মুন্সিগঞ্জে দুই বছরে ৩৩ লাশ

গুপ্তহত্যার পর লাশ গুম বা ফেলে যাওয়ার নিরাপদ স্থানে পরিণত হয়েছে মুন্সিগঞ্জ। গত দুই বছরে এ রকম অন্তত ৩৩ জনের লাশ পাওয়া গেছে। এরা সবাই গুপ্তহত্যার শিকার হয়েছে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট মহলগুলো ধারণা করছে। উদ্ধার করা লাশগুলোর মধ্যে পরিচয় মিলেছে মাত্র ১০ জনের। তবে এদের কেউ-ই মুন্সিগঞ্জের বাসিন্দা নয়।

মুন্সিগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. শাহাবুদ্দিন খান প্রথম আলোকে বলেন, উদ্ধার করা যেসব লাশের পরিচয় পাওয়া যায়নি, তাদের বাড়িও এই জেলার বাইরে হবে। কারণ, মুন্সিগঞ্জের হলে নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনেরা এসে লাশ শনাক্ত করতেন।

স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তাদের ধারণা, এসব অন্য কোথাও হত্যা করে লাশ গুম করার জন্য মুন্সিগঞ্জ এলাকায় ফেলে গেছে দুর্বৃত্তরা। এর মধ্যে বেশির ভাগ লাশ পাওয়া গেছে ধলেশ্বরী নদীতে। বাকিগুলো রাস্তার পাশে নির্জন স্থানে। মৃতদেহগুলোর হাত-পা-চোখ বাঁধা এবং মাথায় গুলি ও শরীরে জখমের চিহ্ন ছিল। নদীতে ফেলা লাশগুলো শরীরের সঙ্গে সিমেন্টের বস্তা বা ভারী বস্তু বেঁধে দেওয়া হয়।

৩৩ লাশের মধ্যে ২০১১ সালে ২২টি, গত বছর আটটি ও সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবার তিনটি লাশ পাওয়া গেছে।

এসব ঘটনায় থানায় মামলা হলেও আজ পর্যন্ত একটি ঘটনারও পুলিশ রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি। এর মধ্যে ফতুল্লার শাওনের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় সাক্ষ্য-প্রমাণ মেলেনি মর্মে পুলিশ চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে মামলাটি শেষ করে দিয়েছে। বাকি মামলাগুলো এখনো তদন্তাধীন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

আবার কিছু লাশ উদ্ধারের ঘটনায় হত্যা মামলার পরিবর্তে অপমৃত্যু মামলা করেছে পুলিশ। এর কারণ জানতে চাইলে মুন্সিগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল বাশার বলেন, যেসব লাশের শরীরে জখম, আঘাত বা গুলির চিহ্ন থাকে, সেসব ঘটনায় হত্যা মামলা করা হয়। আর যেসব মৃতদেহে কোনো আঘাতের চিহ্ন থাকে না, সেসব ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা হয়ে থাকে।

পুলিশ জানায়, পরিচয়বিহীন উদ্ধার করা লাশগুলো পরে দাফনের জন্য আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করা হয়।


যেসব মৃতদেহের পরিচয় মিলেছে, তাদের একজন হলেন ঢাকা মহানগরের ৫০ নম্বর ওয়ার্ডের ছাত্রদল নেতা ইসমাইল ওরফে আল-আমিন। ২০১১ সালের ৮ ডিসেম্বর মুন্সিগঞ্জের যুগনীঘাট এলাকায় ধলেশ্বরী নদী থেকে আল-আমিনসহ দুজনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। দুজনই গুলিবিদ্ধ ও হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ছিলেন। লাশের সঙ্গে সিমেন্টের বস্তা বাঁধা ছিল।

আল-আমিনকে এর এক সপ্তাহ আগে পুরান ঢাকার হাতিরপুল সড়ক থেকে এক দল লোক ধরে নিয়ে যায়। তখন তাঁর পরিবার অভিযোগ করেছিল, র‌্যাব পরিচয় দিয়ে সাদা পোশাকের একদল লোক আল-আমিনকে ধরে নিয়েছিল। অবশ্য র‌্যাব এ ধরনের অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে।

এর চার দিন পর ১৩ ডিসেম্বর একই স্থান থেকে একই রকম অবস্থায় আরও তিনটি লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এদের মধ্যে একজনের পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি হলেন ফরিদপুরের সালথা উপজেলার বড় লক্ষণদিয়া গ্রামে মঞ্জুর মুন্সী (৪৩)।


একই বছরের ২২ নভেম্বর একই নদী থেকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার ধর্মগঞ্জের শাওন নামের এক যুবকের লাশ উদ্ধার করা হয়।

২০১১ সালের ২২ জুলাই সিরাজদিখান উপজেলায় ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের পাশের খাদ থেকে উদ্ধার করা হয় পুরান ঢাকার দয়াগঞ্জ থেকে অপহূত রাজিবের (২৫) মৃতদেহ। মুখ ও হাত নতুন গামছা দিয়ে বাঁধা অবস্থায় পড়ে ছিল গুলিবিদ্ধ লাশটি। রাজিব পুরান ঢাকা থেকে অপহূত হয়েছিলেন। এ ঘটনায়ও অভিযোগের তির ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি। যদিও র‌্যাব-পুলিশ কেউ এর দায় স্বীকার করেনি। আবার হত্যার রহস্যও উদ্ঘাটন করতে পারেনি।

সর্বশেষ গতকাল পাওয়া তিনটি লাশেরও মুখ নতুন গামছা দিয়ে বাঁধা ছিল। এ তিনজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। এঁদের মধ্যে দুজন ঢাকার কেরানীগঞ্জ ও একজন জুরাইনের বাসিন্দা।

প্রথম আলো