পহেলা বৈশাখ ও একুশে ফেব্রুয়ারি

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
উভয়েই গুরুত্বপূর্ণ আমাদের জন্য, যেমন পহেলা বৈশাখ, তেমনি একুশে ফেব্রুয়ারি। তবে তফাত আছে। পহেলা বৈশাখই আগের; যখন একুশ ফেব্রুয়ারি ছিল না তখনো সে ছিল। তা ছাড়া পহেলা বৈশাখ হচ্ছে আনন্দের ও মিলনের; একুশে ফেব্রুয়ারিও মিলনের, এমনকি বিজয়েরও। তবু তার অন্তরে শোক আছে, স্মৃতি রয়েছে স্বজন হারানোর। বলা যেতে পারে যে পহেলা বৈশাখ হচ্ছে লক্ষ্য, আর একুশে ফেব্রুয়ারি সেই লক্ষ্যে পেঁৗছার পথ।

কিন্তু লক্ষ্যটা কি পহেলা বৈশাখের? লক্ষ্যটা কেবল যে অনুভব তা নয়, সে একটা আকাঙ্ক্ষাও বটে। আকাঙ্ক্ষার জন্যই সে তাৎপর্যপূর্ণ। পহেলা বৈশাখে নতুন একটি বছরের শুরু। আমরা চাই নতুন বছর পুরনো বছর থেকে ভিন্ন হবে; নতুন বছরে সুখ আসবে, উন্নতি দেখা দেবে। আমরা এগোতে পারব নতুন একটি সমাজের দিকে। সেখানে আনন্দ থাকবে, এক দিনের নয়। প্রতিদিনের। আর সেই সুখের অন্তরে থাকবে আত্মপরিচয়ের গৌরব ও আশ্রয় লাভের স্বস্তি এবং তা পূর্ণ হবে ঐক্যে। কেবল মিলন নয়। ঐক্যও। অন্য সব বাঙালির সঙ্গে স্থায়ীভাবে মিলব আমরা, ঐক্যবদ্ধ হব প্রকৃতি এবং পরিবেশের সঙ্গেও।

এইখানে, ওই যে মিলনের পথ সেখানে অনেক অন্তরায় রয়েছে। সেগুলো দূর করার জন্যই একুশে ফেব্রুয়ারি প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। সেই প্রয়োজন এখনো রয়েছে এবং থাকবে। বেশ কিছুকাল থাকবে বলেই মনে হয়। ঐক্যের অন্তরায় অস্পষ্ট থাকে, থাকতে ভালোবাসে, যাতে সে চিহ্নিত না হয়। নানা ধারণার বিভ্রম মাঝখানে এসে দাঁড়ায়; এনে দাঁড় করানোও হয়, যাতে অন্তরায়টি চিহ্নিত না হয়ে যায়। অপসারণ করতে হলে তো তাকে চিনতে হবে সর্বাগ্রে। না চিনলে সরাব কী করে? কে এই বিঘ্ন, ঐক্যের কে শত্রু? সে হচ্ছে কায়েমি স্বার্থ। এই স্বার্থে দেশি-বিদেশি শক্তি একসঙ্গে মেলে। মিলে বিদ্যমান ব্যবস্থাটাকে টিকিয়ে রাখে। অল্প মানুষের সুখকে নিশ্চিত করতে চায় অধিকাংশ মানুষের সুখের বিনিময়ে। অধিকাংশ মানুষ যদি তাদের শত্রুকে চিনে ফেলে, নিজেদের স্বার্থে যদি তারা ঐক্যবদ্ধ হয়, তবে অল্প কয়েকজনের স্বার্থ রক্ষাকারী কায়েমি ব্যবস্থাটা ভেঙে খান খান হয়ে যাবে। মানুষ মুক্ত হবে, মিলিত হবে। বাঙালি জীবনে দুই ধরনের বিভাজন হয়েছে। দুটিই অত্যন্ত প্রাচীন। একটি বিভেদ খাড়াখাড়ি, অপরটি আড়াআড়ি। খাড়াখাড়ি বিভেদটি সাম্প্রদায়িক, সেটি হিন্দু-মুসলমানের। আড়াআড়িটি অর্থনৈতিক, সেটি ধনী ও গরিবের।

