আমাদের নববর্ষ, আমাদের গৌরব আমাদের ভালোবাসা

নূহ-উল-আলম লেনিন
বৈশাখ আমার ব্রাত্যচোখে প্রথম আলো-প্রথম বিস্ময়!
বৈশাখ আমার প্রথম ভালোবাসা

বিশ্বের প্রতিটি জাতির স্বাতন্ত্র্য তার নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বিশিষ্টতার মধ্যে। অভিন্ন ভাষা ও ধর্মের একাধিক দেশ আছে। পক্ষান্তরে অভিন্ন ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভাষা, সংস্কৃতি এবং বহু ধর্ম, বহু মত-পথের মানুষকে নিয়ে অভিন্ন জাতি-রাষ্ট্রের দৃষ্টান্ত হচ্ছে বাংলাদেশ। রাজনৈতিক কারণে বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চল খণ্ডিত এবং বাঙালি জনগোষ্ঠীর একটি অংশ ভারতের অধিবাসী। সে কারণে রাষ্ট্রিক পরিচয়ে বাংলাদেশের জনগণই বিশ্বে বাঙালি জাতিসত্তার আত্মপরিচয় ও বাঙালি সংস্কৃতির পতাকাবাহী, প্রতিনিধিত্বকারী প্রধান শক্তি। আমাদের এই অর্জনের পেছনে রয়েছে যেমন ভাষা সংগ্রাম থেকে মুক্তিযুদ্ধ; তেমন আমাদের জাতিসত্তা নির্মাণের সুদীর্ঘ পথপরিক্রমা।

বলাবাহুল্য আমাদের এ অর্জন সহজসাধ্য ছিল না। আজ যে বাঙালি জাতিসত্তা গড়ে উঠেছে তার পেছনে রয়েছে প্রায় তিন হাজার বছরের জঙ্গম ইতিহাস। পন্ডিতজনদের অনেকেই বাংলা ভাষার সেই সঙ্গে বাঙ্গালা বা অখন্ড সুবে বাঙ্গাল মুলুকের বয়সকাল নির্ধারণ করেছেন মোটামুটি হাজার খানেক বছর। বাংলা ভাষার প্রাচীনতম সাহিত্যিক নিদর্শন চর্যাপদ। মতভেদ থাকলেও এগুলোর রচনাকাল নবম থেকে দ্বাদশ শতক। অখন্ড বাংলা গড়ে ওঠার আগে বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চল- অঙ্গ, বঙ্গ, হরিকেল, রাঢ়, বরেন্দ্র, সমতট প্রভৃতি জনপদে বিভক্ত ছিল। পাল ও সেন শাসনামলে বাংলা অঞ্চলে এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়। পরবর্তীকালে দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতকে, সুলতানী আমলে এ ব্যবস্থা আরও সংহতরূপ লাভ করে। এই যে ভূ-খন্ডগত ঐক্য এবং ভাষাগত ঐক্য গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া তার সময়কালও ১ হাজার থেকে ১২শ’ বছর।

উলিস্নখিত ধারণা, আমাদের মতে, খন্ডতি এবং সরলীকরণের দোষে দুষ্ট। বাংলা অঞ্চলে যে প্রাচীন সভ্যতার প্রত্ন-নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে তার বয়সকাল আড়াই থেকে তিন হাজার বছর। প্রাগৈতিহাসিক বা প্রাচীনতম ঐতিহাসিক সাক্ষ্য প্রমাণ করেছে ‘গঙ্গা রিড়ি’ বা ‘গঙ্গা ঋদ্ধি’ অঞ্চল বলে খ্যাত গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ অঞ্চলের নগর সভ্যতার বয়সকাল আড়াই থেকে তিন হাজার (উয়ারি বটেশ্বর ও পুন্ড্র-নগরী) বছর। অতএব, হঠাৎ করে ১২০০ বছর আগে আমরা বাংলাভাষী বা বাঙালি হয়ে উঠিনি। বস্তুত, এই প্রায় তিন হাজার বছরের দীর্ঘপথ পরিক্রমার ভেতর দিয়েই বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও বাঙালি জাতিসত্তা গড়ে উঠেছে।

