পহেলা বৈশাখের কাটা ঘুড়িগুলো

ইমদাদুল হক মিলন
ছানা সেন্টু আর তালেব মোতালেবের সঙ্গে আমার বড়ভাই আজাদ সুতা মানজা দিচ্ছে। ছানা আর সেন্টু হচ্ছে আমার মামাতো ভাই, তালেব মোতালেব মামা। মা’র কোনও আপন ভাই নেই, চাচাতো ভাইয়ের ছেলে ছানা সেন্টু। আমরা ডাকি ছানাদা, সেন্টুদা। তালেব মোতালেব হচ্ছে তালেব মামা, মোতালেব মামা।

শেষ চৈত্রের দুপুরের রোদে ঝকমক ঝকমক করছে চারদিক। নানাবাড়ির বিশাল উঠানে ঘর দুয়ারের ছায়া পড়ার পরও রোদের কমতি নেই। সেই রোদে সুতা মানজা দিচ্ছে পাঁচ কিশোর। পাঁচজন চাঁদা করে মাওয়ার বাজার থেকে কাঠিম সূতা কিনে এনেছে, লাল নীল হলুদ বেগুনী সবুজ ঘুড়ির কাগজ কিনে এনেছে। এক তা কাগজের দাম দুই পয়সা, এক কাঠিম সুতা এক আনা। বাঁশের চটি চেছে চেছে বানানো হয়েছে ঘুড়ির কামিনি। কাঁচা গাবের মাথার দিকটা কেটে আঠা বের করা হচ্ছে। ভাঙা শিশি বোতল পাটা পুতায় পিষে ফাকি করা হয়েছে। সব মিলিয়ে বিশাল আয়োজন।

আমি উঠানের কোণে বসে কাণ্ডটা দেখছি।

বহুদূর ছেলেবেলার কথা। চার পাঁচ বছর বয়স আমার। দুদিন ধরে ঘুড়ি বানানো হয়েছে। সেই ঘুড়িগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা হয়েছে হামিদ মামাদের বাংলাঘরে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখলে হাওয়ায় হাওয়ায় আঠা শুকাবে, ঘুড়ি পোক্ত হবে।

হাফেজ মামা তিন চারটা লাটাই বানিয়ে দিয়েছেন। উঠানের দু’ মাথায় দাঁড়িয়েছে দুজন। দুজনের হাতেই লাটাই। এক লাটাইয়ে সাদা নিরীহ সুতা প্যাঁচানো। মাঝখানে মাটির মালসা হাতে দাঁড়ানো একজন। এই মালশায় সুতা মানজা দেওয়ার কাচের ফাকি, গাবের আঠার সঙ্গে কমলা রংয়ের গুড়া রং মেশানো হয়েছে। উঠানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে একজন মালশা থেকে মুঠো ভরে তুলছে মানজা দেওয়ার দ্রব্য। এক মাথায় দাঁড়ানো একজন খালি লাটাইয়ে সুতা টেনে নিচ্ছে অন্য মাথায় দাঁড়ানো আরেকজনের সুতা ভরা লাটাই থেকে। মাঝখানেরজন মানজা দেওয়ার দ্রব্যসহ মুঠো করে ধরে রেখেছে সুতা। এক লাটাইয়ের সাদা সুতা গুড়া কাচের ধারে, গাবের আঠার আর কমলা রংয়ে রঙিন হয়ে প্যাচিয়ে যাচ্ছে অন্য লাটাইয়ে। ওইটুকু সময়ের মধ্যে রোদের তাপে শুকিয়ে মানজা দেওয়া সুতা হয়ে যাচ্ছে ব্লেডের মতো ধারালো।