পহেলা বৈশাখ এই দুই প্রাচীন বিভাজনেরই বিপক্ষে। সে অসাম্প্রদায়িক। তার মেলা হিন্দু মেলা নয়, যেমন সে মহররমের মেলাও নয়। তার মেলাটা বাঙালির। সেখানে ক্রয়-বিক্রয় অবশ্যই আছে। কিন্তু সেটা স্থানীয়, আন্তর্জাতিক নয়। বিদেশি পণ্য আসে যদি বা তবু নিতান্ত অল্প। এই মেলা মুক্তবাজার অর্থনীতির অন্তর্গত নয়। এর অঙ্গনে মেলামেশাটা বিপণিকেন্দ্রের মতো নৈর্ব্যক্তিক ও হৃদয়হীন হয় না। অন্যদিকে আবার পহেলা বৈশাখ ধনী-দরিদ্রকে এক সমান করতে চায়। ভাবে সবাইকে সে এক পরিচয়ে পরিচিত করবে। ভাষার পরিচয়।

সেটা তো গেল আকাঙ্ক্ষার পহেলা বৈশাখ। বলা যাবে স্বপ্নের। কিন্তু বাস্তবতাটা কী? বাস্তবে সুখ কোথায়? বাস্তবের পহেলা বৈশাখ তো গ্রীষ্মের। গ্রীষ্মকাল বাঙালির মিত্র নয়। কোনো কালে ছিল না, এখনো নয়। বাঙালির নিজস্ব ঋতু হলো বর্ষা। নরম ও গার্হস্থ্য। গাঁয়ের মতো। আর সবচেয়ে উপভোগ্য ঋতু যদি বলতে হয় কোনোটিকে, তবে সেটি হলো শীত। গ্রীষ্মের ঠিক বিপরীতে যার দাঁড়ানো। পহেলা বৈশাখ তো খরতাপের সূচনা। কোথাও কোনো করুণা নেই, আশ্রয় নেই, কেবল দাহ। দুঃসহ। আতঙ্কজনক। আর যদি কালবৈশাখী আসে তবে স্বস্তি না এনে ধ্বংসই আনে। তাহলে কেন আকাঙ্ক্ষায় পূর্ণ দিন বলব পহেলা বৈশাখকে। বলব একটি মাত্র কারণে, সে হলো নতুন বছরের সূচনা। এ আমাদের নিজেদের বছর। আত্মপরিচয়ের এবং আশ্রয়ের। এখানে আমরা স্বতন্ত্র, সারা পৃথিবী থেকে। আমরা আশা করি, নতুন বছর পুরনো বছরের মতো হবে, যা পৃথক হবে অগ্রগতিতে ও সুখে। এবং অবশ্যই আমাদের জাতীয়তাবাদী করবে।

করে কি? না, করে না। পহেলা বৈশাখে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মধ্যেই যা চাঞ্চল্য। অত্যন্ত ধনীরা তার ধার ধারে না। তারা নিউ ইয়ার ডে করে। ইয়ার বন্ধুবান্ধবীদের নিয়ে হুল্লোড়ে মাতে। পহেলা বৈশাখ কবে এল, কবে গেল খবর রাখে না। দরিদ্ররা রাখে খবর। তবে ভিন্নভাবে। আনন্দে নয়, আতঙ্কে। জমিদার গেছে, তবে পাওনাদার আছে। তারা সুদ চায়, পাওনা দাবি করে। খরা নামছে দেখে কৃষকের অন্তরাত্মা শুকিয়ে যায়, তৃষ্ণায়, ঘামে, ভয়ে। অভাব ঘটে পানীয়জলের। কঠিন হয় পরিশ্রম করা। গুমোট দেখা দেয় চতুর্দিকে। আশঙ্কা থাকে ঝড়ের। শহরেও সুখ নেই। গলতে থাকে রাস্তার পিচ। দুর্বিষহ হয় তাপ।

যে মধ্যবিত্ত আনন্দ করে পহেলা বৈশাখে, সেও ভরসা করে না দীর্ঘস্থায়ী স্বস্তির। দুপুরেই শেষ। বড় ক্ষণকালীন। আজকাল পেঁয়াজ, মরিচ, ইলিশ মাছ ভাজা দিয়ে পান্তাভাত খাওয়াও তেমন জমে না। ভেজাল জুটেছে। তা ছাড়া অনভ্যাসের দরুন একদিন খেয়ে ১০ দিন কাটাতে হয় হজমের অশান্তিতে।

