রাজনীতিই গুরুত্বপূর্ণ

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
বাঙালিকে বলা হয় অতিরিক্ত রাজনীতিসচেতন। এটা খুবই স্বাভাবিক। কেননা রাষ্ট্র ও রাজনীতি বাঙালির জীবনকে দীর্ঘকাল ধরে নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। পরাধীনতার একটি বিরাট যুগ আমরা তো পার হয়ে এসেছি। কিন্তু সাতচলি্লশের স্বাধীনতা, এমনকি একাত্তরের স্বাধীনতাও বাঙালিকে মুক্ত করেনি। সে জন্য রাজনীতির গুরুত্বটা রয়েই গেছে।

আমরা যে রাষ্ট্র পেয়েছি, সেটাকে রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন বলা হয়। কিন্তু মানব সভ্যতার ক্রমোন্নয়নের সর্বশেষ মুহূর্ত এই ২০১৩ সালের দরজায় দাঁড়িয়েও দেখা যাচ্ছে_ এটা জনগণকে স্বাধীনতা দেয়নি, নিরাপত্তা দেয়নি, মুক্তি দেয়নি। রাষ্ট্র কেন জনগণকে প্রত্যাশিত মুক্তি দিতে পারল না, তার কারণ হচ্ছে_ রাষ্ট্র চলে গেছে শাসকশ্রেণীর নিয়ন্ত্রণে। খুবই স্বাভাবিক যে, শাসকরাই রাষ্ট্র চালাবে। কিন্তু আমাদের দেশের শাসকশ্রেণী জনগণের নয়, নিজেদের স্বার্থ দেখে। এ শাসকশ্রেণী কখনও বৈধ, কখনও অবৈধ উপায়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করে। তাদের মধ্যে যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সেটা হচ্ছে ক্ষমতার ভাগাভাগির প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এ ব্যাপারে তারা যদি মীমাংসায় আসতে পারত, তাহলে তাদের মধ্যে কলহ থাকত না। কিন্তু যেহেতু তারা ক্ষমতা ভাগাভাগির মীমাংসায় আসতে পারে না, সে জন্যই কখনও সামরিক শাসন আসে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসে, তথাকথিত গণতান্ত্রিক শাসন চলে। তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতার যে চরিত্র দেখি, সেটা আসলে লুণ্ঠনেরই প্রতিযোগিতা। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সব সাম্রাজ্যবাদী শক্তিই বাধা দিয়েছিল। তাদের আশঙ্কা ছিল, এ দেশ প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হবে, এখানে সমাজ বিপ্লব ঘটে যাবে। তখন এ রাষ্ট্র আর তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। পাকিস্তানকে তারা নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল, কিন্তু বাংলাদেশকে রাখতে পারবে না। এ আশঙ্কা থেকেই তারা একাত্তরে বাংলাদেশবিরোধী ভূমিকা নিয়েছে। এমনকি যুদ্ধ যখন অনিবার্য হয়ে পড়ল, সেটা যাতে তাড়াতাড়ি শেষ হয়, সে জন্য চেষ্টা করেছে। তাদের আশঙ্কা ছিল, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এর নেতৃত্ব তথাকথিত চরমপন্থিদের হাতে চলে যেতে পারে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে না। এমনকি ভারতও এ ব্যাপারে চিন্তিত ছিল। যে কারণে মুক্তিবাহিনীকে সহায়তার পাশাপাশি ভারত মুজিব বাহিনীও গঠন করেছিল। এ বাহিনী গঠন খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। ভারত ও সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো চেয়েছিল পুরনো রাষ্ট্র ভেঙে একটি নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হতেই পারে; কিন্তু সমাজে যেন বৈপ্লবিক পরিবর্তন না হয়। নতুন রাষ্ট্র যেন গণতান্ত্রিকও না হয়।


