ফখরুদ্দীন ও মইনের বিরুদ্ধে সংসদ অবমাননার সিদ্ধান্ত

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদ ও সাবেক সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদের বিরুদ্ধে সংসদ অবমাননার অবিযোগ আনা হবে। সংসদীয় কমিটির কাছে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে সৃষ্ট সহিংসতার ঘটনায় সশরীরে উপস্থিত হয়ে সাক্ষ্য দিতে না আসায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে তাদের পাঠানো চিঠি ও অনানুষ্ঠানিক বক্তব্য দেয়ার প্রস্তাব নাকচ করে আবারও সংসদীয় কমিটিতে তলব করা হবে। আগামীকাল এ নিয়ে গঠিত সংসদীয় কমিটির বৈঠক শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে তা ঘোষণা করা হবে।

কমিটির সদস্য মাগুরা থেকে নির্বাচিত এমপি বীরেন শিকদার গতকাল মানবজমিনকে এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে এসব পদক্ষেপ চূড়ান্ত করা হয়েছে। সোমবারের বৈঠকে এ নিয়ে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই ঘটনা অধিকতর তদন্তের জন্য গত বছরের ১৯শে আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি রাশেদ খান মেননকে আহ্বায়ক করে ৪ সদস্যের এ উপ-কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অপর সদস্য হচ্ছেন শাহ আলম, মির্জা আজম ও বীরেন শিকদার। এর আগে গত ২৭শে ফেব্রুয়ারি কমিটির চতুর্থ বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা ও সাবেক সেনাপ্রধানকে ডাকার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পরে ওই ঘটনার সাক্ষ্য চেয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমেদের হাতে সংসদীয় কমিটির চিঠি পৌঁছানো হয়। ওয়াশিংটনের বাংলাদেশ দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি এম জে এইচ জাভেদ চিঠি পৌঁছে দেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের ১০৮৮, ব্রিক ইয়ার্ডপোটোম্যাক শহরে অবস্থান করছেন।

এ সময় ফখরুদ্দীন আহমদ চিঠিটি হাতে নিলেও আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করতে রাজি হননি। এ কারণে পরে দূতাবাসের পক্ষ থেকে তার ইমেইলেও ওই চিঠি পাঠানো হয়। এর আগে সংসদীয় কমিটিতে সাক্ষ্য প্রদান সংক্রান্ত ওই চিঠি ফখরুদ্দীনের মুন্সীগঞ্জ ও ঢাকার ঠিকানায় পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয়। চিঠিটি পৌঁছানোর জন্য ওই দুই জেলার প্রশাসনের ওপর দায়িত্ব দিয়েছিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এরই প্রেক্ষিতে মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসন ফখরুদ্দীনের বাড়িতে কাউকে না পেয়ে ৭ জন সাক্ষীর সামনে বাড়ির দরজায় চিঠিটি ঝুলিয়ে দিয়ে আসেন। এদিকে, ঢাকা জেলা প্রশাসনও তার ঢাকার ঠিকানায় কাউকে পায়নি। এরই প্রেক্ষিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় তাকে সরাসরি চিঠি পৌঁছানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। এদিকে শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদ সংসদীয় তদন্ত কমিটির বৈঠকে উপস্থিত হতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের পাম বিচ থেকে সংসদীয় কমিটির কাছে পাঠানো চিঠিতে তিনি কিডনি ও হূদরোগে আক্রান্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করে বলেন, অসুস্থতার কারণে দীর্ঘ পথ যাত্রা করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। এর আগে কমিটির তদন্তের প্রথম পর্যায়ে গত বছরের ২৭শে অক্টোবর এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাক্ষ্য নেয়া হয়। তিন ঘণ্টাব্যাপী চলা বৈঠকে সাক্ষ্য দিতে আসেন সে সময়ে ছাত্রদের সঙ্গে আন্দোলনে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তারকৃত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস (বর্তমানে প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের মহাপরিচালক) ও অধ্যাপক মলয় কুমার ভৌমিক (বর্তমানে নাট্যকলা ও সংগীত বিভাগের চেয়ারম্যান)। এ ছাড়া ঘটনার বিষয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এস এম এ ফয়েজ, সাবেক প্রক্টর আ কা ফিরোজ এবং চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক এম শামসুল আলম। বৈঠকে শিক্ষকরা ওই ঘটনায় সেনাবাহিনীর সদস্যদের দায়ী করেন।

ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তারা বলেন, খেলা দেখাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ঘটনায় দেশব্যাপী এত তোলপাড় হতে পারে না। এতটা উত্তাল পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে না। ছাত্রদের বিরুদ্ধে সেদিন সেনাবাহিনী তাণ্ডব ঘটিয়েছিল। ছাত্রদের উত্তেজিত করা হয়েছিল। এর পেছনে উস্কানিদাতা ছিল কয়েক জন সামরিক কর্মকর্তা। দ্বিতীয় পর্যায়ে সাক্ষ্য নেয়া হয় সাবেক শিক্ষা উপদেষ্টা আইয়ুব কাদরী, সাবেক শিক্ষা সচিব মমতাজুল ইসলাম, সাবেক স্বরাষ্ট্র সচিব ও বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবদুল করিম, সাবেক পুলিশের মহাপরিদর্শক নূর মোহাম্মদসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। উল্লেখ্য, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৭ সালের ২০শে আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে খেলা দেখাকে কেন্দ্র করে ছাত্র ও সেনা সদস্যদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অপ্রীতিকর ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। ওই সহিংসতা ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ২২শে আগস্ট সন্ধ্যায় ৬ বিভাগীয় শহরে কারফিউ জারি করে। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় ৫৩টি মামলা করে। ওই ঘটনায় উস্কানি দেয়ার অভিযোগে ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গ্রেপ্তার করা হয়। নির্বিচারে আটক করে নির্যাতন করা হয় ছাত্রদের।

কাজী সোহাগ:

[ad#bottom]