মুজিবনগরে সেদিন

মাহবুব উদ্দিন আহমদ, বীরবিক্রম
আজ ১৭ এপ্রিল, ২০১১। আজ থেকে ৪০ বছর আগে আমার জীবনে এমনই একটি দিন এসেছিল, যা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। বাঙালী জাতির জন্য একটা নতুন দিনের সূচনালগ্ন। সেদিন বাঙালী জাতির ভাগ্যাকাশে স্বাধীনতার সূর্য নতুন করে উদিত হয়েছিল। এই দিনেই বর্তমান মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে গঠিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার। ঐতিহাসিক দিক থেকে দিনটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।

বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডের আপামর জনতার একতার প্রতীক ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাসের নির্বাচনে বাংলার সাড়ে সাত কোটি বাঙালী তাঁকে ব্যালট বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে ম্যান্ডেট দিয়েছিল। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশের রাজনীতির ঐতিহ্যবাহী দল আওয়ামী লীগ পেয়েছিল বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা। ফলশ্রুতিতে একমাত্র তাঁরই এই দেশের রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণের কথা ছিল। কিন্তু তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তাঁকে রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে দিতে চাইলেন না। এর পর শুরু হলো নানা ষড়যন্ত্র। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পহেলা মার্চ, ১৯৭১ থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রযন্ত্র অকার্যকর হয়ে পড়ে। এর পর সব কিছু চলতে শুরু করে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে। তিনিই ছিলেন এ দেশের অধিকর্তা, নায়ক এবং সকল ক্ষমতার উৎস। সেই থেকে ৭ মার্চ। আজকের সোহরাওর্য়াদী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু দিলেন সেই কালজয়ী ভাষণটি। সেই ময়দানে দাঁড়িয়ে ১০ লক্ষাধিক জনতার সামনে তিনি বললেন, ”এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” তিনি উদাত্তকণ্ঠে সবাইকে আহ্বান জানালেন, ”যার হাতে যা কিছু আছে তাই নিয়ে রুখে দাঁড়াও। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। পাকিসত্মানীদের আমরা ভাতে মারব, পানিতে মারব।” বঙ্গবন্ধুর এই আহ্বানকে সেদিন বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষ অন্তরের মর্মস্থলে ধারণ করেছিল। শুধুই ধারণই নয়, সেই কথাকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিল। এর পরের ১৮ দিন পাকিস্তানী বর্বর বাহিনী আমাদের সাধারণ জনগণের ওপর চালাতে লাগল নির্যাতনের স্টিমরোলার। তারা চেয়েছিল নির্যাতনের মধ্য দিয়ে জনগণের ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলনকে দমিয়ে দিতে। কিন্তু তারা তা পারেনি। তারপর আমাদের জাতীয় জীবনে নেমে এলো সেই কালরাত্রি। ২৫ মার্চ। ২৫ মার্চে রাতের অন্ধকারে হায়েনার দল ঝাঁপিয়ে পড়ল নিরীহ-নিরস্ত্র বাঙালীর ওপর। সেই রাতে তারা হত্যা করল লাখ লাখ নিরপরাধ মানুষকে। চালাল লুণ্ঠন, অগি্নসংযোগ, ধর্ষণের মতো জঘন্যতম অপরাধ। কামান, বন্দুক আর ট্যাঙ্কের গোলায় তারা চেয়েছিল রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ইপিআর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পুরো ঢাকা গুঁড়িয়ে দিতে। কিন্তু বাংলার মানুষ তাদের এই বর্বর নির্যাতন রুখে দিয়েছিল। সেদিন পুলিশ লাইনের ওয়ারলেস ট্যাঙ্কের গোলা উপেক্ষা করে প্রচার করেছিল, ”পাকিস্তানীরা আমাদের আক্রমণ করেছে যে যেখানে আছো, তাদের রম্নখে দাঁড়াও। আমরা তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছি।” এই কথাটা যখন বেতার তরঙ্গের মাধ্যমে সকল জেলায়, থানায় পৌঁছে গেলো তখন মানুষ পুলিশ বাহিনীকে তাদের বন্ধু মেনে নিয়ে নির্ভয়ে পাকিসত্মানীদের বিরুদ্ধে মরণপণ লড়াই শুরু করে দেয়। এভাবেই ২৫ মার্চ রাত থেকে বাংলার প্রতিটি গ্রামে-গঞ্জে, শহর-বন্দরে, বাজারে-ঘাটে শুরম্ন হলো লড়াই-প্রতিরোধ।