বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ: লোকায়তিক মাত্রা

মফিদুল হক: বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের আন্তর্জাতিক মাত্রা অনুধাবনের পাশাপাশি এর লোকায়তিক দিক আমরা বিবেচনায় নিতে চাই। লোকজীবনসঞ্জাত যে দর্শন ও শিল্পপ্রকাশের পরিচয় আমরা পাই তাকে আধুনিক ফোকলোর চর্চায় লোকায়তিক অভিধায় চিহ্নিত করা হয়। রূপগতভাবে এর রয়েছে প্রাকৃত চরিত্র, প্রকৃতি ও সমাজের সঙ্গে ঐতিহ্যগতভাবে সংলগ্ন থেকে লোকায়তিক এইসব প্রকাশ কোনো জড়বত্ ধারণা নয়, আধুনিক জীবনজিজ্ঞাসার মোকাবিলায় নিশ্চিতভাবে সক্রিয় ও সক্ষম, কিন্তু সেই রূপসনাতনকে চিহ্নিত করতে অনেক সময় আমরা ব্যর্থ হই। তার একটি বড় কারণ দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসনের ফলে শিক্ষিত নাগরিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রোথিত সমাজ-বিচ্ছিন্নতা, বিশেষভাবে যেসব প্রপঞ্চ ব্যবহার করে তারা সমাজ, রাজনীতি ও শিল্প বিশ্লেষণের চেষ্টা নেন, অনেক ক্ষেত্রে তা আরও বেশি করে তাদের সমাজ-বিযুক্ত করে ফেলে। এই সঙ্কট জাতীয়তাবাদী আন্দোলনেও প্রভাব ফেলে। দেখা গেছে যে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রথম যুগের প্রবক্তারা অনেকেই শিক্ষাগ্রহণ করেছেন পশ্চিমি দুনিয়ায়, রপ্ত করেছেন ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠীর ভাষা ও জীবনরীতি, পরে হতাশ ও পীড়িত হয়েছেন বাস্তবের রূঢ়তায়। পাশ্চাত্ত্য শিক্ষা ও দর্শনে প্রতিফলিত স্বাধীনতা ও মানবতার বাণী এবং ঔপনিবেশিক শাসনের নিষ্ঠুর বাস্তবতার দ্বন্দ্বে তাঁরা ক্ষত-বিক্ষত হয়েছেন।


৭ মার্চের ভাষণ বিষয়ক আলোচনাকালে এর পটভূমিকায় অসহযোগ আন্দোলনের অনন্য ভূমিকা কোনোভাবেই আমরা বিস্মৃত হতে পারি না। একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে মহাত্মা গান্ধী পরিচালিত অসহযোগ ও সত্যাগ্রহী আন্দোলনের সাযুজ্য ও উত্তরণ বিশেষভাবে লক্ষ করতে হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে ৩ মার্চ থেকে ৬ মার্চ পর্যন্ত হরতাল কর্মসূচি সূচিত হলে ৪ মার্চ থেকে তা সার্বিক অসহযোগ আন্দোলনের রূপ নেয়। ৪ মার্চ আওয়ামী লীগের মুলতবি সভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভবিষ্যত্ কর্মপন্থা তুলে ধরে বলেন, প্রত্যেককে মনে রাখতে হবে সর্বোচ্চ ত্যাগ ছাড়া কোনো জাতি স্বাধীনতা অর্জন করতে পারে না। এই উক্তি সত্যাগ্রহীদের কাছে সর্বোচ্চ ত্যাগ বরণে গান্ধীর প্রত্যাশা স্মরণ করিয়ে দেবে। এর পরের দিন থেকে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সকল সরকারি-বেসরকারি কার্যক্রম নিয়ন্ত্রিত হতে থাকে এবং শুরু হয় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন।
৭ মার্চের ভাষণে প্রতিরোধ আন্দোলনের এই লোকায়ত রূপ মেলে ধরবার পাশাপাশি প্রত্যাঘাতের ডাক এমন এক লোকভাষায় ব্যক্ত করলেন বঙ্গবন্ধু যে তিনি উন্নীত হলেন অনন্য লোকনায়কের ভূমিকায়, যার তুলনীয় নেতৃত্ব জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের কাফেলায় বিশেষ খুঁজে পাওয়া যাবে না।

