মৃত্যুকূপ মুন্সীগঞ্জ ১: অজ্ঞাতপরিচয় লাশের ডাম্পিং জোন

monshigonj-bg20130203073438ঢাকা রেঞ্জের ১৭ জেলার আইন-শৃঙ্খলা সূচকে এক নম্বরে থাকা মুন্সীগঞ্জ যেন এক মৃত্যুকূপ। একই সঙ্গে অজ্ঞাতপরিচয় লাশের ডাম্পিং জোনেও পরিণত হয়েছে পদ্মাপাড়ের এই জেলা। স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক ও স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যমতে, কখনো দুর্বৃত্তরা লাশ নিয়ে সেখানে আসে অ্যাম্বুলেন্সে, কখনোবা মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কার, কাভার্ড ভ্যান, ইঞ্জিন চালিত নৌকা, লঞ্চ, বালুর ট্রলার বা কার্গো জাহাজে।

কখনো আবার যাত্রীবাহী লঞ্চে করে নিয়ে আসা হয় টুকরো টুকরো বস্তাবন্দী লাশ। জীবিত ব্যক্তিকে ধরে এনে বা বেড়ানোর নাম করে এনে লাশ ফেলে যাওয়ার ঘটনাও আছে।

কেবল ২০১২ সালেই এ জেলায় অজ্ঞাতপরিচয় লাশ পাওয়া গেছে ৩৩টি। স্থানীয়ভাবে খুন হয়েছেন এ জেলার আরো ৩৬ অভাগা। এগুলোর অধিকাংশই দাফন হয়েছে বেওয়ারিশ হিসেবে।

আর অধিকাংশ খুনেরই রহস্য উদঘাটনে ব্যর্থ হয়েছে পুলিশ।

এসব খুনের জন্য কখনো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও তাদের সোর্স, চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের অভিযুক্ত করছেন অধিকাংশ নিহতের পরিবার।

গত ২৪ জানুয়ারি মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানের রশুনিয়া এলাকা থেকে ইব্রাহিম (২৫), কুদ্দুস মিয়া (৪০) ও শ্রীনগরের বাড়ৈইখালী-শ্রীধরপুর সড়কের পাশ থেকে গুলিবিদ্ধ মাসুদের (৩০) লাশ উদ্ধার করা হয়।

এ ৩ জনকে একই কায়দায় নতুন গামছা দিয়ে হাত, মুখ ও চোখ বেঁধে গুলি করে হত্যা করে ঘাতকরা।

মাসুদের ভাবী নুরজাহান বেগম বাংলানিউজকে জানান, ১০ জানুয়ারি রাতে নাজমুলের বরাত দিয়ে অপরিচিত এক ব্যক্তি ২০ হাজার টাকা দেওয়ার কথা বলে মাসুদকে ডেকে নিয়ে যায়।
এরপর থেকেই মাসুদ নিখোঁজ হয়ে পড়েন। এ ঘটনায় ১৩ জানুয়ারি দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় জিডি করা হয়।

নিহত কুদ্দুসের ভাতিজা আবু রায়হান অপু বাংলানিউজকে জানান, তার চাচা কুদ্দুসকে মাসুদ ডেকে নিয়ে যাওয়ার পর থেকেই তিনি নিখোঁজ ছিলেন। পরে মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে পৃথক স্থান থেকে মাসুদ ও কুদ্দুসের লাশ উদ্ধারের করা হয়।

এ ঘটনায় ২৪ জানুয়ারি সন্ধ্যায় সিরাজদিখান থানায় ২টি ও শ্রীনগর থানায় ১টিসহ মোট ৩টি হত্যা মামলা রুজু করা হয়।

নিহত ইব্রাহিমের মামা বাবুল জানান, এ হত্যার ঘটনায় পুলিশ রহস্যজনক ভুমিকা পালন করছে।

একই কায়দায় ৩ যুবককে গুলি করে হত্যার আলামত থাকায় এর সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী জড়িত থাকতে পারে বলেও সন্দেহ করছেন নিহতদের পরিবার।

বাংলানিউজকে বাবুল মিয়া বলেন, “এ হত্যাকাণ্ড র‌্যাব সদস্যরাও করতে পারে বলে ইব্রাহিমের পরিবারের লোকজন ধারণা করছে। নিহত ইব্রাহিম অন্য (কদমতলী) এলাকার ইসমাইল হত্যা মামলার আসামি বলে পুলিশ একটি মিথ্যা তথ্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে।”

সিরাজদিখান থানার ওসি মো. মাহাবুবুর রহমান বাংলানিউজকে বলেন, “কারা এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত তা শনাক্ত করা যায়নি।”

এদিকে এ হত্যায় জড়িতদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে বলে দাবি করেছেন শ্রীনগর থানার ওসি মো. মিজানুর রহমান।