তাহলে জরুরি কেন পহেলা বৈশাখ? জরুরি ওই শিক্ষিত মধ্যবিত্তের জন্যই। জরুরি আকাঙ্ক্ষার কারণে। আকাঙ্ক্ষা থাকে সুখের, সুখের প্রয়োজনে মিলনের, অতীতের সঙ্গে প্রকৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে, সর্বোপরি মানুষের সঙ্গে। বিচ্ছিন্নতা কাটাতে চায়, ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ইচ্ছা রাখে।

আর ওই যে একটা গন্তব্যে পেঁৗছার অভিপ্রায় তার প্রয়োজনেই একুশে ফেব্রুয়ারি এসেছে। বাঙালির জীবনে সাম্প্রদায়িক ও অর্থনৈতিক ভাগাভাগিটা অত্যন্ত গভীর এবং পুরনো বলেই নবীন একুশে ফেব্রুয়ারি এসেছে। একুশে ফেব্রুয়ারি একই সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও সামন্তবাদবিরোধী। কায়েমি স্বার্থকে সে অপসারণ করতে চায়। বাঙালি করতে চায় বাংলাদেশের সব বাঙালিকে। তার আদর্শ গণতান্ত্রিক, বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে অধিকার ও সুযোগের সাম্য স্থাপনে বিশ্বাসী। ভাষা কারো একার নয়, গোষ্ঠীর নয়, শ্রেণীর নয়, সম্প্রদায়ের নয়, ভাষা ভাষা ব্যবহারকারী সব মানুষের সম্পত্তি। সে যেমন ইহজাগতিক, তেমনি সমাজতান্ত্রিক। একুশে ফেব্রুয়ারি পহেলা বৈশাখের পরিপূরক নয়, পহেলা বৈশাখের ভেতর যে গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাটি রয়েছে একুশে ফেব্রুয়ারি তাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পথ। বাংলাদেশে গণতন্ত্র এখনো আসেনি, সমাজতন্ত্র অনেক দূরে। সে জন্য একুশে ফেব্রুয়ারি এখনো প্রয়োজনীয়। একুশে ফেব্রুয়ারির আন্দোলন ভিন্ন। পহেলা বৈশাখ যথার্থ অর্থে পহেলা বৈশাখ হবে কী করে? পহেলা বৈশাখ তো এখন একেবারেই খণ্ডিত, অল্প কয়েকজনের। সাধারণ মানুষের জীবন থেকে কেবল যে দূরে তা নয়। তাদের জন্য সে একটি আতঙ্কের কারণ বটে।

দুই.
কেবল মানুষের নয়, প্রকৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টাও উঠে আসে পহেলা বৈশাখে। বিশেষ করে এ জন্য যে আমাদের জীবন অনেক দিক দিয়েই প্রকৃতিনির্ভর এবং পহেলা বৈশাখ ঋতুর যে পরিক্রম ঘটে বাংলাদেশে তারই অংশ। কেবল অংশ নয়, প্রধান অংশ। কেননা ঠিক কবে আসবে প্রথম তারিখ সেটা যারা খেয়াল রাখে না, অথবা প্রয়োজন মনে করে না রাখার, তারাও বৈশাখ যে এসেছে সেটা টের পায়। বৈশাখ বড়ই প্রচণ্ড, ভীষণ উগ্র, সে হচ্ছে বাঘের মতো। বাংলাদেশ বাঘের জন্য বিখ্যাত ছিল, বাঘ এখন বিলুপ্তপ্রায়, কিন্তু বৈশাখ আছে, সে থাকবে এবং জানিয়ে দেবে যে সে আছে।

প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটা হওয়া উচিত দ্বান্দ্বিক। বৈরী নয়, অবৈরী দ্বন্দ্ব। প্রকৃতিকে জয় করেই মানুষের সভ্যতা এগোয়, সংস্কৃতি এগোয়। কিন্তু জয় করা মানে ধ্বংস করা নয়। এমনকি পদানত যদি করে রাখা হয় প্রকৃতিকে, যদি তাকে জব্দ করা হয় পদে পদে, তাহলে কেবল যে ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায় তা নয়, প্রকৃতি প্রতিশোধ নেয়। নীরবে। যেমন এখন নিচ্ছে। পৃথিবী এখন বিপন্ন। ধরিত্রী তপ্ত। পরিবেশ দুষ্ট। আশঙ্কা এই যে পানির নিচে ডুববে কোনো অংশ, আর কোথাও দেখা দেবে প্রচণ্ড খরা। লক্ষণ ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।

