জগদীশচন্দ্র বসু

অমিত প্রতিভাবান বাঙালি বিজ্ঞানী
খালেদা ইয়াসমিন ইতি
অদম্য অধ্যবসায় আর নিরলস কর্মপদ্ধতি ছিল যার পথ চলার পাথেয়, সেই জ্ঞানসাধক বিজ্ঞানাচার্য জগদীশচন্দ্র বসু বিজ্ঞানমহলে একদিন মাথা উঁচু করে বাঙালির শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করেছিলেন। নিজের সব কর্মফলকে পৃথিবীর মানুষের কল্যাণে বিনাশর্তে দান করে তিনি যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, তা ইতিহাসে বিরল। বেতারযন্ত্র এবং জড়জগতের রহস্য উদ্ঘাটনকে ঘিরে তার রয়েছে শতাধিক চমকপ্রদ আবিষ্কার। বিবর্তনবাদের জনক চার্লস ডারউইনের সহযোগী স্যার লডার ব্রানটন মন্তব্য করেছিলেন, বিগত ৫০ বছরের মধ্যে শারীরবৃত্ত সম্বন্ধে যতসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা আমি এ পর্যন্ত দেখেছি তা আপনার আবিষ্কারের প্রদর্শনের সঙ্গে তুলনা করলে অনেক অপরিণত এবং স্থূল বলে মনে হয়। ১৯২৭ সালে লন্ডনের ‘ডেইলি এক্সপ্রেস’ লিখেছিল, ‘জগদীশচন্দ্র গ্যালিলিও এবং নিউটনের সমকক্ষ বিজ্ঞানী’। আমাদের বুক গর্বে ভরে যায় এই ভেবে যে, এ বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী জন্মগ্রহণ করেছিলেন আমাদের এই বাংলার মাটিতেই। স্বপ্ন দেখেছিলেন বাঙালিকে এক বিজ্ঞানমনস্ক জাতি হিসেবে গড়ে তোলার।

ফরিদপুরে সে সময় ছিল দুটি স্কুল। একটি সরকারি ইংরেজি স্কুল, অপরটি সাধারণের জন্য প্রতিষ্ঠিত বাংলা স্কুল। ইংরেজি স্কুলের দরজা খোলা ছিল সাহেব-বাবুদের ছেলেমেয়েদের জন্য। আর বাংলা স্কুলে পড়ত চাষি, মজুর, শ্রমিক, নিম্নমধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেমেয়েরা। জগদীশচন্দ্রের পিতা ভগবানচন্দ্র ছেলেকে চার বছর বয়সে ভর্তি করলেন সাধারণের বাংলা স্কুলে। জগদীশচন্দ্র তার বাল্যকাল সম্বন্ধে লিখেছেন_ ‘শৈশবকালে পিতৃদেব আমাকে বাংলা স্কুলে প্রেরণ করেন। তখন সন্তানদিগকে ইংরেজী স্কুলে প্রেরণ আভিজাত্যের লক্ষণ বলিয়া গণ্য হইত। স্কুলের দক্ষিণ দিকে আমার পিতার মুসলমান চাপরাসীর পুত্র এবং বাম দিকে এক ধীবরপুত্র আমার সহচর ছিল। তাহাদের নিকট আমি পশুপক্ষী ও জীবজন্তুর বৃত্তান্ত স্তব্ধ হইয়া শুনিতাম। সম্ভবত প্রকৃতির কার্য অনুসন্ধানে আমার অনুরাগ এইসব ঘটনা হইতেই বদ্ধমূল হইয়াছিল।’

শৈশবেই জগদীশ মা, মাটি, নদী, জল আর মাটির মানুষের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। তার একপাশে বসে থাকত চাষার ছেলে। গায়ে তার মাটির গন্ধ, চোখে তার হলদে ফুলে ভরা ফসলের মাঠ। আর একপাশে জেলের ছেলে। তাই তিনি আরও লিখেছেন, ‘জীবনের এই প্রান্তে এসে আজ আমি বুঝে ফেলেছি, জীবনের সবচেয়ে তলতলে কাঁচা বয়সে কেন আমাকে বাংলা স্কুলে পাঠানো হয়েছিল। নিজের ভাষা শেখো, নিজের ভাবে উদ্বুদ্ধ হও, নিজের ভাষার সাহিত্যের মাধ্যমে স্বদেশের সংস্কার ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হও। চিনে নাও নিজের উত্তরাধিকার। হূদয়ঙ্গম করো, তুমি ওদেরই একজন। বিচ্ছিন্ন নও, শ্রেষ্ঠ নও।’

