নতুন বিমানবন্দর নির্মাণ বিতর্ক

আড়িয়ল বিলে বিমানবন্দর নির্মাণের সরকারি সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে গত শনিবার বিল এলাকায় আবার মিছিল ও বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে। সমাবেশ থেকে বলা হয়েছে, শত লাশের বিনিময়ে হলেও আড়িয়ল বিল রক্ষা করা হবে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, সার্বিক দিক বিবেচনায় আড়িয়ল বিলে বিমানবন্দর হলে ক্ষতির তুলনায় লাভই বেশি। তিনি বিল এলাকায় জমির ক্ষতিগ্রস্ত মালিকদের তিনগুণ মূল্য পরিশোধের কথা বলেন।

বিমানবন্দর নির্মাণের ঘোষণার পর থেকে আড়িয়ল বিলের বাসিন্দারা এর বিরোধিতা করছে। সেখানকার ২৫ গ্রামের মানুষের ভাষ্য হচ্ছে, এই বিল ধ্বংস হলে প্রায় ১০ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা বিপর্যস্ত হবে। শুকনো মৌসুমে সেখানে ধান উৎপন্ন হয় এবং বর্ষা মৌসুমে মাছ পাওয়া যায়। অনেক কৃষক ও মৎস্যজীবী এর ওপর নির্ভরশীল। বিমানবন্দর নির্মাণের খবরে স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া বোধগম্য। এর মধ্যে তাদের অস্তিত্ব সংকটের প্রশ্ন রয়েছে। এজন্য তারা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেছে। দুঃজনকভাবে সরকার তাদের শঙ্কা আর ক্ষোভকে এখন পর্যন্ত যথার্থভাবে অনুধাবন করতে পারেনি। যে কারণে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভের মধ্যে ষড়যন্ত্র খোঁজা হচ্ছে।

স্থানীয় মানুষের স্বার্থকে উপেক্ষা করা সরকারের জন্য সমীচীন নয়। প্রতিমন্ত্রী জমির মালিকদের তিনগুণ বেশি মূল্য দিতে চেয়েছেন। মন্ত্রী মহোদয়কে বুঝতে হবে যে, প্রশ্নটা জমির মূল্যের নয়। জমি বিক্রির পর একজন কৃষক কী করবেন, বিল নিশ্চিহ্ন হওয়ার পর জেলে জীবনধারণ করবেন কী ভাবে_ সেটিও ভেবে দেখতে হবে। সরকার হয়তো এমন এলাকাও খুঁজে নিতে পারে যেখানে স্থানীয়রা বিমানবন্দর নির্মাণকে স্বাগত জানাবে।

৫০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন বিমানবন্দর নির্মাণের প্রয়োজন কতটা এ প্রশ্নও ওঠেছে। নতুন বিমানবন্দর নির্মাণ-সংক্রান্ত সরকারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতের চাহিদা মেটাতে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বর্তমান অবকাঠামো যথেষ্ট নয়। এর চারদিকে আবাসিক এলাকা ও সেনানিবাস থাকায় ভবিষ্যতে সম্প্রসারণ সম্ভব নয়। প্রতিবেদনে আরও অনেক কারণ তুলে ধরা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট অনেকের কাছে এসব কারণ যৌক্তিক মনে হয়নি। তারা বলছেন, দেশে আরও ২টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রয়েছে। আর অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরের সংখ্যা ৫। তদোপুরি গত রোববার প্রকাশিত একটি জাতীয় দৈনিকের রিপোর্ট থেকে জানা গেল, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ব্যবহার তার ক্ষমতার তুলনায় অনেক কম। ক্রমবর্ধমান ফ্লাইট ও যাত্রী বৃদ্ধির হিসাব অনুযায়ী বর্তমান অবকাঠামো নিয়েই আরও ২০ বছর শাহাজালাল দিয়ে আকাশপথে যোগাযোগ সমস্যা হওয়ার কথা নয়। এ অবস্থায় ৫০ হাজার কোটি টাকা খরচের যৌক্তিকতা কতটুকু_ এটি আমাদেরও প্রশ্ন। দেশে বিমানবন্দর নির্মাণের চেয়েও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে, যা জরুরি ভিত্তিতে করা দরকার। অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ কাজে এখনই এতগুলো টাকা খরচ করার আগে সরকারকে গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে। এটি শুনতে ভালো শোনাবে যে, সরকার ভবিষ্যতের কাজ এখনই করে রাখতে চায়। তবে দেশের বিদ্যমান বাস্তবতায় ভবিষ্যতের কোন কাজকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে_ সেটি আগে ঠিক করা দরকার।

সরকার জলাভূমি তথা পরিবেশ রক্ষায় অঙ্গীকারবদ্ধ। এজন্য ড্যাপ প্রণয়ন করা হয়েছে। আড়িয়ল বিলে বিমানবন্দর নির্মাণ করলে জলাভূমি রক্ষায় সরকারি অঙ্গীকারের কী হবে?

[ad#bottom]