পাপুয়া নিউগিনি থেকে লাশ হয়ে ফিরলেন মুন্সীগঞ্জের লাবলু

lavludeathবন্দীজীবন কাটাচ্ছেন আরো অনেকে
পাপুয়া নিউগিনি থেকে লাশ হয়ে ফিরলেন মুন্সীগঞ্জের লাবলু। তার বাড়িতে এখন চলছে কান্নার রোল। পূর্ব অস্ট্রেলিয়া হিসেবে খ্যাত এই দেশটিতে পাড়ি জমিয়ে এখন বন্দিজীবনযাপন করছেন আরো অনেক বাংলাদেশী যুবক-শ্রমিক।

কর্মস্থল আর রাতে ঘুমানোর জায়গা ছাড়া দেশটির বাইরের চিত্রের দেখা পাচ্ছেন না শত শত বন্দী বাংলাদেশী যুবক। সেখানকার একটি মার্কেটে টানা ২ বছর বন্দী থাকার পর চলতি সপ্তাহে মুন্সীগঞ্জের এক যুববকে অমানুষিক নির্যাতনে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। অনেকেই বন্দিজীবনের নির্যাতনের ক্ষত নিয়ে পালিয়ে দেশের বাড়িতে ফিরে আসছেন।

পাপুয়া নিউগিনি সংক্ষেপে পিএনজিতে বন্দী অবস্থায় নিহত যুবক লাবলু হাসানের (৪২) মুন্সীগঞ্জ শহরের কাছে রন্ছ-রুহিতপুর গ্রামের বাড়িতে স্বজনদের মাঝে চলছে কান্নার রোল। স্ত্রী ও ৩ সন্তানের সংসারে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন বুকে নিয়ে ২ বছর আগে পাপুয়া নিউগিনিতে পাড়ি জমিয়েই সেখানকার একটি মার্কেটে কর্মস্থল ও রাতে ঘুমানোর ঠিকানায় বন্দি হন লাবলু। দেশটির বাইরের কোনো কিছুই দেখা না হলেও তিনি সংসারের কথা ভেবে ইট-পাথরের চার দেয়ালের ভেতর বন্দী থেকে কাজ করে গেছেন। তবু বাঁচতে পারলেন না লাবলু। তার এই মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি পরিবারের স্বপ্নের মৃত্যু ঘটেছে।

এমনই শত শত বাংলাদেশী যুবক-শ্রমিকের স্বপ্ন ভঙ্গের নিঃশব্দের কান্না চলছে যেন পাপুয়া নিউগিনির বন্দিজীবনের চার দেয়ালের ভেতর।

নিহত বাংলাদেশী যুবকের আত্মীয়-স্বজন ও পিএনজি ফেরত বেশ কয়েকজন যুবক বন্দি জীবনের দুর্বিষহ প্রবাসযাপনের করুণ চিত্রের বর্ণনা করেছেন।
lavludeath
নিহত লাবলুর লাশ গত শুক্রবার দিবাগত রাত সাড়ে ৯টার দিকে সিঙ্গাপুর এয়ার লাইন্সে করে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে আসে। তিনি শহরের কাছের রন্ছ-রুহিতপুর গ্রামের আব্দুল মালেক মাদবরের ছেলে। তার ছোট ভাই মোঃ নুরুল মাদবর জানান, প্রায় ২ বছর আগে ৭ লাখ টাকা খরচ করে তার ভাই সেখানে গিয়েছিলেন। বন্দী অবস্থায় ৩ মাস আগে অসুস্থ হয়ে পড়লেও চিকিৎসা না পেয়ে গত ৬ জানুয়ারি মারা যান লাবলু হাসান। তাদের অভিযোগÑ যে কোম্পানিতে কর্মরত ছিলেন লাবলু সেই কোম্পানির মালিক কালাম রহমান তার কোনো চিকিৎসার ব্যবস্থা করেননি এবং নিজ উদ্যোগে চিকিৎসা নেয়ার সুযোগও দেননি। এ কারণে অমানবিকভাবে বন্দী অবস্থায় মৃত্যু হয় তার।

এদিকে, বেতন দাবি করায় কালাম রহমানের ভাড়া করা সেখানকার আদিবাসী সন্ত্রাসীদের হামলায় পিঠে ছুরিকাঘাতের ক্ষতচিহ্ন ও প্রাণটা সঙ্গে করে বন্দিজীবন থেকে কোনোরকমে পালিয়ে এসেছেন মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার রনছ ভুঁইয়া বাড়ির আব্দুর রহমান ভুঁইয়ার ছেলে আক্তার হোসেন (৩৬)।


অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ করে ১৯৭৫ সালে স্বাধীনতা লাভ করা পিএনজিতে এ বাংলাদেশী যুবক ১৭ মাস অবস্থান করেন। ওই ১৭ মাসই তিনি সেখানে একটি মার্কেটের ভেতর বন্দী ছিলেন। সম্প্রতি তিনি ওই মার্কেটের নিজের থাকার কক্ষ ছেড়ে নিচে আসতেই স্থানীয় অধিবাসীরা তার পিঠে ছুরিকাঘাত করে। তিনি পিঠে ছুরিবিদ্ধ অবস্থায় ছিলেন দিনের আধাবেলা। এরপর কোনোরকমে বন্দিজীবন থেকে বেরিয়ে এসে চিকিৎসা করান। তিনি সাড়ে ৭ লাখ টাকা খরচ করে নিহত লাবলু হাসানের মতো একই আদম বেপারি আব্দুল মালেকের মাধ্যমে পাপুয়া নিউগিনিতে পাড়ি জমিয়েছিলেন।

এখন রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ১৩০৩/১৩০৪ ফ্লাটের ১৫ নম্বর দালানের এবি ভিলার আব্দুল মালেক নামে ওই আদম বেপারিকে তার বাসভবনে গিয়েও পাচ্ছেন না ভাগ্যহত শ্রমিকদের স্বজনরা।

বাংলাদেশের প্রায় সমান আয়তনের পিএনজির জনসংখ্যা মাত্র ৬৫ লাখ। ১৯টি জেলা রয়েছে মাত্র দেশটিতে। পিএনজিতে বন্দীজীবনে বাংলাদেশী যুবক-শ্রমিকদের ওপর প্রায়শই চড়াও হয় সাদা জাতির বর্তমান অস্ট্রেলিয়ান ও কালো জাতির মূল অস্ট্রেলিয়ান অধিবাসীরা।

সদর উপজেলার দক্ষিণ কেওয়ার গ্রামের মোঃ রোস্তম আলী হাওলাদারের ছেলে মেহেদী হাসানকে বন্দীজীবনের অমানবিক কষ্টের স্বাদ পেতে হয়েছে। তিনি দেড় বছর সেখানে একই আদম বেপারির মার্কেট ও ফার্স্ট ফুডের দোকানের ভেতর বন্দীজীবন কাটিয়ে সম্প্রতি পালিয়ে দেশে ফিরে আসেন। শুধু প্রাণ সঙ্গে করে ফিরতে পেরেছেন তিনি। একই ভাগ্যবরণ করতে হয়েছে নারায়ণগঞ্জের উত্তর চাষাড়ার চানমারী এলাকার মোঃ সাকু মিয়ার ছেলে যুবক ওমর মিয়াকে (২৫)। এদিকে নিহত লাবলু হাসানকে গতকাল শনিবার নিজ গ্রামের কবরস্থানে সমাহিত করা হয়েছে।

ভোরের কাগজ