সময়ের ভেতরে ও বাইরে

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
সংস্কৃতি হচ্ছে মানুষের বিজয় নিশান; প্রকৃতি, পরিবেশ ও প্রবৃত্তির ওপর মানুষের জয়ের চিহ্ন। কিন্তু কেবল চিহ্ন বললে কিছুই বলা হয় না। কেননা, সংস্কৃতি সব সময়ই অত্যন্ত জীবন্ত ও পরিব্যাপ্ত। অনেকটা পানির মতো। সহজ কিন্তু শক্তিশালী। থাকলে বোঝা যায় না, না থাকলে প্রাণ সংশয় দেখা দেয়। তাই বলা যাবে যে, সংস্কৃতি শিক্ষার চেয়েও ব্যাপ্ত ও জরুরি। সংস্কৃতির স্তর দেখে মনুষ্যত্বের স্তর জানা যায়। আমাদের এও জানা যে, মানুষেরই সংস্কৃতি আছে; পশুর নেই।

রাজনৈতিক অস্থিরতায়ই হোক কিংবা আমাদের বিদ্যমান নানাবিধ সংকটের কারণেই হোক_ সমাজ ও ব্যক্তিজীবনে অবিশ্বাসের বীজ আজ প্রকাণ্ড বিষবৃক্ষে পরিণত। এ বৃক্ষের ছায়া আমাদের সর্বক্ষেত্রেই ছড়িয়ে পড়ছে যেন। সমাজ, জীবন, সাহিত্য, রাজনীতি_ কোথায় নেই এর সংক্রমণ? সাহিত্যাঙ্গনে লক্ষ্য করা যায় :উদীয়মানেরা প্রতিষ্ঠিতদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উত্থাপন করেন। কিন্তু এই অভিযোগকারী উদীয়মানেরা যখন প্রতিষ্ঠার আসন দখল করেন, তখন তাদের কার্যকলাপও পূর্ববর্তীদের ধারাতেই চলে এবং অচিরেই তারাও অভিযুক্ত হন একই অভিযোগে পরবর্তীকালের উদীয়মানদের দ্বারা। এ ব্যাপারটি বিশেষভাবে দেখা যায় আমাদের ব্রিটিশ-শাসনোত্তর চার দশকের ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে।

সাহিত্যাঙ্গনে এবং যে-কোনো সামাজিক কর্মের ক্ষেত্রে সব দেশ-কালেই প্রতিষ্ঠিতদের সঙ্গে প্রতিষ্ঠাকামীদের বিরোধ থাকে। সে বিরোধের প্রকাশ সব সময় যে নীতিহীনতা, আদর্শহীনতা, আন্তরিকতাহীনতা, মিথ্যাচার, দুর্নীতি, অধঃপতন ইত্যাদি অভিযোগকে কেন্দ্র করে হয়; তা নয়। স্বাভাবিক সুস্থ পরিবেশে সে বিরোধের প্রকাশ ঘটে তথ্য; সত্য, ন্যায়, সুন্দর, শ্রেয় ও কল্যাণের স্বরূপ ও পন্থা সম্পর্কে মতপার্থক্যকে কেন্দ্র করে; এবং সে অবস্থায় সকল পক্ষেরই লক্ষ্য থাকে সঠিক তথ্য, গভীরতম সত্য, মহত্তর সুন্দর, শ্রেষ্ঠতম ন্যায় ও উচ্চতর কল্যাণ অনুসন্ধানের দিকে। সেখানে যুক্তি প্রকাশের উদ্দেশ্য কোনো অন্ধবিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠা করা কিংবা অন্যকে পরাজিত করে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা নয়। যুক্তি প্রয়োগের উদ্দেশ্য সেখানে_ প্রকাশরূপ ও মর্মবস্তুর পার্থক্য নির্দেশ ও মর্মোদ্ধার; ন্যায়, সুন্দর, শুভ ও কর্তব্য নির্ধারণ। যারা অন্য উদ্দেশ্যে যুক্তি প্রয়োগে তৎপর হন, তারা সেখানে বিপথগামীরূপে গণ্য হন।

যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে আজ আমরা চলছি, ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য বিচারে তা আমাদের দেশেরই বর্তমান সময়ের, এক যুগসংক্রান্তির, বিশেষ অবস্থা; অত্যন্ত বিকৃত, অত্যন্ত বিকারপ্রাপ্ত, অস্বাভাবিক এক অন্ধকারময় অবস্থা।

এ অবস্থার মধ্যেও সম্ভাবনার দিক আছে। এবং এই অবস্থার অবসান সকলেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে কামনা করেন। কেউ কেউ অত্যন্ত তীব্রভাবে উত্তেজনার সঙ্গে এর অবসান কামনা করেন। তবু অগ্রগতির সাধারণ ধারাটা আজও অধোগামী; উত্থানমুখী নয়। সমাজের ভেতরে সচেতনতা ও সংগ্রাম সূচিত হলে সমাজ পতনের সোপান থেকে উত্থানের সোপানে উত্তীর্ণ হতে পারে; সেই সচেতনতা ও সংগ্রাম আমাদের সমাজে আজও দেখা যায়নি। স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ এবং উদ্দেশ্য-নিষ্ঠাহীন সংগ্রাম অবশ্য সব সময়েই আছে। আর সেই সংগ্রাম কখনও রাজনীতি থেকে বাইরে গিয়ে নয়। কারণ রাজনীতির বাইরে গিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে আমাদের কোনো অগ্রগতিই স্থায়ী হবে না। এখনকার রাজনীতিকদের অপরাধ যদি আমাদের রাজনীতির ওপরই চেপে বসে_ বলাবাহুল্য তাতে সমাজের কোনো মঙ্গল হবে না। সুবিধা হবে অসামরিক ও সামরিক আমলাদের। সমাজের বিকাশ তখন ক্রমশ অন্ধকারের দিকেই এগোবে।

আগামী দিনে তাই আমরা চাইব যে, জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা যেমন ক্ষোভ-বিক্ষোভও তেমনই রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়েই আত্মপ্রকাশের পথ খুঁজে পাক। আর এ আন্দোলনে সংস্কৃতির একটা বড় ভূমিকা থাকা জরুরি। কেননা, সংস্কৃতি আসলে রাষ্ট্রের চেয়েও গভীর এবং সমাজের চেয়েও স্থায়ী।

সংস্কৃতির এ ব্যাপারটাকে আমরা তেমন গুরুত্ব দিইনি। ফলে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে বটে, কিন্তু তা গভীর ও স্থায়ী হয়নি। আর তার মধ্য দিয়ে মানবিক বিকাশের যে ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, তাও ব্যাহত হয়েছে। বারবার সেই সংকট এই সময়ে এসে আমাদের সেই প্রকাণ্ড বিষবৃক্ষের নিচে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

সংস্কৃতির একটা বড় দায়িত্ব হচ্ছে সুস্থ বিনোদন সরবরাহ করা। কিন্তু আনন্দদানের সঙ্গে সঙ্গে এবং তার মধ্য দিয়েই সংস্কৃতি আরও একটা কাজ করে। সেটা হলো এই যে, সংস্কৃতি মানুষকে সামাজিক করে তোলে। তাকে দর্শন, ইতিহাস, সাহিত্যের বিষয়ে অবহিত করে। বস্তুত সামাজিকতা, দার্শনিকতা ও ইতিহাসচেতনা যদি না থাকে, তাহলে কাউকে পুরো মানুষ বলা সম্ভব নয়; তা আকারে সে ব্যক্তি যতই মনুষ্যসদৃশ হোক না কেন। আর মানুষ হবার প্রক্রিয়ায় যে যত এগিয়ে থাকে, তারই তত বেশি যোগ্যতা তৈরি হয় নিজেকে জানার, নিজেকে সমালোচনা করার, অন্যের সমালোচনাকে গ্রহণ করতে পারার। এ কথা সাহিত্যক্ষেত্রেও একইভাবে প্রযোজ্য। যে অবস্থা থেকে এই সময় অনেক বেশি দূরে সরে যাচ্ছে দিন দিন।