বাংলার লোকঐতিহ্য ও জীবনধারার গভীর থেকে উঠে আসা ব্যক্তি হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের নেতৃভূমিকায়। জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে তিনি যে কতটা সার্থকনামা হয়ে উঠেছিলেন তার পরস্ফুিটন ঘটেছিল সঙ্কটময় মার্চ মাসে তাঁর অবস্থান ও ভূমিকা এবং ৭ মার্চের ভাষণের মধ্যে। তিনি বক্তব্যে যেমন গভীরভাবে জাতীয়তাবাদী, তেমনি আন্দোলনের স্বাদেশিক রীতির নব-রূপায়ণ ও প্রসার ঘটালেন সার্বিক ও সক্রিয় অসহযোগের ডাক দিয়ে, যে অসহযোগে শামিল ছিল ব্যাপক জনতা এবং সকল সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। অসহযোগ আন্দোলন ও ৭ মার্চের ভাষণের আবেদন উপচে পড়েছিল পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামোতে সামরিক-আধাসামরিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সকল বাঙালি সদস্যের ওপর এবং এর প্রতিফল জাতি লাভ করল মুক্তিযুদ্ধের সূচনা থেকেই। বক্তৃতার রূপ হিসেবেও প্রচলিত রাজনৈতিক ভাষণের কাঠামো সম্পূর্ণভাবে পরিহার করে বঙ্গবন্ধু এমন এক সৃজনশীলতার পরিচয় দিলেন যা দেশের মাটির গভীরে শেকড় জারিত করা ও গণসংগ্রামের দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়া অনন্য নেতার পক্ষেই সম্ভব হয়েছিল।


