হোয়াইট ডে : এনে দিতে পারে অর্থনীতি বিকাশের সুযোগ

white japanরাহমান মনি
ইউরোপের দেশগুলোর প্রচলিত ধারা ভেঙে ১৪ ফেব্রুয়ারি ২৬৯ খ্রিষ্টাব্দে পছন্দের ব্যক্তিটিকে বিয়ে করায় ঘটনাবলির মধ্য দিয়ে ভালোবাসা দিবসের সূচনার কথা আধুনিক মিডিয়ার কল্যাণে কমবেশি আমরা সকলেই জানি, বিশেষ করে সম্পাদক শফিক রেহমানের যায়যায়দিনের মাধ্যমে বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে তা প্রচার পায়। পাশ্চাত্যপন্থি গির্জা কর্তৃক ১৪ ফেব্রুয়ারিকে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস ঘোষণা দিলেও প্রাচ্যপন্থি গির্জাগুলো কিন্তু ৬ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস ঘোষণা করে।

মজার ব্যাপার হলো প্রায় ১৮০০ বছর আগে ইউরোপের বিশ্ব ভালোবাসা দিবস আমরা মনে রেখে ঘটা করে পালন করলেও, আমাদের দেশে কিন্তু ১৪ ফেব্রুয়ারি সুন্দরবন দিবসের কথা আমরা অনেকেই জানি না। যেমন আমরা ভুলতে বসেছি স্বৈরশাসক কর্তৃক বিতর্কিত শিক্ষানীতির কথা। ১৪ ফেব্রুয়ারি মজিদ খান শিক্ষানীতি চাপিয়ে দিয়েছিল তৎকালীন স্বৈরশাসক।

১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবস পালন মনে রাখা এবং ঘটা করে তা পালন করার অন্যতম কারণ হচ্ছে ভ্যালেন্টাইন ডে তার মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে বাণিজ্যিক রূপ পাওয়ায়, দিবসটি উপলক্ষ করে কেনাকাটা হয় প্রচুর। কর্পোরেট কোম্পানিগুলো অটেল অর্থ করে বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে ক্রেতা আকর্ষণ করার জন্য। হোটেল ব্যবসা বিশেষ ব্যবস্থা নেয় দিবসটি পালনে। কনফেকশনারি কোম্পানিগুলো বিশেষ ছাড় দিয়ে থাকে। গিফ্ট আইটেম ব্যবসায়ী বিশেষ উদ্যোগ নেয় ক্রেতা আকর্ষণে। এ সবকিছুর সঙ্গেই অর্থনীতি জড়িত। কর্মসংস্থান বাড়ে। অর্থনীতি একমুখী হতে পারে না। বেচাকেনা মানেই অর্থনীতির চাকা ঘোরা।


জাপানকে বলা হয় নতুন নতুন ব্যবসার উদ্ভাবক। সবকিছুতেই ব্যবসায়িক চিন্তাভাবনা জাপানিদের একটা সহজাত প্রবৃত্তি। যেমন তাদের আরেকটি সহজাত প্রবৃত্তি হচ্ছে গিভ অ্যান্ড টেক। অর্থাৎ দেয়া নেয়ার সম্পর্ক। কিছু নিলে কিছু দিতে হয় এই সত্যটি জাপানিরা বেশ ভালোভাবেই রপ্ত করেছে। এ নেয়া-দেয়া সম্পর্ক এবং ব্যবসায়িক চিন্তাভাবনা থেকেই জাপানে ‘হোয়াইট ডে’ বা সাদা দিবস প্রচলন করে। ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবসে জাপানে সাধারণত মেয়েরা ছেলেদের দিয়ে থাকে উপহার সামগ্রী, জাপানে মেয়েরা ছেলেদের যে উপহার দেয় ১৪ ফেব্রুয়ারি তা দুটি ভাগে ভাগ করা হয়। প্রথম ভাগকে বলা হয় গিরি চোকো (Obligatory chocolate), এটা সাধারণত দেয়ার জন্যই দেয়া। অনেকটা নিয়ম রক্ষার্থে। যেমন অফিসের সহকর্মী, বস্ বা অধস্তনদের, পরিচিতদের দেয়া। আর দ্বিতীয় ভাগটি হচ্ছে হোনমেই চোকো (Chocolate for the man the women is serious about)। কেবল প্রিয়জনদের দেয়া। বয়ফ্রেন্ড বা একেবারের কাছের লোকদের দেয়া।

জাপান ১৪ ফেব্রুয়ারি যেসব ব্যক্তি বা প্রিয়জনদের কাছ থেকে উপহার পাওয়া গেছে তাদের ধন্যবাদ জ্ঞাপন হিসেবে ঠিক মাস পর অর্থাৎ ১৪ মার্চকে ছেলেদের পক্ষ থেকে ফেরত দেয়ার দিন ধার্য করে দিবসটিকে ‘হোয়াইট ডে’ বা সাদা দিবস হিসেবে পালন করে আসছে ৩৩ বছর ধরে। সাদা দিবসের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে একেবারে পূতপবিত্র। কোনো ধরনের আঁচড় নেই তাতে অর্থাৎ সাদা মন।

ফুকুওকা ভিত্তিক একটি কনফেকশনারি কোম্পানি মালিক (ইশিমুরা মানসেই দো কো. লি.) ইশিমুরা ১৯৭৭ সালে সর্বপ্রথম হোয়াইট ডে ধারণা প্রচলন করেন। তিনি বলেন, যদি ছেলেরা ভ্যালেনটাইন ডেতে মেয়েদের কাছ থেকে কিছু মেয়ে থাকে তা হলে ছেলেদের কাছ থেকেও মেয়েদের কিছু দেয়া উচিত একটি নির্দিষ্ট দিনে। এবং সেটি হতে পারে ২৬৯ সালের ১৪ মার্চ (১৪ ফেব্রুয়ারির পর বিবাহোত্তর আনুষ্ঠানিকতা) এর প্রতি সম্মান রেখে।

কোম্পানির মালিকের ইচ্ছা অনুযায়ী তারই কোম্পানিতে তৈরি Marshmallow নামক ধবধবে সাদা একটি সুস্বাদু খাবার মেয়েদের জন্য উপহার হিসেবে পাঠান। এটা দেখতে অনেকটা স্পঞ্জের মতো। খাল কিংবা নালার ধার নেয়া এক ধরনের উদ্ভিদ (মার্শমালো) ব্যবহার করে ওই খাবারটি তৈরি করা হয়েছিল। যদিও এখন আর সেই উদ্ভিদ ব্যবহার করা হয় না এবং কেবলমাত্র ধবধবে সাদার মধ্যেও সীমাবদ্ধতা নেই তারপরও তার প্রতি সম্মান রেখে নামটি এখনো মার্সমালো রাখা আছে খাবারটির।


পরবর্তী বছর অর্থাৎ ১৯৭৮ সালে জাপান জাতীয় কনফেকশনারি শিল্প সংস্থা ১৪ মার্চকে উত্তর দিবস বা Answer day হিসেবে ঘোষণা করে। এর আগেও বিভিন্নভাবে এই দিনটিকে কফি ডে, বা ফ্লাওয়ার ডে হিসেবে বিক্ষিপ্তভাবে পালন করেছে বিভিন্ন স্থানে। ১৪ মার্চ উপহার হিসেবে যাই দেয়া হোক না কেন তার সঙ্গে এক প্যাকেট ক্যান্ডি অবশ্যই থাকতে হবে। ১৪ মার্চ পালিত হয় হোয়াইট ডে হিসেবে। প্রথমে এটি ক্যান্ডি কোম্পানির চিন্তা (ব্যবসায়িক) থাকলেও ১৯৭৮ জাতীয় স্বীকৃতি এবং ১৯৮০ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পালন হয়ে আসায় দিন দিন এর ব্যবসায়িক প্রসার ঘটছে। ১৪ ফেব্রুয়ারি যেসব পণ্য অবিক্রীত অবস্থায় থেকে যায় শুধু লেবেল বদল করে হোয়াইট ডে’র সিল মেরে পুনরায় বিক্রির জন্য পসরা সাজানো হয় শপিংমলগুলোতে।

জাপান ছাড়াও এশিয়ায় জায়ান্ট দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান এবং বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক পরাক্রমশালী চীনেও ঘটা করে পালন করা হয় হোয়াইট ডে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে কিছু কিছু অঞ্চলে সবে শুরু হয়েছে পালন করা।

ইতিবাচক বা নেতিবাচক যেভাবেই দেখা হোক না কেন বাংলাদেশে ভালোবাসা দিবস পালনে বড় ভূমিকা রেখেছেন শফিক রেহমান। এ দেশের ক্রমবর্ধিষ্ণু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ভোগবাদ ভালোবাসা দিবসে ভূমিকা রাখছে। কারণ অর্থনৈতিক সচ্ছলতা না বাড়লে আমাদের দেশের মতো দেশে ভালোবাসা ঘটা করে পালিত হতো কি না সন্দেহ, শফিক রেহমানের বদৌলতে ভালোবাসা দিবস পালন উপলক্ষে বিভিন্ন সেন্টার (ফুল, গিফটকার্ড, ক্যান্ডি কোম্পানি) গতিশীল হয়েছে যা অর্থনীতিতে অবদান রাখছে।

rahmanmoni@gmail.com

সাপ্তাহিক