হুমায়ুন আজাদ হত্যামামলায় সাক্ষ্য দিলেন ছোট ভাই

অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ হত্যা মামলায় আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন মামলার বাদি ও নিহতের ছোট ভাই মঞ্জুর কবির। মঙ্গলবার ঢাকার চতুর্থ মহানগর দায়রা জজ আদালতে প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে দেয়া জবানবন্দিতে তিনি বলেন, পাক সার জমিন সাদ বাদ- বইটি লেখার জন্য প্রতিক্রিয়াশীল মৌলবাদীরা তাকে অধ্যাপক আজাদকে হামলা করে বলে তিনি জানিয়ে গিয়েছিলেন।

বিচারক এ এইচ এম হাবিবুর রহমান ভূইয়া সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আগামী ১৭ জানুয়ারি মামলায় পরবর্তী দিন রাখেন।

২০০৪ সালের ২৭ ফেব্র“য়ারি রাতে একুশে বইমেলা থেকে ফেরার পথে বাংলা একাডেমীর উল্টো পাশে হামলার শিকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক, লেখক ও ভাষাতত্ত্ববিদ হুমায়ুন আজাদ। ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে তাকে গুরুতর জখম করা হয়।

কয়েক মাস চিকিৎসার পর সে বছর অগাস্টে গবেষণার জন্য জার্মানিতে যান এই লেখক। পরে ১২ অগাস্ট মিউনিখে নিজের ফ্ল্যাট থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়।

২০১২ সালের ১০ সেপ্টেম্বর এ মামলায় পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে আদালত। অভিযোগ গঠনের পর একটি ধার্য তারিখে সাক্ষী হাজির না হওয়ায় সাক্ষ্যগ্রহণ পিছিয়ে মঙ্গলবার দিন রাখা হয়।

মঞ্জুর কবির তার জবানবন্দিতে বলেন, ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্র“য়ারি রাত ৯টা দিকে যখন হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে, সে সময় তিনি ঢাকার গ্রিন রোডে একটি ফার্মেসিতে ছিলেন।

‘আমার সেজ ভাই সাজ্জাদ কবির মোবাইলে আমাকে সংবাদ দেয় যে বাংলা একাডেমীর বই মেলায় আমার বড়দা, প্রফেসর হুমায়ুন আজাদ সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হয়েছেন। তাকে আঘাত করা হয়েছে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে আসতে থাকি।’

এরই মধ্যে মেজ ভাই জানায়, তাদের বড়ভাইকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়েছে।


‘তখন আমি ঢাকা মেডিকেলে যাই। পরে তাকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নিয়ে যাওয়া হয়। তার সমস্ত শরীর রক্তাক্ত এবং মাথা, কাঁধ ও হাত পর্যন্ত ব্যান্ডেজ দেখতে পাই। এ সময় ভাই অজ্ঞান ছিল। সিএমএইচে নেয়ার ছয় ঘণ্টা পর তার অপারেশন হয়। তিন দিন পর জ্ঞান ফেরে। জ্ঞান ফিরলে তিনি আমাকে বলেন, পাক সার জমিন সাদ বাদ- বই লেখার জন্য প্রতিক্রিয়াশীল মৌলবাদীরা তাকে হামলা করে।’

২৫/২৬ দিন চিকিৎসার পর সিএমএইচ থেকে হুমায়ুন আজাদকে থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেথানে ৪৭ দিন চিকিৎসার পর তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। এরপর কিছুদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ার্টারে অবস্থান করেন তিনি।

এরপর পেন ইন্টারন্যাশনালের আমন্ত্রণে ২০০৪ সালের ৮ অগাস্ট জার্মানির মিউনিখে যান অধ্যাপক আজাদ। ওই বছর ১২ অগাস্ট তার মৃত্যু হয়।

ঢাকায় জার্মানির শার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সের কাছ থেকে ফোনে ভাইয়ের মৃত্যুর খবর পান মঞ্জুর কবির। মরদেহ দেশে আসার পর মুন্সীগঞ্জের রাঢ়িখালে গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয় হুমায়ুন আজাদকে।


হামলার সময় তার চেয়ালে চাপাতি ও ছুরি দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল বলে আদালতকে জানান তার ছোট ভাই।

আদালত কাঠগড়ায় দাঁড়ানো কাউকে সনাক্ত করতে পারছেন কি না জানতে চাইলে বাদি ‘না’ বলেন।

এ মামলায় অভিযুক্ত আসামিরা হলেন- মো. মিজানুর রহমান মিনহাজ ওরফে শফিক ওরফে শাওন ওরফে হামিম ওরফে হাসিম, আনোয়ারুল আলম ওরফে ভাগ্নে শহীদ, নূর মোহাম্মদ শামীম ওরফে জে এম মবিন ওরফে সাবু, সালেহীন ওরফে সালাউদ্দিন ওরফে সজীব ওরফে তাওহিদ এবং হাফেজ মাহমুদ ওরফে রাকিব ওরফে রাসেল।

অভিযুক্তরা নিষিদ্ধ সংগঠন জামায়েতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা। এ মামলার অন্যতম আসামি নূর মোহাম্মদ শামীম ওরফে সাবু পলাতক আছেন।

মামলার শুরুতে আসামির তালিকায় জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর নাম থাকলেও গত বছর ১৩ মে দেয়া সম্পূরক অভিযোগপত্রে ‘অভিযোগের প্রমাণ না পাওয়ার’ কথা উল্লেখ করে তার নাম বাদ দেয়া হয়।

প্রথমে এটি ‘হত্যাচেষ্টা’ মামলা হলেও সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিলের মধ্য দিয়ে এটি হত্যামামলায় পরিণত হয়।

মামলার বাদি মঞ্জুর কবির আদালতের বারন্দায় দাঁড়িয়ে বলেন, এ মামলায় যখন দেলোয়ার হোসেন সাঈদীকে বাদ দেওয়া হয় তখন থেকেই মামলার গুরুত্ব কমে গেছে।

‘তাই মামলা নিয়ে আমার কোনো আগ্রহ নেই।’

মামলায় প্রকৃত আসামিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি দাবি করে ২০০৯ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার ১ নম্বর অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে অধিকতর তদন্তের আবেদন করেছিলেন মঞ্জুর কবির।

এ আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর বিপুল চন্দ্র দেবনাথ জানান, হুমায়ুন আজাদকে হামলার ঘটনায় ঢাকার অন্য একটি আদালতে বিস্ফোরক আইনে আরেক মামলার বিচার চলছে।

আমাদের সময়