সেবা না পেলেও নেই টাকা ফেরত

মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরের পুটিমার গ্রামের ষাটোর্ধ্ব আহসান উল্লাহ তার মেয়ে মাকছুদা বেগমকে (২৮) নিয়ে এসেছিলেন স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালে। প্রচণ্ড ব্যথায় কাতরাচ্ছিলেন মাকছুদা। অ্যাপেনডিক্সের সমস্যা সন্দেহ করে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক তাকে জরুরিভিত্তিতে আলট্রাসনোগ্রাম করাতে বলেন। কৃষক আহসান উল্লাহ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় ২২০ টাকা জমা দিয়ে একটি রশিদ নিয়ে রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগে যাই আলট্রাসনোগ্রাম করাতে। সকাল ৮টার বাজতে কিছুটা বাকি তখনো।”

আলট্রাসনোগ্রাম করানো রোগী বেশি থাকায় সেখানে কর্মরত চিকিৎসক আহসানকে বলেন, পরদিন আসতে। এরপর আহসান ফেরত যান জরুরি বিভাগের চিকিৎসকের কাছে।

ওই চিকিৎসকের অনুরোধেও কাজ হয়নি। ততক্ষণে মাকছুদার ব্যথা তীব্র হওয়ায় উপায়ান্তর না দেখে পাশের একটি ক্লিনিক থেকে ৮০০ টাকা খরচ করে আলট্রাসনোগ্রাম করান আহসান, যা মিটফোর্ডে তিনি করাতে পারতেন আড়াইশ টাকার মধ্যে।

এরপরে আহসান রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগে তার দেওয়া ২২০ টাকা ফেরত চাইলে তাকে জানানো হয়, পরীক্ষা না করালেও তিনি টাকা ফেরত পাবেন না।

“এক কর্মচারী বললো, সরকারি রশিদ কেটে টাকা জমা দেওয়া হলে পরীক্ষা না করালেও আর টাকা ফেরত দেওয়ার নিয়ম নেই”, বলেন আহসান।

গত সপ্তাহের ঘটনা এটি। এভাবে প্রতিদিনই পরীক্ষা না করেই এ হাসপাতালে টাকা জমা দিয়ে যাচ্ছেন চিকিৎসা নিতে আসা অনেকে, যারা দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে কম খরচে চিকিৎসা পাওয়ার আশায় বিভিন্ন সরকারি এ হাসপাতালে আসেন।

রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ফরিদ আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “শুধু এ বৃদ্ধই (আহসান) নয়, প্রতিদিন কমপক্ষে ৪০/৪৫ জন রোগী টাকা জমা দিয়ে ভিড়ের চাপে আলট্রাসনোগ্রাম না করিয়ে চলে যান।”

গত সপ্তাহের আগের সপ্তাহে তিন দিনে ১২৬ জন রোগী এভাবে টাকা জমা দিয়ে পরীক্ষা না করিয়ে চলে যান বলে একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, পরীক্ষা না করেই গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৫ হাজার টাকা এভাবে সরকারি কোষাগারে দিয়ে যাচ্ছেন রোগীরা।

পরীক্ষা না করানোর কারণ জানতে চাইলে ফরিদ বলেন, “আমাদের ১০০ জন রোগীর আলট্রাসনোগ্রাম করার মতো জনবল রয়েছে। কিন্তু প্রতিদিন গড়ে মিটফোর্ড হাসপাতালে ১৪০ জন রোগী আসেন, তাই প্রতিদিন ৪০ জন রোগীর আলট্রাসনোগ্রাম করানো সম্ভব হয় না।”

সম্ভব না হলে বাড়তি রোগীর কাছে টাকা নেওয়ার কারণ কী- জানতে চাইলে তিনি বলেন, “কর্তৃপক্ষ সব রোগীকে আলট্রাসনোগ্রাম করানোর নির্দেশ দিয়েছে। তাই সবারই করানোর চেষ্টাটা করা হয়।”

তবে হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আবুল হাসেম খান বলেন, গত বছর ইউজার ফি বন্ধ করে দেওয়ার পর থেকে সমস্যাটি বেড়েছে।

পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রে আগে শতকরা ৫০ শতাংশ অর্থ ইউজার ফি হিসেবে চিকিৎসক ও কর্মচারীরা পেতেন। কিন্তু গত বছরের মে মাস থেকে সে সুবিধা বন্ধ করে দিয়েছে সরকার।

এ কারণে চিকিৎসক ও কর্মচারীরা বেশি রোগীকে পরীক্ষা করতে তেমন আগ্রহী নন বলে আবুল হাশেমের দাবি।

তবে তার এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. রুয়েদ হোসেন।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আগে প্রতিদিন গড়ে ৭০/৮০ জন রোগী হতো, কিন্তু এখন তা বেড়ে ১৩০-১৪০ জন হয়েছে। কিন্তু জনবল আগে যা ছিলো, এখনও তা-ই রয়েছে।”

রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগে সব মিলিয়ে ১০ জন চিকিৎসক রয়েছে। তাদের দুটি শিফটে কাজ করতে হয়।

পরীক্ষা না করা হলেও টাকা ফেরত না দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে ডা. রুয়েদ বলেন, “রশিদ কাটার পর টাকা সরকারি কোষাগারে না দেখালে পরে অডিটে আপত্তি তুলবে। এতে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের পেনশনের টাকা পেতে অসুবিধায় পড়তে হবে, তাই টাকা ফেরত দেওয়া হয় না।”

কামাল হোসেন তালুকদার

[ad#bottom]