গণহত্যার তালিকায় এক মধুসূদন

maduঅজয় দাশগুপ্ত
১৯৭১ সালের ১ মার্চ দুপুরে জেনারেল ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করার সঙ্গে সঙ্গেই এ ক্যান্টিন থেকে ছাত্রদের মিছিল বের হয় স্বাধীনতার স্লোগান দিয়ে। উত্তাল মার্চের দিনগুলোতে আন্দোলনের ভরকেন্দ্র স্থানান্তরিত হয় ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে। কিন্তু মধুর ক্যান্টিনের পাশেই চলে বাংলাদেশের জন্য সশস্ত্র লড়াইয়ের প্রস্তুতি। মধুদা তাদের জন্য বরাভয় হয়ে বিরাজ করেন। ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় শুরু হয় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কুখ্যাত ‘অপারেশন সার্চলাইট’ বা গণহত্যার নীলনকশার বাস্তবায়ন। তারা ঢাকার অনেক স্থানে নির্বিচারে গণহত্যা চালায়। একই সঙ্গে চলে সিলেকটিভ জেনোসাইড। এই নির্বাচিত ‘বিশিষ্টজনদের’ তালিকায় স্থান হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক চা-শিঙ্গাড়া বিক্রেতার, যার নাম মধুসূদন দে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের এক পাশে রয়েছে ‘মধুর ক্যান্টিন’। কেন এমন নাম? কেন এটা ঐতিহ্যের ধারক? ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ক্যান্টিনটি যার নামে প্রতিষ্ঠিত, তিনি নিশ্চয়ই বিখ্যাত কোনো ব্যক্তি হবেন। ক্যান্টিনের দেয়ালে কিংবা আশপাশে তার নামে নেই কোনো ফলক। তবে একটি আবক্ষ মূর্তি রয়েছে ক্যান্টিনের বাইরের অংশে, যাতে লেখা ‘আমাদের প্রিয় মধুদা’।

মধুদার পরিচয় একালের অনেকের অজানা। প্রতি বছর একটি বিশেষ দিনে ক্যান্টিনে আয়োজিত হয় তার স্মরণসভা। মধুদার পরিচিতজনরা দলমত নির্বিশেষে তাতে হাজির হন। এদের মধ্যে থাকেন মন্ত্রী ও সাবেক মন্ত্রী, এমপি, সরকারের পদস্থ কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও অন্য বিশিষ্টজনরা।
madu
তবে অনেকের অচেনা মধুদাকে নিয়ে একটি কৌতুক রয়েছে এভাবে : ‘এক তরুণ সাংবাদিককে দেওয়া হয়েছে মধুর ক্যান্টিন নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির অ্যাসাইনমেন্ট। এ ক্যান্টিনের প্রকৃত ইতিহাস তার জানা ছিল না। সে ধরে নেয়, ক্যান্টিনটি কপোতাক্ষ নদের বিখ্যাত কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের নামে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু ক্যান্টিনের বাইরে যে আবক্ষ মূর্তিটি রয়েছে তা দেখে কোনোভাবেই বলা যাবে না যে এটি কবির মতো হয়েছে। সে লেখা শুরু করেছে এ বাক্য দিয়ে :মূর্তিটি মোটেই মাইকেল মধুসূদনের মতো হয়নি।’

এটা নিছকই হয়তো কৌতুক। এ ক্যান্টিনটি যার নাম ধারণ করে আছে সেই মধুসূদন দে কেউকেটা ছিলেন না, বরং নিতান্তই একজন সাধারণ মানুষের দলে তাকে ফেলা যায়। মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরের আদিত্য চন্দ্র দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে ক্যাম্পাসে (বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পেছনের অংশে) চা-শিঙ্গাড়া বিক্রি শুরু করেন। ১৫ বছর বয়সী পুত্র মধুসূদন তার সঙ্গী ছিলেন। ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কলাভবন নীলক্ষেতের বর্তমান স্থানে স্থানান্তরিত হয়। মধুসূধন ততদিনে পিতার ক্যান্টিনের দায়িত্ব নিয়েছেন। তার জন্য বরাদ্দ হয় কলাভবনের পাশে ঢাকার নবাবদের দরবার হল হিসেবে ব্যবহৃত ঘরটি। পুরনো ক্যাম্পাসের মতোই ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের মতো প্রধান ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের নিয়মিত বসার স্থান হয়ে ওঠে মধুর ক্যান্টিন। [সত্তর ও আশির দশকে আরও দুটি প্রধান ছাত্র সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটে_ জাসদ সমর্থিত ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ এবং বিএনপি সমর্থিত ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল]। ততদিনে টিএসসি বা ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র মিলনায়তনেও চালু হয়েছে আধুনিক সুযোগ-সুবিধার ক্যান্টিন। কিন্তু ছাত্ররাজনীতির কেন্দ্র রয়ে গেছে মধুর ক্যান্টিন। আর তাদের মাথার ওপর বটবৃক্ষের মতো ছায়া হয়ে বিরাজ করেন মধুদা, যিনি ছোট-বড় সবার প্রিয়। বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা সেখানে নিজস্ব পরিমণ্ডল তৈরি করেন। কোনো ছাত্র সংগঠনের কর্মী সংখ্যা কত কম বা বেশি, সেটা পরিমাপের একটি সহজ উপায় হয়ে ওঠে মধুর ক্যান্টিনের আড্ডায় সাজানো চেয়ার-টেবিল দিয়ে। ছাত্রনেতারা ক্যান্টিনে বসে আন্দোলনের কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করেন। সঙ্গে থাকে চা-শিঙ্গাড়া।