গণতন্ত্র বলতে আমরা কী বুঝি? নির্বাচিত সরকার মানেই গণতান্ত্রিক সরকার নয়। নির্বাচিত সরকার অনেক সময় অনির্বাচিতদের তুলনায় বেশি নিপীড়নকারী হতে পারে। গণতান্ত্রিক সরকার ও সমাজ বলতে আমরা সে রকম ব্যবস্থা বোঝাব, যেখানে মানুষের সঙ্গে মানুষের অধিকার ও সুযোগের সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে। অর্থাৎ বৈষম্য ঘুচে যাবে। তখন আর সাম্প্রদায়িকতা থাকবে না, ক্ষুদ্র জাতিসত্তার পক্ষে বিভাজন থাকবে না। সর্বোপরি শ্রেণীবৈষম্য থাকবে না। এটা হচ্ছে প্রথম শর্ত। দ্বিতীয় শর্ত হচ্ছে, ক্ষমতা কোনো এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত থাকবে না। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ হবে। তৃতীয় হচ্ছে, সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সত্যিকার জনপ্রতিনিধিদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে।

রাজনীতি এখনও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাষ্ট্র জনগণের মিত্র নয়। পরাধীনতার যুগে রাষ্ট্র যেখানে জনগণের শত্রু হিসেবে কাজ করেছে, এখনও সে ভূমিকার পরিবর্তন ঘটেছে বলে সাধারণ মানুষ মনে করে না। তারা দেখতে পায় একটি আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা তাদের ওপর চেপে বসে আছে। অন্যদিকে রাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তাও দিতে পারছে না। বিশেষ করে, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নেই। ব্যক্তিগত জীবনেও নিরাপত্তা আছে_ তেমনটি নয়। বিশেষ করে মেয়েরা খুবই অনিরাপদ অবস্থায় রয়েছে। সমাজে নারী নির্যাতনের মাত্রা এখনও উদ্বেগজনক। সেই সঙ্গে ভয়ানক বিপদের মতো সন্ত্রাস ও জঙ্গি তৎপরতাও রয়েছে। রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালন করছে না বলেই এগুলো ঘটছে। মাঝে জনগণকে রাজনীতিবিমুখ করার চেষ্টা হলো। এমনটি আগেও ঘটেছে। রাষ্ট্রের কর্তারা চেয়েছেন জনগণ যেন রাষ্ট্র সম্পর্কে উদাসীন থাকে। জনগণকে রাজনীতির ব্যাপারে নিরুৎসাহ করার চেষ্টা সব সময়ই ছিল। রাষ্ট্র চায় এমন কিছু ইস্যু তৈরি করতে, মানুষ যেগুলো নিয়ে ব্যস্ত থাকবে এবং রাষ্ট্রের চরিত্র সম্পর্কে অস্পষ্টতায় ভুগবে। তথাকথিত সুশীল সমাজও তৎপর, রাজনীতি যাতে গুরুত্বপূর্ণ না হয় সেটা দেখতে। শাসকশ্রেণী নিজেদের স্বার্থেই ছাত্র-শ্রমিকসহ সব পেশায় বিভেদ সৃষ্টি করে রেখেছে। মতাদর্শিক বিভেদ নয়, স্বার্থগত বিভেদ। প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের কী করণীয়। একাত্তরের যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা একটি সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে পেঁৗছেছিলাম। সেখান থেকে রাষ্ট্র ও সমাজকে আরও সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়া উচিত ছিল। অর্থাৎ রাষ্ট্র ও সমাজকে রূপান্তরিত করে তোলা উচিত ছিল। তাদের গণতান্ত্রিক করে তোলা উচিত ছিল।

শ্রেণীবিভাজন বেড়েছে। আত্মকেন্দ্রিক শাসকশ্রেণীর আদর্শই জনগণের আদর্শ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ আদর্শ হচ্ছে ভোগবাদী, পুঁজিবাদী আদর্শ। এমন আদর্শের কারণেই আমরা রাষ্ট্র ও সমাজকে রূপান্তরিত করতে পারলাম না। প্রয়োজন ছিল প্রকৃত দেশপ্রেমিক ও গণতান্ত্রিক শক্তি বিজয়ের মুহূর্তকে নিজেদের হাতে ধারণ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। সেটাকেই এগিয়ে নেওয়া দরকার।

সমকাল