নানা প্রতিকূলতার মধ্যদিয়ে এগিয়ে চলছে মুন্সীগঞ্জ ক্রিকেট একাডেমি

munshiganj-cricket-academy-দীর্ঘ সাড়ে চার বছর ধরে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে চলছে ‘মুন্সীগঞ্জ ক্রিকেট একাডেমি’। একাডেমি বলতে যা বুঝায় তেমন কিছু অবকাঠামো না থাকলেও নামটা খুবই ফুলে ফেঁপে আছে। স্টেডিয়ামের মাঠ আর ক্রীড়া সংস্থা কর্তৃক বরাদ্দকৃত পরিত্যক্ত ভবনের একটি বিপদজনক কক্ষ বলতে গেলে একাডেমির অবকাঠামো।

তবে বড় মনোবল হলো ক্রিকেট শিখতে আসা ৩০/৩৫ জন ছেলেমেয়ের নিত্য পদচারণা। তাদের শেখার অদম্য ইচ্ছা। বর্তমানে ৫/৬ জন মেয়েও এগিয়ে এসেছে। এটাই আমাদের অনুপ্রেরণা। একাডেমিতে আসা ছেলে-মেয়েদের বর্তমানে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন নারায়ণগঞ্জ জেলার রসুল দা। তিনি লেভেল টু আপডেট করা কোচ। বিসিবি ও ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া কর্তৃক ট্রেনিংপ্রাপ্ত কোচ। পথচলায় তিক্ত কিছু অভিজ্ঞতা আছে-যা আমাদের একাডেমির কর্মকা-ে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। কষ্ট লেগেছে এটা ভেবে যে যাদের এসব করার কথা তারা এগিয়ে আসছেন না। কর্মকর্তা হয়ে বিভিন্ন ফায়দা লুটছেন। আর আমরা যারা আছি নিজেরটা খেয়ে বনের মহিষ তাড়ানোর মানুষ। আমাদের সহযোগিতা না করে উল্টো পথ কিভাবে রুদ্ধ করা যায়- সে চেষ্টা করছেন তারা। এটা আসলে খুবই কষ্টদায়ক বিষয়। আমি ভাবতে পারি না-মানুষ কিভাবে নিজের দেশের কথা না ভেবে- দেশের মানুষের কথা না ভেবে শুধুই নিজের কথা ভাবে। শুধু কি তাই। দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য যারা কাজ করছে-তাদেরকে নিরুৎসাহিত করতে না পেরে পথ রুদ্ধ করার সব অপকৌশল অবলম্বন করে। সত্যিই বিষয়টি খুবই বেদনাদায়ক।


তুমি ভালো কিছু করতে না পারো-সহযোগিতা করো। তা না পারলে দোয়া করো। কিন্তু পথে কাঁটা বিছাবে এটা কেমন আচরণ। আসলে মানুষের মনুষত্ববোধ শূন্যের কোঠায় চলে যাচ্ছে। সব জায়গায় আর সবক্ষেত্রেই এমন আচরণের শিকার হচ্ছেন কিছু সাদা মনের মানুষ। তবে এটাও সত্য- ভালো কিছু থেমে থাকে না। তাদের স্বপ্ন পূরণ হয়ে যায়। আমরা সেদিকটা বিবেচনা করেই এগিয়ে যাবো।

চার বছর আগের কথা তিনজন তিন ভুবনের মানুষ। ঢাকা প্রথম বিভাগের ক্রিকেটার কাউছার আহমেদ বাবু, আইনজীবি কাজী মোজাম্মেল হোসেন রোমেল আর আমি স্থানীয় সাংবাদিক মু. আবু সাঈদ সোহান স্টেডিয়ামের ঘাসে বসে আলাপচারিতার মধ্যদিয়েই ‘মুন্সীগঞ্জ ক্রিকেট একাডেমি’ যাত্রা শুরু করে। যেই কথা সেই কাজ। বাবু দেখবেন খেলোয়াড় তৈরির বিষয় আর আমি ডোনার জোগাবো। রুমেল সহযোগিতায় থাকবে। বর্তমানে নিজের পেশার ব্যস্ততায় রুমেলের সময় না হলেও খোঁজ রাখছেন নিয়মিত। আর আমরা দু’জন জেলার ক্রিকেট উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি আজ অবধি।

চার বছর আগের মুন্সীগঞ্জ জেলার ক্রিকেটকে যদি আমরা দেখি। তাহলে কি দেখবো। কোনো অর্জন ছিল কি? বিসিবি’র উদ্যোগে বয়সভিত্তিক খেলা শুরু হলে ঢাকার কিছু টোকাই খেলোয়াড় দিয়ে মুন্সীগঞ্জ জেলার দল হয়ে যেতো। আমরা শুধু পত্রিকায় দেখতাম সব ম্যাচেই শোচনীয় পরাজয়ে ধরাশায়ী মুন্সীগঞ্জ জেলা। নিয়ম রক্ষার এসব অংশগ্রহণে কাদের লাভ সেটা জেলাবাসী সবাই জানেন। এ বিষয়ে বলার কিছু নেই। জেলা ক্রিকেট লিগ হলে টাকার বিনিময়ে ঢাকার তারকা ক্রিকেটারদের একটি প্রদর্শনী হয়ে যেতো। শিরোপা হতো টাকার উত্তাপে। জেলার খেলোয়াড় না থাকলে অংশগ্রহণ কিভাবে সম্ভব। তাই জেলার বাহিরের খেলোয়াড়দের টাকা উপার্জনের উর্বর ক্ষেত্র ছিল মুন্সীগঞ্জ জেলা স্টেডিয়াম।

