আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে

মীজানূর রহমান শেলী
সাম্প্রতিক দশকগুলোতে বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার বিস্তারের দরুন আন্তর্জাতিক সহায়তা ও সহযোগিতার ফলে খাদ্য ঘাটতি মেটানোর ক্ষেত্রে দ্রুত ও সময়োচিত ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে জনগণের আশু চাহিদা মেটানোর জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারগুলোকে যথাসময়ে যথোচিত ব্যবস্থা নিতে হয়। এখানে প্রয়োজন দূরদৃষ্টি, বিশ্ব খাদ্যবাজারের গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে তথ্য-জ্ঞান, সুসংবদ্ধ পরিকল্পনা ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা। বিশেষ করে যখন দুনিয়াজোড়া খাদ্য সংকটের অশনি সংকেত ধ্বনিত হয় তখন এ বিষয়গুলো আরও জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আজকের দুনিয়ায় খাদ্যশস্য উৎপাদন ও সরবরাহের ক্ষেত্রে যেসব আশঙ্কাজনক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে তার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের মতো দেশগুলোতে এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করার বিষয়টি অতি জরুরি রূপ নিয়েছে।

‘গধহ ফড়বং হড়ঃ ষরাব নু নৎবধফ ধষড়হব’, ‘শুধু রুটি (খাদ্যবস্তু) হলেই মানুষ বাঁচে না’। কথাটি বহুল প্রচলিত। এতে জীবনের বহুমাত্রিক প্রয়োজনের কথা উপ্ত রয়েছে। মানুষ শুধু খেয়ে-পরেই জীবনের পূর্ণ স্বাদ নিতে পারে না। জীবনের পরিপূর্ণতার জন্য প্রয়োজন দেহের সঙ্গে মানবমনের ক্ষুধা মেটানোর। সেখানে আসে মানুষের চিরন্তন আধ্যাÍিক ও সাংস্কৃতিক চাহিদাগুলো পূরণ করার প্রসঙ্গ।

কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে দেখলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, পেটের ক্ষুধা না মেটাতে পারলে জীব হিসেবে মানুষ নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে না। ইসলামের শিক্ষায়ও এই মৌলিক চাহিদার অগ্রাধিকারের স্বীকৃতি দেয়া হয়। কবিতার ছন্দে যেমন লিপিবদ্ধ আছে : জোটে যদি মোটে একটি পয়সা/ খাদ্য কিনিও ক্ষুধার লাগি/ যদি জুটে যায় দুইটি পয়সা,/ ফুল কিনিও হে অনুরাগী।

আবহমানকাল ধরে বাংলাদেশের মানুষ সহজিয়া সাধনায় অবিনশ্বর আÍা ও নশ্বর দেহের কথা বারবার উচ্চারণ করেছে। এ দেশের বাউলের গান, লালনগীতি তা-ই স্মরণ করিয়ে দেয় :

খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কমনে আসে যায়/ ঃ মন তুই রইলি খাঁচার আশে/ খাঁচা যে তোর কাঁচা বাঁশের/ একদিন খাঁচা পড়বে খসে/ ফকির লালন কেঁদে কয়।

অনিত্য জীবনের বর্ণনামুখর এই মন উদাস করা গানের পাশাপাশি যুগ যুগ ধরে ঝংকৃত হয়েছে বাংলার মা-বাবার একান্ত আন্তরিক প্রার্থনা : ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’