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত থেকে বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্ট থেকে শত্রু সেনারা বেরিয়ে বিভিন্ন জায়গা দখল শুরম্ন করল। এ তালিকায় কুষ্টিয়া শহরও ছিল। কুষ্টিয়া শহরকে দখল করার জন্য যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে পাক সেনাবাহিনী ২৭ নম্বর (এসএ্যান্ডটি) ব্যাটালিয়নকে পাঠাল। সে দিন তারা ঝিনাইদহ শহরের বুকের ওপর দিয়ে রাতের অন্ধকারে বস্ন্যাকআউট উপেক্ষা করে কুষ্টিয়া চলে যায়। কিন্তু এরপর আর তারা এগুতে পারেনি। তাদের জন্য দক্ষিণ-পশ্চিম রণাঙ্গন অথর্াৎ কুষ্টিয়া, যশোর, ঝিনাইদহ, ফরিদপুর, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, নড়াইল, রাজবাড়ী, মাদারীপুর জেলায় ঢোকা আর সম্ভব হয়নি এপ্রিল মাঝামাঝি অবধি। এর পর তাদের সকল শক্তি সনি্নবেশিত করে মুক্তিবাহিনীর করতলগত দৰিণ-পশ্চিম রণাঙ্গন পুনর্দখলে। ২৫ মার্চ রাত থেকে দেশের আপামর মানুষ তাদের চলাচলের সকল পথ বন্ধ করে দিয়েছিল। রাতদিন আহার-নিদ্রা ভুলে এলাকার জনসাধারণ সমসত্ম জায়গায় বড় বড় বৃক্ষ কেটে রাসত্মায় ফেলে রাখল। অনেক জায়গায় রাসত্মাও কেটে ফেলা হলো। ফলে পাক বাহিনীর জন্য সৃষ্টি হয় প্রতিবন্ধকতা। মুক্তিবাহিনী ঝিনাইদহ জেলার চারদিকের সমস্ত রাস্তা পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছিল। ফলে পাক বাহিনীর পক্ষে হঠাৎ করে ঝিনাইদহ জেলায় আক্রমণ করা সম্ভব ছিল না। এই অবস্থায় আমরা তখন এই অঞ্চলকে পুরোপুরি শত্রম্নমুক্ত ঘোষণা করলাম। সেই সময় আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের অন্যতম দুই প্রধান পুরম্নষ_ তাজউদ্দিন আহমেদ ও ব্যারিস্টার আমিরম্নল ইসলাম ২৯ মার্চ এই অঞ্চল দিয়ে মুক্তিবাহিনীর সাহায্যে ভারতে চলে যান। তাঁদের আমরা ঝিনাইদহ-চুয়াডাঙ্গার ওপর দিয়ে ভারত সীমানত্মে পেঁৗছে দেই। ভারতীয় বিএসএফ-এর কর্নেল চক্রবর্তী এবং পশ্চিম বাংলার তৎকালীন বিএসএফ প্রধান গোলক মজুমদার তাঁদের গার্ড অব অনার দিয়ে গ্রহণ করেন এবং মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেন। ওই সময় তাঁরা সরকার গঠনের ব্যাপারে পারস্পরিক আলাপ-আলোচনা করেন। তাঁরা প্রথমে ১৫ এপ্রিল চুয়াডাঙ্গা জেলায় স্বাধীন বাংলাদেশের স্বাধীন মাটিতে সরকার গঠন করার কথা চিনত্মা করেছিলেন। সে দিন আমার সঙ্গে ছিল আমার বন্ধু তৌফিক ইলাহী চৌধুরী (বর্তমানে সরকারের প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা)। তৌফিক ইলাহী চৌধুরী এমনই এক ব্যক্তিত্ব, যিনি ২৫ মার্চ রাত থেকে নিজেই মেহেরপুর অঞ্চলে মাইকিং করে জনগণকে জানিয়ে দিয়েছিলেন, পাকিসত্মানী সেনাবাহিনী আমাদের আক্রমণ করেছে, লড়াই করা ছাড়া আমাদের কোন উপায় নেই। আপনারা সবাই আমাদের সঙ্গে যোগদান করম্নন। শুধু তাই নয়, তিনি নিজের হাতে ভারতীয় জনগণের উদ্দেশে একটি চিঠি লিখেছিলেন। ”পাকিসত্মানীরা আমাদের আক্রমণ করেছে। আপনারা আমাদের সাহায্য করম্নন।” সেই চিঠি ভারতের বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় ফলাও করে প্রচার হয়েছিল। এতে ভারতবাসী জেনে যায়, বাংলাদেশীরা পাকিসত্মানীদের বিরম্নদ্ধে লড়াই শুরম্ন করেছে।