আমাদের দেশে অবশ্য উল্টোটা ঘটেছে, প্রকৃতিকে আমরা জয় করব, পদানত করব ইত্যাদি মনোভাব নিয়ে বের হইনি। আমরা চেয়েছি তার সঙ্গে তাল দিয়ে চলতে। প্রকৃতির কৃপাপ্রার্থী হয়েছি অনেক সময়। বৃষ্টি পড়লে তবেই ফসল হয়েছে। প্রার্থনা করেছি ঝড় যাতে না হয়, অথবা বন্যা কিংবা খরা। প্রকৃতির উর্বরতা আমাদের ওপর নানাভাবে প্রভাব ফেলেছে। একদিকে দেখা দিয়েছে অল্পে সন্তুষ্টি। সহজেই পাওয়া যায় এবং বেশি না পেলেও চলে যায়_এই চেতনা দৃষ্টিভঙ্গির অংশ হয়ে গেছে। তা ছাড়া বর্বরতাকে মানবিক গুণ হিসেবেও আদর্শায়িত করা হয়েছে। বিশেষ করে সন্তান প্রজননের ক্ষেত্রে। জনসংখ্যার এই যে প্রচণ্ড আধিক্য, এটি এমনি এমনি ঘটেনি, এর পেছনে একটি দার্শনিক কারণও রয়েছে বৈকি। সেটি হচ্ছে এই যে উর্বরতাই শ্রেয় এবং প্রমাণ দেওয়া প্রয়োজন ধারণ করার শক্তির। বন্ধ্যত্বের চেয়ে অভিশপ্ত আর কিছু আছে বলে মনে করা যায়নি। প্রকৃতির ওপর নির্ভরতা দায়িত্বজ্ঞানহীনতাকেও পুষ্ট করেছে, পরগাছা হওয়ার প্রকৃতিকে উৎসাহী করেছে সে ভেতর থেকে। সন্তানের দায়িত্ব নেয় না যে পিতা, অপারগ হয় সে ক্ষেত্রে, সে অন্য কোনো দায়িত্ব নেবে?

কিন্তু এখন প্রকৃতি আর আগের মতো নেই। সে প্রতিশোধ নিচ্ছে। ক্রমাগত বৈরী হয়ে পড়ছে। তা ছাড়া তার ধারণক্ষমতাও কমে এসেছে। প্রাকৃতিক পরিবেশ অসুস্থ। খাবার পানিতে আর্সেনিকের বিষ। খরা দেখা দিচ্ছে অনেক এলাকায়। মশার উৎপাত বাংলাদেশের সর্বত্র। মানুষ শত্রুতা করেছে প্রকৃতির সঙ্গে, ফলে প্রকৃতি বিরূপ হয়েছে, এ রকম কথা বলা যাবে। বলা সহজ বটে, স্বাভাবিকও বটে। কিন্তু মানুষ তো নয়, প্রকৃতির আসল শত্রু হচ্ছে মনুষ্যসৃষ্ট পুঁজিবাদ। সে-ই ধ্বংস করেছে প্রকৃতিকে, আসল কুড়াল তারই হাতে। মানুষের হাতেই এই পুঁজিবাদের সৃষ্টি, কিন্তু এখন মানুষের চেয়ে সে অনেক বড়, অনেক শক্তিশালী। সে হচ্ছে দৈত্য, বলা যায় দানব। সামন্তবাদের অনেক দোষ ছিল; সে ছিল সীমাবদ্ধ, কিন্তু ওই সীমাবদ্ধতাই প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তার একটা গুণ হয়ে দেখা দিয়েছিল। কৃষিকে সে অত্যন্ত মূল্যবান মনে করত এবং সেই কৃষিতে যন্ত্রের ব্যবহার জানত না, জেনেছে যখন তখনো যন্ত্রের ব্যবহার করেনি। কৃত্রিম সার দেওয়ার কথাও তার ধারণায় আসেনি।

পুঁজিবাদী ইংরেজ বণিক এ দেশে নীল চাষের প্রবর্তন করেছিল। তাতে ধান চাষের ক্ষতি হয়েছে। সর্বনাশ হয়েছে, নীল চাষে বাধ্য করা হয়েছে যে কৃষক তাদের। পাট চাষও ওই বণিকদেরই স্বার্থে। পাট চাষের স্বার্থে ডোবা, নালা, খালের পানি বিপন্ন হয়েছে, পচা পাট ধুতে গিয়ে পানি নষ্ট হয়েছে। চাষি মরেছে জোঁক ও মশার কামড়ে। দুর্গন্ধে ছেয়ে গেছে গ্রাম ও গৃহ। মুনাফা হয়েছে বিদেশি বণিক ও তাদের দেশি অনুচরদের। এখন এসেছে চিংড়ি। চিংড়ির ঘের বিপন্ন করেছে বাংলাদেশের উপকূল, মুনাফা করছে বণিক। রপ্তানি করো নয়তো ধ্বংস হও, এই আওয়াজ তোলা হয়েছে, আসলে যা ঘটেছে বাংলাদেশে তা হলো রপ্তানি করো এবং ধ্বংস হও।

যত উন্নতি তত বিপদ প্রকৃতির_এই নিয়মে কাজ চলেছে বাংলাদেশে। ব্রিটিশ আমলে এই নিয়ম চালু হয়, পাকিস্তানি শাসনের কালে তা অক্ষুণ্ন ছিল, এখন আরো ফুলে ফেঁপে উঠেছে। আমাদের দেশে বন্যা হয়। আসলে যা ঘটে তা বন্যা নয়, তা হচ্ছে জলাবদ্ধতা। অপরিকল্পিত বাঁধ ও রাস্তা তৈরি হয়েছে। ফলে পানির প্রবাহ স্বাভাবিক থাকেনি। নদীর গতি উত্তর থেকে দক্ষিণে, বাঁধ ও রাস্তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত। রেললাইনও তাই। ফলে জলপ্রবাহে বদ্ধতা দেখা দিয়েছে। নদী শুকিয়ে গেছে, হারিয়ে গেছে অনেক ক্ষেত্রে, কোথাও কোথাও পরিণত হয়েছে নালায় ও বিলে। ওপরে পানি না পেয়ে ভূগর্ভে পানি খুঁজছি, তাতে পাওয়া যাচ্ছে আর্সেনিকে দৃষ্ট পানীয় দ্রব্য। বিপন্ন হচ্ছে হাজার হাজার মানুষ।

সারা বিশ্বে এখন ধ্বনি উঠেছে মোটরগাড়ির বিপক্ষে। তার কারণ মোটরগাড়ির বিষাক্ত ধোঁয়া। সেই ধোঁয়ায় পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে মারাত্মকভাবে। আমাদের আওয়াজটা একেবারেই বিপরীত। আমরা মোটর আমদানি বৃদ্ধিকেই মনে করছি উন্নতির প্রধান লক্ষণ। এসব গাড়ির অধিকাংশই পরিত্যক্ত। ব্যবহারকারীরা ফেলে দিত, ফেলে দেওয়ার জায়গা খুঁজে হয়রান হতো, আমরা কিনে আনছি, এনে স্বাভাবিক ধোঁয়ার চেয়ে বেশি ধোঁয়া ছড়াচ্ছি। টাকা পাঠাচ্ছি বিদেশে জ্বালানি তেল আমদানি করতে। ভয়াবহ করে তুলছি যানজট পরিস্থিতি। গতিবেগ বৃদ্ধি করতে গিয়ে গতিবেগ কমিয়ে আনা হচ্ছে। অথচ প্রয়োজন ছিল রেল চালাচলব্যবস্থা পরিকল্পিতভাবে শক্তিশালী করা। রেলের ইঞ্জিনও যন্ত্রই, দৈত্যের মতো দেখতে, কিন্তু তার কাজ ভদ্রবেশী মোটরগাড়ির কাজের তুলনায় কম ক্ষতিকর। যে জন্য যেসব দেশ আমাদের তাদের পরিত্যক্ত মোটরগাড়িগুলো গছিয়ে দিচ্ছে তারা মোটর ছেড়ে এখন ট্রেনে চড়া যায় কিভাবে সেই চিন্তায় মাথা ঘামাচ্ছে। আমাদের জন্য আবশ্যক ছিল নৌপরিবহন ব্যবস্থাকে আরো উন্নত করা। নদী আমাদের চিরকালের বন্ধু, সেই বন্ধুকে আমরা উপেক্ষা করছি না শুধু, তার গলা টিপেও ধরছি বটে।

মানুষের প্রকৃতিতে যে পশু আছে সেটা জানা কথা, আর সেই পশু যে বনের পশুর চেয়েও হিংস্র হতে পারে, সেটা বোঝা যায় পুঁজিবাদের অধীনে মানুষের আদর্শিক আচরণে। আদর্শটা হচ্ছে_লুণ্ঠন। এখানে কোনো দয়ামায়া নেই, ন্যায়-অন্যায় বিবেচনা নেই। পশুর আচরণেও ওইসব বিবেচনা যে থাকে না, এটা ঠিক। কিন্তু পশুর জীবনে বিলাসিতা নেই, অপ্রয়োজনে সংগ্রহ নেই, জমিয়ে রাখার প্রবৃত্তি নেই। মানুষের আছে। মানুষের ক্ষুধা তাই পশুর ক্ষুধার চেয়ে অনেক বেশি। সে ক্ষুধা অপরিসীম ও অপূরণীয়। এই ক্ষুধা মেটাতেই সে প্রকৃতিকে তছনছ করেছে। এমন কাজ করছে যা করা পশুর পক্ষে কোনোকালে সম্ভব হয়নি। বিশেষ বিশেষ পশু ছাড়া সাধারণ পশু পরিবেশকে নোংরাও করে না। নোংরা করার ব্যাপারে মানুষ অপ্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু মানুষকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। দোষ পুঁজিবাদের। সে দেখতে ভদ্র, কিন্তু ভেতরে কদর্য, নিজের কদর্যতার দরুন সে মানুষকে কদর্য কাজে উৎসাহী করছে, নিযুক্তও করছে।

তিন.
প্রকৃতি এক ধরনের সাম্যে বিশ্বাস করে, তার মূলনীতিকে সাম্যবাদী বলা অসম্ভব নয়। তার আকাশ সবার জন্য, সমুদ্রও তাই। প্রকৃতি যখন বৃষ্টি বর্ষণ করে, তখন আলাদা করে দেয় না, সবাইকেই দেয়। রোদও তাই। মানুষকে সে বৈচিত্র্য দিয়েছে, কিন্তু কাউকে মানুষ, কাউকে দৈত্য করতে চায়নি। পতঙ্গও নয়। মানুষের নিজস্ব স্বার্থ দানবীয় আকার নিয়ে, আবার কখনো লুকানো কীটপতঙ্গ হয়ে প্রকৃতির সাম্যনীতিতে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে। দেয়াল উঠেছে মস্ত মস্ত, অন্তর্ঘাত চলছে গোপনে গোপনে। বিভাজনগুলো স্বার্থের কারণেই সৃষ্টি। বিভেদ ঘটেছে ধনী-দরিদ্রদের ধর্ম সম্প্রদায়ের সঙ্গে ধর্ম সম্প্রদায়ের। অঞ্চলের বিরোধ, বর্ণের ব্যবধান সবই এসেছে। খাড়াখাড়ি ভাগ করে ফেলা হয়েছে পুরুষ ও নারীতে। পৃথিবীতে ধর্ষণ এখন ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। এটা দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার তথা আধুনিক লুণ্ঠনেরই একটি প্রকাশ বটে।

