বিজয় দিবস পালন

moni4রাহমান মনি
মহান বিজয়ের ৪১তম বর্ষপূর্তি উদযাপন করেছে জাপান প্রবাসীরা। বিজয়ের এই দিনে মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মত্যাগী বীর শহীদদের বিদেহী আত্মার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়েছে প্রবাসীরা। একই সঙ্গে যুদ্ধে আহত পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা, বীরাঙ্গনা মা বোনদের সর্বোচ্চ স্বশ্রদ্ধেয় ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা জানানো হয়, সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে সহায়তাকারী বিদেশি বন্ধুদের প্রতিও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানানো হয়।

দিবসটির তাৎপর্যে টোকিওস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে। কর্মসূচির মধ্যে ছিল দূতাবাস ভবনে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন, বিশেষ দোয়া কামনা, শিশু-কিশোরদের উন্মুক্ত চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন, নীরবতা পালন, প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শন, বাণী পাঠ, পুরস্কার বিতরণ, কেক কাটা এবং সবশেষে আপ্যায়ন। এছাড়াও ড. জাফর ইকবালের রচনায় ইমপ্রেস টেলিফিল্মের ‘আমার বন্ধু রাশেদ’ চলচ্চিত্রটি প্রদর্শিত হয়। ‘আমার বন্ধু রাশেদ’ পরিচালনা করেন মোরশেদুল ইসলাম।

এবারই দূতাবাস প্রথমবারের মতো মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে প্রবাসী শিশু-কিশোরদের জন্য উন্মুক্ত চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। প্রথমবারের মতো এই মহতী আয়োজনে ব্যাপক সাড়া জাগে। ৪০ জন শিশু-কিশোর দূতাবাসের তিনটি রুমে বসে উৎসবমুখর পরিবেশে উন্মুক্ত চিত্রাঙ্কন করেন। বিষয়ভিত্তিক চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় খুদে আঁকিয়েদের তুলিতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ফুটে ওঠে। সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত খুদে আঁকিয়েদের জন্য নির্ধারিত সময় বরাদ্দ থাকলেও স্থান সঙ্কুলান না হওয়া এবং অনেকেই দেরি করে আসার জন্য অতিরিক্ত সময় বরাদ্দ করতে বাধ্য হয় দূতাবাস। পরবর্তীতে এমন আয়োজনে অংশগ্রহণকারীদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করে এবং স্থান পরিবর্তন করে হল ভাড়া নিয়ে আয়োজন করার উদ্যোগ নিলেই ভালো হবে অভিমত ব্যক্ত করেছেন অনেক অভিভাবক। কেউ কেউ অভিযোগ করে বলেন, দেরি করে যারা আসেন তাদের মূল্যায়ন করতে গিয়ে যারা নির্দিষ্ট সময় মেনে আসেন তাদের অবমূল্যায়ন করা হয়।

টোকিওতে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন দূতাবাস প্রাঙ্গণে বিপুলসংখ্যক প্রবাসীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা আনুষ্ঠানিক উত্তোলনের মাধ্যমে দিবসটির সূচনা করেন। জাতীয় পতাকা উত্তোলন শেষে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে বীর শহীদদের বিদেহী আত্মার শান্তি এবং বাংলাদেশের উত্তরোত্তর সুখ সমৃদ্ধি ও সংহতি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়।


দূতাবাস মিলনায়তনে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন শেষে মহান মুক্তিযুদ্ধে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর শহীদদের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনায় তাদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। তারপর স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও বিজয় গাথার উপর ভিত্তি করে একটি প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শন করা হয়। প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক জাপানি অতিথিরাও প্রামাণ্য চিত্র উপভোগ করেন।

দুপুরে শিশু-কিশোরদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীদের মাঝে শুভেচ্ছা মেডেল প্রদান করা হয়। বয়সভিত্তিক ২টি গ্রুপে বিষয়ভিত্তিক চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় ক গ্রুপে প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় স্থান অধিকার করে যথাক্রমে তাশদিদ আলাভি, শুমেনি শারমিতা রাহমান এবং নাফাস ইসলাম। ক গ্রুপে ৮ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুরা অংশ নিয়ে থাকে।

