উপজেলা ব্যবস্থায় দ্বৈতনীতি

অলিউর রহমান ফিরোজ
উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলনে নামছে তাদের দাবি-দাওয়া আদায়ের লক্ষ্যে। তারা তাদের হারানো মর্যাদা পুনরায় ফিরে পেতে ১০ দফা দাবি আদায়ের কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা সমস্যা এখন বিস্ফোরণমুখী হয়ে দেখা দিয়েছে। এরশাদ আমলে প্রবর্তিত উপজেলা পরিষদের অবকাঠামো বিভিন্ন সময় তার নীতিমালায় রাজনৈতিক দলগুলোর হস্তক্ষেপের কারণে তা এখন অচলাবস্থায় পর্যবসিত হয়েছে। উপজেলা প্রথায় এখন ত্রিমুখী সমস্যাসঙ্কুুল হয়ে দাঁড়িয়েছে । সংসদ সদস্য, চেয়ারম্যান এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম দ্বন্দ্ব। সবচেয়ে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে একই উপজেলায় একদল থেকে সংসদ সদস্য এবং অপর দল থেকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে। তারা কেউ কারো উপস্থিতি মেনে নিতে না পারার কারণেই উপজেলা পরিষদ কার্যত ধীরে ধীরে তার কার্যকারিতা অসার বলে প্রমাণিত হচ্ছে।

তৃতীয় উপজেলা নির্বাচন ২০০৯ সালের ২২ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ ১৮ বছর পর উপজেলা চালু হলেও কার্যত তা এখন অপরিণামদর্শিতার দিকে ধাবিত হচ্ছে। এরশাদ সরকারের আমলে প্রবর্তিত উপজেলা পরিষদ এবং বর্তমান সরকারের আমলের উপজেলা নির্বাচনে অনেক পার্থক্য অন্তর্নিহিত রয়েছে। এমনকি ১৯৯৮ সালের আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের নতুন যে অধ্যাদেশ জারি করেছিল তার মধ্যে বিস্তর ব্যবধান রয়েছে। আগে উপজেলা প্রথায় একজন চেয়ারম্যান থাকলেও তা নতুন ব্যবস্থায় দু’জন ভাইস চেয়ারম্যান অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের সঙ্গে একটি চেইন অব কমান্ডের আওতায় তাদের আনা হয়। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যাতে করে একটি টিম ওয়ার্কের মাধ্যমে কাজ করতে পারে। স্থানীয় সরকারের সব ধরনের উন্নয়নমূলক কাজ তাদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে প্রয়াস সৃষ্টি করা হয়। আগে উপজেলা ও জেলা কমিটিতে সংসদ সদস্যদের উপদেষ্টা হিসেবে রাখারও বিধান ছিল। নতুন আইনে তদের এ বিধিবিধানের বাইরে রাখা হয়। অতীতের সংসদ সদস্যদের ক্ষমতা তখন রহিত করা হয়। ত্রাণের বণ্টন নীতিতে সংশোধনী করা হয়। এতে করে সংসদ সদস্যরা তারা তাদের কিছু ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। এরশাদ আমলে উপজেলা প্রথা চালু হলে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে তা রহিত করে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে উপজেলা পদ্ধতি প্রবর্তিত করেন। কিন্তু তখন তারা সেই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করে যেতে পারেনি। এর পর ২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট সরকার গঠন করার পর উপজেলা নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ নিলেও তা কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর হস্তক্ষেপে নস্যাৎ হয়ে পড়ে। সর্বশেষ উপজেলা পদ্ধতি বিদায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার অগ্রগতির লক্ষ্যে সম্পূর্ণ কাজ সাধিত করেন। তখন নতুন অধ্যাদেশ অনুযায়ী চেয়ারম্যানরা ১১টি মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন কর্মকা-ের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার নিয়ম চালু হয়। এর মধ্যে স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষির মতো বড় মন্ত্রণালয় তাদের কাজ করার পরিধি সমপ্রসারণ করা হয়। তাছাড়া জলমহাল ইজারা, ফেরিঘাট, সিনেমা হল, যাত্রা, নাটক ও মেলা প্রদর্শনীর জন্য করারোপ করা এবং লাইসেন্স ও পারমিটের ওপর ধার্যকৃত ফি তারা আদায় করতে পারারও বিধান রাখা হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কমিটিতে তাদের সম্পৃক্ততা এতে অন্তর্ভুক্তকরণের বিষয়টি ছিল।

দীর্ঘ ১৮ বছর পর উপজেলা প্রথায় গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে সুশাসনের ভিত মজবুত ও দৃঢ় করতে ইতিবাচক পদক্ষেপ সৃষ্টি, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ প্রক্রিয়া, স্থানীয় নেতৃত্বে সুসংহত ও বিকশিত করা, স্থানীয় উন্নয়ন কর্মকা-ে জনগণের অংশগ্রহণের পথ সুগম, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের গুণগত মান ও গ্রহণযোগ্যতা ব্যাপক পরিসর, উপজেলা প্রবর্তিত ব্যবস্থায় গণতন্ত্রের চর্চায় অগ্রগতিতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার কার্যক্রমে গতিশীলতা আনাই ছিল সময়োপযোগী পদক্ষেপ।

তাছাড়া আমাদের জাতীয় সংবিধানের ৫৯ এবং ৬০ ধারায় স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার কার্যক্রম ও ক্ষমতাকে বিস্তৃত করার ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। ৫৯(১) বিধিতে আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক এককাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হবে। ৬০ বিধিতে-সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদের বিধানাবলী পূর্ণ কার্যকরদাতাদানের উদ্দেশ্যে সংসদ আইনের দ্বারা ওই অনুচ্ছেদে উল্লেখিত স্থানীয় শাসন-সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্থানীয় প্রয়োজনে কর আরোপ করার ক্ষমতাসহ বাজেট প্রস্তুতকরণ ও নিজস্ব তহবিল রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষমতা প্রদান করবেন। অন্যদিকে সংবিধানের ৯ও ১২ ধারায় নারী ও পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের সুযোগ এবং স্থানীয় সরকারের স্তর বিন্যাসের উল্লেখ রয়েছে। সংবিধানের ৯ বিধিতে-রাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা সমন্বয়ে গঠিত স্থানীয় সরকার শাসন সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসাহদান করবেন এবং এইসব প্রতিষ্ঠানগুলো কৃষক, শ্রমিক এবং মহিলাদিগকে যথাসম্ভব বিশেষ প্রতিনিধিত্ব দেয়া হবে। বিধি ১২ অনুসারে সংবিধান (দ্বাদশ সংশোধনী) আইন, ১৯৯১ এর ২ ধারাবলে এবং প্রশাসনের সব পর্যায় নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে। আর এ ধারাগুলো এ দেশে একটি শক্তিশালী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার আইনগত ভিত্তি তৈরি করেছে।

সংবিধান অনুযায়ী স্থানীয় সরকার গঠন করার কার্যক্রম পরিচালনা করার সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে জাতীয় উন্নয়নে অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হতো। কিন্তু রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি থাকায় সংবিধানের আলোকে পরিচালিত না হতে পেরে এখন তা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা রাজনৈতিক দলগুলো গ্রহণ না করে তাকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। স্থানীয় সরকার শক্তিশালী হলে ক্ষমতা খর্ব হবে এ ধরনের আশঙ্কা থেকে রাজনৈতিক দল ও আমলারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে স্থানীয় সরকারের বিপক্ষে কাজ করছেন।

