আড়িয়ল বিলেই বঙ্গবন্ধু বিমানবন্দর হতে হবে এটাই সরকারের শেষ কথা নয়

প্রয়োজনে পদ্মার ওপারে সরিয়ে নেয়ার চিন্তা
দুলাল আহমদ চৌধুরী ও মিলটন আনোয়ার: মুন্সীগঞ্জের আড়িয়ল বিলেই বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মিত হতে হবে এটাই শেষ কথা নয়। প্রয়োজনে বিমানবন্দর নির্মাণের স্থান নির্ধারণে আবারো পরিবর্তন আসতে পারে। আড়িয়ল বিল এলাকায় জনসমর্থন না থাকলে তা পদ্মার ওইপাড়ে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এনিয়ে ভাবতেও শুরু করেছে সরকার। কোনো অবস্থাতেই এই বিমানবন্দর নিয়ে বিরোধী দল যেন কোনো ধরনের ফায়দা নিতে না পারে সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা হচ্ছে। প্রয়োজনে পুরো পরিকল্পনা নিয়ে সরকার নতুন করে ভাববে বলে উচ্চপর্যায় থেকে এমনটাই আভাস পাওয়া গেছে।

এর আগেও এই বিমানবন্দরের জন্য প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত স্থান পরিবর্তিত হয়েছে। প্রথমে ময়মনসিংহের ত্রিশালে এই বিমানবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল। কিন্তু ওই স্থানে বিমান বাহিনীর ফ্লাইং জোনের অবস্থান হওয়ায় সরকার নতুন স্থান হিসেবে আড়িয়ল বিলকে নির্বাচিত করে। সেসময় শুধু আড়িয়ল বিল নয়, শরিয়তপুর জেলার জাজিরা, মাদারীপুর জেলার শিবচর ও ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গার মালিগ্রাম এলাকাসহ পদ্মার ওইপাড়ে সম্ভাব্য নতুন এ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য স্থান পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্ট কমিটি।

এরপর থেকে আড়িয়ল বিল এলাকার জনগণ এই বিমানবন্দর নির্মাণের বিরোধিতা করে আন্দোলন শুরু করে। সর্বশেষ শনিবার রাতে বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া এই আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে একে আরো বেগবান করার ঘোষণা দেন।

বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী এই বিমানবন্দর কেন্দ্রিক একটি শহর স্থাপনেরও পরিকল্পনা ছিল। জমির অপচয় ঠেকাতে এই শহর স্থাপনের পরিকল্পনা থেকেও সরকার সরে আসছে বলে জানা গেছে। সূত্রমতে বিমানবন্দরের জন্য ২৫ হাজার একর নয়, অপচয় কমাতে ১০ হাজার একরের বেশি জমি ব্যবহার না করার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।

সূত্রমতে, শেষ পর্যন্ত আড়িয়ল বিলেই বিমানবন্দর হলে এর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য যাতে নষ্ট না হয় তার দিকে সর্বোচ্চ নজর রাখা হবে। এর পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সংঘাত এড়িয়ে আলোচনার ভিত্তিতে তাদের সম্মতিতে আড়িয়ল বিলে বিমানবন্দর করার পক্ষপাতী সরকার। স্থানীয় জনসাধারণকে ভুল বুঝিয়ে বা তাদের ক্ষতিগ্রস্ত করে কোনো কিছু না করতে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। সরকার কাউকে বাস্তুচ্যুত করতে চায় না। যাদের জমি নেয়া হবে তাদের যুক্তিসঙ্গত মূল্য প্রদানে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়া এই প্রকল্প নিয়ে যেন কোনো গুজব ছড়াতে না পারে সে বিষয়েও সরকার সতর্ক রয়েছে।

আমাদের সময়
—————————————————

আড়িয়াল বিলে না হলে ভাঙ্গা বা রাজৈরে হবে বিমানবন্দর

প্রকল্পটি বাতিল হলে এলাকাবাসীর ক্ষতি হবে : সচিব

আড়িয়াল বিল এলাকার মানুষ বিমানবন্দর নির্মাণের বিরুদ্ধে অবিচল থাকলে সরকার বিকল্প চিন্তা করতে পারে। সে ক্ষেত্রে ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় বা মাদারীপুরের রাজৈরে বিমানবন্দর নির্মাণের কথা ভাববে সরকার। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন সচিব শফিক আলম মেহেদী এ ইঙ্গিত দিয়েছেন। এর পাশাপাশি তিনি এ-ও বলেছেন, আড়িয়াল বিলে বিমানবন্দর নির্মাণের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কোনো পরিকল্পনা আপাতত সরকারের নেই। আবার এলাকাবাসী না চাইলে জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার কোনো ভাবনাও সরকারের নেই। গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে তিনি এসব কথা বলেন।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন সচিব বলেন, সে ক্ষেত্রে ফরিদপুর বা মাদারীপুরের সুবিধাজনক কোনো স্থানে বিমানবন্দর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। তবে আপাতত আড়িয়াল বিলেই বিমানবন্দর নির্মাণের চেষ্টা চলবে।
শফিক আলম মেহেদী আরো বলেন, বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য ঢাকার আশপাশে যতগুলো স্থানের ওপর সমীক্ষা চালানো হয়েছে, তার মধ্যে আড়িয়াল বিলের জায়গাটি বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য বেশি উপযুক্ত। এখানে বিমানবন্দর নির্মিত হলে মানুষজন সবচেয়ে কম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ এখানে একফসলি জমি বলে কৃষিপণ্য উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব পড়বে না। এ ছাড়া এখানে ব্যক্তিগত কোনো স্থাপনাও নেই। ফলে উচ্ছেদেরও প্রয়োজন হবে না।