আজ পহেলা বৈশাখ। দুপুরের পর পর মেলা বসবে কালিরখিলের মাঠে। মাঠের দক্ষিণে পদ্মা। পদ্মার সাদা তীরে হবে ঘুড়ি উড়ানোর উৎসব। ঘুড়ির কাটাকুটি খেলা। সেই উৎসবে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে। ঘণ্টাখানেক পরে দুতিনটি লাটাই ভরে যাবে মানজা দেওয়া সুতায়। তারপর খেয়ে দেয়ে ঘুড়ি লাটাই নিয়ে পদ্মাতীরে রওনা দেবে পাঁচ কিশোর। আমি ছোট, আমাকে নেবে না। তবে আমি কালিরখিলের মেলায় যেতে পারবো হাজামবাড়ির মজিদের সঙ্গে। সেই মেলা থেকে মাটির খেলনাপাতি কিনতে পারবো, ফাপা কদমা কিনতে পারবো। মজিদের হাতে টাকা দিয়ে দেবেন বুজি (নানী)। রসগোল্লা আমৃতি চিনি দেওয়া বালুসা মাটির হাড়ি ভরে ওইসব মহার্ঘ মিষ্টি আমাদের জন্য কিনবে মজিদ। পহেলা বৈশাখের রোদে গরমে ক্লান্ত হয়ে আমি আর মজিদ খাবো বরফ দেওয়া ঠাণ্ডা তোকমাদানা কিংবা ইসবগুলের শরবত। বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা। ততোক্ষণে হয়তো কালিবাউস মাছের মতো রং হয়েছে আকাশের। এক ফোটা হাওয়া নেই। দেশগ্রাম থম ধরে আছে। ঝড়ের পূর্বাভাস।

পহেলা বৈশাখের সন্ধ্যার দিকে ঝড়বৃষ্টি একটা হতোই।

মজিদের সঙ্গে মেলায় গেছি ঠিকই, এত আনন্দ উৎসব চারদিকে, মাটির তৈরি এত খেলনাপাতি, নিমকি মুড়লিভাজা বিনি্নরখই, মিষ্টির দোকানগুলোতে ক্ষিরমোহন লালমোহন ছানার আমৃতি, প্রাণ জুড়ানো রঙিন শরবত, তালপাতার বাঁশি, বাঁশের বাঁশি, টিনের তলোয়ার। হাতি ঘোড়া বাঘ ভাল্লুক ময়না টিয়া পাখির দল। এত কিছুতেও আমার মন ভরে না। আমার মন চলে গেছে পদ্মার অচেনা তীরে। সেখানে চারপাশের গ্রামের কোনো যুবক কিশোরদের সঙ্গে ঘুড়ির কাটাকুটি খেলায় মেতেছে আমার ভাইয়েরা, মামারা। কোথায় গোত্তা যাচ্ছে সেন্টুদার লাল রংয়ের ঘুড়ি? মোতালেব মামার নীল গোয়ার ধরনের ঘুড়িটা এইমাত্র কেটে দিল কোন গ্রামের কোন কিশোরের সাদা ঘুড়ি? সরু বাঁশের মাথায় হাগড়ার শুকনা ঝাঁকা বাঁধা কোন দুরন্ত কিশোর বালক ছুটে যাচ্ছে সেই ঘুড়ি ধরতে, আহা যদি একবার দেখতে পেতাম।

অতদূর যাওয়া নিষেধ আমার। মজিদকে পাই পাই করে বলে দিয়েছেন বুজি। তারপরও মজিদ আমাকে একবার গোপনে নিয়ে গিয়েছিল। মেলার কেনাকাটা শেষ করে আমার হাত ধরে মজিদ তখন তোকমাদানার শরবত খাচ্ছে। আমার গ্লাস আমি শেষ করেছি। বুকের কাছে ধরা ছিল খেলনাপাতি, নিমকি গজা মুড়লিভাজা আর বিনি্ন খইয়ের পোটলা-পাটলি। মজিদের হাতে মিষ্টির বড় বড় দুটো হাড়ি। দুজন মানুষের তুলনায় টুকুর টাকুর বোঝা অনেক। আর আমি তো শিশু। বুক থেকে যখন তখন খসে পড়ছে এই খেলনা, ওই খেলনা, নিমকি মুড়লির ঠোঙা।

দুআনা দিয়ে বড় সাইজের একটা চাঙারি কিনে ফেলল মজিদ। আমার জিনিসপত্র আর তার মিষ্টির হাড়ি চাঙারিতে বসিয়ে শরবতের দোকানদারকে বলল তার মাথায় তুলে দিতে। একহাতে মাথার চাঙারি অন্যহাতে আমার একহাত ধরে বলল, ঘুড্ডি উড়ানি দেখনের বহুত শখ তর, না রে?