সরকারের আমলারা স্থানীয় পর্যায় নির্বাচিত নেতাদের আওতাধীন কাজ করার মানসিকতাই তাদের মধ্যে এখন পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি। ফলে আমলাদের দাম্ভিকতার কাছে সরকারকে হার মানতে হয়। এরশাদ আমলে উপজেলা প্রথা প্রবর্তন করে গ্রামীণ জনপদের খুব কাছে সরকারেকে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আর প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ প্রক্রিয়াও ছিল মাইলফলক। উপজেলা প্রথা প্রবর্তন করে তার আওতায় সারাদেশে বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ শুরু হয়েছিল। এসব অবকাঠামো কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে গতি সঞ্চার ঘটে। এর ফলে মানুষের শহরমুখি হওয়ার প্রবণতা কমে আসে। এ ধারা অব্যাহত রাখা গেলে আমরা অনেক পথ এগিয়ে যেতে পারতাম। মূলত পাঁচটি কারণে উপজেলা প্রথা হোঁচট খায়। বৃহত্তর রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিরোধ, দলমত নির্বিশেষে সংসদ সদস্যদের বৈরী ভাবাপন্ন মনোভাব, আমলাতন্ত্রের অসহযোগিতা, উপজেলা ব্যবস্থায় কিছু কাঠামোগত ত্রুটি। উপজেলা প্রথা সরকারের প্রয়োজন ছিল প্রত্যাশিতভাবে। কিন্তু তখনকার সরকার যে অজুহাতে উপজেলা পদ্ধতি বাতিল করেছিল তা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল ছাড়া আর কিছুই নয়। সংসদ সদস্যদের সঙ্গে মূলত চেয়ারম্যানদের দ্বন্দ্ব হচ্ছে ক্ষমতার বণ্টন, প্রয়োগ আর রাজনৈতিক আধিপত্য নিয়ে। জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে একজন সদস্যের দায়িত্ব হচ্ছে- আইন প্রণয়ন ও তা বিশ্লেণ। অন্যদিকে স্থানীয় উন্নয়নসহ সব কর্মকা- দেখভাল করার দায়িত্ব পালন স্থানীয় প্রতিনিধিদের করার কথা। যারা দেশের আইন প্রণয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন তাদের এখানে নিষপ্রয়োজন। নির্বাচনের আগে সংসদ সদস্যরা জনগণকে নির্বাচিত হয়ে তাদের স্কুল, কলেজ ও রাস্তাঘাট এবং অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নের যে প্রতিশ্রুতি দেয় তাও তাদের বিবেচ্য বিষয় হতে পারে না এবং সাংবিধানিক দায়িত্বের মধ্যে তা বর্তায় না। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা অকার্যকর থাকায় সংসদ সদস্যরা স্থানীয় সরকারের শূন্যস্থান পূরণ করেছেন মাত্র। যা এখন স্থানীয় প্রতিনিধিদের চরম সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। নতুন আইনের মাধ্যমে সংসদ সদস্যরা উপজেলা পরিষদে তাদের দপ্তর ব্যবস্থা করা হয়। এর ফলে এ ব্যবস্থায় একটা দ্বৈতনীতির অপপ্রয়াস সৃষ্টি হয়েছে এবং তারা ব্যক্তি দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছেন। নতুন আইনে চেয়ারম্যানদের প্রচুর ক্ষমতা দেয়া হলেও তা দ্বৈতশাসন ব্যবস্থার কারণে তা গৌন হয়ে পড়েছে। জনমানুষের দীর্ঘদিনের দাবি একটি স্থায়ী ও স্বাধীন সরকার কমিশনের। এ দাবির উদ্দেশ্য স্থানীয় সরকারগুলোকে কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক বলয় থেকে মুক্ত রাখার ব্যবস্থা। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক সরকারই তা আমলে নেননি। শেষ পর্যন্ত সেনাসমর্থিত সরকার অধ্যাদেশের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার কমিশন প্রতিষ্ঠিত করেন। কিন্তু অধ্যাদেশে কমিশনকে যে কার্যবলি, কর্মপরিধি ও দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তাতে অনেকে হতাশ হয়েছেন। কমিশন মূলত স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে মাত্র পরামর্শদাতার ভূমিকায় রাখা হয়েছে। কমিশনের কাজ হবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করা। ফলে এ কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য অন্তরালেই থেকে গেছে। বাস্তবতার নিরিখে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংশোধন এনে কমিশনকে কার্যকর ও গতিশীল করা। প্রথম স্থানীয় সরকার কার্যক্রম মন্ত্রণালয়ের কঠোর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বাইরে নিয়ে এসে স্থানীয় কমিশনের অধীনের আওতায় সরকার সংক্রান্ত নীতিমালা, দিকনির্দেশনা, মনিটরিং, নিয়ন্ত্রণ প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র প্রণয়নসহ সব কাজ স্থানীয় সরকারের ওপর ন্যস্ত করার মতো সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেয়া এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। সরকার উপজেলা ব্যবস্থায় চেয়ারম্যান এবং ভাইস চেয়ারম্যানদের ন্যায়সঙ্গত দাবি-দাওয়ার ব্যাপারে বলিষ্ঠ ভূমিকা গ্রহণ করবেন দেশের মানুষ এটাই সরকারের কাছে প্রত্যাশা করেন।

অলিউর রহমান ফিরোজ: কলাম লেখক।