মুন্সীগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আলহাজ্জ্ব মোহাম্মদ মহিউদ্দীন বাংলানিউজকে বলেন, “প্রশাসনের কর্মকাণ্ড ও ভূমিকায় আমি দুর্বলতা দেখি না। আইন-শৃঙ্খলাও নিয়ন্ত্রণে আছে। তারপরেও এসব হত্যাকাণ্ড ঘটছে।”

তিনি বলেন, “অপরাধের জায়গা চিহ্ণিত করা গেলে অবশ্যই অপরাধ ঠেকানো যাবে এবং প্রশাসন নজর দিলে তা অবশ্যই সম্ভব।”
monshigonj-bg20130203073438
জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি শ.ম. কামাল হোসেন বাংলানিউজকে বলেন, “এটা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস কি না তা খতিয়ে দেখতে হবে। দেশে যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে, তখন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস হলে তা সরকারের জন্য সুখকর নয়। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস না হলে আবার কারা এমন বিধ্বংসী কাজ করছে তা দেখার দায়িত্বও সরকারের।”

কামাল বলেন, “অপরাধ ঘটার মতো প্রশাসনিক দুর্বলতা এখানে অনেক। মহাসড়কে পর্যাপ্ত টহল নেই। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতার মনোভাবও নেই বলে প্রতীয়মান হয়। পুলিশ সক্রিয় হলে যারা এই অপরাধে জড়িত তাদের ধরা সম্ভব হবে।”

শহর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম বলেন, “নদী দিয়ে লাশ ভেসে আসে। এ লাশ আমাদের এখানকার নয়। লঞ্চে করে বস্তাবন্দী লাশ আসে বলে শুনেছি। যা রাতের আঁধারে নদীতে ফেলা হয়। নৌ ফাঁড়িও অপ্রতুল। এটা ঠেকানো যায় না।”

প্রেসক্লাব সভাপতি শহীদ-ই-হাসান তুহিন বলেন, “এ ধরনের অপরাধের মূল কারণ প্রশাসনিক দুর্বলতা। হাইওয়ে পুলিশ টহল দেয় না বললেই চলে। নৌপথেও টহল নেই। এমন একটি নদী বেষ্টিত জেলা, অথচ কোস্টগার্ডের স্টেশন নেই। কোন তথ্য পেলে কোস্টগার্ড পাগলা থেকে এসে কাজ করে। এতে বোঝা যায় নদীপথ অরক্ষিত ও প্রশাসন উদাসীন।”

মুন্সীগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাকির হোসেন বাংলানিউজকে বলেন, “মুন্সীগঞ্জের অজ্ঞাত লাশের মিছিলের কারণ এর ভৌগলিক অবস্থান।”


তিনি বলেন, “মুন্সীগঞ্জের সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, চাঁদপুর, শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও ঢাকার সীমানা রয়েছে। এরমধ্যে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের মতো দু’টি বৃহৎ জনবসতিপূর্ণ নগরী এ জেলার কাছেপিঠে অবস্থিত। এ জেলার মধ্য দিয়ে দেশের বৃহৎ দু’টি মহাসড়ক ( ঢাকা-কুমিল্লা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-মাওয়া-খুলনা) চলে গেছে। মুন্সীগঞ্জ থেকে কুমিল্লা, নরসিংদী, সিলেট, ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, শরীয়তপুর খুবই কাছে।”

হরহামেশা লাশ পড়ছে মুন্সীগঞ্জে। বাইরে থেকে অজ্ঞাতপরিচয় লাশ এনেও ফেলে যাওয়া হচ্ছে জেলার এখানে ওখানে। পাওয়া যাচ্ছে বস্তাবন্দি লাশের টুকরা। সব মিলিয়ে এ যেন এক মৃত্যুকূপ, অজ্ঞাতপরিচয় লাশের ভাগাড়। ঢাকা রেঞ্জের ১৭ জেলার মধ্যে আইন-শৃঙ্খলা সূচকে তবুও এক নম্বরে আছে পদ্মাপাড়ের এই জেলা। কেন খুন হচ্ছে, কারা খুন করছে, প্রশাসনের কি ভূমিকা, স্থানীয়রা কি ভাবছে ইত্যাদি প্রশ্ন নিয়ে সম্প্রতি পুরো জেলা চষে বেড়িয়েছেন বাংলানিউজের সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট রহমান মাসুদ, চিফ ফটো করেসপন্ডেন্ট জীবন আমীর ও মুন্সীগঞ্জ জেলা সংবাদদাতা কাজী দীপু। তাদের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য নিয়ে তৈরি ধারাবাহিক প্রতিবেদনের প্রথমটি ছাপ হলো রোববার।

রহমান মাসুদ ও কাজী দীপু
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম