স্বপ্নের পদ্মাসেতু নির্মাণে ১২০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি স্বাক্ষর

কোটি মানুষের স্বপ্ন ছুঁয়ে গেলো
মাওয়ার রো রো ফেরি থেকে: বৃহস্পতিবার দুপুরে মুন্সীগঞ্জের মাওয়ায় স্বপ্নের পদ্মাসেতু নির্মাণে ১২০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে।

বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের মধ্যে এই চুক্তিটি সম্পাদিত হলো। এই চুক্তির মধ্য দিয়ে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তিন কোটি মানুষের প্রাণে স্বপ্ন ছুঁয়ে গেছে। পদ্মাসেতু নির্মাণ বাস্তবায়নের পথে আনুষ্ঠানিকতাও শুরু হয়েছে এই চুক্তির মধ্য দিয়ে।

বাংলাদেশের পক্ষে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মোশারফ হোসেন ভুঁইয়া এবং বিশ্বব্যাংকের পক্ষে সংস্থাটির আবাসিক প্রতিনিধি মিস অ্যালেন গোল্ডস্টেইন ঋণচুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।

বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে প্রজেক্ট প্রকল্পের আরো একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। প্রকল্প চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন সেতু বিভাগের সচিব মোশারারফ হোসেন ভুঁইয়া।

চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে ঢাকা-সফররত বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. এনগোজি ওকোনজো ইউয়েলা, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, পরিকল্পনামন্ত্রী একে খন্দকার, যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমানসহ সরকারের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদ্মাসেতুর নির্মাণকাজ শেষ হবে। সরকার দারিদ্রমুক্ত দেশ গঠনে অঙ্গীকারবদ্ধ। এজন্য সরকার অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ খাতকে গুরুত্ব দিয়ে যাচ্ছে । তারই ধারাবাহিকতায় পদ্মাসেতু নির্মাণকাজ শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। অক্টোবর মাসে দরপত্রের মাধ্যমে সেতু নির্মাণের কার্যাদেশ দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, এ প্রকল্প সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত প্রকল্প হবে। এজন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও এ বিষয়ে তদারকি করছেন। পদ্মাবহুমুখি সেতু প্রকল্পে দরপত্র চুক্তি যেন যথাযথ ভাবে যেন হয় সেজন্য পরামর্শক নেওয়া হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, দারিদ্রবিমোচনের জন্য এ প্রকল্প অতীব জরুরি। এছাড়া দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকার উন্নয়নের বিষয়টি মাথায় রেখে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। এ সেতু চালু হলে এখানে শিল্প-কল কারখানা তৈরি করা সম্ভব হবে। সেক্ষেত্রে এ অঞ্চলে কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ও গ্যাস যদি থাকে তাহলে দেশের যে কোনো অঞ্চলে শিল্প-কারখানা করা সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংক আমাদের শুধু এ প্রকল্পে সহায়তা করেননি, তারা অনেক প্রকল্পেই সহযোগিতা করেছে।

বহুমুখি পদ্মাসেতু নির্মাণে দুনীতিমুক্ত প্রকল্প দেখতে চায় বিশ্ব ব্যাংক। বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. এনগোজি ওকোনজো ইউয়েলা বলেন, পদ্মাসেতু নির্মাণে কোনও প্রকার অনিয়ম ও দুনীতি সহ্য করা হবে না। তিনি পদ্মাসেতুর কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রক্রিয়ায় এবং দুনীতিমুক্ত করার জন্য সরকারে সৃষ্টি দেওয়ার কথা বলেন। তিনি বলেন, স্বচ্ছতা ও দুনীতিমুক্ত রাখতে প্রকল্পের সকল ক্ষেত্রে মনিটরিংয়ের ব্যবস্থার জন্য বিশ্বব্যাংক নিজেদের প্রতিনিধি রাখার কথা বলেন।

ড. এনগোজি ওকোনজো ইউয়েলা বলেন, বিশ্বব্যাংক এই প্রথম এশিয়ায় কম সুদে এতো বড় প্রকল্পে সহায়তা করছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এই অঞ্চলের মানুষের উন্নয়ন ঘটবে। এর মধ্য দিয়ে তারা উপকৃত হবে। এ প্রকল্পের ফলে অনেকেই নতুন করে জীবন গঠন করতে পারবেন। মোট কথা এই সেতুর মাধ্যমে এই এলাকার মানুষের অর্থনৈতিক জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটবে।

তিনি বলেন, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্নের প্রকল্প। এ সেতু নির্মিত হলে দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের তিন কোটি মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটবে। তবে পদ্মাসেতু একটি উন্নতমানের আন্তর্জাতিক সেতু হিসেবে তৈরি হয়েছে বিশ্বব্যাংক এটা দেখতে চায়।

তিনি আরো বলেন, পদ্মাসেতু এশিয়ার ৩য় বৃহত্তম সেতু হতে যাচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জনগণের একটি স্বপ্ন পূরণ হবে। এই স্বপ্নযাত্রায় বিশ্বব্যাংক যুক্ত হতে পেরে গর্বিত। এই সেতুর মাধ্যমে বাংলাদেশ এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গেও যুক্ত হবে। ফলে এ অঞ্চলে অন্যান্য দেশ যেমন ভারত, নেপাল, মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থাও গড়ে উঠবে। সেই সঙ্গে এই সেতুর মাধ্যমে মংলাপোর্টের ব্যবহার আরো বৃদ্ধি পাবে। তাই এ সেতু নির্মাণে গুণগতমান রক্ষায় কোনো ধরনের দুর্নীতি কিংবা আর্থিক অনিয়মকে বিশ্বব্যাংক ছাড় দেবে না।

এর আগে জাতীয় সংসদের হুইপ সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি, মুন্সীগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য সুকুমার রঞ্জন ঘোষ অতিথিদের স্বাগত জানান।

বিশ্বব্যাংকের ব্যাবস্থাপনা পরিচালক এনগোজি ওকোনজো ইউয়েলা তার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, ঋণচুক্তি সাক্ষরের এই দিনে আজ আমরা খুবই আনন্দিত।

তিনি বলেন, আমি আশা করি পদ্মাসেতু নির্মাণ হলে এদেশের মানুষের জীবন ধারার পরিবর্তন ঘটবে। বিশ্বব্যাংক এ সরকারের মাধ্যমে যে অর্থঋণ দিচ্ছে তা মূলত এ দেশের মানুষেরই অর্থ।

এরও আগে তিনি মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার মাওয়া ফেরিঘাটের কাছে কুমারভোগ এলাকায় পদ্মাসেতু নির্মাণ প্রকল্পের কারণে স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে দেখা করেন।

এখানে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন, তাদের কথা শোনেন। ইউয়েলা বলেন, পদ্মাসেতু নির্মাণের পর এ এলাকায় প্রতিটি পরিবারের জীবনজীবিকার মানোন্নয়ন ঘটবে। সেই সঙ্গে তারা কর্মসংস্থানের পথ খুঁজে পাবে। ক্ষতিগ্রস্ত প্ররিবারকে যে অর্থ প্রদান করা হয়েছে তা যেন সঠিকভাবে ব্যবহার হয় সে দিকে লক্ষ্য রাখার কথা বলেন তিনি।

এ সময় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, আড়াই বছরের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত সকল ব্যক্তিকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে। এরই মধ্যে ২ হাজার পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে।

পদ্মাসেতু নির্মাণে ব্যয় হবে ২৯০ কোটি ডলার। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংক দেবে ১২০ কোটি ডলার। বাকি ১১৫ কোটি ডলার দেবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) এবং জাপান।

সেতুটি নির্মাণ শেষ হলে এটিই হবে এশিয়ার বৃহত্তম সেতু। ১০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে এই সেতুর ৬.১৫ কিলোমিটার থাকবে নদীর উপর। অবশিষ্ট ৪ কিলোমিটার থাকবে নদীর দুই পাড়ে। এছাড়া সেতুর উপর ৪ লেন বিশিষ্ট সড়ক হবে। মাঝে রেললাইন থাকবে। তবে এ রেল লাইন চালু করতে আরো সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী ও যোগাযোগমন্ত্রী।

২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসের আগেই সেতুটির নির্মানকাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

পবন আহমেদ/মামুনুর রশীদ খোকা
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
————————————————————-

পদ্মা সেতু নির্মাণে ঋণ চুক্তি সই

পদ্মা সেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে ১২০ কোটি ডলারের রেয়াতি ঋণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার দুপুর পৌনে ১টার দিকে পদ্মা সেতুস্থল মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার মাওয়া এলাকার কাছে পদ্মা নদীতে বিআইডবিস্নউটিএ’র রো রো ফেরি ভাষা শহীদ বরকতে এই ঋণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

বাংলাদেশের পক্ষে ইআরডি’র সচিব মোশাররফ হোসেন ভূইয়া ও বিশ্বব্যাংকের পক্ষে বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি এলিন গোল্ড এস্টেন চক্তিতে স্বাক্ষর করেন।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিস এনগোজি ওকানোজো-ইউওয়েলা, পরিকল্পনা মন্ত্রী এ কে খন্দকার, যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান, জাতীয় সংসদের হুইপ সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলিসহ সরকারের নেতৃবৃন্দ ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

এর আগে মাওয়া পদ্মা রিসোর্ট হাউজে পদ্মা বহুমুখী সেতু সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন প্রকল্প পরিচালক। পরে লৌহজংয়ের কুমারভোগে পদ্মা সেতু পুনর্বাসন পল্লী-৩ ও সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন অতিথিবৃন্দ।

দুপুর ১টায় যৌথ সংবাদ সম্মেলন চুক্তি সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হবে।

সূত্র জানায়, বিশ্বব্যাংকের চুক্তি স্বাক্ষরের পর পর্যায়ক্রমে জাইকাসহ অন্যান্য দাতা সংস্থাগুলোর সঙ্গেও এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। এরপরই পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হবে। এছাড়া সেতু নির্মাণ কাজ নির্বিঘ্নে সম্পন্ন ও নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সেতু এলাকাকে কেপিআই বা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ঘোষণা করে সেখানে সেনাবাহিনীর একটি টিম মোতায়েন করা হবে।

শীর্ষ নিউজ
——————————————-

দক্ষিণাঞ্চলের কাঙ্খিত পদ্মা সেতু নির্মাণের চুক্তি স্বাক্ষরিত

হুমায়ুন কবির খোকন ও সম্পা রায় শিবচর থেকে : কিছুক্ষণ আগে মাওয়ায় পদ্মা নদীতে ভাষা শহীদ বরকত ফেরিতে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ প্রতিনিধি এলেন গ্লোড স্টেইন এবং ইআরডি সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়ার মধ্যে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঋণ চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। এসময় সেতু প্রকল্প সহায়তার জন্য এলেন গ্লোড স্টেইনের সঙ্গে সেতু বিভাগের সচিব মোশাররফ হোসেনের আরো একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ড.নাগোজিএম ওকোনজো ইয়েলা, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, পরিকল্পনা মন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল(অবঃ) একে খন্দকার, যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা ড.মসিউর রহমানসহ ঊধ্বর্তন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। মাওয়ায় পদ্মা নদীতে ভাষা শহীদ বরকত ফেরিতে পদ্মা সেতু নিয়ে প্রধান দাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে ২শ ১০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বাদ্য বাজনারও আয়োজন করা হয়। এই সংবাদে পদ্মা পাড়সহ দক্ষিনাঞ্চলজুড়ে আনন্দের জোয়ার বইতে শুরু করেছে। দাতা সংস্থাগুলো ইতোমধ্যে ২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার প্রদান নিশ্চিত করেছে।

সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা যায় অধিগ্রহণের ক্ষতিপুরণ প্রকল্পের কাজ শেষ পর্যায়ে ।

