স্বপ্নের সেতু নিয়ে কোটি মানুষ আনন্দে উদ্বেল, পরিবর্তনের বাতাস

তাজা ইলিশ ভাজার ঘ্রাণে মুগ্ধ বিশ্বব্যাংক এমডি
মীর নাসিরউদ্দিন উজ্জ্বল, মুন্সীগঞ্জ ॥ পদ্মা সেতুর ঋণ চুক্তি সম্পাদনের আনন্দ-উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়েছে সবখানে। পদ্মাতীরের মানুষের চোখেমুখে এখন সাবলম্বী হবার আকাঙ্ৰা। ভাগ্যোন্নয়নের এ আশা এখন বাস্তবে সাজানো মালা গাঁথা শুরম্ন হয়ে গেছে। ব্যবসাবাণিজ্য, শিল্প-কারখানা, কৃষি সবক্ষেত্রেই এ অঞ্চলে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের বাতাস বইছে। অপার সম্ভাবনা এখন এ জনপদের। সেভাবেই এখন নিজেদের গুছিয়ে নেয়ার চিন্তায় মগ্ন। কিষানির মুখে হাসি উৎপাদিত পণ্য দ্রুত বাজারজাতসহ কৃষিভিত্তিক শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার খবরে।

জমির দরও বেড়ে গেছে। আগে থেকে বেড়ে থাকা জমির মূল্য আরেক ধাপ বেড়েছে। শুক্রবার বিভিন্ন শিল্পোদ্যোক্তা জমি কেনার জন্য এ অঞ্চল ঘুরে গেছেন। যাঁরা জমি বিক্রির দরদাম করছিলেন, তাঁরা তা বিক্রির সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছেন বা দর বাড়িয়ে দিয়েছেন। এ সবকিছুই ঘটেছে বৃহস্পতিবার মাওয়ার কাছে মাঝপদ্মায় বসে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে এ সেতু নির্মাণে ১২০ কোটি ডলার ঋণ চুক্তি সম্পাদন এবং বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. এনগোজি ওকোনজো ইয়েলার ইতিবাচক বক্তব্যের কারণে। এখন পদ্মার এপার মাওয়া এবং ওপার জাজিরা ও শিবচরই নয়, গোটা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৩ কোটি মানুষের মধ্যেই স্বপ্নের সেতু নিয়ে প্রাণের ছোঁয়া নানাভাবে তাদের পুলকিত করছে। আনন্দে উদ্বেল শ্রমিকরাও। আর বেকার-অর্ধবেকারদের মুখেও হাসি ফুটেছে। স্কুল-কলেজ পড়ুয়ারা বলাবলি করছে_ ‘বিশাল এ নদীর ওপর ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে যখন যানবাহন চলবে, তখন অবস্থাটা কী দাঁড়াবে? একই সুতোয় গেঁথে যাবে রাজধানী ঢাকা আর দক্ষিণাঞ্চল। মংলা পোর্ট পাবে যৌবন। দেশের অর্থনীতির মুক্তির দ্বার খুলে যাবে, তখন এ অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রায় আসবে আমূল পরিবতন।’ হোটেল, চায়ের স্টল, সব আড্ডায়ই এ আলোচনা। যানজটহীন যাতায়াতে সবাই রেল যোগাযোগকে বেশি প্রাধান্য দেয়ার জন্য সরকারকে এ মুহূর্তেই ভাবনার পরামর্শও দিয়েছেন। পদ্মাতীরের মাওয়ার কান্দিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা খোরশেদ আলম বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের কর্তাব্যক্তি এসে এ সেতু তৈরিতে যে বক্তব্য দিয়ে গেছেন আর বিরাট অঙ্কের ঋণচুক্তি সই করলেন, আমরা মনে করি সেতু এখন সময়ের ব্যাপার। তাই আমাদের রঙিন স্বপ্ন এখন বাসত্মবে ভাবতেই পারি।’ ওপারের চরজানাজাতের বাসিন্দা রেখা বেগম বলেন, ‘চরের বাসিন্দা মনে আনি না অহন, আমাগো বাড়িঘরও শহরের মতোই ভাবতাছি।’ মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোঃ আজজুল আলম জানিয়েছেন, দেশের সর্ববৃহৎ এ প্রকল্প বাসত্মবায়নের ক্ষেত্রে এ চুক্তি স্বাক্ষরের ঘটনাটি সংশিস্নষ্ট এলাকার জেলা প্রশাসক হিসেবে আমার জীবনেরও একটি আনন্দের স্মরণীয় দিন। সেতুকেন্দ্রিক কর্মযজ্ঞ মাওয়ায় ব্যাপক আকার ধারণ করবে। এতে বহু মানুষের কর্মসংস্থান হবে।