আমি মন খারাপ করা ভঙ্গিতে মাথা নাড়লাম।

মজিদ বলল, ল তরে দেখাইয়া আনি।

সঙ্গে সঙ্গে আমার মুখ উজ্জ্বল। সত্যই?

সত্যঐ। তয় বুজিরে কইলাম কইতে পারবি না।

আইচ্ছা। কিন্তু ওরা যুদি কইয়া দেয়?

অগো আমি না কইরা দিমু নে।

তারপর আমার আর আনন্দের সীমা নেই। মজিদের হাত ধরে গেছি পদ্মার তীরে। গিয়ে দেখি সেখানে চলছে আরেক মেলা। ঘুড়ি উড়ানোর মেলা। আকাশ ভরে গেছে নানা রঙের ঘুড়িতে। আকাশের তলায় কত যে ছেলে বুড়ো জোয়ান মরদো। কেউ ঘুড়ি ওড়াচ্ছে, কেউ আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখছে, কেউ বাঁশের মাথায় বাঁধা ঝাঁকা হাতে ছুটছে কাটা ঘুড়ি ধরতে। কোনও কোনও কাটা ঘুড়ি হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে চলে যাচ্ছে পদ্মায়। পদ্মা নদীটি বয়ে যাচ্ছে চিরকালীন উদাসিনতায়। মানুষের এইসব আনন্দ উৎসবে তার যেন কিছুই যায় আসে না।

কিন্তু সেদিন নদীর জলেও যেন লেগেছিল আনন্দ উৎসবের ছোঁয়া। নদীর জল যেন একটু বেশি কলকল ছলছল শব্দ করছিল। পহেলা বৈশাখের ফুরিয়ে আসা বিকেলবেলাটি যেন অন্যদিনের তুলনায় অনেক বেশি স্নিগ্ধ, অনেক বেশি মনোরম। মানুষের হইচই, আনন্দ উল্লাসে যেন নদীও ফেটে পড়ছিল।

মজিদের হাত ধরে আমি তাকিয়ে আছি আকাশের দিকে। ঘুড়ির রঙে রঙিন হয়ে আছে আকাশ। ওই যে ওই গোত্তা খাচ্ছে হাওলাদার বাড়ির দুলালের হলুদ ঘুড়ি। কার যেন নীল ঘুড়ি এইমাত্র কেটে দিল একটা বেগুনী রঙের ঘুড়ি। ছানাদা সেন্টুদা আর মোতালেব মামার হাতে লাটাই। তাদের ঘুড়িগুলো বারবারই কেটে দিচ্ছে অন্যদের ঘুড়ি। দাদা, আমার বড়ভাই আর তালেব মামা পাশে দাঁড়িয়ে আনন্দে লাফালাফি করছে। ওদের সুতার মানজা হয়েছে বেদম ধার। কেউ পারছে না ওদের সঙ্গে।

হঠাৎই দেখি আমাদের সবুজ রঙের একটা ঘুড়ি কাটা পড়ল। মোতালেব মামা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাটা ঘুড়ির সুতা লাটাইতে প্যাঁচাতে লাগল। আমি মন খারাপ করে তাকিয়ে আছি কাটা ঘুড়ির দিকে। হাওয়ার টানে দোল খেতে খেতে ঘুড়ি চলে যাচ্ছে গৃহস্থবাড়ির ঘর দুয়ার আর গাছপালার মাথার উপর দিয়ে কোন সুদূরে কে জানে। আমি তাকিয়েই আছি, তাকিয়েই আছি। এখনও সেই দৃশ্য আমার চোখ জুড়ে। এখনও পহেলা বৈশাখের কাটা ঘুড়িগুলো আমার চোখের ওপর দিয়ে ভেসে যায় কোন অচেনা প্রান্তরের দিকে। জীবনের টানে যেমন করে ভেসে গেছে আমার ছেলেবেলা, আমার রঙিন শৈশব।

বাংলাদেশ প্রতিদিন

[ad#bottom]