চর্ব, চৌষ্য, লেহ্য, পেয় বিলাসী খাদ্যের সম্ভার নয়, বাংলার মানুষ সন্তানের জন্য আকুল হয়ে চেয়েছে শুধু দুধ-ভাতের নিশ্চয়তা। ব্যাপক দারিদ্র্র্য এই সাদামাটা ভবিষ্যৎ নির্মাণে বারবার বাধা দেয়। সমাজ ও রাষ্ট্রে, রাজনীতিতে ও প্রশাসনে ত্র“টি ও দুর্বলতার কারণে যে অব্যবস্থাপনার সৃষ্টি হয় তা দারিদ্র্যকে প্রবল করে। এর সঙ্গে খরা, বন্যা, ঝড়-তুফান ইত্যাকার প্রাকৃতিক দুর্যোগ যুক্ত হয়ে সমস্যাকে সংকটে পরিণত করে। এ পরিস্থিতিতে খাদ্যাভাব দরিদ্র জনসাধারণের দুর্ভোগ বাড়ায়। খাদ্যের সরবরাহ যদিবা থাকে, তার অগ্নিমূল্য তাকে সাধারণ জনগোষ্ঠীর আয়ত্তের বাইরে নিয়ে যায়। ফলে প্রতিকূল সময়ে প্রকট না হলেও নীরব বা ছদ্মবেশী দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। সন্তানদের জন্য দুধ-ভাতের সংস্থান করা অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের জন্য সহজ হয় না। এই দুরবস্থা বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন কালে আমাদের দেশকে জর্জরিত করেছে। গত শতাব্দীর চল্লিশের দশকে, ১৯৪৩ সালে ব্রিটিশ শাসনাধীন উপমহাদেশের অবিভক্ত বঙ্গে যে চরম দুর্ভিক্ষাবস্থা সৃষ্টি হয় আকাল হিসেবে, তা এখনও জনস্মৃতিতে অভিশাপের মতো জাগরুক। সত্তরের দশকের প্রথমার্ধে আকালের মতো তেমন ব্যাপক আকারে না হলেও খাদ্যাভাব এবং দরিদ্র মানুষের খাদ্য কেনার অক্ষমতা দেশে এক করুণ ও মর্মস্পর্শী পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। পরবর্তী দশকগুলো থেকে হাল আমল পর্যন্ত ওই ধরনের মারাÍক পরিস্থিতির সৃষ্টি ব্যাপকভাবে হয়নি। বন্যা এসেছে, কখনও কখনও মহাপ্লাবনের রূপে (১৯৮৮, ১৯৯৮)। প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও তুফান বারে বারে কেড়ে নিয়েছে লাখ লাখ প্রাণ, ধ্বংস করেছে খাদ্যশস্যসহ অনেক সম্পদ। খরার কারণে অনেক সময়ই সৃষ্টি হয়েছে খাদ্যশস্য উৎপাদনে ঘাটতি। কিন্তু এতসব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকার খাদ্য সরবরাহ যুক্তিযুক্ত পর্যায়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে। তাছাড়া বিদেশী ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতানির্ভর বিশ্বে বাংলাদেশসহ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ কার্যক্রমের মাধ্যমে খাদ্য সরবরাহের ব্যবস্থা নেয়া হয়। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হচ্ছে কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা), উš§ুক্ত বাজারে স্বল্পমূল্যে চাল বিক্রয় (ঙঢ়বহ গধৎশবঃ ঝধষব) এবং দরিদ্র মানুষের (নাজুক গোষ্ঠীর) ঠঁষহবৎধনষব ৎেড়ঁঢ় ঋববফরহম (ঠঋে)-এর জন্য খাদ্য কার্ড (ঠঋে) পদ্ধতি।

মনে রাখা দরকার যে, সাম্প্রতিক দশকগুলোতে বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার বিস্তারের দরুন আন্তর্জাতিক সহায়তা ও সহযোগিতার ফলে খাদ্য ঘাটতি মেটানোর ক্ষেত্রে দ্রুত ও সময়োচিত ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে জনগণের আশু চাহিদা মেটানোর জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারগুলোকে যথাসময়ে যথোচিত ব্যবস্থা নিতে হয়। এখানে প্রয়োজন দূরদৃষ্টি, বিশ্ব খাদ্যবাজারের গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে তথ্য-জ্ঞান, সুসংবদ্ধ পরিকল্পনা ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা। বিশেষ করে যখন দুনিয়াজোড়া খাদ্য সংকটের অশনি সংকেত ধ্বনিত হয় তখন এ বিষয়গুলো আরও জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আজকের দুনিয়ায় খাদ্যশস্য উৎপাদন ও সরবরাহের ক্ষেত্রে যেসব আশংকাজনক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে তার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের মতো দেশগুলোতে এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করার বিষয়টি অতি জরুরি রূপ নিয়েছে।
ঘনায়মান এই বিপদের রূপরেখা ফুটে উঠেছে বিশ্বের শীর্ষ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতাদের উক্তিতে। ১৪ থেকে ১৬ এপ্রিল ওয়াশিংটনে অুনষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক ও ইন্টারন্যাশনাল মনিটরি ফান্ডের (আইএমএফ) বসন্তকালীন সভাসমূহের শেষ দিনে তাদের উদ্বেগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০০৭-২০০৮-এ ভয়াবহ বিশ্বমন্দার প্রকোপ হ্রাস ও পরিস্থিতির উন্নয়নের আভাসে কিছুটা আশ্বস্ত হলেও তারা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাই সতর্কবাণী উচ্চারণ করে তারা বলেন, ‘খাদ্যদ্রব্যের দাম বেড়ে চলা, বেকারত্ব নিরসনে সফল পদক্ষেপ নেয়ার ব্যাপারে অপারগতা, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তাল অবস্থা এবং অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশগুলোতে অর্থায়ন ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা বিশ্বমন্দা কাটিয়ে ওঠার প্রক্রিয়াকে পথচ্যুত করতে পারে। ক্রমাগত বেড়ে ওঠা খাদ্যপণ্যের মূল্য সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বিশ্বব্যাংক সভাপতি মি. জোয়েলিক বলেন, ‘আর একটি মাত্র ধাক্কা এলেই আমরা পূর্ণমাত্রার সংকটে পতিত হব’। তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী আর্থিক সংকট আমাদের নতুন করে শিখিয়েছে যে, প্রতিরোধ প্রতিকারের চেয়ে উত্তম। এই শিক্ষা ভুলবার বিলাসিতার সাধ্য আমাদের নেই।’

