কেমন কাটল মুন্সীগঞ্জবাসীর নতুন বছরের প্রথম মাস?

সাদনান সিয়াম: কেমন কাটল মুন্সীগঞ্জবাসীর নতুন বছরের প্রথম মাস? অবশ্যই ভালো। তবে শুরুটা ভালো হলেও শেষটা তেমন ভালো যায়নি। বছরের শুরুটা হয় নতুন শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের মাঝে বই বিতরণের মধ্য দিয়ে। আর সিরাজদিখান ও শ্রীনগরে উদ্ধার করা গামছা দিয়ে মুখ ও চোখ বাঁধা অবস্থায় ৩টি লাশের মধ্যে দিয়ে শেষ টা পরিণত হয় টক অব দ্যা কান্ট্রিতে! এছাড়া তো রয়েছে চুরি-ডাকাতি, অপহরণ, ধর্ষণ-যৌন হয়রানি, অগ্নিকান্ড, পরিবহন ধর্মঘট, সড়ক দুর্ঘটনা ইত্যাদি।

শেষ থেকেই শুরু করা যাক! সিরাজদিখান ও শ্রীনগরে উদ্ধার করা ৩টি লাশের মধ্যে দিয়ে মুন্সীগঞ্জ পরিণত হয় টক অব দ্যা কান্ট্রিতে! আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে মুন্সীগঞ্জসহ গোটা দেশে। পুলিশের হিসাব অনুযায়ী ২০১১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৩ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত অন্তত ৩৫টি লাশ উদ্ধার হয়েছে। ৩৫টি লাশের মধ্যে ২০১১ সালে পাওয়া গেছে ২২টি লাশ। এর অধিকাংশেরই কোন কুল কিনারা পায়নি পুলিশ। মুন্সীগঞ্জের উপর দিয়ে দুটি মহাসড়ক থাকায় প্রতিনিয়ত সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হচ্ছে মুন্সীগঞ্জ। অন্যত্র হত্যা করে এখানে ফেলে যাচ্ছে লাশ অথবা ভাসিয়ে দিচ্ছে নদীতে। এখানে হরহামেশাই রাস্তার ধারে, ক্ষেতে অথবা নদী থেকে উদ্ধার হয় অজ্ঞাত পরিচয়ে লাশ। সব নিারাপত্তা ভেদ করেই অনবরত এভাবে লাশ ফেলে যাচ্ছে অপরাধীরা এই বিষয়ে সর্বশেষ জেলা আইন শৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় আলোচনা হয়। আর এসব ঘটনায় আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দাদের নাজেহাল করে ছাড়ছে দুবৃত্তরা। আর এসব ঘটনার কোনো ক্লুও খুঁজে বের করতে পারছে না পুলিশ। এর ফলে সন্ত্রাসীরা হত্যার ফলে ডাম্পিং স্টেশন হিসেবে বেছে নিয়েছে মুন্সীগঞ্জকে।

আর হাত বাড়ালেই পাওয়া যায় মাদক দ্রব্য। মাদক নিয়ে মুন্সীগঞ্জে আইন-শৃঙ্খলা মিটিং থেকে শুরু করে পত্র-পত্রিকা ও স্থানীয় সুশীল সমাজে ব্যাপক তোলপাড় হলেও ভয়াল থাবা থেকে রক্ষায় পায়নি মুন্সীগঞ্জ। বেড়ে চলেছে মাদক বিক্রি ও সেবন। মাদকদ্রব্য চালানের উপযুক্ত স্থান হিসেবে মাদকব্যবসায়ীরা বেছে নিয়েছে মুন্সীগঞ্জকে। জানুয়ারির বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ মাদক দ্রব্য উদ্ধার করেছে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে মাদক ব্যবসায়ীরাও বসে নেই। মাদক পাচারে নিত্য নতুন পন্থা অবলম্বন করছে তারা। জানুয়ারিতে প্রায় ৪০ কেজি গাঁজা, ৩৯ পিছ ইয়াবা ও ২ হাজার ৮শ ৮৭ বোতল ফেন্সিডিল উদ্ধার করছে পুলিশ। এসময় দুজন মাদক স¤্রাটসহ ১১ জন মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করেছে আইন পুলিশ।

শুধু মাদক ও অজ্ঞাত লাশেই থেমে নেই, নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের মহোৎসব চলে এখানে। গজারিয়ার মেঘনা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে গত ৪ জানুয়ারি ৪টি বাড়িসহ ৫০ বিঘা জমি মেঘনার বুকে চলে যায়। এ ঘটনায় প্রায় ২০ জন আহত হয়।

জানুয়ারিতে ৩টি চুরি ২টি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে মুন্সীগঞ্জে। তবে চুরি ও ডাকাতির ঘটনায় কেউ গ্রেফতার হয়নি। এছাড়া ২টি অপহরণর ও একটি অপহরণের চেষ্টাকালে পুলিশ হাতেনাতে গ্রেফতার করে অপহরণকারীদের।