বাংলাদেশের মানুষও কায়েমি স্বার্থের প্ররোচনায় নানাভাবে বিভক্ত বটে। সর্বনাশা একটা বিভাজন ছিল, সম্প্রদায়িক। প্রকৃতি এই পার্থক্যটা চায়নি। প্রকৃতি সবাইকেই বাঙালি হতে বলেছে। কিন্তু স্বার্থ চেয়েছে দেয়াল তুলতে। দেয়াল তুলে ক্ষান্ত হয়নি, হানাহানি বাধিয়েছে। শেষ পর্যন্ত ভাগ করে ফেলেছে প্রকৃতিকে। দুই টুকরো করে ছেড়েছে বাংলার ভূমিকে। প্রকৃতি প্রতিশোধ নিয়েছে এই অস্বাভাবিক ও হিংস্র কাণ্ডের। দুই দিকেরই ক্ষতি হয়েছে। প্রাণ দিতে হয়েছে অসংখ্য মানুষকে। ভূমি থেকে উৎপাটিত হয়েছে কত লাখ জন, কে তার হিসাব রাখে! অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়েছে। শুকিয়ে গেছে নদী। প্রকৃতি চেয়েছিল পানির অবাধ বিতরণ, স্বার্থ সৃষ্টি করল বাঁধ, যাতে ভয়ংকর ক্ষতি হয়েছে পূর্ববঙ্গের, লাভ হয়নি পশ্চিমবঙ্গেরও। এই যে পাশবিক দাঙ্গা-হাঙ্গামা, হত্যা-লুণ্ঠন-ভাগাভাগি, এর সঙ্গে সাধারণ মানুষ জড়িত ছিল না। এসব তারা চায়নি। এতে তাদের কোনো লাভ হয়নি। অনেকেরই সর্বনাশ হয়েছে, বিশেষ করে তাদের যারা শরণার্থী হয়ে এপার-ওপার করতে বাধ্য হয়েছে। লড়াইটা ছিল দুই সম্প্রদায়ের দুই মধ্যবিত্তের মধ্যে। নিজেদেরটা গোছাতে গিয়ে তারা সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়েছে, বিপদে ফেলেছে নিরীহ মানুষকে।
পহেলা বৈশাখ তাই এসেও আসে না। ক্যালেন্ডার আসে, কিন্তু জীবনে আসে না। পরিবর্তন যা হওয়ার ভালোর দিকে হয় না, খারাপের দিকেই হয়। আকাঙ্ক্ষা মেটে না, ব্যর্থতা বোধের গ্লানিই প্রধান হয়ে ওঠে। গরিব মানুষ গ্রাম ছেড়ে চলে আসে শহরে। কেননা গ্রামে তার আশ্রয় নেই, সেখানে কাজ নেই, উপার্জন নেই। শহরে এসে বাসিন্দা হয় রাস্তাঘাটের, বড়জোর বস্তির। নারী স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারে না, ক্রমাগত স্বাধীনতা হারায়।
এ অবস্থায় পহেলা বৈশাখ নিয়ে উল্লাস করা তো প্রহসন মাত্র। হৃদয়বিদারক প্রহসন, গরিব মানুষের জন্য। অতিরিক্ত ধনীদের ফার্স্ট অব জানুয়ারি পালন থেকে আলাদা কোথায়?

এ জন্যই একুশে ফেব্রুয়ারি দরকার। ভাষা আন্দোলন হচ্ছে সাম্য প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। সবাইকে এক করবে, বাংলাভাষী করবে এই ছিল তার লক্ষ্য। ধনী-দরিদ্র, হিন্দু-মুসলমান, নারী-পুরুষ এসব প্রাচীর সে ভেঙে ফেলতে চেয়েছে, সবাইকে নিয়ে আসতে চেয়েছে একই সমতলে। নিচের নয়, ওপরের।

সেই আন্দোলন এখনো তার লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। একুশে ফেব্রুয়ারি এখনো মধ্যবিত্তেরই অনুষ্ঠান। মধ্যবিত্তই স্মরণ করে, উদ্বুদ্ধ হয়। বইমেলায় যায়, শহীদ মিনারে তাদেরই এক অংশ মারপিট করে। সাধারণ মানুষ কোথাও নেই। সাধারণ মানুষ এসব থেকে অনেক দূরে। দুই উদ্যাপনই পহেলা বৈশাখ যেমন, একুশে ফেব্রুয়ারিও তেমনি, তাদের কাছে এক রূপকথার রাজ্য, যেখানে অন্য মানুষের ভিন্ন তৎপরতা।

কিন্তু একুশে ফেব্রুয়ারি দরকার, তাকে জীবন্ত ও প্রবহমান রাখা প্রয়োজন পহেলা বৈশাখের জাতীয়তাবাদী আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্যই। মুক্তিযুদ্ধ করেও আমরা মুক্ত হইনি। অত্যন্ত ধনীরা এখন আর জাতীয়তাবাদী নয়, তারা আন্তর্জাতিক, তাদের ভাষা বাংলা নয়, আন্তর্জাতিক; অর্থাৎ ইংরেজি। অধিকাংশ মানুষের চোখে এখন কোনো স্বপ্ন নেই, সামনে তাদের অন্ধকার।

একুশে সংগ্রামটা যদি না থাকে তাহলে পহেলাকে পাব না। যথার্থ পহেলা বৈশাখ এমনি এমনি আসবে না, তাকে সংগ্রাম করে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বৈষম্য দূর করার সংগ্রাম। অধিকার ও সুযোগের সাম্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও শিক্ষাবিদ

[ad#bottom]

One Response

Write a Comment»
  1. Dhonnobad lekhok k, amader view ta jemon hoya uchit chilo ta korchina.