‘গ্রামবাংলাই আমার কাজের মূল বিষয়’

shamvuমুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার মিরকাদিম পৌরসভার কালিন্দীপাড়ায় সপরিবারে বসবাস করছেন উপমহাদেশের বিখ্যাত পটচিত্রশিল্পী শম্ভু আচার্য। অনবরত তিনি আপনমনে বিভিন্ন রঙে পটচিত্র এঁকে যাচ্ছেন। পটচিত্র আমাদের নিজস্ব শিল্পরীতি। বাঙালি জীবন-জীবিকা আর ইতিহাস-ঐতিহ্য, শিল্পরুচি পটচিত্রে প্রকাশ পায়। পটচিত্রী শম্ভু আচার্য এ শিল্পকে বিশ্বপরিসরে সুপরিচিত করে বাংলাদেশের জন্য বয়ে এনেছেন বিরল সম্মান। ২২ জানুয়ারি থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত চলছে তাঁর পটশিল্প প্রদর্শনী। বিজ্ঞাপনী সংস্থা এক্সপ্রেশনের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রদর্শনীটি চলছে ঢাকা আর্ট সেন্টারে। এই গুণী শিল্পীর সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন—মোহাম্মদ মোর্শেদ নাসের

এবারের প্রদর্শনীর চিন্তা-ভাবনা কীভাবে এল এবং এক্সপ্রেশন এই উদ্যোগের সাথে সম্পৃক্ত হলো কীভাবে?

প্রথম থেকেই আমার এক্সিবিশন, কাজ, পরিচিতি—সব কিছুতেই এক্সপ্রেশনের যথেষ্ট অবদান। এক্সপ্রেশনের কর্ণধার রামেন্দু মজুমদারের আন্তরিক শুভানুধ্যানেই আমি আজকে এখানে। উনিই আমাকে হাতে ধরে নিয়ে আসেন শিল্পকলা একাডেমীতে, ১৯৯৪ সালে। ২০১০ সালে যখন এক্সপ্রেশনের দশম বার্ষিকী উদ্যাপিত হয়, তখন আমার প্রথম এক্সিবিশন হয় গ্যালারি চিত্রকে। এক্সপ্রেশনের বিশ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে, এক্সপ্রেশন আয়োজিত এটা আমার দ্বিতীয় এক্সিবিশন। কিন্তু বাংলাদেশে সব মিলিয়ে এটা আমার চতুর্থ এক্সিবিশন। দেশের বাইরেও প্রদর্শনী হয়েছে। ২০০৩ সালে প্রথম প্রদর্শনী করি, তারপর ২০০৬ সালে দ্বিতীয় এক্সিবিশন হয় গৌতম চক্রবর্তীর গ্যালারি কায়াতে, ২০০৭ সালে ইউরোপীয় উনিয়নের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে আলিয়ঁস ফ্রজেসে। এরপর আমার কোনো এক্সিবিশন হয়নি। ২০০৭ সালে চিন্তা করলাম, একটা এক্সিবিশন করি; সেই চিন্তা থেকে পাঁচ বছরের চেষ্টায় চলতি এক্সিবিশনটির আয়োজন করি।

আপনি এবং আপনার পরিবারের সক্রিয় ভূমিকায় পটশিল্পের পুনর্জাগরণ ঘটে। বর্তমানে এর অবস্থা সম্পর্কে আপনার ভাবনা কী?

বর্তমান অবস্থা আগের চেয়ে অনেক ভালো। আমার বিশ্বাস, পৃথিবীটা গোল, ঘুরেফিরে আবার একটা জায়গায় আসতে হবে আমাদের। আর শিকড়ের প্রতি সবার আর্কষণ চিরন্তন। পটশিল্প আদিকালে ছিল, মাঝখানে একটু ভাটা পড়লেও আমার বাবা—যিনি ছিলেন পটশিল্পীদের অষ্টম পুরুষ—পরিচিত হতে পারেননি, মঞ্চের পেছনেই কাজ করে গেছেন। পুরুষ ন্যাশনাল কাপ কাউন্সিল আমাকে ও বাবাকে আবিষ্কার করল। এরপর এক্সিবিশন করলাম। আমার মনে হলো, আবার মানুষের মাঝে পটশিল্পের প্রতি আগ্রহ আগের মতোই বেড়েছে। তো আমি মনে করি, আগামীতে ব্যাপকভাবে পটশিল্পের প্রসার ঘটবে।
shamvu
আপনার কি মনে হয়, সাধারণ মানুষকে পটশিল্প সম্পর্কে জানানোর সত্যিকার অর্থে কোনো উদ্যোগ আছে আমাদের দেশে?

এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হলে আর্ট ইনস্টিটিউট হতে পারে, স্কুলে এর প্রশিক্ষণ হতে পারে, এ ছাড়া বিভিন্ন ওয়ার্কশপ হতে পারে। কিন্তু এই উদ্যোগগুলো নেওয়া হচ্ছে না। আমি নিজ উদ্যোগে কিছু ওয়ার্কশপ করার চিন্তা করেছি, যাতে সবাই পটশিল্প সম্পর্কে জানতে ও শিখতে পারে। একসময় আমি হয়তো থাকব না, আমার প্রতিনিধিত্ব করার মানুষগুলো আমি গড়ে যেতে চাই। আমার পরিবারের সকলেই এর সাথে জড়িত। আমার সন্তান পটশিল্পীদের দশম পুরুষ হবে, যে কাজ করছে। আর চারুকলা থেকে ডাকলেই পটশিল্প শেখানো হবে—এটা বড় কথা না। আমি নিজেই গাছতলায় এর চর্চা করতে পারি, একটা নদীর পাড়েও করতে পারি। চারুকলায় মোজাইক করা দেওয়াল, মোজাইক করা গ্যালারি—এটা বড় কথা না। একটা প্রতিষ্ঠানে গিয়েই শিখতে বা শেখাতে হবে—এমন কোনো কথা নেই। বিশেষ দিনে বা যেকোনো জাতীয় উত্সবেও আমি শেখাতে পারি।

এ ক্ষেত্রে আপনার কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা আছে কি?