সব মিলিয়ে জানুয়ারিতে অপহরণের ঘটনায় সর্বমোট ৬জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এরমধ্যে দিনে-দুপুরে আদালত প্রাঙ্গণ থেকে বিক্রমপুর সংবাদের প্রধান সম্পাদক ও প্রেসক্লাব সভাপতি মীর নাসিরউদ্দিন উজ্জ্বলের মোটর বাইক চুরি, আদালত প্রাঙ্গণ থেকে এক ব্যাক্তিকে অপহরণের চেষ্টা ও জেলাখানায় থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী খসরুর কাছ থেকে মাদক দ্রব্য উদ্ধার করা হয়। চোর ও অপহরণকারীরা এত সাহস পায় কোথা থেকে। আদালতের মত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এসব করছে কারা ? আর জেলাখানায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও কিভাবে জেলাখানায় পৌঁছায় মাদক? এতসব প্রশ্ন জাগে সাধারণ জনগণের মনে। আতংকিত করে তাদের। এসব ঘটনা প্রশ্নবিদ্ধ করে আদালত ও জেলাখানার নিরাপত্তাকে। আর সন্দেহের আঙ্গুল ওঠে পুলিশ ও গোয়েন্দার দিকে! সারা বছর কি করে তারা? এ ঘটনায় আদালত প্রাঙ্গণ ও জেলাখানা চরম নিরাপত্তাহীনতার সম্মুখীন হয়ও বটে।

জানুয়ারিতে মুন্সীগঞ্জে প্রায় ৪টি অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে সব মিলিয়ে প্রায় ২৮ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে মুক্তারপুরে ক্যামিক্যাল ফ্যাক্টরীতে রিয়েক্টর বিস্ফোরণের ঘটনায় ৩জন কর্মী আহত ছাড়া কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

চলতি বছরে বাংলাদেশের উপর দিয়ে বয়ে গেছে দেশের ইতিহাসের ৪৫ বছরের সর্বনিন্ম তাপমাত্রা। এর প্রভাব থেকে রক্ষা পায়নি মুন্সীগঞ্জও। তাইতো তীব্র শীতেও সামান্য উষ্ণতা যোগাতে ছিন্নমুল মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা থেকে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার কম্বল বিতরণ করা হয় শীতার্ত ও গরীব দুঃখীদের মাঝে। জানুয়ারিতে বয়ে যাওয়া শৈত্য প্রবাহের ফলে কনকনে শীতে মুন্সীগঞ্জবাসীর উষ্ণতা কিছুটা হলেও বাড়িয়ে দিয়েছে মুন্সীগঞ্জের ক্রীড়াঙ্গন। ফুটবলসহ বেশ কটি লীগ ও প্রীতি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে মুন্সীগঞ্জ জেলা স্টেডিয়ামে ও ১টি মিরকাদিম পৌরসভায়।

জানুয়ারিতে মুন্সীগঞ্জে ১ ধর্ষণ ও ১টি যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেছে এবং সদর উপজেলার চরাঞ্চলে একটি ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া গেলেও ভিকটিম ও তার পরিবার তা অস্বীকার করেছে। পৃথক ৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২জন নিহত ও ৩৫জন আহত হয়েছে।

এছাড়া জানুয়ারিতে বিনা চিকিৎসায় পাপুয়া নিউিগিন ও সড়ক দুর্ঘটনায় আমেরিকা প্রবাসী মারা যান।

গত ১ নভেম্বর থেকে আগামী ৩১ মে পর্যন্ত জাটকা ইলিশ শিকার নিষিদ্ধ করেছে মৎস্য বিভাগ। তবে জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকে এই অভিযান তোরজোর করা হয়েছে। ২৮ জানুয়ারি ভোরে অভিযান চালিয়ে ৩০মণ জাটকা আটক করে কোস্ট গার্ড। তবে কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি। আগামী ৩১ মে পর্যন্ত এ অভিযান পরিচালনা করবে কোস্ট গার্ড।

সুখবরও ছিল জানুয়ারিতে! মুন্সীগঞ্জের ৬ উপজেলার ৬৮টি বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণের আওতাভূক্ত করা হয়েছে। ফলে জেলার ২৫৭ জন শিক্ষক সরকারি শিক্ষকের মর্যাদা পেলেন।

শুরু হয়েছে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভূমি জরিপ ও রেকর্ড প্রণয়ন এবং সংরক্ষণ প্রকল্প। স্বতঃস্ফূত ভাবে এ জেলার লোকজন অনলাইনের মাধ্যমে ১৩ থেকে ১৫ জানুয়ারি ৩দিন ধরে ১৪ হাজার ১শ ৫৮ জন নিবন্ধন করে। এদের মধ্যে লটারীরর মাধ্যমে মালোশিয়া যাওয়ার জন্য নির্বাচিত হয় ৩শ ৭৮জন। শহরের শিলমন্দি মৌজার নিজস্ব ৮৪ শতাংশ জমিতে নির্মিত হবে ১শ’ শয্যার পূর্ণাঙ্গ ডায়বেটিক হাসপাতাল। চূড়ান্ত পর্যায় রয়েছে প্রকল্পটি।

তবে সুখবরের চেয়ে দুঃখের খবরই ছিল বেশি নতুন বছরের প্রথমে। এসব ঘটনার সার্বিক দিক পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায় কতটা নিরাপত্তাহীনতা ও ঝুকির মধ্যে রয়েছে মুন্সীগঞ্জবাসী।

মুন্সীগঞ্জ নিউজ