ভাষা আছে মধ্যবিত্তের দখলে

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
ভাষা মধ্যবিত্তের দখলেই থাকার কথা। মধ্যবিত্তই তো ভাষা ব্যবহার করে সবচেয়ে বেশি। ভাষাকে তারা জ্ঞানে-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ করে। বাংলাদেশেও করেছে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে মধ্যবিত্তরাই ছিল, তারাই শুরু করেছে, পরে সাধারণ মানুষ এসে যোগ দিয়েছে। কিন্তু মধ্যবিত্তের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন জাগে ভাষাকে তারা কেন আর এগোতে দিল না? এগোতে দেয়ার কথা তো তাদেরই। বাংলা কেন এখনও উচ্চশিক্ষার মাধ্যম হয়নি? এ প্রশ্ন এখন উঠবে। উচ্চ আদালতের ভাষাই বা বাংলা কেন হল না সেটাও একটা জরুরি জিজ্ঞাসা বটে। এ দুটি ক্ষেত্রে বাংলা যে প্রতিষ্ঠা পায়নি সেটা ভাষার কারণে নয়, ওই মধ্যবিত্তের কারণেই, ভাষার যারা কর্তা তাদের ব্যর্থতার দরুন। বাংলাভাষার উন্নতি বানান থেকে ী-কারের নির্বাসনের ওপর নির্ভর করে না; করে ভাষাকে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্যে সমৃদ্ধ করার ওপর। মধ্যবিত্ত সে কাজটা কিছুটা করেছে কিন্তু অনেকটা করেনি।

উচ্চশিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বই লিখে, অনুবাদ করে, জ্ঞানের অনুশীলনের বাহন করে বাংলাভাষাকে সমৃদ্ধ করা দরকার ছিল। আমরা মধ্যবিত্তরা সেটা করলাম না। করতে পারলাম না বোধ হয় এজন্য যে, ওই অত্যন্ত বড় কাজের জন্য যে সমষ্টিগত উদ্যোগ দরকার ছিল সেটা আমাদের নেই। মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত হওয়ার জন্যই মনে-প্রাণে ব্যাকুল। উচ্চবিত্ত সে শ্রেণীগতভাবে হবে না, হবে ব্যক্তিগতভাবে এবং উন্নত হওয়ার জন্য অর্থ উপার্জন চাই। মধ্যবিত্ত ব্যস্ত সেই কাজেই। তাছাড়া উন্নতির ক্ষেত্রে মাতৃভাষার চর্চার কোন উপযোগিতা নেই। বিশ্বায়নের যুগে ইংরেজি জানলে অনেক সুবিধা, বাংলা নিয়ে ব্যস্ত থাকলে উন্নতি হাতছাড়া হয়ে যাবে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলা চালু করতে হলে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার প্রয়োজন। রাষ্ট্রের দিক থেকে তেমন কোন উদ্যোগ নেই। পাকিস্তান আমলেও কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড নামে একটি সংস্থা তৈরি হয়েছিল যার প্রধান দায়িত্ব ছিল উচ্চশিক্ষার জন্য উপযুক্ত পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেই সংস্থাটি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বাংলা একাডেমীকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে কিন্তু একাডেমীর অনেক দায়িত্বের মধ্যে এটি তেমন গুরুত্ব পায়নি।

উচ্চ আদালতে বাংলা প্রচলনের ব্যাপারে দায়িত্বটা বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে যারা জড়িত কেবল তাদেরই নয়, প্রধানত রাষ্ট্র ও সমাজেরই। উচ্চ আদালতে যদি বাংলা চালু থাকত তা হলেও সে বাংলা যে সহজবোধ্য হতো তা নয়। আইন-আদালত ও বিচারের সঙ্গে যারা জড়িত তারা আইনের ভাষাকে সহজ করতে চান না। দুর্বোধ্য রাখতেই তাদের সুবিধা। বিচার প্রার্থীদের অসুবিধাটা বিচারের সঙ্গে জড়িতদের সুবিধার কারণ হয়ে দেখা দেয়। কিন্তু এখন যে বাংলা নয়, উচ্চ আদালতে ইংরেজিই চলছে তাতে বিচার প্রার্থীদের পক্ষে ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়ারই কথা এবং তারা তা খাচ্ছেও।

শিক্ষা অভিন্ন ধারার হবে মাতৃভাষার মাধ্যমে, কেবল সেটাই সহজ ও স্বাভাবিক। মাতৃভাষা ভিন্ন অন্য কোন ভাষাতেই শিক্ষা কখনোই যথার্থ ও পরিপূর্ণ হতে পারে না। স্বাধীনতার পরে শিক্ষার মাধ্যম হবে মাতৃভাষা এটাই ছিল প্রত্যাশিত। কিন্তু শিক্ষা এখন তিন ভাষার কাছে চেপে বিদ্যমান শ্রেণীবিভাজনকে নির্মমভাবে গভীরতর করছে। শিক্ষা যে ঐক্য না এনে বিভাজনের কারণ হচ্ছে, সেটা সমাজকে কোন ভয়াবহ পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে কে জানে।

অনেকে বলেন, আরেকটি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রয়োজন। কিন্তু আসলে তা না, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন নয়, সে আন্দোলন তো যা দেয়ার দিয়েছে, ওই পথে এগিয়েই আমরা এ রাষ্ট্র স্বাধীন রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছি। আজ যা প্রয়োজন তা হল রাষ্ট্রকে জনগণের মালিকানায় নিয়ে আসা। রাষ্ট্র স্বাধীন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু জনগণের হয়নি। জনগণের যে হয়নি সেটা তো সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতার মধ্যেই বিশেষভাবে দেখতে পাচ্ছি। বাংলাভাষার অমর্যাদাও একটি রাজনৈতিক সমস্যা বৈকি। বাংলাভাষা তার যথোপযুক্ত মর্যাদা ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমলে পায়নি এখনও পাচ্ছে না। তাই রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে বাংলাকে সমৃদ্ধ, সর্বত্র প্রচলিত ও সম্মানিত করতে। ঘরেই যার সম্মান নেই সে আন্তর্জাতিকভাবে সম্মানিত হবে কী করে?

বাংলাকে প্রকৃত অর্থে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য রাষ্ট্রের ওপর জনগণের প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে বেগবান করে তোলা ভিন্ন অন্য কোন উপায় আছে বলে তো মনে হয় না। এবং এ দায়িত্বটা নিতে হবে মধ্যবিত্তকেই।

যুগান্তর