প্রস্তাবিত পদ্মা সেতুটি হবে দ্বিতল। দৈর্ঘ্য ৬.১৫ কিলোমিটার, প্রস্থ ২৫ মিটার, উপরতলায় ৪ লেনবিশিষ্ট সড়ক পথ এবং নীচের তলায় রেলপথ। তাতে গ্যাস পাইপ লাইন, অপটিক ফাইবার ক্যাবল এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন থাকবে। সেতুর উভয় পাড়ে মাদারীপুরের শিবচরে ১টি , শরিয়তপুরের লৌহজংয়ে ১টি ও ম্ন্সুীগঞ্জের লৌহজংয়ে ২টি পুর্নঃবাসন প্রকল্পের কাজ প্রায় ৮০ ভাগ সম্পন্ন। অধিগ্রহণকৃত সেতুর দুই পাড়ে দুটি টোল প্লাজা, সার্ভিস এরিয়া, ৬টি ছোট সেতু, ৭টি আন্ডারপাস , ১৪ টি কালভার্টসহ ১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ৪ লেনবিশিষ্ট প্রবেশপথ এ্যাপ্রোচ সড়ক, ৯ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক ও ১৪.৫ কিলোমিটার সার্ভিস রোড নির্মাণ হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০১ সালের ৪ জুলাই মাওয়া এলাকায় প্রস্তাবিত পদ্মা বহুমুখি সেতুর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন।

আমাদের সময়
—————————————

স্বপ্নের পদ্মা সেতু_ ১২০ কোটি ডলারের চুক্তি

০ পদ্মা সেতু নির্মাণে ঋণ চুক্তি সই করল বিশ্বব্যাংক
০ ২০১৪’র জানুয়ারির ভেতর শেষ হবে সেতু নির্মাণের কাজ

মীর নাসিরউদ্দিন উজ্জ্বল, মাওয়া থেকে ফিরে ॥ স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণের ১২০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে এই চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তিন কোটি মানুষের প্রাণে স্বপ্ন ছুঁয়ে গেছে। বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর এ্যালেন গোল্ডস্টিইন ও বাংলাদেশের পক্ষে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মোশারফ হোসেন ঋণ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে প্রকল্পের আরও একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। প্রকল্প চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন সেতু বিভাগের সচিব মোশারফ হোসেন। এ সময় বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. এনগোজি ওকোনজো ইয়েলা, অর্থমন্ত্রী আবুল আল আব্দুল মুহিত, পরিকল্পনামন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল (অব) একে খন্দকার, যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান, জাতীয় সংসদের হুইপ অধ্যাপিকা সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি এমপি, বিএম মোজাম্মেল হক এমপি, সুকুমার রঞ্জন ঘোষ এমপিসহ উর্ধতন কর্মকর্তা এবং বিদেশী অতিথিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

রো রো ফেরি ‘ভাষা শহীদ বরকত’-এ করে মাঝ পদ্মায় গিয়ে এই চুক্তি স্বাক্ষর হয়। বেলা ১টা থেকে সোয়া ৩টা পর্যন্ত ফেরিটি পদ্মার বুকে সেতুস্থলে বিচরণ করে। স্বাক্ষর শেষে এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে বিশ্বব্যাংক এমডি উদ্বেলিত হয়ে নেচে নেচে গানের সঙ্গে নিজেকে বিলিয়ে দেন। এতে গোটা অনুষ্ঠানস্থলে এক বিশেষ পরিবেশ তৈরি হয়। পরে এমডি কপ্টারে করে বিকেল সাড়ে ৩টায় ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন।

১০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই সেতুর ৬ কিলোমিটার থাকবে নদীর ওপর। অবশিষ্ট ৪ কিলোমিটার নদীর দু’পারে থাকবে। ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসের আগেই সেতুটির নির্মাণ কাজ শেষ হবে। এটা হবে এশিয়ার বৃহত্তম সেতু। সেতু নির্মাণে ব্যয়ে হবে ২৯০ কোটি ডলার। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংক দেবে ১২০ কোটি ডলার। ১১৫ কোটি ডলার দেবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), বাকি অংশ ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) এবং জাপান। ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসের আগেই সেতুটির নির্মাণ কাজ শেষ হবে। চুক্তি শেষে ভ্রাম্যমাণ মঞ্চে বক্তব্য বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ড. এনগোজি ওকোনজো ইয়েলা বলেন, বিশ্বব্যাংক এই প্রথম এশিয়ায় কম সুদে এত বড় প্রকল্পে সহায়তা করছে। এই প্রকল্প বাসত্মবায়িত হলে এই অঞ্চলের মানুষের উন্নয়ন ঘটবে। উপকৃত হবে বহু মানুষ। অনেকের জীবনেই উন্নত পরিবর্তন আসবে। সর্বোপরি এই সেতু বাসত্মবায়নের মধ্য দিয়ে এলাকার অর্থনৈতিক জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। পাশাপাশি এই সেতুটি এশিয়ার হাইওয়ে নেটওয়ার্কের সঙ্গে টোকিও থেকে ইসত্মাম্বুল পর্যনত্ম সংযুক্ত হবে। এছাড়া এই সেতু থেকে নেপালের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্য সুবিধা পাবে।
বিশ্বব্যাংকের এমডি বলেন, পদ্মা সেতু তৈরির মানের সঙ্গে কোন আপোস করব না। আমরা আশা করি সম্পূর্ণ দুর্নীতি মুক্তভাবে প্রকল্প বাসত্মবায়ন হবে। বাংলাদেশ সরকার প্রতিশ্রম্নতি দিয়েছে সর্বোচ্চ মান স্বচ্ছতার মাধ্যমে এটি বাসত্মবায়িত হবে।