সচিব আরো বলেন, আড়িয়াল বিলে কয়েক হাজার বিঘা সরকারি খাসজমি রয়েছে। কিছু অসাধু ব্যক্তি অবৈধভাবে এগুলো ভোগদখল করে আসছে। তারাই আন্দোলনকে উসকে দিচ্ছে এবং নিজেদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করছে। তারাই বিমানবন্দর নির্মাণের বিরোধিতা করছে।

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আড়িয়াল বিলের ২৫ হাজার একর জমিতে বিমানবন্দর ছাড়াও বঙ্গবন্ধুর নামে একটি আধুনিক শহর গড়ে তোলার বৃহৎ পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এটা হলে মুন্সীগঞ্জসহ দোহার-নবাবগঞ্জের আমূল উন্নয়ন সাধিত হবে। প্রচুর কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ১০ হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে জমির মালিকরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে জন্য তাঁদের বাজারমূল্যের চেয়ে তিন গুণ দাম দেওয়া হবে।

মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, যাঁদের জমি অধিগ্রহণ করা হবে, আধুনিক আবাসিক শহরে তাঁদের প্লট বরাদ্দ দেওয়া হবে। যাঁরা এলাকার উন্নয়নের চিন্তা করেন, তাঁরা চান আড়িয়াল বিলে বিমানবন্দর হোক। কিন্তু খাসজমির দখলদার ও কিছু বিরোধীদলীয় লোকই আন্দোলনকে উসকে দিচ্ছে। প্রায় প্রতিদিনই লোকজনকে বিমানবন্দরবিরোধী মনোভাব তৈরিতে উজ্জীবিত করা হচ্ছে।

জানা গেছে, আড়িয়াল বিলে সম্ভব না হলে বিমানবন্দরটি ফরিদপুর কিংবা মাদারীপুরে নির্মাণের কথা ভাববে সরকার। সূত্র মতে, এর আগেও ফরিদপুরে বিমানবন্দর নির্মাণের ব্যাপারে সরকার আগ্রহী হয়েছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর জন্মভূমি বৃহত্তর ফরিদপুরের মধ্যে বিমানবন্দর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ায় সরকারের সমালোচনা হবে_এ জন্যই সরকার আড়িয়াল বিলে বিমানবন্দর নির্মাণের ব্যাপারে আগ্রহী হয়।

সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে আড়িয়াল বিলে বিমানবন্দর হলে সরাসরি ঢাকার সঙ্গে মুন্সীগঞ্জে মাত্র ৩০ মিনিটে যাতায়াতের ব্যবস্থা করার। এ জন্য ঢাকার জিরো পয়েন্ট থেকে আড়িয়াল বিল পর্যন্ত ২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এলিভেটেড এঙ্প্রেসওয়ে নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া থাকবে সরাসরি আধুনিক রেল যোগাযোগব্যবস্থা। মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে একটি বৃহৎ রেলওয়ে জংশন হবে। এখান থেকে গজারিয়া, দাউদকান্দি, লাকসাম, সিরাজদিখান, শ্রীনগর, ফতুল্লা, নিমতলা, কেরানীগঞ্জ, দৌলতদিয়া, দোহার, পাটুরিয়া, হরিরামপুর, সিঙ্গাইর, টঙ্গী ও জয়দেবপুরে আধুনিক রেলযোগাযোগ ও সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হবে। কিন্তু বিমানবন্দর নির্মাণের উদ্যোগ বাতিল হলে এগুলোও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। আধুনিক আইটি ভিলেজ নির্মাণের পরিকল্পনাও সেই সঙ্গে বাতিল হবে।

জানা গেছে, দোহার-নবাবগঞ্জ ও শ্রীনগরবাসী এ ধরনের প্রকল্পে খুশি হবেন_এমনটা ভেবেই একাধিক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর অনুরোধে সরকারের শীর্ষ পর্যায় আড়িয়াল বিলকে বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য মনোনীত করেছিল। এ ছাড়া বিমানবন্দরের জন্য এ জায়গাটিও সবচেয়ে নিরাপদ। সরকারের তরফ থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো প্রকল্পও এটা না। আর বিমানবন্দর নির্মাণের খবরে ইতিমধ্যেই এসব এলাকায় জমির দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে।
সম্প্রতি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আব্দুল মান্নান খান কালের কণ্ঠের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, চলতি সরকারের আগামী তিন বছরের মধ্যে অন্তত একটি রানওয়ের কাজ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা সরকারের আছে। এখানে বিমানবন্দরের সঙ্গে সড়ক ও মহাসড়ক যুক্ত থাকবে। এ ছাড়া এই এলাকায় গড়ে তোলা হবে এঙ্পোর্ট প্রসেসিং জোন, ট্রেড সেন্টার, পর্যটন স্পট ও অন্যান্য শিল্প। এসবের সরাসরি সুফলভোগী হবে মুন্সীগঞ্জের মানুষ। বিদ্যুৎ-গ্যাস যাওয়ায় এলাকার মানুষের জন্য একটি বিশাল সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হবে। অন্তত ১০ লাখ লোক বিমানবন্দর প্রকল্পের সরাসরি সুফল পাবেন। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ও মুন্সীগঞ্জে স্থাপন করা হবে। মুন্সীগঞ্জে যাঁদের পাঁচ কাঠা জমি আছে, তাঁরা বুঝতে পারবেন, এই জমির কী মূল্য। প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, বিমানবন্দরটি হলে সোনা ও হীরার খনিতে পরিণত হবে মুন্সীগঞ্জের মাটি। মানুষের ভাগ্য খুলে যাবে।

কালের কন্ঠ
—————————————-

[ad#bottom]