অজ্ঞান পার্টির নিরাপদ জোন

ঢাকা-মাওয়া মহাসড়ক
ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কে চলাচলরত বাসে অজ্ঞান পার্টির দৌরাত্ম্য বৃদ্ধি পেয়েছে। রোববার দুই ব্যক্তি অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব খুইয়েছেন। এ নিয়ে গত ১৭ দিনে এ রুটে ৮ ব্যক্তি অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়েছেন। অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব হারাচ্ছেন সাধারণ মানুষসহ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও। এ অবস্থা চলতে থাকলেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তেমন তৎপর হতে দেখা যাচ্ছে না। এদিকে অজ্ঞান হয়ে যাত্রীরা বাসস্ট্যান্ডে পড়ে থাকলেও পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠাতে কোনো উদ্যোগ নেয় না বলে এলাকাবাসী অভিযোগ করেছে। তাই ঢাকা-মাওয়া মহাসড়ককে অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা তাদের নিরাপদ জোন হিসেবে বেছে নিয়েছে।


ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কে চলাচলরত বাসগুলোয় দীর্ঘদিন ধরে অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা যাত্রীদের অজ্ঞান করে সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে। এ অজ্ঞান অবস্থা কখনও কোনো কোনো যাত্রীর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একটি সংঘবদ্ধ চক্র ঢাকার গুলিস্তান থেকে যাত্রীবেশে মাওয়ার বাসে চড়ে। পরে তারা পাশের যাত্রীর সঙ্গে আলাপ শুরু করে। এক সময় পাশের যাত্রীর সঙ্গে ভাব জমে উঠলে ওই যাত্রীকে কিছু খাওয়ার প্রস্তাব করে। সরল বিশ্বাসে সাধারণ যাত্রীটি যাত্রীবেশী অজ্ঞান পার্টির সদস্যের খাবার খেয়ে অচেতন হয়ে পড়েন। এ সুযোগে অচেতন হওয়া যাত্রীর সর্বস্ব লুটে মাঝপথে নেমে পড়ে অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা। আবার কখনও যাত্রীর বিশ্বাস অর্জনে নিজে খাবার না দিয়ে হকারবেশী অজ্ঞান পার্টির সদস্যের কাছ থেকে খাবার কিনে খেতে দেয়। যাত্রী সরলমনে খাবার খেয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেললে পাশের যাত্রীবেশী অজ্ঞান পার্টির সদস্য চলন্ত বাসে যাত্রীর সর্বস্ব লুটে সুবিধামতো কোনো এক জায়গায় বাস থেকে নেমে যায়। এক সময় বাসটি মাওয়ায় এলে হেলপার সেই যাত্রীকে অচেতন অবস্থায় বাসস্ট্যান্ডে ফেলে রাখে। স্থানীয় জনতা পকেট খুঁজে আত্মীয়স্বজনের কোনো মোবাইল নম্বর পেলে সেখানে ফোন করে খবর দিলে তারা এসে যাত্রীকে নিয়ে যান। তাছাড়া জ্ঞান না ফেরা পর্যন্ত তাকে ঘাটের কোনো স্থানে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকতে হয়। অথচ এ অজ্ঞান ব্যক্তিটিকে উদ্ধার করে হাসপাতাল বা পরিজনের কাছে ফিরিয়ে দিতে পুলিশ বা প্রশাসনের কাউকে তেমন কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যায় না।


গত বুধবার চার ব্যক্তি অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ে জ্ঞান হারিয়ে মাওয়ায় পড়ে ছিলেন। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নিজামুল হক নিজাম। পুলিশ তাকে মাওয়া ঘাট থেকে উদ্ধার করে পার্শ্ববর্তী শ্রীনগর উপজেলার ষোলঘর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসার জন্য পাঠায়। অথচ নিজামুল হকের সঙ্গে বরিশালের কাউনিয়া থানার চকবাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা ও সাপানিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মাহাবুব সাইদুর, সাভারের নরসিংহপুরের হক আলী শরীফের ছেলে গার্মেন্টকর্মী মঞ্জু শরীফসহ অন্য এক ব্যক্তি জ্ঞান হারিয়ে পড়ে থাকলেও পুলিশ তাদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠায়নি। পরে তাদের পকেট থেকে উদ্ধার করা মোবাইল ফোন নম্বরে স্থানীয় জনতা খবর দিলে আত্মীয়স্বজন এসে তাদের নিয়ে যায়।

একইভাবে ১ ফেব্রুয়ারি শরীয়তপুরের খড়িয়াতলা গ্রামের আবুল খালেক ফকিরের ছেলে লিটন ফকির এ মহাসড়কে অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব হারিয়েছেন। এরপর ৭ ফেব্রুয়ারি গোপালগঞ্জের শিবনাথ ভক্তের ছেলে প্রশান্ত একইভাবে অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব হারিয়ে আত্মীয়ের মাধ্যমে বাড়ি পেঁৗছেন। সর্বশেষ গতকাল রোববার বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকার কোতোয়ালি থানার খান সড়কের নেজারত ভবনের বাসিন্দা মৃত নেজারত হোসেন খানের ছেলে মশিউর রহমান খান ও মাদারীপুরের শিবচর থানার ভদ্রাসন গ্রামের আবদুল রহিম হাওলাদারের ছেলে জিয়াউর রহমান ঢাকার গুলিস্তান থেকে মাওয়ার বাসে চড়ে হকারের কাছ থেকে পানি কিনে খেয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। এ সময় অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা মশিউরের কাছে থাকা দেড় লাখ টাকা ও মোবাইল ফোনসেটসহ সবকিছু লুটে নেয়। একইভাবে জিয়াউরের সাড়ে ৭ হাজার টাকা ও মোবাইল ফোনসেট নিয়ে যায় তারা। বাসের হেলপার মাওয়া বাসস্ট্যান্ডে ফেলে রাখলে স্থানীয় জনতা পুলিশের সহযোগিতায় স্বজনদের হাতে তাদের তুলে দেয়।

মুন্সীগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. জাকির হোসেন বলেন, ঘটনাগুলো সাধারণত মাঝপথে ঘটে থাকে। আমরা এরই মধ্যে সোর্স লাগিয়েছি অজ্ঞান পার্টির সদস্যদের চিহ্নিত করতে। অচেতন যাত্রী পেলে পুলিশ সহযোগিতা করে না, এটা ঠিক নয়। অচেতন ব্যক্তিকে হাসপাতালে পাঠানোসহ আইনগত সহায়তা দেওয়া পুলিশের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

সমকাল