‘মুন্সীগঞ্জ ক্রিকেট একাডেমি’ যাত্রা শুরুর পরে কি সফলতা এসেছে যদি প্রশ্ন করেন। তাহলে বলবো- প্রথমে মাঠে কোনো পাকা পিচ ছিল না। আমাদের দরখাস্তের মাধ্যমে তৎকালীন জেলা প্রশাসক তাৎক্ষণিকভাবে জেলা ক্রীড়া সংস্থাকে পিচ তৈরির নির্দেশ দেন। কিছু দিনের মধ্যেই পিচ তৈরি হয়ে যায়। পিচ তৈরি হলে সেখানে আমাদের প্রশিক্ষণার্থীরা ঘামজড়ানো পরিশ্রম শুরু করেন। সফলতা আসতে বেশি সময় নেয়নি আমাদের উদীয়মান কিশোররা।


২০১০ সালেই মুন্সীগঞ্জ জেলা অনূর্ধ্ব-১৬ দল ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও শরীয়তপুর জেলাকে হারিয়ে আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। একই সালে তার বিভাগীয় রানার্স আপ হওয়ার গৌরব অর্জন করে প্রথমবারের মতো মুন্সীগঞ্জ জেলার সুনাম ছড়িয়ে দেয়। এ দলে আমাদের প্রশিক্ষণার্থীরা যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখেন। বিদায়ী বছরের (২০১২) প্রথম দিকে অনূর্ধ্ব-১৬ দল আবার সফলতা নিয়ে আসে। তারা আঞ্চলিক রানার্স আপ হওয়ার গৌরব অর্জন করে। এর মাঝেও সফলতা এসেছে। তবে আমাদের এ জেলায় একটা বিষয় প্রচলিত আছে- জেলার কতিপয় ক্রীড়া কর্মকর্তা মুন্সীগঞ্জ দল জিতুক-তা চান না। জেলার সুনাম অর্জন তাদের কাছে গলায় ফাঁসের মতো। জেলা দল জয়ী হলে তাদের মন খারাপ হয়। অর্থের নাকি অপচয় হয়। তারা অর্থের সাশ্রয় চান। অর্থ কী জেলার ক্রীড়া উন্নয়নে? নাকি নিজেদের পকেট ভারি করতে? তা আমাদের বোধগম্য নয়।

‘মুন্সীগঞ্জ ক্রিকেট একাডেমি’ একক সফলতার কথা যদি বলি। সেটাও শুরু হয়েছে। ২০১০ সালে অনুষ্ঠিত জেলার প্রিমিয়ার লিগে একাডেমির ছেলেরা মাঠপাড়া সমাবেশের হয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে। ২০১১ সালে একাডেমির প্রশিক্ষণার্থীরা কক্সবাজার ও বান্দরবান সফর করে। বান্দরবান জেলা স্টেডিয়ামের বান্দরবান জেলা ক্রিকেট দলের বিপক্ষে টি-২০ প্রীতি ম্যাচে জয়লাভ করে।

এছাড়া নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন একাডেমির সাথে প্রতিনিয়ত প্রীতি ম্যাচে সফলতা আসছে। তবে এসব উল্লেখযোগ্য কিছুই নয়। শুধু উল্লেখ করার জন্য করা। আমাদের দৃষ্টি বহুদূর। আমরা শুধু প্রশিক্ষণ দিচ্ছি তা নয়। আমরা বিভাগীয় রানার্স আপ ও আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় মুন্সীগঞ্জ জেলা অনূর্ধ্ব-১৬ দলকে স্থানীয় চাইনিজ রেস্তোরাঁয় সংবর্ধনা দিয়েছি।

তবে দীর্ঘ সাড়ে চার বছর পর প্রথমবারের মতো ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আহাদ আলী সরকার সম্প্রতি আমাদের ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়ে উৎসাহিত করার পাশাপাশি স্বীকৃতি দিয়েছেন। যেটা গত সাড়ে চার বছরে জেলা ক্রীড়া সংস্থা করার আগ্রহ দেখায়নি।

আমাদের বহুদূরের পথ পাড়ি দিতে হবে। আর সেজন্য চাই সকলের সহযোগিতা। এ জেলায় বিত্তবান ও শিল্পপতির কমতি নেই। তাদের একটু সুনজর আশা করছি। তাদের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আমরা নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবো। এক্ষেত্রে আমাদের চলার পথ যেমন মসৃণ হবে, তেমনি বিশ্ব দরবারে এদেশের ক্রিকেট আরো এগিয়ে যাবে। আমাদের মুন্সীগঞ্জ জেলার ছেলেরা খুব সহজেই জায়গা করে নিতে পারবে। আমরা আশাবাদী। আপনিও আশা করতে পারেন। আপনারা সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে আসুন- আমরা এগিয়ে যাবো। আমাদের একটাই লক্ষ্য জাতীয় ক্রিকেট দলে মুন্সীগঞ্জ জেলার ছেলে-মেয়েদের জায়গা করে দেয়া। সে লক্ষ্য অর্জনেই নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ‘মুন্সীগঞ্জ ক্রিকেট একাডেমি’।

বিডিস্পোর্টস২৪ ডটকম