এ বিষয়ে দক্ষিণাঞ্চলের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন সেখানকার চিত্র। বরিশাল থেকে কাজী শামীম জানান, ঋণচুক্তি সম্পাদনের পর পদ্মা সেতু নিয়ে খুশিতে আটখানা বরিশালের মানুষ। মংলা থেকে আহসান হাবিব হাসান জানান, সেখানে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকেই এ নিয়ে মানুষের মধ্যে আনন্দ ছিল লক্ষণীয়। খুলনা থেকে অমল সাহা জানান, খুলনাবাসী স্বপ্নের সেতুর সফল ঋণ চুক্তিতে আনন্দে উদ্বেলিত। ফরিদপুর থেকে অভিজিৎ রায় জানান, গোটা জেলার মানুষই খশি। তবে ভাঙ্গা এলাকায় এ খুশির মাত্রা সবচেয়ে বেশি। গোপালগঞ্জেও একই চিত্র। এ সেতুর ঋণ পাওয়ার খবরে খুবই খুশি গোপালগঞ্জের জেলাবাসী।

এছাড়া পদ্মার তাজা ইলিশ গরম গরম ভেজে তাৎক্ষণিক বিশ্বব্যাংকের এমডিসহ অতিথিদের অ্যাপায়নের ঘটনাটি সবার কাছে এখন আলোচিত। রো রো ফেরি ভাষা শহীদ বরকতের তৃতীয় ও দ্বিতীয় তলা ভাজা ইলিশের ঘ্রাণ আলোড়িত করে। ড. এনগোজি ওকোনজো ইয়েলা বাঙালী খাবারে মুগ্ধ হন। তিনি এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, এ চুক্তি স্বাক্ষরে অন্য কাউকেও পাঠানো যোত। কিন্তু বাংলাদেশের প্রতি বিশেষ টান ছিল বলেই স্বয়ং আমি এসেছি এবং এসে মুগ্ধ হয়েছি। তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভূয়সী প্রশংসা করেন। নারীদের নেতৃত্ব এবং সফলতায় তিনি সনত্মোষ প্রকাশ করেন। নারীরা সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে সংসদে যাওয়ার প্রতি গুরম্নত্বারোপ করে স্থানীয় সংসদ সদস্য সরাসরি ভোটে নির্বাচিত নারী হওয়ার বিষয়টি তিনি বার বার উলেস্নখ করেন এবং মতবিনিময় সভায় তিনি সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলির গালে গাল মিলিয়ে আনত্মরিকতা প্রকাশ করেন। পদ্মায় প্রায় সোয়া তিন ঘণ্টার ভ্রমণ এবং অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে এবং শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মুগ্ধ হন তিনি। গানের সঙ্গে নেচেগেয়ে তার আনন্দ প্রকাশ করেন। শারমিন রমা ও নকুল কুমার বিশ্বাস এ সেতু নিয়ে লেখা বেশ ক’টি গান ছাড়াও জনপ্রিয় কয়েকটি সঙ্গীত পরিবেশন করে সকলকে মুগ্ধ করেন।

প্রেস ব্রিফিং ॥ সোয়া ১টায় ঋণচুক্তি স্বাক্ষর ও বক্তৃতাপর্ব শেষে দুপুর সোয়া ২টার দিকে প্রেস ব্রিফিংয় করেন বিশ্বব্যাংকের এমডি ড. এনগোজি ওকোনজো ইয়েলা ও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত। সাংবাদিকের এক প্রশ্নের জবাবে বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, এটি এখন নতুন বিশ্বব্যাংক। অনেক শর্তের বেড়াজালে এখন আর আমরা আবদ্ধ নই। তিনি বলেন, করাপশন_জিরোটলারেন্স, এটাই বড় শর্ত নয় কী?

এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, সেতুতে রেল সুবিধা থাকবে। তবে সেতু চালুর সঙ্গে সঙ্গেই সরাসরি ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের রেল যোগাযোগ চালু করা যাবে না। কারণ আশপাশে এখনও রেললাইন স্থাপিত হয়নি। তবে তাড়াতাড়িই এটিও চালু হবে। তিনি প্রশ্নের জবাবে বলেন, শঙ্কা নয়, আমরা দুনর্ীতির বিষয়ে আগে থেকেই সতর্ক, যাতে দুর্নীতি না হয়।

[ad#bottom]