তবে এই গড়ে ওঠার পথটি সহজ-সরল বা একরৈখিক ছিল না। সুদূর বৈদিক যুগ থেকেই বাংলা অঞ্চলের জনগোষ্ঠীকে প্রাকৃতজন হিসেবে ব্রাত্য বলে ভাবা হতো। বর্ণাশ্রম প্রথায় বিভক্ত প্রাচীন ভারতের শাসকগোষ্ঠী থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর সপ্তম দশক পর্যন্ত উচ্চবর্ণের শাসক অভিজাত শ্রেণী কী হিন্দু কী মুসলমান, কী বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী বাঙালিদের ‘নিচু জাতির’ মানুষ হিসেবে ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। ‘দেবভাষা সংস্কৃত’ বা ভারতীয় আর্যভাষী অভিজাতরা তো বাংলা ভাষাকে মানুষের ভাষা বলেই মনে করত না। ‘পক্ষী’ ভাষা বলে শেস্নষাত্মক মন্তব্য করতে অথবা চণ্ডালের ভাষা বলে ঘৃণা করতে তারা দ্বিধা করত না। আরবি-ফারসি-উদর্ু ভাষী মুসলমান শাসকরাও প্রায় একই মনোভাব পোষণ করত। উনিশ-বিশ শতকের উদর্ু-ফারসি-হিন্দি ভাষী মুসলমান অভিজাতরা বাংলাকে মনে করত হিন্দুদের ভাষা, হিন্দুদের সংস্কৃতি। বিস্ময়কর হলেও সত্য যে, হিন্দু ও মুসলমান বাঙালিদের একটি অংশও বাংলা ভাষা, বাঙালি সংস্কৃতি ও ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে হীনমন্যতায় ভুগতো।

প্রকৃতই আদি বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি ছিল ব্রাত্যজনের ভাষা ও সংস্কৃতি। বৌদ্ধ দোঁহা ও গান তথা চর্যাপদের বিষয়বস্তু, চর্যাপদে বিধৃত লোকজীবন, রূপক, উপমা চিত্রকল্প এবং এর রচয়িতা সিদ্ধাচার্যদের জীবনচর্যা অনুসন্ধান ও ব্যাখ্যা করলে একটি সত্যই বেরিয়ে আসে; আর তা হলো বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ নিম্নবর্ণের হতদরিদ্র, অত্যাচারিত, উপেক্ষিত, শোষিত-বঞ্চিত মানুষের দীর্ঘশ্বাস! নগরের বাইরে যাদের বাস অর্থাৎ নাগরিক সভ্যতার বাইরের ডোম, চণ্ডাল, শবর, তাঁতি, মাঝি, নিষাদ, ব্যাধ, ধুনুরি প্রভৃতি শ্রমজীবী অন্ত্যজ শ্রেণী, যাদের ‘টালত ঘর মোর নাহি পড়িবেষী/ হাঁড়িত ভাত নাহি নিতি আবেশী’, তারাই শ্রমে-ঘামে-মননে ও সৃজনশীলতায় বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির বুনিয়াদটি রচনা করেছেন।

ইতিহাসের সাক্ষ্য অন্ত্যজ শ্রেণীর ভাষায় শাস্ত্র আলোচনা ও রচনা নিষিদ্ধ ছিল। দেবভাষা সংস্কৃতিই ছিল উচ্চচিন্তা, ধর্মচিন্তা এবং শাস্ত্র আলোচনার বাহন। কিন্তু বাঙালির ইতিহাসে ভিনদেশী, বিভাষী পাঠান সুলতানরাই প্রথম বাংলা ভাষাকে কিছুটা রাজকীয় মর্যাদার আসন দেয়। ইতোমধ্যে বাংলা ভাষা তার নিজস্ব আত্মশক্তিতেই ‘সান্ধ্যভাষার’ কুহেলিকা ছিন্ন করে জনবোধ্য ব্যবহারিক ভাষা ও সাহিত্যিক ভাষায় রূপান্তরিত হচ্ছিল। সুলতানী আমলে তার শৈশব অবস্থাই কেবল কাটেনি, সৃজনশীলতার ফল্গুধারায় অবগাহন করে তা দেবভাষার পাশাপাশি নিজের একটি অবস্থান করে নেয়। মঙ্গলকাব্য বা বৈষ্ণব পদাবলি বাংলা ভাষাকে নতুন মর্যাদায় অভিষিক্ত করে।

দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে মুঘল শাসনামলে। ষোড়শ শতকে, ১৫৮৪ সনে সম্রাট আকবর রাজস্ব আদায়কে ফসলচক্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে গিয়ে প্রবর্তন করেন বাংলা সন। বলাবাহুল্য ভারতে মুসলমান শাসকরা চান্দ্রবর্ষ ভিত্তিক ইসলামি হিজরী সনকেই রাষ্ট্রীয় ক্যালেন্ডার বছর হিসেবে মান্য করতেন। হিজরী সনের সঙ্গে কখনও কখনও শকাব্দকে মিলিয়ে ফসল আবাদের এবং ওঠার কাল নির্ণয় এবং খাজনা আদায়ের সময় নির্ধারণ করা হতো। সম্রাট আকবর মুঘল সাম্রাজ্যের সবচেয়ে কৃষি সমৃদ্ধ এবং সরকারি রাজস্বের প্রধান জোগানদাতা সুবা বাঙ্গালার রাজস্ব আদায়ের উপযুক্ত সময় নির্ধারণের জন্য হিজরী চান্দ্র বছর ও শকাব্দের সৌরবছরকে ভিত্তি করে বাংলা সন বা বঙ্গাব্দ চালু করেন। প্রথমে এটি ফসলি সন হিসেবে পরিচিত ছিল। পরে বঙ্গাব্দ হয়। আকবরের সিংহাসন আরোহণের তারিখ ১৫৫৬ সনের ৫ নভেম্বর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সন গণনা চালু হয়।

প্রচলিত শকাব্দ অনুসরণে ১ বৈশাখ থেকে বাংলা বছর গণনা শুরু হয়। রাজকীয় সিদ্ধান্ত হয় বছরের শেষ দিন অর্থাৎ ৩০ চৈত্র পর্যন্ত কৃষক ও অন্যান্য পেশার নাগরিকগণ সম্রাট বা তার প্রতিনিধি রাজা, জমিদার, তালুকদার প্রমুখের কাছে খাজনা বা রাজস্ব পরিশোধ করতে পারবে। আর ১ বৈশাখে হবে হালখাতা। সারা বছরের হিসাব নিকাস শেষে ওইদিন থেকে ব্যবসায়ীগণ নতুন খাতা খুলবেন। পুরনো পাওনা বুঝে নেবেন। পূজা-আর্চা (হিন্দুদের ক্ষেত্রে গণেশ পূজা) হবে, মিলাদ হবে, মিষ্টিমুখ হবে, বাড়ি বাড়ি আনন্দ উৎসব হবে, গ্রামে-গঞ্জে মেলা বসবে ইত্যাদি।

এভাবেই ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশে এক সময় নববর্ষ পালিত হতো আতব উৎসব বা ঋতু উৎসব হিসেবে। ঋতু পরিক্রমায় বৈশাখ নামকরণটিও হয়েছে জ্যোতিষ শাস্ত্র এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান থেকে। ‘যে চান্দ্র মাসে সাধারণত বিশাখা নক্ষত্র পূর্ণিমায় অস্ত হয়, তাহাকে চান্দ্র-বৈশাখি কহে।’ তবে বাংলা সন যেহেতু সৌরবছর ‘তজ্জন্য সূর্যের মেষরাশি স্থিতিকাল সৌর-বৈশাখ নামে অভিহিত।’ সে যাই হোক, বাংলাদেশে দু’ভাবে বাংলা বছর গণনা করা হয়। আগেই বলেছি বাংলা বছর গণনায় চান্দ্র ও সৌরবছরের একটা গোঁজামিল চালু ছিল। মূলত সৌরবছর হলেও কাল গণনায় গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের (ইংরেজি বছর) সঙ্গে বাংলা বছরের একটা তারতম্য হতো। সেই তারতম্য থাকায় কোনো কোনো মাস একেক বছর একেক রকম হতো। যেমন এক বছর যে মাস ৩০ দিন পরের বছর পঞ্জিকা মতে তা ৩১ বা ৩২ দিন হিসাবে গণনা করা হতো। লিপইয়ারের বালাই ছিল না। ষাটের দশকের গোড়ায় এ সমস্যার সমাধান করে আমাদের বাংলা একাডেমী। প্রাতঃস্মরণীয় জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুলস্নাহর নেতৃত্বে গঠিত একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি বাংলা সনের এসব গোঁজামিল দূর করেন এবং পরিপূর্ণ সৌরবছর হিসাবে লিপইয়ারসহ বাংলা সন গণনা চালু করেন। এটা ছিল একটা বিজ্ঞানসম্মত ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয়ভাবে এই সন গণনাকেই মান্য করে আসছে।