তিনি অনভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, ঋণ স্বাক্ষরের এই দিনে আমরা খুবই আনন্দিত। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, পদ্মা সেতু দেশের মানুষের জীবন ধারার পরিবর্তন ঘটাবে। বিশ্বব্যাংক এ সরকারের মাধ্যমে যে অর্থ ঋণ দিচ্ছে তা মূলত এ দেশের মানুষেরই অর্থ।

অর্থমন্ত্রী আবুল আল আব্দুল মুহিত বলেন, বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ হবে। সরকার দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গঠনে অঙ্গীকারাবদ্ধ। এজন্য সরকার অবকাঠামো ও বিদু্যত খাতকে বেশি গুরম্নত্ব দিচ্ছে। আগামী অক্টোবরে দরপত্রের মাধ্যমে সেতু নির্মাণের কার্যাদেশ দেয়া হবে। তিনি বলেন, স্বচ্ছ ও পরিষ্কারভাবে কাজ হবে, দুর্নীতি হবে না। সম্পূর্ণ দুনর্ীতিমুক্ত প্রকল্প হবে। এটা আমরা নিশ্চিত করেছি। এজন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও তদারকি করছেন। প্রধানমন্ত্রীর দফতরের এ প্রকল্পের উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। দরপত্র চুক্তি যাতে যথাযথ হয় এবং দুনর্ীতিমুক্ত হয় সে লক্ষ্যে সব ব্যবস্থাই নেয়া হয়েছে। ব্যাপক এলাকার দারিদ্র্য বিমোচনে এ প্রকল্প গুরম্নত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে উলেস্নখ করে তিনি বলেন, বিদু্যত সমস্যারও সমাধান হচ্ছে। যদি যোগাযোগ ও বিদু্যত আমাদের দুয়ারে থাকে তাহলে জীবনযাত্রার মান বাড়বেই। এ সেতু হলে এখানে কলকারখানা হবে, কর্মসংস্থান বাড়বে। তিনি আরও বলেন, বিশ্বব্যাংক শুধু এই প্রকল্পে সহায়তা করেনি, তারা অনেক প্রকল্পেই সহযোগিতা করছে।

যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন বলেন, প্রকল্পের খুঁটিনাটি তুলে ধরে বলেন, এই চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে সরকারের দেয়া প্রতিশ্রম্নতি অনুযায়ী পদ্মা সেতু বাসত্মবায়ন হতে যাচ্ছে। তিনি বলেন, দুর্নীতি মুক্তভাবে এই প্রকল্প বাসত্মবায়িত হবে।

স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ অধ্যাপিকা সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি বলেন, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সরকারের ঋণ চুক্তির ফলে এ সেতু নির্মাণে এখন আর তেমন কোন বাধা রইল না। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের পদ্মা সেতু এখন বাসত্মবে রূপ নিতে আর কোন বাধা থাকল না। এ সেতু আমার এলাকায় হওয়াতে আমি খুবই খুশি। আমার এলাকার জনগণ দেশের স্বার্থে তাদের পূর্ব পুরম্নষদের সম্পত্তি ছেড়ে দিয়েছে হাসিমুখে। সেজন্য তিনি তাদের ধন্যবাদ জানান। এমিলি বলেন , পদ্মা সেতু এ অঞ্চলের লোকদের ভাগ্য খুলে দিয়েছে। এ সেতুর ফলে এ অঞ্চলের লোকদের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। লোকজনের আর বেকার থাকতে হবে না ।