পকেটে পয়সা না থাকলেও সমস্যা নেই_ আছে মধুদার খাতা। অনেক ছাত্রনেতা বছরের পর বছর বাকি খেয়েছেন। ক্যাম্পাস ছেড়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেছেন কিংবা কর্মজীবনে খ্যাতি অর্জন করেছেন। তারপর মধুদার বাকি শোধ করেছেন। এমন নজির ভূরি ভূরি। কোন ছাত্র সংগঠনের প্রতি তার আনুকূল্য রয়েছে, সেটা কেউ বলতে পারবে না। তবে এটা বলা চলে যে, পঞ্চাশের দশকে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন এবং ষাটের দশকে সেনা শাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা প্রবল ছাত্র আন্দোলনের প্রতি তার সমর্থন ছিল নিরঙ্কুশ। ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ক্যান্টিনের চেয়ার-টেবিল দখল করে বসে থাকে, চা-শিঙ্গাড়া কখনও খায় (খেলেও অনেকে বাকি রাখে), কখনও খায় না। কিন্তু তিনি কাউকে বলেন না উঠে যেতে। ক্যান্টিনের দেয়ালে সবসময় ছাত্র সংগঠনগুলোর পোস্টার সাঁটানো থাকে সবসময়। ছাত্রনেতাদের ঠাঁই না দিতে শাসকদের চাপ অবশ্যই ছিল। কিন্তু বিবেকের তাড়নায় তিনি সেটা উপেক্ষা করেছেন। এতে ঝুঁকি ছিল অনেক। পরিবারের চলার জন্য আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যেতে পারত। ক্যাম্পাসে থাকার স্থানটি হারানোর শঙ্কা ছিল। কিন্তু ছাত্রদরদি মধুদা ছিলেন অবিচল। স্বাধীন বাংলাদেশ বোধকরি তার হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিল। কিন্তু জীবন গেল স্বাধীনতার উষালগ্নে।


১৯৭১ সালের ১ মার্চ দুপুরে জেনারেল ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করার সঙ্গে সঙ্গেই এ ক্যান্টিন থেকে ছাত্রদের মিছিল বের হয় স্বাধীনতার স্লোগান দিয়ে। উত্তাল মার্চের দিনগুলোতে আন্দোলনের ভরকেন্দ্র স্থানান্তরিত হয় ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে। কিন্তু মধুর ক্যান্টিনের পাশেই চলে বাংলাদেশের জন্য সশস্ত্র লড়াইয়ের প্রস্তুতি। মধুদা তাদের জন্য বরাভয় হয়ে বিরাজ করেন। ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় শুরু হয় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কুখ্যাত ‘অপারেশন সার্চলাইট’ বা গণহত্যার নীলনকশার বাস্তবায়ন। তারা ঢাকার অনেক স্থানে নির্বিচারে গণহত্যা চালায়। একই সঙ্গে চলে সিলেকটিভ জেনোসাইড। এই নির্বাচিত ‘বিশিষ্টজনদের’ তালিকায় স্থান হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক চা-শিঙ্গাড়া বিক্রেতার, যার নাম মধুসূদন দে। তিনি রাজনৈতিক নেতা বা কর্মী ছিলেন না, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিও ছিল না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিববাড়ি এলাকায় একটি ছোট ফ্ল্যাটে নিম্নবিত্তের সংসার চলত টেনেটুনে। অথচ ২৬ মার্চ সকালে পাকিস্তানি সেনাদের একটি দল তার ঘরেই হাজির হলো যমদূতের মতো। আগের রাতেই তারা পার্শ্ববর্তী সার্জেন্ট জহুরুল হক হল ও জগন্নাথ হলে হামলা চালিয়েছে। খ্যাতিমান দার্শনিক ড. জিসি দেব এবং পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক ড. মুনিরুজ্জামান নিহত হয়েছেন। জগন্নাথ হলের প্রভোস্ট ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা গুলিবিদ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাজউদ্দীন আহমদসহ আরও অনেক শীর্ষ আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে হানা দিয়েছে। এমন বিশিষ্টজনদের তালিকাতেই স্থান পেলেন মধুসূদন দে। একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ৩০ লাখ নারী-পুরুষ-শিশুকে নির্বিচারে হত্যা করে। পোড়ামাটির নীতি অনুসরণ করে তারা। সামনে যাকে পেয়েছে গুলি করে কিংবা বেয়নেট চার্জ করে হত্যা করেছে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেছে কি-না, আওয়ামী লীগ করে কি-না_ এসব জানার দরকার নেই।