খ গ্রুপে (৯-১২) প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় স্থান অধিকার করে যথাক্রমে নিহোন আনান রাহমান, ওয়াফা ইসলাম এবং প্রিয়াংকারী। রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন বিজয়ীদের মাঝে ক্রেস্ট তুলে দেন। চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার বিচারকার্যের দায়িত্ব পালন করেন তোয়ো ইনস্টিটিউট অফ আর্ট এন্ড ডেজাইন এর শিক্ষক তাকেশি মোরিইসি এবং শিনকোকু আর্ট মিউজিয়ামের উপদেষ্টা সোমেয়া মিনোরু। সহযোগিতায় ছিলেন কাহাল আর্ট গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা কামরুল হাসান লিপু। পরিচালনায় ছিলেন দূতাবাস প্রথম সচিব (শ্রম) বেবী রানী কর্মকার এবং দ্বিতীয় সচিব শাহনাজ রানু।

বৃহত্তর ময়মনসিংহ সোসাইটির বিজয় দিবস পালন
প্রতি বছরের মতো এবারও বৃহত্তর ময়মনসিংহ সোসাইটি জাপান, বিজয় দিবস পালন করে। বিজয় দিবস উপলক্ষে ২৪ ডিসেম্বর টোকিওর কিতা সিটি, কিতা আকাবানে ফুরে আইকানে এক আলোচনা সভা ও মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।


অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন টোকিওস্থ বাংলাদেশ রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন। অনুষ্ঠানে দুইজন মুক্তিযোদ্ধা (বর্তমানে জাপান প্রবাসী), শ্রী অজিত বড়–য়া এবং আব্দুল ওয়াদুদকে বিশেষ সম্মাননা জানানো হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতে রাষ্ট্রদূতের নেতৃত্বে জাপান প্রবাসীরা অস্থায়ী স্মৃতিসৌধে পুষ্পার্ঘ অর্পণের পর জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন।

জুয়েল আহসান কামরুল (এমকিউ)-এর সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন এমডি এস ইসলাম নান্নু, কাজী ইনসানুল হক, খন্দকার আসলাম হীরা, সনথ বড়–য়া, আলমগীর হোসেন মিঠু, সুনীল রায়, মাসুদুর রহমান, জিয়াউল ইসলাম, মীর রেজাউল করিম রেজা, কাজী মাহফুজুল হক, আব্দুল ওয়াদুদ, অজিত বড়–য়া, সুখেন ব্রহ্ম, আব্দুর রহমান কামন। আলোচনা সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন সংগঠনের নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক এম এ এন শাহীন এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন সভাপতি ড. রফিকুল ইসলাম।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাষ্ট্রদূত বলেন, রোমে আমরা ৪ বছর বিজয় দিবস পালন করেছি কিন্তু জাপান প্রবাসীদের মতো এত আন্তরিকতা এবং সর্বদলের অংশগ্রহণে এত স্বতঃস্ফূর্ততা দেখিনি। জাপান প্রবাসীদের সহাবস্থান দেখলে মনে হয় সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশ অসাম্প্রদায়িক এবং দেশের স্বার্থে সকলের সহাবস্থান রয়েছে। তিনি আয়োজকদের ধন্যবাদ জানান।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ প্রবাসী কল্যাণ সমিতির আয়োজনে ছোটদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন ববিতা পোদ্দার। পরিকল্পনায় ছিলেন কামাল উদ্দিন টুলু।
সবশেষে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন ‘উত্তরণ’ বাংলাদেশি কালচারাল গ্রুপ। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অ্যামেচার শিল্পীগণও অংশগ্রহণ করেন।

rahmanmoni@gmail.com

সাপ্তাহিক