১৬ তারিখে আমরা ভারতীয় সীমানত্ম বেতাইয়ে পেঁৗছি। ১৭ তারিখ সকালবেলা তৌফিক আমাকে বললেন, এখনই আমাদের বৈদ্যনাথতলায় যেতে হবে। কারণ সেখানে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠন করা হবে। আমি আর তৌফিক মিলে জীপ গাড়িতে বৈদ্যনাথতলায় যাই। পথে আমাদের পাড়ি দিতে হয় নানা চড়াই-উতরাই। সকাল সাড়ে নয় থেকে দশটার মধ্যে আমরা পেঁৗছে যাই বৈদ্যনাথতলায়। বৈদ্যনাথতলায় পেঁৗছার পর সেখানে দেখতে পাই ছোট্ট একটি মঞ্চ। যার উপর কয়েকটি ভাঙ্গা চেয়ার ও একটি টেবিল। মঞ্চের এক কোণায় একটা বাঁশের দ-। মঞ্চের আশপাশে অনেক মানুষ। তখন সেখানে সাদা পোশাক পরিহিত কিছু সৈনিক ছিল যারা ছিল ভারতীয় কমান্ডো বাহিনীর সদস্য। যে কোন ধরনের বিপজ্জনক পরিস্থিতি এড়াতেই তারা সেখানে অবস্থান করছিল। তখন সেখানে ভাঙ্গা হারমোনিয়ামে চলছিল জাতীয় সঙ্গীতের রিহার্সেল, যা পাশের একটি চার্চ থেকে আনা হয়েছিল। এ অবস্থায় বেলা ১১ টার দিকে আমাদের জাতীয় নেতারা গাড়িবহর নিয়ে কলকাতা থেকে বৈদ্যনাথতলায় উপস্থিত হলেন। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন দেশী-বিদেশী অনেক সাংবাদিক। এরপর তাঁরা ধীর পায়ে মঞ্চে উঠলেন। মঞ্চে থেকে ঘোষণা দেয়া হলো, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরম্নল ইসলাম উপরাষ্ট্রপতি, তাজউদ্দিন আহমেদ প্রধানমন্ত্রী, এম কামরম্নজ্জামান স্বরাষ্ট্র ও ত্রাণমন্ত্রী, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী অর্থমন্ত্রী এবং কর্নেল আতাউল গণি ওসমানী প্রধান সেনাপতি। এঁদের মধ্যে আরও একজন ছিলেন, যার কথা আমি বলতে চাই না। আপনারা বুঝে নিন। এই কুলাঙ্গারের কথা মুখে আনতে আমার ঘৃণা হয়। এই অনুষ্ঠান পরিচালনা করছিলেন আব্দুল মান্নান। পরিচয় পর্বের পর শপথ ও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করালেন প্রয়াত ইউসুফ আলী। এর পর আমার জীবনে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। যে ক্ষণে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকারকে আমার নেতৃত্বে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। গার্ড অব অনার দেয়ার কথা ছিল ইপিআরের সেক্টর কমান্ডার মেজর আবু ওসমান চৌধুরীর। অজ্ঞাত কারণে তিনি সেখানে উপস্থিত হতে পারেননি। এরই মাঝে এক ফাঁকে বন্ধু তৌফিক এসে বলল, ”ওসমান ভাই আসার কথা ছিল উনি তো এলেন না, এখন গার্ড অব অনার কী করে দেয়া যায় চিনত্মা কর।” আমি তাকে বললাম, তুমি কোন চিনত্মা করো না, আমি একজন পুলিশ অফিসার, জীবনে বহুবার গার্ড অব অনার নিয়েছি গার্ড অর্ব অনার দিয়েছি। আমি এখনই ব্যবস্থা করছি। আমার গাড়িতে যে তিন-চার পুলিশ কনস্টেবল ছিল তাদের এবং আশপাশের কয়েক আনসারকে ডেকে একত্রিত করে পাঁচ-সাত মিনিট প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের প্রস্তুত করলাম। ব্যাপারটি তৌফিককে জানালে তিনি উপরাষ্ট্রপতি তথা ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরম্নল ইসলামকে মঞ্চের সামনে দাঁড়াতে অনুরোধ করেন। তিনি ছিলেন মঞ্চের উপরে। তাঁর পেছনে ছিলেন সরকারের প্রধান সেনাপতি ওসমানী সাহেব। মঞ্চের বাঁ দিকে মাটিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন তাজউদ্দিন সাহেব। এ অবস্থায় আমার নেতৃত্বে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতিকে সামরিক কায়দায় গার্ড অব অনার প্রদান করলাম। এক সময় প্রেজেন্স আর্মস করে সৈনিকরা যখন তাদের রাইফেল উর্ধমুখী করে দাঁড়াল তখন আমি হাত তুলে তাঁকে স্যালুট দিলাম। তিনি স্যালুট গ্রহণ করলেন। এ অবস্থায় ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ গানটি বেজে উঠল। এর পরই মঞ্চের পাশে যে বাঁশ লাগানো হয়েছিল সেই বাঁশে পতাকা উত্তোলন করেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি। পতাকাটা যখন বাতাসে পতপত করে উড়ছিল তখন আমাদের মন ছিল আনন্দে উদ্ভাসিত। পতাকা উত্তোলন শেষে তাঁকে আবার সালাম জানিয়ে প্যারেড করে তাঁর কাছে গিয়ে বললাম_ স্যার, আমাদের দল আপনার পরিদর্শনের অপেক্ষায়। উনি ধীর পদক্ষেপে মঞ্চ থেকে নেমে এলেন। এর পর তাঁকে সঙ্গে নিয়ে গার্ড অব অনার পরিদর্শন করালাম। এরপর তিনি আবার মঞ্চে চলে গেলেন। আমি আবার তাঁকে সালাম জানিয়ে বললাম, আমি এখন সৈনিকদের নিয়ে বেরিয়ে যেতে চাই]