বৈরী আবহাওয়ার কারণে ঢাকা থেকে বিমানবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারযোগে লৌহজংয়ের কুমারভোগ ইউনিয়নের পদ্মা সেতু পুনর্বাসন কেন্দ্রের অস্থায়ী হেলিপ্যাডে অবতরণ করেন। অর্থমন্ত্রী ও পরিকল্পনামন্ত্রীসহ এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন। সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের এখানে অবতরণ করার কথা থাকলেও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে পৌনে ১২টায় অবতরণ করেন। আবাসন পলস্নীর অস্থায়ী হেলিপ্যাডে অবতরণের পর বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. এনগোজি ওকোনজো ইয়েলাকে প্রথমে অভ্যর্থনা জানান স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ অধ্যাপিকা সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি।

পুনর্বাসন প্রকল্প পরিদর্শন ও ক্ষতি গ্রসত্মদের সঙ্গে মতবিনিময় কপ্টার অবতরণের কিছু পরেই বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পুনর্বাসন প্রকল্প পরিদর্শন করেন। মানচিত্রের মাধ্যমে সংশিস্নষ্টরা এই প্রকল্পের খুঁটিনাটি উপস্থাপন করেন। এর পর তিনি সেতু নির্মাণের কারণে ক্ষতিগ্রসত্ম লোকজনের সঙ্গে মতবিনিময়ে অংশ নেন। এই সময় ড. এনগোজি ওকোনজো ইয়েলা স্বাগত ভাষণে বলেন, এই সেতু বাংলাদেশ সরকারের স্বপ্ন এই স্বপ্ন বাসত্মবায়নে এই অঞ্চলের মানুষ উন্নত জীবনযাপন করবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা। এই সেতুর কারণে বাসস্থান পরিবর্তন করতে হচ্ছে, এতে তাদের সমস্যা হচ্ছে। আমরা তাদের সাহায্য করছি। যাতে তারা বাসস্থানের নিশ্চয়তা পায়। আমাদের অনুরোধ এই পুনর্বাসনের জমি অন্য কাউকে দেবেন না। নিজেরাই ব্যবহার করবেন।

এই মতবিনিময়ে কুমারভোগের ক্ষতিগ্রসত্ম রীনা বেগম বলেন, ‘পদ্মা সেতুর জন্য আমার যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তার চেয়ে অনেকগুণ বেশি ক্ষতিপূরণ আমি পেয়েছি। দক্ষিন মেদিনী ম-লের আবুল হোসেন বলেন, এ সেতু আমাদের এ এলাকার ওপর দিয়ে হওয়ায় আমরা গর্ববোধ করছি। ক্ষতির তুলনায় টাকা বেশিই পেয়েছি।

ক্ষতিগ্রসত্ম হামিদা বানু বলেন, ‘টাকা পেতে কোন অসুবিধা হয়নি। যা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সে তুলনায় অনেকগুণ বেশিই ক্ষতিপূরণ পেয়েছি।’ পদ্মা সেতু এ অঞ্চলে হওয়াতে ক্ষতিগ্রসত্মরা ক্ষতির সম্মুখীন হলেও যথাযথ ক্ষতিপূরণ পাওয়ায় সনত্মোষ প্রকাশ করেন।

এ সময় বিশ্বব্যাংকের এমডি তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, যথাযথ ক্ষতিপূরণ পাওয়ায় আমি খুশি হয়েছি। কিন্তু কোন প্রকার দুর্নীতির আশ্রয় নিলে বিশ্বব্যাংক এ সেতু আর্থিক সহযোগিতা থেকে পিছিয়ে আসবে। এ সময় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত কোন প্রকার দুর্নীতি ছাড়া এ সেতুর কাজ সম্পন্ন করার আশ্বাস দেন।

জনকন্ঠ – 29-04-2011
————————-

[ad#bottom]