তিনি বক্তৃতা শুরু করেছিলেন ‘ভাইয়েরা আমার’ সম্বোধন দিয়ে, সবরকম পোশাকি রীতি ও আড়ম্বর বর্জন করে লাখো জনতার মুখোমুখি হয়ে এমন অন্তরঙ্গ, প্রায় ব্যক্তিগত সম্বোধন যে সম্ভব, তা কে কখন ভাবতে পেরেছিল! ভাষণের প্রথম বাক্যটিও একান্ত ব্যক্তিগত ভঙ্গিতে বলা, যেন ঘনিষ্ঠজনের কাছে মনের নিবিড়তম অনুভূতির প্রকাশ, ‘আজ দুঃখভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি।’ এরপর তিনি যখন বাংলার মানুষের আত্মদানের কথা বললেন, তাদের মুক্তি-আকুতির প্রকাশ ঘটালেন, তখন সেই অন্তরঙ্গ ভঙ্গি রূপ পেল জনসভার ভাষণের, কিন্তু তারপরও হারাল না বিষয়ের সঙ্গে নিবিড় সম্পৃক্তি। তিনি বললেন, ‘আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুরে আমার ভাইয়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে। আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়।’ এই অনন্য সূচনা বেঁধে দিয়েছিল বক্তৃতার সুর, তিনি সত্যোচ্চারণ করলেন অন্তরের সবটুকু আকুতি ঢেলে এবং নিবিড় ভালোবাসার বন্ধনে শ্রোতৃমণ্ডলীকে, যেন তাঁর রক্তসম্পর্কের ভ্রাতৃপ্রতিম সবাই, একাত্ম করে তুললেন। গভীর প্রেমভাব উত্সারিত এই একাত্মতা নেতা ও জনতার মধ্যে আর কোনো ফারাক রাখল না। দেখা গেল ভাষণে যখনই বলেছেন মানুষের কথা সেখানে আর কোনো নৈর্ব্যক্তিকতার অবকাশ থাকেনি, এই মানুষেরা যে তাঁরই মানুষ, একান্ত আপনজন। বুকভরা ভালোবাসা ও বেদনা নিয়ে তিনি বলেছেন, ‘৭ জুনে আমাদের ছেলেদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।’ ‘আমার পয়সা দিয়ে যে অস্ত্র কিনেছি বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য আজ সেই অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে আমার দেশের গরিব, দুঃখী, আর্ত মানুষের মধ্যে, তার বুকের উপর হচ্ছে গুলি।’ ‘কার সাথে বসব, যারা আমার মানুষের বুকের রক্ত নিয়েছে তাদের সঙ্গে বসব?’ ‘গরিরেব যাতে কষ্ট না হয়, যাতে আমার মানুষ কষ্ট না করে।’ ‘আর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয়’-এভাবে বারংবার তিনি উচ্চারণ করেছেন আমার মানুষ, আমার দেশের গরিব-দুঃখী, আমার লোক। এই সব উচ্চারণ উত্সারিত হয়েছে মানুষের সঙ্গে নিবিড় একাত্মতার মধ্য দিয়ে এবং প্রায় তিন দশকের দীর্ঘ ও কঠিন গণসংগ্রামের পথ বেয়ে বঙ্গবন্ধু অর্জন করেছিলেন গণমানুষের সঙ্গে এই বিশেষ সম্পৃক্ততা। ৭ মার্চের ভাষণে বারবার যে উত্থাপিত হয়েছে মানুষকে হত্যার প্রসঙ্গ এবং সেই কথা বলতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এসব ঘটনাকে চিহ্নিত করেছেন আমার লোক, আমার মানুষকে হত্যা হিসেবে, তার পেছনে রয়েছে ইতিহাসের এক ধারাবাহিকতা এবং ইতিহাস-নির্মাতা জননেতার বিশিষ্ট মানসিক গড়ন। পাকিস্তানের তেইশ বছরের নিপীড়নমূলক শাসন এবং তার বিরুদ্ধে জনসংগ্রামের ইতিহাসের নির্যাস একটি বাক্যে তুলে ধরে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘বাংলার ইতিহাস এদেশের মানুষের বুকের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস।’ বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শহীদের যে কাফেলা ইতিহাসের অগ্রপথ রঞ্জিত করেছে সেই শহীদদের অনেকের নাম আমরা জানি, অনেকের জানি না। তাঁরা আমাদের শ্রদ্ধার পাত্র, নানাভাবে এই শ্রদ্ধা জাতি প্রকাশ করে, যে শ্রদ্ধা-জ্ঞাপনের একটি পোশাকি ভাষা আছে, বহুল-ব্যবহারে সেই ভাষা ধার হারিয়ে নিবীর্য হয়ে পড়লেও আমরা প্রচলিত ধারার বাইরে যাওয়ার কথা ভাবতে পারি না। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত দায় অনুভব করেছেন, ১৯৬৬ সালে ৬-দফা ঘোষণা করে তিনি যখন জাতীয় অধিকারের আন্দোলনের নতুন পর্বের সূচনা করেন তখন এর নেতৃত্বে তিনিই অধিষ্ঠিত হয়েছেন অথবা বলা চলে জনমানুষই তাঁকে দিয়েছে নেতৃত্বের আসন। নেতৃত্বের আসনের রয়েছে কর্তব্য, আবার রয়েছে এক নিঃসঙ্গতা, যৌথভাবে কর্মকাণ্ড পরিচালনার পরও নেতার ওপর বর্তায় অনেক দায়ভার। এই দায়ভার পালনে নেতৃত্বের ভূমিকা দিয়ে অনেক কিছু যাচাই হয়ে যায়, অনেক নেতা দায়ভার পালনে সফলতার উদাহরণ তৈরি করে স্মরণীয় হয়ে ওঠেন, কিন্তু দায়ভারকে পরম ভালোবাসা দিয়ে মণ্ডিত করবার মতো অনুভূতি ও সংবেদনশীলতা নেতৃত্বে খুব বেশি দেখা যায় না, মানুষও বোধহয় তেমন বিপুল প্রত্যাশা নিয়ে নেতৃত্বের দিকে তাকিয়ে থাকে না। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের ধাঁচে, তাঁর অন্তর-মানসে মানুষের জন্য যে বিপুল ভালোবাসা সেটা তাঁর নেতৃত্বের ধরনেও উপচে পড়েছে। ৬-দফা ঘোষণার পর যে কঠিন পথ বেয়ে তাঁকে ও জাতিকে চলতে হয়েছে সেখানে রাজপথে রক্ত-ঝরানো প্রতিজন শহীদের জন্য তিনি নিজেকে দায়বদ্ধ ভেবেছেন, তাঁর ঘোষিত ও পরিচালিত আন্দোলনেই যে এই মানুষেরা বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছে। ১৯৬৬ সালের ৭ জুনে ৬-দফার দাবিতে আহূত হরতালের সময় পুলিশ নারকীয়ভাবে জনতার ওপর হামলা চালায়, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে মনু মিয়া, মুজিবুল হকসহ এগার জন শহীদ হন। বঙ্গবন্ধু তখন কারাগারে এবং এই প্রথম তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত আন্দোলনে তরুণ-যুবকেরা ঢেলে দিল বুকের রক্ত। তাঁর কাছে এই ঘটনা যে পৃথক আবেদন ও আবেগের তীব্রতা সঞ্চার করে সেটা প্রকাশ পেয়েছে যখন ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি বলেন, ‘৭ই জুনে আমাদের ছেলেদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।’ এই শহীদেরা স্বাভাবিকভাবে তাঁর কাছে বিবেচিত হয়েছিল ‘আমাদের ছেলে’ হিসেবে।