ভ্রমণরসিক জগদীশ
১৮৭৭ সালে এফএ পরীক্ষা পাস করেন দ্বিতীয় বিভাগে। ১৮৮০ সালে স্নাতক পরীক্ষায়ও জুটল দ্বিতীয় বিভাগ। বাবার এখন ইচ্ছে বিলেতে ডাক্তারি পড়ানো। স্নেহময়ী মায়ের প্রথমে ছেলেকে হাতছাড়া করার শত আপত্তি থাকলেও পরে তিনিও রাজি হন। ভীষণ আর্থিক সংকটের মধ্যে জগদীশ অবশেষে বিলেতে রওনা হন ডাক্তারি পড়তে। কিছুদিন যেতে না যেতেই আবার সেই ভয়ঙ্কর কালা জ্বর। অসুস্থ হয়ে পড়তে থাকলেন তিনি বারবার। পরে ডাক্তার তাকে ডাক্তারি পড়া বাদ দেয়ার পরামর্শ দেন। ডাক্তারি ছেড়ে দিয়ে তিনি চলে গেলেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান শিক্ষার উদ্দেশ্যে। এত বাধা সত্ত্বেও জয় তিনি ঠিকই ছিনিয়ে আনলেন। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়নশাস্ত্র এবং উদ্ভিদ বিজ্ঞানে নিপুণ পারদর্শিতার ফলে কোন রকম গবেষণা ছাড়াই তিনি বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করলেন। তিক্ত একটি অভিজ্ঞতা থাকলেও জগদীশের ভ্রমণতৃষ্ণা ছিল অসীম।

শিক্ষাদান ও গবেষণাকর্মের ফাঁকে যখনই সময় পেতেন তখনই বের হতেন দীর্ঘ ভ্রমণে। সঙ্গে থাকতেন সুখ-দুঃখের সদাসঙ্গী স্ট্পী অবলা বসু। তাদের ঝোঁক ছিল সাধারণত সুবিখ্যাত তীর্থক্ষেত্র, প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণসহ দর্শনীয় স্থান ভ্রমণ_ অজন্তা, ইলোরা, তক্ষশিলা, নালন্দা, পাটলিপুত্র, বুদ্ধগয়া, সারনাথ, কাশ্মির, বদ্রীনাথ, পি-ারি হিমবাহ, রাজপুত শৌর্যের বিভিন্ন পীঠভহৃমি, উত্তরাখ-ের মোগল নগরীগুলো, পুরি, ভুবনেশ্বর, কোনারকের মন্দিরগুলো ও মন্দিরময় দাক্ষিণাত্যের আরও অনেক তীর্থভূমি এবং প্রাচীন নগরী পরিদর্শন করেন। তার ভ্রমণসঙ্গীরূপে বন্ধুরাও কখনো কখনো যোগ দিতেন। বুদ্ধগয়া, রাজগীর এবং নালন্দা ভ্রমণের সময় তাদের সহযাত্রী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যদুনাথ সরকার এবং ভগিনী নিবেদিতা। স্ত্রী ও বন্ধুবান্ধবসহ ওই হিমবাহের উদ্দেশে যাত্রা করে গঙ্গানদীর উৎস খুঁজে বের করেন।

শত বাধার বিরুদ্ধে জগদীশের লড়াই…
লন্ডনে পড়াশোনা শেষ করে জগদীশ ফিরলেন কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক হয়ে। কিন্তু অধ্যক্ষসহ কর্তৃপক্ষ তার নিয়োগের বিরোধিতা করলেন। তাদের যুক্তি ছিল বাঙালি কখনো ভালো শিক্ষক হতে পারে না। তারা জগদীশকে গবেষণার কোন সুযোগ তো দিলেনই না এমনকি তার বেতন কেটে ইংরেজ শিক্ষকদের বেতনের অর্ধেক করে দিলেন। প্রতিবাদে জগদীশ তিন বছর তার মাসিক বেতন ছুঁয়ে দেখেননি। অথচ তখন পিতার আর্থিক অবস্থা সংকটজনক। ভগবানচন্দ্র ঋণগ্রস্ত। তিনি মাথানত করেননি। তার পড়ার ধরন ছিল খুবই চমৎকার। সারা ক্লাস জগদীশের লেকচার শোনার জন্য পরিপূর্ণ হয়ে যেত। শিক্ষক হিসেবে তার মেধা এবং যোগ্যতার সামনে তার শত্রুদের শেষতক পরাজয় হলো। মাত্র বিশ বর্গফুট একটা কক্ষে জগদীশ তার গবেষণাগার শুরু করেছিলেন। টেকনিশিয়ান হিসেবে নিরক্ষর একজনকে হাতে-কলমে গবেষণার যন্ত্রপাতি তৈরি করা শিখিয়ে নিয়েছিলেন।

