পহেলা বৈশাখ ও ছায়ানট

ইমদাদুল হক মিলন
কাল পহেলা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষ। আমরা কয়েক বন্ধু দিনভর ঘুরে ঘুরে সাদা পাঞ্জাবি কিনেছি। সুবর্ণা কিনেছে লালপাড়ের সাদা শাড়ি। পহেলা বৈশাখে ভোরবেলা রমনা বটমূলে যাবো ছায়ানটের অনুষ্ঠানে। রবীন্দ্রনাথের গানে গানে বর্ষবরণ করা হবে। আমরা গান শুনবো আর আড্ডা দেবো। সারারাত উত্তেজনায় ঘুমাতে পারি না। কখন ভোর হবে, কখন গিয়ে হাজির হবো ছায়ানটের অনুষ্ঠানে। বৈশাখের রোদে গরমে আমাদের দলের একটি মেয়ে অচেতন হয়ে পড়ে যাওয়ার আগে সুবর্ণা তাকে ধরে ফেললো। সেই মেয়ে আমার স্ত্রী। পরের বছর তাকে বললাম, ওরকম ভিড়ে গরমে যাওয়ার দরকার নেই। আবার ফিট হয়ে গেলে…! সে বলল, ফিট হলেও যাবো। পহেলা বৈশাখ রমনা বটমূলে যাবো না, ছায়ানটের অনুষ্ঠান দেখবো না, এটা হতেই পারে না।

তারপর অনেক বছর কেটে গেছে। পহেলা বৈশাখ আর ছায়ানট একাকার হয়ে বাঙালি জাতির বিশাল উৎসবে রূপান্তরিত হয়েছে। এখন মানুষের চাপে সেখানে যাওয়াই মুশকিল।

এই মুশকিল আসান করে দিলো চ্যানেল আই। ২০০২ সাল থেকে তারা ছায়ানটের পুরো অনুষ্ঠান রমনা বটমূল থেকে সরাসরি সমপ্রচার শুরু করলো। দেশের মানুষ যারা রমনা বটমূলে যেতে পারেন না তারা যাতে উপভোগ করতে পারেন অনুষ্ঠান আর বিদেশে বসবাস করছেন যে বিশাল বাঙালি জনগোষ্ঠী তারাও যেন উপভোগ করতে পারেন।

চ্যানেল আইয়ের মূল স্লোগান ‘হৃদয়ে বাংলাদেশ’। পরবর্তীকালে যুক্ত হলো ‘প্রবাসেও বাংলাদেশ’। বাংলাদেশকে হৃদয়ে ধারণ করে এই চ্যানেলটি অনেকগুলো নতুন ধারণা নিয়ে এলো টেলিভিশন অনুষ্ঠানে। সরাসরি সমপ্রচারের ক্ষেত্রে তৈরি করলো নতুন ইতিহাস। দিনভর রবীন্দ্র-নজরুল মেলা, পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান, আদিবাসী মেলা, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, মাতৃভাষা দিবস। পৃথিবীর ছয়টি মহাদেশের প্রবাসী বাঙালিরা সরাসরি দেখতে পান সেই অনুষ্ঠান।

কিছুদিন ধরে প্রতি মাসের শেষ শুক্রবার রাত দু’টো থেকে সকাল ন’টা পর্যন্ত আমি একটা গানের অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করি। ‘দেশের গান, ভাষার গান’ এই ধরনের শিরোনাম থাকে অনুষ্ঠানের। সরাসরি সমপ্রচারিত সেই অনুষ্ঠান চলাকালে প্রবাসী বন্ধুদের এত ফোন আসে, দেশের প্রতি তাদের মমত্ববোধ দেখে চোখ ভিজে যায়।
চ্যানেল আই প্রবাসী বাঙালিদের কাছে সরাসরি পৌঁছে দিচ্ছে প্রতিদিনকার বাংলাদেশ। দেশের দিকে মন পড়ে থাকা প্রবাসী বাঙালি ভাই বন্ধুরা তাকিয়ে থাকেন চ্যানেল আইয়ের দিকে। চ্যানেল আইয়ের কল্যাণে প্রবাসে থেকেও তারা থাকেন আসলে বাংলাদেশেই।

পহেলা বৈশাখ আসছে, এবারও ছায়ানটের অনুষ্ঠান সরাসরি দেখার জন্য অপেক্ষা করছিলেন প্রবাসী বাঙালিরা। তারা অনুষ্ঠানটি এবার দেখতে পাবেন না। ছায়ানট কর্তৃপক্ষ চ্যানেল আইকে তাদের অনুষ্ঠান প্রচারের অনুমতি দেননি। নয় বছর ধরে প্রতি বছর যে চ্যানেল এই কাজটি করে আসছে, আচমকা কেন তাদেরকে বাদ দেয়া হলো, প্রবাসী বাঙালিরা ভেবে পাচ্ছেন না। দেশের মানুষও অবাক।

বীণা খালা আমার প্রিয়তম বন্ধুদের একজন। সে কবি এবং রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী। থাকে ফ্লোরিডার ওয়েস্ট পামবীচে। পহেলা বৈশাখের দিন ছায়ানটের অনুষ্ঠানের সঙ্গে সময় মিলিয়ে সে লাল পাড়ের সাদা শাড়ি পরে টেলিভিশনের সামনে বসে। চ্যানেল আই তার চোখের সামনে তুলে ধরে রমনার বটমূল, ছায়ানটের অনুষ্ঠান। বীণা খালা ফোন করে খুবই মন খারাপ করা গলায় বললো, এবার ছায়ানটের অনুষ্ঠান দেখতে পারবো না, পহেলা বৈশাখের আনন্দটাই মাটি হয়ে গেল! ঘটনা কি রে?

ঘটনা যে কি, তা তো আমিও জানি না। কি জবাব দেবো তাকে! মন খারাপ করা কথা না বলে মজা করে বললাম, রবীন্দ্রনাথের ওই গানটার মতো অবস্থা, ‘সে কি এলো, সে কি এলো না, বোঝা গেল না গেল না’। পুরো ব্যাপারটাই রহস্যময়!

[ad#bottom]

One Response

Write a Comment»
  1. pohela boyshake megachonno are rode kub