ফখরুদ্দীন ক্ষুব্ধ

সংসদীয় কমিটির ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদ। সংসদীয় কমিটির কাছে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে সৃষ্ট সহিংসতার ঘটনায় সশরীরে উপস্থিত হয়ে সাক্ষ্য চেয়ে চিঠি পাঠানোয় তিনি কমিটির ওপর অসন্তুষ্ট। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভীর মাধ্যমে তিনি শিক্ষামন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সভাপতি রাশেদ খান মেননের কাছে তার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার কথা জানান। গতকাল কমিটি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা এ তথ্য জানান। এ বিষয়ে রাশেদ খান মেননের কাছে জানতে চাইলে তিনি কোন মন্তব্য করেননি।

এদিকে সাবেক এ প্রধান উপদেষ্টা শনিবার রাতে ভগ্নিপতির মাধ্যমে অনানুষ্ঠানিকভাবে একটি চিঠি রাশেদ খান মেননের বাসায় পৌঁছে দেন। গতকাল শিক্ষামন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কার্যালয়ে এ চিঠি নথিভুক্ত হয়। গত ১২ই এপ্রিল তিনি চিঠিটি লেখেন। ওই চিঠিতে সাবেক উপদেষ্টা ঢাবি’র ঘটনার বর্ণনা দেন। এদিকে ওই ঘটনায় গঠিত সংসদীয় উপ-কমিটির আজকের বৈঠকে হাজির হচ্ছেন না ড. ফখরুদ্দীন আহমদ। তবে চিঠিতে উপকমিটির বৈঠকে হাজির হতে না পারার কোন কারণ উল্লেখ করা হয়নি। এর আগে শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদ সংসদীয় তদন্ত কমিটির বৈঠকে উপস্থিত হতে অপারগতা প্রকাশ করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের পাম বিচ থেকে সংসদীয় কমিটির কাছে পাঠানো চিঠিতে তিনি কিডনি ও হূদরোগের আক্রান্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করে বলেন, অসুস্থতার কারণে দীর্ঘ পথ যাত্রা করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই ঘটনা অধিকতর তদন্তের জন্য গত বছরের ১৯শে আগস্ট শিক্ষামন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি রাশেদ খান মেননকে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের এ উপ-কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অপর সদস্য হচ্ছেন- শাহ আলম, মির্জা আজম ও বীরেন শিকদার। এর আগে গত ২৭শে ফেব্রুয়ারি কমিটির চতুর্থ বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা ও সাবেক সেনাপ্রধানকে ডাকার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পরে ওই ঘটনার সাক্ষ্য চেয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদের হাতে সংসদীয় কমিটির চিঠি পৌঁছানো হয়। ওয়াশিংটনের বাংলাদেশ দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি এম জে এইচ জাভেদ চিঠি পৌঁছে দেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের ১০৮৮, ব্রিক ইয়ার্ডপোটোম্যাক শহরে অবস্থান করছেন। এ সময় ফখরুদ্দীন আহমদ চিঠিটি হাতে নিলেও আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করতে রাজি হননি। এ কারণে পরবর্তী সময়ে দূতাবাসের পক্ষ থেকে তার ই-মেইলেও ওই চিঠি পাঠানো হয়।

প্রধান উপদেষ্টার চিঠিতে যা আছে
ইংরেজিতে লেখা এক পৃষ্ঠার চিঠিতে ড. ফখরুদ্দীন আহমদ বলেন, ২০০৭ সালের ২১শে আগস্ট বিকালে আমি জানতে পারি, আগের দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে ছাত্র ও এক সেনা সদস্যদের মধ্যে সৃষ্ট সংঘাতের কথা। উত্তেজিত ছাত্ররা বিক্ষোভ করে এবং সংঘর্ষে কয়েক ছাত্র ও পুলিশ আহত হয়। এতদসত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ রাতব্যাপী সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নেয়ার অব্যাহত চেষ্টা করেছে। পরদিন ২২শে আগস্ট সকালে আমি অন্যান্য উপদেষ্টা, সেনা প্রধান, ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করি। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, যত দ্রুত সম্ভব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করে নেয়া হবে। জনগণকে জানানোর জন্য এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি জারির নির্দেশ দিই আমি। আরও সিদ্ধান্ত হয় যে, ঘটনা তদন্তে বিচারবিভাগীয় তদন্ত করার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হবে। পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা বিক্ষোভ মিছিল করে এবং গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। সে সময় জানমালের নিরাপত্তা বিধানের জন্য সকাল-সন্ধ্যা কার্ফ্যু জারির নির্দেশ দিই। নাগরিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সাময়িকভাবে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়। চিঠিতে ফখরুদ্দীন আহমদ বলেন, পুরো বিষয়টিকে সে সময় সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারে প্রধান হিসাবে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে আমি জনগণকে জানাই যে, ঘটনা তদন্তে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জনগণকে পুরো বিষয়টি অবহিত করার জন্য ওই তদন্ত প্রতিবেদন গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়- যাতে তা জনগণের সম্পত্তি হতে পারে এবং যে কেউ ইচ্ছা করলেই তা দেখতে পারে। চিঠিতে তিনি ঘটনা আরও ভালভাবে জানতে উপকমিটিকে বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনটি দেখে নেয়ার পরামর্শ দেন।

কমিটি সূত্র জানিয়েছে, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শীর্ষ দুই ব্যক্তির লিখিত জবাব গ্রহণ করা হবে কিনা তা আজ সোমবারের বৈঠকে চূড়ান্ত করা হবে। বৈঠকে এমন সিদ্ধান্তও আসতে পারে যে, তারা দু’জন বিদেশে অবস্থানের কারণে একান্তই হাজির হতে না পারলেও চিঠি দু’টি নোটারি পাবলিক করে কমিটিতে জমা দিতে বলা হবে। তা না হলে এভাবে ব্যক্তিগত চিঠি সাক্ষ্য হিসাবে আমলে নেয়া না-ও হতে পারে। এছাড়া কমিটিতে তাদের সাক্ষ্য দেয়ার বিষয়টিকে গ্রহণযোগ্য করতে অন্যান্য বিকল্প উপায় নিয়েও আলোচনা হবে। এদিকে প্রাথমিকভাবে ড. ফখরুদ্দীন আহমদ ও সাবেক সেনাপ্রধান বিরুদ্ধে সংসদ অবমাননার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের পাঠানো চিঠি ও অনানুষ্ঠানিক বক্তব্য দেয়ার প্রস্তাব নাকচ করে আবারও সংসদীয় কমিটিতে তলব করা হবে। কমিটির সদস্য মাগুরা থেকে নির্বাচিত এমপি বীরেন শিকদার মানবজমিনকে এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে এসব পদক্ষেপ চূড়ান্ত করা হয়েছে। সোমবারের বৈঠকে এ নিয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হবে।

কাজী সোহাগ

[ad#bottom]