছিল একটি অভিন্ন শিক্ষারীতি প্রচলনের। একটি নয়, তিনটি রীতি এখন প্রচলিত। শিক্ষা তাই জাতি গঠনে সহায়ক না হয়ে সহায়ক হচ্ছে শ্রেণী সংগঠনকে শক্তিশালী করার কাজে। আর শ্রেণী-বিভাজন হলো জাতির চিহ্নিত শত্রু। গতি তাদের বিপরীতমুখো। ওদের একে শক্তিশালী হয় না অপরকে দুর্বল না করে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মাদ্রাসা শিক্ষার যে নিরন্তর বিকাশ তা এক ধারে প্রশ্রয় দেয় মৌলবাদকে, অন্য ধারে সমর্থন যোগায় শ্রেণী-বিভাজনের পেছনে। কেননা মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিতরা যেমন দৃষ্টিভঙ্গিতে সংকীর্ণ হয়, তেমনি আবার বৈষয়িকভাবে গরিবও হয়। গরিবের ছেলেমেয়েরাই মাদ্রাসায় পড়ে এবং গরিবই রয়ে যায়।

তিনটি প্রধান শত্রুর কথা বলেছি। আরও একটি শত্রু আছে জাতীয়তাবাদের; সেটি হচ্ছে নারীর প্রতি অসম আচরণ। প্রধান শত্রুদের সবচেয়ে বড় হচ্ছে শ্রেণী। শ্রেণীই বিভক্ত করে রেখেছে মানুষকে, এক হতে দিচ্ছে না। মধ্যবিত্তই নেতৃত্ব দেয়। সেটাই স্বাভাবিক। মাধ্যবিত্তের নানা চেহারা। কিন্তু দুটি চেহারা বেশ স্পষ্ট। একটি দেশপ্রেমিকের, অপরটি বিশ্বাসঘাতকের।

বহু অভিজ্ঞতা পার হয়ে এসেছি আমরা। জাতীয়তাবাদী হয়েছি। যাঁরা শাসন করছেন, কিংবা করবেন ভবিষ্যতে_ তাঁরা সবাই জাতীয়তাবাদী, তা দলের নাম যা-ই হোক না কেন। কিন্তু জাতীয়তাবাদী কি প্রকৃত অর্থে? না, তা নন।

প্রথমত, তাঁরা সমগ্র জনগণের স্বার্থ দেখেন না। স্বার্থ দেখেন ব্যক্তির, দলের ও শ্রেণীর। যে-পরিমাণে তা দেখেন সেই পরিমাণেই বিচ্যুত হন জাতীয়তাবাদী চরিত্র ও অবস্থান থেকে। প্রকৃত জাতীয়তাবাদ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এবং সামন্তবাদবিরোধী। আমাদের শাসকেরা, যাঁরা দুই বড় দল থেকে আসছেন এবং আসতে থাকবেন, তাঁরা কেউই সাম্রাজ্যবাদবিরোধী নন। বরঞ্চ তাঁদের মধ্যে প্রতিযোগিতা রয়েছে এ ব্যাপারে যে, কে কতটা কাছে যেতে পারবে বিদেশি কর্তাদের। ওদিকে সামন্তবাদের সঙ্গেও তাঁদের আপোসরফা রয়েছে, যে জন্য রাজনীতিতে ধর্ম আসে, মৌলবাদ ও মাদ্রাসা শিক্ষা প্রবল হয়, সাম্প্রদায়িকতা নিঃশেষ হয় না। এরা জাতীয়তাবাদের মিত্র নয়।

সমকাল