ভাষা আন্দোলনের রাজনীতি

মীজানূর রহমান শেলী
অনন্য স্মৃতিতে সমৃদ্ধ একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষাসংগ্রাম বাঙালির ইতিহাসে এক যুগান্তকারী সংগঠন। ১৯৫২ সালের এই দিনে যে ভূখণ্ড আজ স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ, সে এলাকার বাঙালির স্বাধিকার অর্জনের এক রক্তরঞ্জিত ও ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সূচনা ঘটে। সারা বিশ্ব জানে, ছাত্র-জনতার সম্মিলিত আন্দোলনের সেই অতুলনীয় ক্ষণে ভাষাশহীদ তরুণ সালাম, বরকত, রফিক, শফিক, জব্বার ও অন্যান্য বীরের আত্মাহুতির মাধ্যমে বাংলা ভাষার ন্যায্য মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম দুর্বার হয়ে ওঠে। প্রাক ১৯৭১ সালের অখণ্ড পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের ভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য এ অঞ্চলের ছাত্রছাত্রীদের নেতৃত্বে যে আন্দোলন গড়ে ওঠে, তার মূলে ছিল নেতিবাচক ঔপনিবেশিক অন্যায় প্রতিরোধের অদম্য সংকল্প। প্রাথমিক দৃষ্টিতে ভাষা আন্দোলনের প্রকৃতি বিবেচনা করলে মনে হতে পারে, ছাত্র-জনতার এই প্রয়াস ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতা রক্ষার ঐতিহাসিক প্রচেষ্টা। তৎকালীন পাকিস্তানের শাসকচক্রের গভীর ও সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে এ ছিল এক দৃপ্ত প্রতিরোধ। ওই কুটিল ষড়যন্ত্রের মূলে ছিল সেকালের পাকিস্তানে যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেই বাঙালির নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতিকে অবদমিত করে ভিনদেশি ভাষার সর্বগ্রাসী রাজত্ব গড়ে তোলার পরিকল্পনা। এই মারাত্মক পরিকল্পনা তাই ওই রাষ্ট্রের গণতন্ত্রকে অস্বীকার ও লুপ্ত করার হীন প্রয়াসের রূপ নেয়। অথচ উপমহাদেশের বিভক্তির ফলে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি ঘটে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ভোটের মাধ্যমে। সেই প্রক্রিয়ায় প্রাক ১৯৪৭ সালে যাঁরা অগ্রণী ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, তাঁরা ছিলেন বাঙালি। পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানভিত্তিক শাসকগোষ্ঠী এই স্বীকৃত ইতিহাস অস্বীকার করে বাঙালিকে পরিণত করতে চায় নিপীড়িত ও শোষিত জনগোষ্ঠীতে। তাদের দুরভিসন্ধির প্রকাশ ঘটে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কার্যক্রমের মাধ্যমে। বাংলা ছিল ১৯৪৭ সালে সৃষ্ট পাকিস্তানের ৫৪ শতাংশ নাগরিকের ভাষা। পক্ষান্তরে যে উর্দুকে একমাত্র রাষ্টভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার কুটিল পদক্ষেপ শাসকরা নিয়েছিল, তা সারা পাকিস্তানের আড়াই শতাংশেরও মাতৃভাষা ছিল না। পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার রক্তরঞ্জিত আন্দোলন ছিল মূলত ও সার্বিকভাবে রাজনৈতিক।

কী ছিল এই আন্দোলনের প্রধান রাজনৈতিক বার্তা? পরবর্তী ইতিহাস প্রমাণ করে, সে রাজনীতি ছিল গণতন্ত্র মজবুত করার এবং ঐক্যবদ্ধ গণপ্রয়াসের মাধ্যমে পাকিস্তানের বাঙালির ভাষাগত সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধিকার দৃঢ় ভিত্তিতে সুরক্ষিত করা।


ভাষা আন্দোলনের উৎস ও সূচনা বিবেচনা করলে দেখা যায়, ১৯৪৮ সাল থেকেই এর শুরু। যুগে যুগে দেশে দেশে যে তরুণসমাজ এই ধরনের ঐতিহাসিক আন্দোলনের অগ্রমুখ হিসেবে ভূমিকা রাখে, বাংলার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

১৯৪৭ সালের আগে আর্থসামাজিক বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পাওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে যে বাঙালি তরুণরা পাকিস্তানের ভিত রচনায় অগ্রণী ভূমিকা নেয়, নয়া শাসককুলের অন্যায়, অত্যাচার ও সাংস্কৃতিক নিপীড়নের প্রতিবাদে তাদেরই বিপুল অংশ ভাষা আন্দোলনের সূচনা করে। নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে তাদের সেই দাবি- ভাষার দাবি ও গণতন্ত্রের দাবি ১৯৫২ সালের রক্তাক্ত একুশে ফেব্রুয়ারির পথ ধরে প্রবল শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ফলে, এমনকি, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীও ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।