সমস্যার সমাধানের দিকে যদি যথার্থই আমরা এগোতে চাই, তাহলে অনেক জটিল গ্রন্থি আমাদের উন্মোচন করতে হবে এবং অনেক দীর্ঘ বন্ধুর, কণ্টকাকীর্ণ বাধা-বিপত্তিসংকুুল পথ পার হতে হবে। সে জন্য বর্তমান পরিস্থিতিতে আদর্শপরায়ণতার অভাব, নীতিহীনতা, অবক্ষয়, অধঃপতন, দুর্নীতি, মূল্যবোধের বিপর্যয় ইত্যাদির বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন ও এগুলোর স্বরূপ বিশ্লেষণের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের অন্তর্গত মূল্যবোধ, শ্রেয়োবোধ, কল্যাণচেতনা, শক্তি ও দুর্বলতা এবং আদর্শপরায়ণতার স্বরূপ ইত্যাদি সম্পর্কে বাস্তবসম্মত সদর্থক আলোচনা দরকার। ভালো সমাজের মানুষের শ্রেয়োবোধের স্বাভাবিক বিকাশ এবং শ্রেয়োনীতির সুস্থ অনুশীলন যে কারও পক্ষেই স্বার্থহানিকর নয়। বরং প্রত্যেকেরই মহত্তর স্বার্থসাধনের প্রকৃষ্ট পন্থা_ এ বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে স্পষ্ট করা দরকার। সেই সঙ্গে এটাও স্পষ্ট করা দরকার যে, যে মানুষদের নিয়ে সমাজ গঠিত, সেই মানুষেরাই ইচ্ছা করলে নিজেদের চেষ্টা দ্বারা অধঃপতিত সমাজকে ভালো সমাজে রূপান্তরিত করতে পারে।

নতুন সমাজ ও নতুন ধরনের রাষ্ট্রের পাশাপাশি আমরা নতুন সংস্কৃতিও চাইব, যে সংস্কৃতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ও মনোকাঠামো বদলে দেবে। মানুষকে দেশপ্রেমিক ও গণতান্ত্রিক করে তুলবে। ওই সাংস্কৃতিক লক্ষ্য অর্জন করাই হবে আমাদের রাজনৈতিক তৎপরতার মূল কেন্দ্র। অর্থাৎ কেবল রাজনীতি দিয়ে হবে না। কেবল সমাজ সংস্কারের কাজ দিয়েও আমরা লক্ষ্য অর্জন করতে পারব না। আমাদের রাজনৈতিক কাজের সম্পূূরক হিসেবে সাংস্কৃতিক কাজকেও এগিয়ে নিতে হবে। যে কারণে আমরা চাইব একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে উঠুক। নাটক, গান, নৃত্য, গ্রন্থাগার, প্রদর্শনীর বিপুল আয়োজন দরকার। তবে সেটা যেন কোনো অবস্থায়ই আদর্শনিরপেক্ষ না হয়। অতীতে রাজনীতির ক্ষেত্রে আমরা কিছু তৎপরতা দেখেছি। কিন্তু সংস্কৃতির ক্ষেত্রে খুবই উপেক্ষিত থেকেছে। এর ফলে রাজনৈতিক পরিবর্তন, সংরক্ষণ ও প্রভাবিত করার কাজটি হয়নি। সাংস্কৃতিক কাজ বলতে আমরা কেবল বিনোদনই বুঝিয়েছি। আমরাই নিজেদের কাজ করতে ব্যর্থ হয়েছি। যতই কৃষি ও কৃষকের উন্নতির কথা বলা হোক, কৃষিকেও কিন্তু অবহেলা করা হয়েছে। এ খাত স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার বদলে পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। আমরা এখন উৎপাদনকারীর বদলে ক্রেতা ও সেবকে পরিণত হয়েছি। এটা কেবল ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতির ক্ষেত্রেই নয়; জ্ঞান বিকাশের অন্যান্য ক্ষেত্রেও।