নিবিড় প্রেমভাব থেকে স্রষ্টা অথবা দেশমাতার সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রকাশ ঘটাতে বাংলার লোকমানসে সম্বোধনের পরিবর্তনময়তা আমরা লক্ষ করি, স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা নিবেদনে লোকসমাজে যেমন আপনি, তুমি বা তুই ব্যবহূত হয় অনুভূতির স্তর অথবা তীব্রতার প্রকাশক হিসেবে, তেমনি বঙ্গবন্ধুও ভাষণের উচ্চকিত মুহূর্তে আপনি থেকে অনায়াসে চলে গেছেন তুমি বা তোমরা সম্বোধনে।
বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘আমার সোনার বাংলা’, যা ছিল বঙ্গবন্ধুর প্রিয় এক গান এবং ১৯৫৪ সালে সাহিত্য সম্মেলনে সন্জীদা খাতুনকে যে গান গাইবার জন্য তিনি বিশেষভাবে অনুরোধ করেছিলেন, সেখানেও আমরা দেখি গানের কথায় সম্বোধনসূচক সর্বনামে এমনি পরিবর্তন ঘটে যাওয়া। স্বদেশকে তুমি সম্বোধন করে যে ভালোবাসার কথা বলা হয়েছে তা এক পর্যায়ে হয়ে ওঠে তুই। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘ওমা, আমার যে ভাই তারা সবাই, তোমার রাখাল, তোমার চাষি/ওমা তোর চরণেতে দিলেম এই মাথা পেতে।’ আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করতে হয় এখানে কেবল সম্বোধনের পরিবর্তনময়তা নয়, বক্তব্যবিচারেও ৭ মার্চের ভাষণের অনুরণন যেন খুঁজে পাওয়া যায়।

বক্তৃতার একেবারে শেষে, বাংলার লোকায়ত ইসলামে সুফিবাদের প্রভাবে যে উপাসনা-পদ্ধতি বিশেষ স্থান পেয়েছে, স্রষ্টা ও সৃষ্টির মিলনে যে ফানা বা পরম উপলব্ধি সঞ্চারিত হয়, যে নিবিড় সম্পৃক্তি-আকাঙ্ক্ষা লৌকিক ধর্মে আরও নানাভাবে প্রকাশ পেয়েছে, তেমনিভাবে নেতা ও জনতা একীভূত হয়ে পড়েন বক্তৃতাকালে, উপলব্ধির নিবিড়তায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বুঝি অন্তরের কোষে কোষে, রক্তের প্রতিটি বিন্দুতে অনুভব করেছিলেন নেতা ও জনতার একাত্ম হয়ে ওঠার গভীর ব্যঞ্জনা, তাই তো অসাধারণ ও অনন্য বাক্যবন্ধ রচনা করে তিনি বলেন, ‘মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ।’ এখানে কেবল সম্বোধনের রূপবদল নয়, ঘটে যায় সত্তার রূপান্তর, মনে রাখবার আহ্বান নিশ্চয় জনতাকে জানিয়েছেন নেতা, কিন্তু পরবর্তী উচ্চারণ ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব’, এটা নেতা ও জনতার সম্মিলিত উচ্চারণ, উভয়ের সত্তা একীভূত হয়ে যায় যেখানে, তারপরে আবার ফিরে আসে নেতৃরূপ, ঘোষিত হয় প্রত্যয়, ‘এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব’। একই নিশ্বাসে ভবিষ্যত্বাদী প্রত্যয়ের সঙ্গে সঙ্গে স্রষ্টার মহিমা কীর্তন করে তিনি উচ্চারণ করেন ‘ইনশাল্লাহ’, লোকধর্ম ও লোকরীতি সহজাত প্রকাশ পায় তাঁর উচ্চকিত রাজনৈতিক ভাষণে। এমন অসাধারণ বাক্য কেউ শিখে-পড়ে-লিখে বা বক্তৃতার পয়েন্ট হিসেবে নিয়ে আসতে পারে না, জীবনব্যাপী সাধনার মধ্য দিয়ে এমন বাক্যোচ্চারণের শক্তি অর্জন করতে হয়। আর তাই বক্তৃতার শেষে অমোঘ ঘোষণার মধ্য দিয়ে ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণ করে দিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বললেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম-এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
লেখক : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

ইউএনএসবিডিডটকম