আইএমএফের নীতিনির্ধারণী আর্থিক ও মুদ্রানীতিবিষয়ক কমিটির সভাপতি থারমান সানমুগরÍমের বক্তব্যে ঘনায়মান সংকটের আভাস মেলে। তিনি বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট সবারই ধারণা যে, আমরা এখনও বেশ নাজুক পরিস্থিতির মুখোমুখি। আমাদের খুবই সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে এবং সেই সঙ্গে আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে যাতে করে যে কোন ভয়াবহ পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে পারি।’

বিশ্বব্যাংক সভাপতি জোয়েলিক উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক উত্তাল অবস্থা, সংঘর্ষ এবং জ্বালানি তেলের মূল্যের ওপর তার প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘এর ফলে যদি জ্বালানি তেলের দাম অত্যধিক হারে এবং দীর্ঘস্থায়ীভাবে বাড়তে থাকে, তাহলে ২০১১ ও ২০১২ সালে বিশ্বের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গড়পড়তা হার ০.৩ থেকে ১.২ শতাংশ পরিমাণ হ্রাস পেতে পারে।’ আসলেই খাদ্যদ্রব্যের এবং জ্বালানি তেলের চড়া দাম ২০০৭ ও ২০০৮ এর চেয়েও জটিল ও ভীতিকর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করতে পারে। বিশ্বব্যাংকের এক সমীক্ষা অনুযায়ী গত বছরের তুলনায় এ বছর বিশ্বব্যাপী খাদ্যদ্রব্যের দাম ৩৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, এর ফলে দুনিয়ার চার কোটি ৪০ লাখ মানুষ নেমে গেছে দারিদ্র্যসীমার নিচে। তাদের গড়পড়তা দৈনিক আয় ১.২৫ ডলারের চেয়েও কমে গেছে। এ অবস্থায় খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহকে দিতে হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। আইএমএফের সভাপতি মি. স্ট্রস কান যথার্থই বলেন, ‘মন্দা কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেয়ায় গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সমস্যা ও সংকটের দিকে প্রয়োজনীয় নজর দেয়া সম্ভব হয়নি।ঃ প্রবৃদ্ধি বেশি হলেই কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয় না।’ পরিণতিতে একদিকে যেমন চাহিদার তুলনায় খাদ্যদ্রব্যের উৎপাদন ও সরবরাহ কমে যাওয়ায় তার মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে বেকার ও আধা-বেকার মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে, সৃষ্টি হচ্ছে নীরব দুর্ভিক্ষ, ব্যাপক অপুষ্টি এবং বিশাল গণ-অসন্তোষের।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় যে, আমরা আবার যেন ২০০৮ এর মাঝামাঝি সময়ে ফিরে যাচ্ছি। সে সময়ে দৈনিক যুগান্তরের এই কলামে লিখেছিলাম : ‘সরবরাহের অপ্রতুলতা ও মার্কিন ডলারের মূল্যহ্রাসের ফলে খাদ্যদ্রব্যের দাম অভূতপূর্ব হারে বেড়ে গেছে। আবার জ্বালানি তেলের দাম বিপুলভাবে বাড়ায় বিকল্প জ্বালানির খোঁজে অনেক দেশই খাদ্যশস্যকে জৈব জ্বালানি তৈরির কাজে ব্যবহার করছে। এর ফলে খাদ্যের সরবরাহ আরও কমে গেছে এবং দামও অনেকগুণ বেড়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, আন্তর্জাতিক পণ্যের বাজারে মুনাফালোভী ফটকাবাজারিদের অপতৎপরতায় খাদ্যদ্রব্যের দাম হু-হু করে বাড়ছে।

