শ্রীনগরের প্রথম শহীদ মিনার

মো. জয়নাল আবেদীন
ভাষা শহীদের কথা আমি প্রথম জানতে পারি ১৯৬৫ সালে ষোলঘর একেএসকে উচ্চ বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়াকালে। আমাদের এক ক্লাশ উপরে পড়তেন পাশের গ্রামের আযাহার ভাই। ঐ বৎসর ২১ শে ফেব্রুয়ারি আযাহার ভাই নেতৃত্ব দিয়ে আমাদেরকে ক্লাশ থেকে বাইরে নিয়ে আসনে। বিদ্যালয় চত্বরে বিল্ডিং নির্মাণের জন্য রাখা বালুর স্তূপ থেকে বালু এনে তিনি উত্তর দক্ষিণে কবরের আকারে ইট ও ফুল দিয়ে সাজালেন। তিনিই ছিলেন একমাত্র বক্তা। ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্ররা কিভাবে ১৪৪ ধারা ভেঙ্গেছিল, ৪ জন ৪জন একত্রে গ্রুপ করে কিভাবে প্রতিবাদ করেছিল, পুলিশ কিভাবে গুলি করে রফিক, সালাম, বরকত, জব্বারকে হত্যা করেছিল এসব কথা আযাহার ভাই আমাদেরকে বলতেন। আমরা ষোলঘর স্কুলের ছাত্র থাকাকালে প্রতি বৎসর ২১ শে ফেব্রুয়ারি বুকে কালো ব্যাজ ধারণ করতাম এবং ‘শহীদ স্মৃতি অমর হোক, ‘শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দিব না’ ইত্যাদি শেস্নাগান দিয়ে মিছিল বের করতাম। ১৯৭০ সালে এমনি এক মিছিল নিয়ে শ্রীনগর থানার সামনের রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় আযহার ভাই থানা প্রাঙ্গণে উড়ানো চানতারা জাতীয় পতাকা নামিয়ে কালো পতাকা উত্তোলন করতে গেলে থানার তৎকালীন ওসি হাবিবুর রহমান বাধা দেন। তিনি আমাদের সামনে এসে বলেন ‘ওটা জাতীয় পতাকা আমি ওটা নামাতে দিব না। তোমরাও যখন অফিসার হবা তোমরাও ওটা নামাতে দিবা না’। আমরা ওসি সাহেবকে কালো ব্যাজ লাগাতে বললে তিনি বুক বাড়িয়ে বলেন ‘যতটা পারো লাগাও আমিও ভাষা শহীদদের পক্ষে’। স্কুলে পড়াকালে লক্ষ্য করতাম প্রতি বছর ২১ শে ফেব্রুয়ারিতে আমরা যখনি বেল বাজার সাথে সাথে শ্রেণীকক্ষ ত্যাগ করতাম তখন স্যারেরা লাইব্রেরী থেকে বেত হাতে নিয়ে আসতেন কিন্তু মারতেন না। মিছিলে যেতে বারণও করতেন না। যা থেকে ধারণা করা যায়-সে কালের শিক্ষকরা মিছিলে না এসেও পরোক্ষভাবে আমাদের সাথে একাত্ম বা সংহতি প্রকাশ করতেন।

১৯৭২ সালে ২১ শে ফেব্রুয়ারি আমরা উদযাপন করি শ্রীনগর উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বেগুনী রংয়ের কাগজ ও বাঁশের চাটি দিয়ে শহীদ মিনার বানিয়ে। ওটাই আমাদের শ্রীনগরে প্রথম শহীদ মিনার। ১৯৭২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেছিলেন শ্রীনগর কলেজের তৎকালীন ভাইস প্রিন্সিপাল আব্দুর রউফ খান। শ্রীনগর থানার সার্কেল অফিসার (উন্নয়ন) আব্দুর রহীমসহ সকল অফিসার, শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রীরা এ অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৭২ সালের শহীদ দিবসের অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা শহীদ মিনারের সামনে দাঁড়িয়ে শহীদদের উদ্দেশ্যে কবিতা আবৃত্তি ও সংগীত পরিবেশন করেছিল। পুরো অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছিলাম আমি। ১৯৭২ সালের ২০ শে ফেব্রুয়ারি সারা রাত জেগে কাগজ ও বাঁশের চাটি দিয়ে যে শহীদ মিনার আমরা বানিয়েছিলাম সে শহীদ মিনারের কথা আমরা কোনদিন ভুলবো না। কারণ এটাই ছিল আমাদের প্রথম শহীদ মিনার।

১৯৭৩ সালে শ্রীনগর কলেজে আমরা মাত্র ১৩০০ টাকা ব্যয়ে সুরকি, রড ও সিমেন্ট দিয়ে পাকা শহীদ মিনার নির্মাণ করি। এটাই শ্রীনগর থানা সদরের প্রথম স্থায়ী শহীদ মিনার। ১৯৭৩ সাল থেকে প্রতি বৎসর ২১ শে ফেব্রুয়ারি এই শহীদ মিনারে সকল ছাত্র, শিক্ষক ও জনতা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে আসছে। এর প্রায় তিন দশক পরে শ্রীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার চেষ্টায় একটি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার উপজেলা অফিসের দক্ষিণে নির্মিত হয়।

শ্রীনগর, মুন্সিগঞ্জ

[ad#bottom]