তবে কিছুটা ধর্মাশ্রয়ী ও শাস্ত্রীয় চান্দ্র বছরের ঐতিহ্য অনুসারী পুরাতন পঞ্জিকা বছরটিও এদেশে এবং ভারতে চালু আছে। পশ্চিমবঙ্গে সরকারিভাবে এই পুরাতন পঞ্জিকাই অনুসরণ করা হয়। সেকুলার ভারত ও মার্কসবাদী কমিউনিস্ট শাসিত পশ্চিমবঙ্গ সরকার ‘শাস্ত্রীয় বছর’ গণনার ফাঁদ থেকে বিজ্ঞানভিত্তিক সেকুলার বছর গণনা গ্রহণ করতে পারছে না। ফলে রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলাদেশে যেদিন (১৪ এপ্রিল) ১ বৈশাখ, ভারতে বছর শুরু তার পরদিন (১৫ এপ্রিল)। রবীন্দ্র জন্মোৎসব ২৫ বৈশাখও বাংলাদেশ ও ভারত একইদিন পালন করে না। রাষ্ট্রীয় পৃথকায়নের পাশাপাশি এভাবে দুই বাংলার সংস্কৃতির মধ্যেও একটি অপ্রয়োজনীয় পৃথকায়নের ধারা অগ্রসর হচ্ছে।

বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশ এবং বাংলা সন গণনার এই ঐতিহাসিক পথ-পরিক্রমার সঙ্গে আমাদের জাতিসত্তা নির্মাণের প্রশ্নটিও ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। এবার সে প্রসঙ্গে সংক্ষেপে একটু আলোকপাত করা যেতে পারে।

বাঙালি জাতি দ্বি-জাতিতত্ত্বে বিভ্রান্ত হয়ে ১৯৪৭ সালে নতুন করে পাকিস্তানের পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়েছিল। পবিত্র ইসলামের নাম ভাঙিয়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালি মুসলমানদের ধর্মানুভূতিতে সুড়সুড়ি দিয়ে আমাদের নিজস্ব ইতিহাস-ঐতিহ্য-ভাষা-সংস্কৃতি ও স্বতন্ত্র জাতি-পরিচয়কে ভুলিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু ইতিহাস সে ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দেয়। মানুষের মর্মমূলে মাতৃভাষা ও জাতিসত্তার যে শেকড়, সহজাত চৈতন্য ও আবেগ তাকে কোনো শক্তিধরের পক্ষেই চূড়ান্তভাবে ধ্বংস করা সম্ভব নয়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাংলাকে হিন্দুর ভাষা এবং বাংলা নববর্ষ পালনকেও হিন্দুয়ানি আচার অনুষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করে বাঙালি সংস্কৃতির মর্মমূলে আঘাত হানে। আর এই আঘাত থেকেই বাঙালি মুসলমানের মোহমুক্তি ঘটতে থাকে। বাঙালি মুসলমান সাম্প্রদায়িক দ্বি-জাতিতত্ত্বের খোলস ভেঙে হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এবং আত্মপরিচয়ের গৌরব পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ব্রতী হয়।

‘৪৮-‘৫২-এর ভাষা সংগ্রাম ষাটের দশকে স্বাধিকার আন্দোলনে উত্তরণ ঘটে। পাকিস্তানিরা রবীন্দ্রনাথকে ‘হিন্দু কবি’ আখ্যা দিয়ে রবীন্দ্রচর্চা নিষিদ্ধ করলে ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালনকে কেন্দ্র করে শিক্ষিত ও নাগরিক বাঙালি মধ্যবিত্ত স্বাধিকার আন্দোলনে নতুন গতিবেগ সঞ্চারিত করে। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু বাঙালির মুক্তিসনদ ৬-দফা ঘোষণা করেন। ৬-দফা বাঙালির জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আশা-আকাঙ্ক্ষাকে বাঙ্ময় ও সূত্রবদ্ধ করে এবং তাকে এক অপ্রতিরোধ্য রাজনৈতিক সংগ্রামে পরিণত করে।

এই পটভূমিতে সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট রমনার অশ্বত্থতলে (বটমূল) আয়োজন করে পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন উৎসব। বাংলা ১৩৭৪ সন অর্থাৎ ১৯৬৭ সাল থেকে এই নববর্ষ অনুষ্ঠান পালন বাঙালি নাগরিক মধ্যবিত্তের চিত্তে বাঙালিত্বের চেতনায় সঞ্চারিত করে নতুন প্রাণরস-নতুন গৌরববোধ। ক্ষুদ্র পরিসর ও সীমিত জনসমাগম থেকে ক্রমেই তা’ বিশাল জনসমুদ্রে পরিণত হয়। এভাবে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান পালনের পেছনে ছিল সক্রিয় প্রতিবাদী মনোভাবের পাশাপাশি সেকুলার বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা।