কিন্তু এত কিছুর পরও তাদের শঠতা ও ছলচাতুরীর অবসান ঘটে না। গণতন্ত্রের যে মহান স্বপ্ন ভাষা আন্দোলনের রাজনীতির ভিত্তিমূল, তাকে সামরিক শাসনের মাধ্যমে ১৯৫৮ সালে অবলুপ্ত করা হয়।

এবারেও বাংলার তরুণসমাজ, বিশেষত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছাত্রসমাজ কিন্তু ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের সেনাশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও সংগ্রাম শুরু করে ১৯৬১-৬২ সাল থেকেই। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে যে গণমুখী, গণভিত্তিক আন্দোলন সামরিক শাসনকে চ্যালেঞ্জ করে, ক্রমে তা পরিণত হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রামে। রূপ লাভ করে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের। ১৯৭১ সালের রক্তরঞ্জিত মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় নতুন করে গণতন্ত্র অর্জনের মহান প্রয়াসে। পাকিস্তানি সামরিক-বেসামরিক শাসকচক্র ২৫শে মার্চের রাতে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর হামলা চালিয়ে যে গণহত্যা চালায়, তা প্রতিরোধেই বাঙালি অস্ত্র ধরে।

ইতিহাসের নিরিখে তাই একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলন ও ২৬শে মার্চের মুক্তিসংগ্রাম এক অভিন্ন সূত্রে বাঁধা। এর পটভূমিতে ও মূল কাঠামোয় যে রাজনীতি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, তা সত্যিকার গণতন্ত্র ও অকৃত্রিম স্বাধীনতার কালজয়ী রাজনীতি। সুতরাং একুশের রাজনীতি কোনো সাময়িক বা অস্থায়ী প্রক্রিয়া নয়; এটি একটি ধারাবাহিক ও অনিঃশ্বেষ প্রয়াসের প্রক্রিয়া।

স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের আবির্ভাবের পর চার দশকেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে, কিন্তু ভাষা আন্দোলনের রাজনৈতিক বার্তা এখনো সার্বিকভাবে সঞ্চারিত হয়নি। গণতন্ত্র বারবার কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে এবং এখনো সুদৃঢ় প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি খুঁজে পায়নি। অনৈক্য, বিভেদ ও কূপমণ্ডূকতা সমাজকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত যে স্বপ্ন এ দেশের মানুষকে প্রাণচঞ্চল করে রেখেছিল, তার মর্মবাণী ছিল জাতীয় আত্মমর্যাদাবোধ, যা বিকশিত হয় গণতন্ত্রে। গণতন্ত্রভিত্তিক ঐক্য শোষণহীন, বৈষম্যবিহীন আর্থসামাজিক ব্যবস্থা এবং উপরোক্ত ভাষা ও সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে। পরিতাপের বিষয় যে সেই দুর্জয় বাণী সমাজের মর্মমূলে ব্যাপকভাবে সঞ্চারিত হয়নি। গণতন্ত্র জর্জরিত অনৈক্যে, বিভেদে ও সংঘাতে। শিক্ষাব্যবস্থা তিন ভাগে বিভক্ত- একদিকে বাংলা মাধ্যম, অন্যদিকে ইংরেজি মাধ্যম এবং অপরদিকে ধর্মীয় ধারার শিক্ষা। গণতান্ত্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় বৈচিত্র্য ও ভিন্নতা স্বাভাবিক। তবে সমন্বয়ধর্মী ব্যবস্থার মাধ্যমে জাতীয় একাত্মতাবোধ বিকশিত না হলে শিশু, কিশোর ও তরুণসমাজ ত্রিধাবিভক্ত হয়ে থাকবে। এতে স্থায়ী জাতীয় একাত্মতা গড়ে তোলা হয়ে উঠবে দুরূহ। তা ছাড়া দেশীয় ভাষা ও সংস্কৃতিকে ভিনদেশি ভাষা ও সংস্কৃতির আগ্রাসন থেকে মুক্ত রাখা অবশ্যকর্তব্য। উন্মুক্ত আকাশ সংস্কৃতির এই যুগে কাজটি করতে হবে সুচিন্তিতভাবে ও সুষ্ঠু উপায়ে। পদক্ষেপগুলো এমন হতে হবে, যাতে আমরা নিখিল বিশ্বের খোলা জানালা বন্ধ করে দিয়ে কূপমণ্ডূক হয়ে না উঠি। অথচ নিজস্ব পরিচিতি ও প্রত্যয় যেন সর্বদা রক্ষা করে চলি। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের রাজনীতি হৃদয়ের প্রসারের রাজনীতি, যার মূলমন্ত্র-

‘ও আমার দেশের মাটি
তোমার পরে ঠেকাই মাথা
তোমাতে বিশ্বময়ী, বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা।’

লেখক : চিন্তাবিদ, সমাজবিজ্ঞানী ও সাহিত্যিক সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ বাংলাদেশের (সিডিআরবি) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও আর্থসামাজিক ত্রৈমাসিক এশিয়ান অ্যাফেয়ার্সের সম্পাদক
mrshelley43@gmail.com

কালের কন্ঠ