এ ভূখণ্ডে বসবাস করছে এবং পরিচয়ে বাঙালি, এ ‘অপরাধই’ যথেষ্ট। এ ছাড়াও তাদের বিশেষ টার্গেট ছিল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, মুক্তবুদ্ধির নারী-পুরুষ এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন। মধুসূদন দে নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের শিকার হলে বিস্ময়ের কিছু ছিল না। সার্জেন্ট জহুরুল হক হল, জগন্নাথ হল কিংবা রাজারবাগ পুলিশ ক্যাম্প অথবা পিলখানা ইপিআর সদর দফতরে তারা যাদের হত্যা করে তাদের কাউকে বিশেষ টার্গেট করা হয়নি। কিন্তু মধুদাকে ফেলা হলো ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইট বাস্তবায়নের ‘সিলেকটিভ জেনোসাইডের’ জন্য নির্বাচিতদের সংক্ষিপ্ত তালিকায়। কী অপরাধ ছিল সামান্য একজন ক্যান্টিন মালিকের? গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের তিনি সন্তানের মতো দেখতেন। একইভাবে তার স্নেহের পরশ পেত দলমতের বাইরে থাকা ছাত্রছাত্রীরাও। কারও প্রতি বিদ্বেষ-ক্ষোভ তিনি প্রকাশ করতেন না। মৃদুভাষী ও বিনয়ী বলে খ্যাতি ছিল। বাকি পয়সা আদায়ের জন্য চাপ সৃষ্টি করেননি কারও প্রতি। ক্যান্টিনের খাবার মান খারাপ কিংবা পচা-বাসি শিঙ্গাড়া পরিবেশন করে ছাত্রদের স্বাস্থ্যহানি ঘটাচ্ছেন, এমন অভিযোগ ছিল না। রাজনৈতিক অভিলাষ ছিল বলেও জানা যায়নি। তারপরও প্রবল পরাক্রমশালী রাষ্ট্র তার মতো একজন অতি সাধারণ নাগরিককে ভয়ঙ্কর প্রতিপক্ষ হিসেবে গণ্য করে। তার ক্যান্টিনে বাষট্টি, ছিষট্টি, ঊনসত্তরের আন্দোলনে সক্রিয় ছাত্র নেতাকর্মীরা বসে আলোচনা করতেন, এই অপরাধে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সৈন্যরা তার প্রাণ কেড়ে নেয়। ঘরের মধ্যে নির্বিচারে গুলিবর্ষণে মৃত্যু হয় তার স্ত্রী, এক পুত্র ও সন্তানসম্ভবা পুত্রবধূর। আহত হয় আরও কয়েকজন। মধুদাসহ নিহতদের সমাহিত করা হয় জগন্নাথ হলের গণকবরে।


২৬ মার্চ গুলিতে আহত তার এক মেয়েকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ‘মধুদার মেয়ে’_ এটা জেনে চিকিৎসকরা তার বিশেষ যত্ন করেছিলেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শুরু হলে মধুদার বেঁচে যাওয়া শিশু সন্তানরা ক্যান্টিনটি চালু করে। সে সময়ে তাদের প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের সহানুভূতির প্রকাশ ছিল চোখে পড়ার মতো। এরপর কয়েক দশক ধরেই এটা চলছে। বাংলাদেশের গৌরবের স্বাধীনতার পথে যাত্রার প্রস্তুতি পর্বের প্রতিটি আন্দোলনে তিনি প্রেরণা ছিলেন বলেই তার এ সম্মান। এভাবেই বেঁচে আছেন সবার প্রিয় মধুদা_ মধুসূদন দে এবং বেঁচে থাকবেন।

অজয় দাশগুপ্ত :সাংবাদিক

সমকাল