পরিণতিতে বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে উন্নয়নশীল দেশের অভাবী মানুষ। অর্থনৈতিক অনগ্রসরতার কারণে এমনিতেই এসব দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আয়-উপার্জন তুলনামূলকভাবে অনেক কম। জ্বালানি, খাদ্যশস্য এবং ভোজ্যতেল ও শাক-সবজিসহ সব নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের চড়া দাম তাদের দিশাহারা করে তুলছে। এ সমস্যা এসব দেশের নেতাদের বিব্রত ও চিন্তাগ্রস্ত করছে।’

এই সময়ে, ২০১১ খ্রিস্টাব্দের প্রথম ভাগে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত অনেক দেশের সরকার খাদ্য ঘাটতি প্রতিরোধে পদক্ষেপ নিচ্ছে। জনগণ, বিশেষত দরিদ্র জনগোষ্ঠী যাতে খাদ্যাভাবে বিপাকে না পড়ে সেই ব্যবস্থা গ্রহণে ক্ষমতাসীন নেতৃবর্গ ব্যস্ত। কিন্তু এসব পদক্ষেপ সব সময়ই সুপরিকল্পিত ও সুচিন্তিত কিনা, এ নিয়ে সংশয় রয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমান সরকার কৃষি ও কৃষকবান্ধব কার্যক্রমে সফলতা দেখিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালেও সরকার এ বিষয়ে প্রশংসনীয় কার্যকারিতার দৃষ্টান্ত রেখেছিল। কিন্তু খাদ্যশস্য উৎপাদনে কৃতিত্বপূর্ণ সফলতা সত্ত্বেও এ বছর খাদ্য ঘাটতি ও খাদ্যদ্রব্যের উঁচু দামের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারকে বিদেশ থেকে আট লাখ টন খাদ্য আমদানির ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। ভারত থেকে চাল আমদানির ব্যাপারে জটিলতা দেখা দিলে থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম থেকে সরকারি পর্যায়ে উঁচু দামে চাল আমদানির ব্যবস্থা নেয়া হলে অভিযোগ ওঠে যে, বেসরকারি আমদানিকারকদের চেয়ে বেশি দামে আমদানির চুক্তি করার ফলে দেশ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন। এ সম্পর্কে খাদ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা হয়তো রাষ্ট্রীয় স্বার্থরক্ষায় পুরোপুরি সফল হতে পারিনি। আমাদের কিছু ব্যর্থতা থাকতে পারে। তবে অনিয়ম-দুর্নীতির যে ইঙ্গিত করা হয়েছে, তা অমূলক। এখানে দুর্নীতি হবে না। আর কোন পরিস্থিতিতে আমরা বিশ্ববাজার থেকে চাল কিনেছি, তা সাংবাদিকদের বিবেচনা করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি হওয়ার পর চালের দাম কমলেই ওই চুক্তি বাতিল করা যায় না।’

সরকারের আন্তরিকতায় পূর্ণ আস্থা রেখেও বলা যায় যে, এই পরিস্থিতির মূলে রয়েছে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কেনাকাটার ব্যবস্থাপনায় ত্র“টি ও দ-র্বলতা। বিশ্বের শীর্ষ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃবৃন্দ যে আসন্ন জ্বালানি ও খাদ্য সংকটের আভাস দিয়েছেন, তার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে তা কাটিয়ে ওঠার আশু পদক্ষেপ নিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য উৎপাদন যেমন বাড়াতে হবে তেমনি মধ্য ও স্বল্প মেয়াদে প্রয়োজনমতো বাইরে থেকে যুক্তিযুক্ত মূল্যে যথাসময়ে খাদ্য সংগ্রহ করতে হবে। শুধু তাই নয়, প্রয়োজনীয়সংখ্যক গুদাম নির্মাণ করে খাদ্যশস্য সংরক্ষণের এবং ন্যায্যমূল্যে সরবরাহের সুনিশ্চিত ব্যবস্থাও নিতে হবে। এসব ব্যবস্থা সুদক্ষভাবে নিতে পারলেই আমাদের সন্তানদের ‘দুধে-ভাতে’ রাখা সম্ভব হবে।

ড. মীজানূর রহমান শেলী : চিন্তাবিদ, সমাজবিজ্ঞানী ও সাহিত্যিক

[ad#bottom]