এদেশে সদর্থক আলোচনার সূত্রপাত করাও আজ যেন অত্যন্ত দুরূহ। কারণ গতানুগতিক মনোবৃত্তি ও চলতি উত্তেজনা প্রায় সকলের মনকেই দারুণভাবে অস্থির ও উত্তপ্ত করে রেখেছে। শুধু সাহিত্যক্ষেত্রে কেন; উৎপাদনকর্ম থেকে রাজনীতি পর্যন্ত সর্বত্রই অবস্থা প্রায় একই রকম :’দুর্নীতি’ ও ‘অনিয়ম’ সম্পর্কে প্রচুর আলোচনা আছে, কিন্তু ‘সুনীতি’ ও ‘নিয়ম’ সম্পর্কে কোনো আলোচনা নেই। স্বতঃস্ফূর্ততা আছে, বিচার-বিশ্লেষণ নেই; উত্তেজনা ও অস্থিরতা আছে, বিবেক ও যুক্তির উপস্থিতি নেই; উদ্দেশ্য নির্ণয়ের চেষ্টা ও উদ্দেশ্যনিষ্ঠার পরিচয় নেই।
এই সময়ের মধ্যে বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগ উদীয়মান পর্যায় অতিক্রম করে পরিণতির ধাপ পার হয়ে অবক্ষয়ের পর্যায়েও অনেকখানি অগ্রসর হয়েছে এবং এখন আমরা নতুন কালের নতুন জিজ্ঞাসার সম্মুখীন। রাজনৈতিক ধারার স্লোগানসর্বস্ব আন্তরিকতাহীন সংকীর্ণ দলীয় বক্তব্য সাহিত্যের অঙ্গনে বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। কারণ সাহিত্যের উৎসমূল তো মানুষের বাস্তব জীবনের মধ্যেই প্রথিত। ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে নিজেদের প্রতি নিজেদের সমালোচনার মৌলিক শক্তির অভাব। দরকার সমালোচনা বিকাশের ও সমালোচকের আত্মপ্রকাশের সুযোগ সৃষ্টি করা। বলা বাহুল্য, সমালোচকের সহায়তা আমাদের সমাজ জীবনে যেমনি, তেমনই সাহিত্যের বিকাশ ও জ্ঞানের অগ্রগতিকে সচল করার ও সচল রাখার এক অপরিহার্য শর্ত।

আর এই সময়ে এসে দেশের অর্থনৈতিক ও প্রাকৃতিক যে সংকট দেখা দিয়েছে, আগামীতে তা আরও কঠিন আকার ধারণ করবে বলে আশঙ্কা। এদের মোকাবেলা করার জন্য সঠিক নেতৃত্ব প্রয়োজন, যে নেতৃত্ব অবশ্যই হবে দেশপ্রেমিক। কেবল দেশপ্রেমিক নয়, গণতান্ত্রিকও। অর্থাৎ তেমন নেতৃত্ব যা দেশের স্বার্থকে ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থের ওপরে স্থান দেবে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রে মানুষের সঙ্গে মানুষের বৈষম্য দূর করে, পারস্পরিক শত্রুতার পরিবর্তে মৈত্রীর সম্পর্ক গড়ে তুলবে।

রাজনীতির মতো জীবনের সর্বক্ষেত্রে বিরোধিতার ঊধর্ে্ব উঠে সংকট সমাধান ও মানবিক বিকাশের দিকে ধাবিত হওয়াই হোক আমাদের লক্ষ্য। মঙ্গল সেই পথেই।

সমকাল