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলন, যা ছিল বাঙালি জাতিসত্তা নির্মাণের প্রধান কারিগর, রাজনৈতিক আন্দোলনকেও পরিপুষ্ট এবং সমৃদ্ধ করে। এভাবেই ধাপে ধাপে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা শানিত হতে হতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে পরিণত হয়। ১৯৭১ সালে বাঙালি জাতির তিন হাজার বছরের ইতিহাসে, আমরা আমাদের প্রথম এবং একমাত্র জাতি-রাষ্ট্র গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হই।

স্বাধীনতার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও বাঙালি জাতিসত্তার বিকাশের প্রধান রাজনৈতিক বাধা অপসৃত হয়; উন্মুক্ত হয় অমিত সম্ভাবনার স্বর্ণদুয়ার। পহেলা বৈশাখ ঘোষিত হয় অন্যতম জাতীয় উৎসব_ জাতীয় ছুটির দিনে। নববর্ষ উৎসব এখন আর রাজধানী ঢাকায় সীমাবদ্ধ

নেই। সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে, সকল জেলা, উপজেলায়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, গ্রামে-গঞ্জে সাড়ম্বরে পালিত হচ্ছে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। ধর্ম-বর্ণ, শ্রেণী-পেশা নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ সপরিবারে ১ বৈশাখের উৎসবে অংশগ্রহণ করে। নববর্ষ উদযাপন এখন বাঙালির সর্ববৃহৎ সেকুলার জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। এই উৎসবটির অসাধারণত্ব এখানে যে, বাংলাদেশ ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার আর কোনো দেশে এ ধরনের কোনো সর্বজনীনভাবে গ্রহণযোগ্য রাষ্ট্রীয়ভাবে নববর্ষ পালনের নজির নেই।

মূলধারার বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি বাংলাদেশের আদিবাসী ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোও তাদের ঐতিহ্য অনুসারে নববর্ষ পালন করে থাকে। যেমন চাকমারা ৩ দিনব্যাপী (চৈত্রের শেষ ২ দিন এবং ১

বৈশাখ) পালন করে বিজু উৎসব। মারমারা পালন করে ৪ দিনব্যাপী সাংগ্রাই উৎসব। ত্রিপুরাদের রয়েছে বৈসাবী বা বৈসুক এবং ম্রোদের ক্লুবংপস্নাই উৎসব। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নববর্ষ উৎসব আরও প্রাণবন্ত এবং ঐশ্বর্যমন্ডিত।

নববর্ষ পালনের ভেতর দিয়ে আমরা অতিক্রান্ত বছরটির অর্জন-বিসর্জন এবং সাফল্য-ব্যর্থতার সালতামামি যেমন করি তেমনি সকল গস্নানিবোধ ও হতাশা ঝেড়ে ফেলে নতুন আশায় বুক বেঁধে ভবিষ্যতের পথে পা বাড়াই।

শেষ করছি একটি ভিন্ন প্রসঙ্গ দিয়ে। সাধারণভাবে আমাদের দেশে অর্থবছর হিসেবে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের জুলাই-জুন’কে গণ্য করা হয়। সেভাবেই সরকারের বাজেট প্রণীত হয়। ফলে দেশের তথা সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতার সালতামামি করা হয় এই অর্থবছরকে ধরে। পক্ষান্তরে আমাদের লোকজীবনে অর্থবছর গণনা করা হয় বাংলা বৈশাখ-চৈত্র মাস ধরে। সরকারি ও জনজীবনের অর্থবছরের এই বৈসাদৃশ্য ঘুচানো কী অসম্ভব? ঔপনিবেশিক আমল থেকে চলে আসা এই সরকারি অর্থবছরকে কি আমরা বৈশাখ-চৈত্র (এপ্রিল-মার্চ) করতে পারি না? মুঘল আমল থেকে বর্তমান বাংলাবর্ষ গণনা শুরু হয়েছিল ফসলচক্র ও অর্থনীতির বৈশিষ্ট্যের কথা মনে রেখে।

সত্য বটে, সময় বদলেছে। বদলে গেছে অর্থনীতি, ফসলচক্র, জনজীবন ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ। তা’ সত্ত্বেও বৈশাখ-চৈত্র ধরে অর্থবছর গণনায় আমাদের বাধা কোথায়? আর কিছু বাধা যদি থেকেও থাকে, তা উত্তরণও সম্ভব হবে_ যদি রাজনৈতিকভাবে আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারি। আমাদের বাংলা বছরটিকে কেবল নববর্ষের উৎসব পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সারাবছর আমাদের জীবনের প্রাত্যহিকতায় ব্যবহার উপযোগী করতে পারলে বাঙালির জাতীয় গৌরববোধকেই নতুন মর্যাদায় অভিষিক্ত করা হবে।

[লেখক: রাজনীতিক]

[ad#bottom]