জগদীশ পদার্থবিজ্ঞানের পদ্ধতি প্রয়োগ করেছেন প্রাণ বা শরীরবৃত্তিক গবেষণার ক্ষেত্রে। শরীরতত্ত্ববিদরা তার এই সীমানা অতিক্রম করায় খুবই নাখোশ হয়েছিলেন। রয়েল সোসাইটিতে জগদীশ একদিন তার গবেষণার পরীক্ষা-নিরীক্ষা উপস্থাপন করলেন। তার উপস্থাপন শেষ হওয়ার পর ইলেকট্রোফিজিওলজির প্রধান বিজ্ঞানী স্যার জন বার্ডন স্যান্ডারসন জগদীশকে প্রশংসা করলেন ঠিকই কিন্তু তার প্রশংসার মধ্যে ছিল একটা বাঁকা কটাক্ষ। তিনি বললেন, ‘এটা আসলে দুঃখজনক যে, জগদীশচন্দ্র বসুর মতো একজন মেধাবী পদার্থবিজ্ঞানী পদার্থবিজ্ঞানের পথ ছেড়ে তার এখতিয়ারের বাইরে শরীরবৃত্তিক গবেষণার দিকে ঝুঁকছেন’। সাধারণ উদ্ভিদের বিদ্যুৎ তরঙ্গের প্রতিক্রিয়া জ্ঞাপন সম্পর্কে স্যার বার্ডন স্যান্ডারসন সাফ সাফ বললেন, এটা কোনভাবেই সম্ভব নয়। কারণ তিনিও এটা বহু বছর ধরে গবেষণা করে প্রমাণ করার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন। জগদীশ ঠা-া মাথায় সমালোচনাটা শুনলেন। সমালোচকদের যুক্তির বিরুদ্ধে তার বক্তব্য ছিল, তার গবেষণায় কোথায় ভুলত্রুটি আছে সেটা বিজ্ঞানসম্মতভাবে ধরিয়ে দিতে না পারলে তার গবেষণাপত্র তিনি যেমন লিখেছেন ঠিক তেমনিভাবে রয়েল সোসাইটির প্রসিডিংসে ছাপানো উচিত। সভায় সেই বিজ্ঞ সমালোচকদের মুখের ওপর চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়ার ফল হলো এই যে, তার গবেষণাপত্র রয়াল সোসাইটি থেকে আর প্রকাশিত হলো না। পরবর্তীকালে নিরলস কর্মপ্রচেষ্টার ফলে তিনি এক্ষেত্রেও সাফল্য অর্জন করেন।

জগদীশের গবেষণার প্রতি উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের প্রবল আপত্তির একটা কারণ তাদের প্রথাগত চর্চা এবং তখনকার বৈজ্ঞানিক-দার্শনিক চিন্তাভাবনার কাঠামোর মধ্যে জগদীশকে বোঝা সত্যিই কষ্টকর ছিল। কিন্তু জগদীশের বিরুদ্ধে আক্রোশের আরেকটি বড় কারণ হলো ধাতু, প্রাণী এবং উদ্ভিদ নিয়ে গবেষণার জন্য তিনি যেসব যন্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন সেটা তৈরি করতে তারা ব্যর্থ হয়েছিলেন। জগদীশ যদি সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতম সাড়া লিপিবদ্ধ করার জন্য তার মেধাবী ও বুদ্ধিদীপ্ত যন্ত্রগুলো আবিষ্কার করতে না পারতেন তাহলে পশ্চিমা বিজ্ঞানীরা তাকে পাগল বলেই আখ্যায়িত করতেন। তিনি জানতেন পশ্চিমাদের বোঝাতে হলে যন্ত্রগুলোর আরও উন্নতি সাধন করতে হবে। তিনি তাতে সক্ষমও হয়েছিলেন। ফলে উদ্ভিদবিদ্যায় নতুন নতুন উদ্ভাবন তিনি নিশ্চিত করলেন। তিনি সাফ সাফ ঘোষণা করলেন, তার গবেষণাগারের সব উদ্ভাবন ও আবিষ্কার হবে জনগণের সম্পত্তি। ওর ওপর কারও কোন প্যাটেন্ট বা ব্যক্তিমালিকানা থাকবে না। এর আগেও যখন তিনি বেতারযন্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন তখন তার প্যাটেন্ট নিতেও তিনি অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। মার্কোনি তার বেতারযন্ত্রের প্যাটেন্ট নেয়ার আগেই জগদীশের আবিষ্কার সম্পন্ন হয়েছিল। তিনি মার্কোনির আগে প্যাটেন্ট নেননি বলে বিজ্ঞানের ইতিহাস তাকে তার কৃতিত্ব থেকে বঞ্চিত করতে পারে না। এটা এখন প্রমাণ হয়েছে, ১৯০৯ সালে মার্কোনিকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়েছিল ভ্রান্ত সংবাদ এবং তথ্যের ভিত্তিতে। বেতারযন্ত্রের প্রথম আবিষ্কারক মার্কোনি নন, বাংলাদেশের জগদীশচন্দ্র বসুই।

[ad#bottom]