আমার বাড়িতে গত কয়েক দিন আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্টিফেন ফ্রাইন গিয়েছিলেন একটি ইনস্টিটিউট করার জন্য। তিনি নিজ উদ্যোগে কাজটি করার পরিকল্পনা করেন বুয়েটের ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে নিয়ে। কিন্তু এই ইনস্টিটিউট আমি ধরে রাখতে পারব কি না বা আমার গ্রামে যে পরিবেশ, সেখানে এই ইনস্টিটিউট টিকে থাকবে কি না বা ছাত্রছাত্রী পাব কি না—এসব নিয়ে আমি কিছুটা সন্দিহান। আমি যে গ্রামে থাকি, সেখানকার মানুষের এ বিষয়ে তেমন কোনো শিক্ষা বা ধারণা নেই। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এত টাকা খরচ করে এই ইনস্টিটিউট করবে, কিন্তু আমি এর সঠিক ব্যবহার করতে পারব না—এতে লাভ কী? সবমিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিই, যেভাবে আছে, সেভাবেই চলুক। কেউ যদি নিজের ইচ্ছায় শিখতে আসে, তাহলে শেখাব।

এ বিষয়ে আপনার নিজের মধ্যে কোনো আক্ষেপ কাজ করে?

আমার তো এক সময় সমাপ্তি ঘটবে, এর আগে আমি চাচ্ছি পটশিল্পকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দিতে। সবাই কাজটি জানুক বা শিখুক। আগেই বললাম, যেকোনো জায়গায় যেকোনো সময়ই পটশিল্পের কাজ হতে পারে। কিন্তু কোনো ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। কেননা, এখনো তেমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। এটা কিন্তু অভিমান থেকে নয়, বাস্তবতা থেকেই বলছি।


এবারের প্রদর্শনীতে বিষয় হিসেবে কী কী এসেছে?

এবারের এক্সিবিশনে ধর্মীয় বিষয় থেকে শুরু করে ইতিহাসের অনেক দিক টানা হয়েছে। রামায়ণ, মহাভারত, মনসামঙ্গল, পদ্মপুরাণ, কারবালা-মহররম আছে বিষয় হিসেবে; আর গাজীর পট তো আছেই। রয়েছে আমাদের গ্রাম্য কৃষ্টি, ঐতিহ্য, গ্রামবাংলার চিরন্তন সামগ্রী—কলস, মাছকুটা, ঢেকি, বৈষ্ণব-বৈষ্ণবী, নৌকা, শিকা, কেশবিন্যাস প্রভৃতি। আমার কাজ মূলত বাংলাদেশ এবং এ দেশের গ্রামাঞ্চল নিয়ে। গ্রামবাংলাই আমার কাজের মূল বিষয়।

আপনি কাজ করেন কখন?

আমি মূলত সবসময়ই কাজ করি। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টার প্রায় ১৮ ঘণ্টাই আমি কাজ করি। এটা কোনো নিয়ম করে করে নয়। আমি বরাবরই কাজ করতে ভালোবাসি। কাজ যখন করি, তখন মনে হয় আমি অবসর কাটাচ্ছি।

এবারের প্রদর্শনীতে কেমন সাড়া পাচ্ছেন?

খুব ভালো সাড়া পাচ্ছি, সকলে অনেক প্রশংসা করছে। আর এর মাধ্যমে একটি মেসেজ সবাইকে দেওয়ার চেষ্টা করেছি যে, পটশিল্প এভাবেও করা যায়। অনেকেই জানতেন না, অনেকে শোনেননি হয়তো। তাই তাঁদের মাঝে এই মেসেজটা পৌঁছে দেওয়াই আমার মূল লক্ষ্য।

ভবিষ্যতে আপনি কী কাজ করতে চান?

শুধু ধর্মীয় পট বা কৃষ্টিবিষয়ক পটই না, আমি একটি স্বাধীনতার পট করেছি। ১৭৫৭ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ২০ খণ্ড ছবি দিয়ে এর সমাপ্তি হয়ে গেছে আজ থেকে ১১ বছর আগে। এটা প্রদর্শনীর অপেক্ষায়। এতে ধরা হয়েছে পলাশীর প্রান্তর থেকে শুরু করে একাত্তর পর্যন্ত আমাদের চূড়ান্ত বিজয় অবধি বিভিন্ন ঘটনাবলি। এর মধ্যে রয়েছে পলাশীর যুদ্ধ, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ, ফরায়েজী আন্দোলন, তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা, ভাষা আন্দোলন—এভাবে এগিয়েছে কাজটি। আর যতজন বুদ্ধিজীবী শহীদ হয়েছেন, তাঁদের পোর্ট্রেট পটশিল্পের ধারায় নিয়ে এসেছি। এর গীতিকাব্য ও লেখা হয়ে গেছে। আমাকে এই ইতিহাস এবং গীতিকাব্য দিয়েছেন ড. এনামূল হক সাহেব। আমি জানি না, কতটুকু করতে পেরেছি। কিন্তু এটা একটা ইতিহাস হতে পারে। এর নামকরণ হয়েছে ‘মহাপুরুষের অন্তর্ধান শহীদ মুজিবনামা’।

মোহাম্মদ মোর্শেদ নাসের – ইত্তেফাক