আলুর ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে কৃষক

বাড়তি সুবিধা যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে
সৈয়দ মিজানুর রহমান: আলুর ওপর থেকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে কৃষক। বাম্পার ফলনেও বাড়তি কোনো সুবিধা পাচ্ছেন না তারা। বরং আলুর বাজার এখন ফড়িয়া ও হিমাগার মালিকদের পুরোপুরি দখলে চলে গেছে। আলুচাষীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিবছরই তাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। লোকসানের মুখে অনেক কৃষি চাষ বাদ দিয়ে দিচ্ছেন। ঝুঁকছেন অন্য ফসলের দিকে।

চাহিদার তুলনায় অপর্যাপ্ত হিমাগারের সুযোগ নিয়েই কৃষকের সুবিধা লুফে নিচ্ছে হিমাগার মালিক ও মধ্যস্বত্বভোগীরা। এর ফলে কষ্ট করে চাষ করা আলুর ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন কৃষক।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০০৮, ০৯ এবং ১০—এ তিন বছরে দেশের সবচেয়ে বেশি আলু উত্পাদনকারী জেলা মুন্সীগঞ্জে যথাক্রমে ১১, ১০ এবং সাড়ে ১১ লাখ টন আলু উত্পাদন হয়েছে। ওই জেলায় হিমাগার আছে ৭১টি, যার সবক’টি মিলে ধারণক্ষমতা মাত্র সাড়ে ৪ লাখ টন। আবার হিমাগারগুলোর সবক’টি চালু থাকছে না প্রতিবছর। এবছর ৭১টি হিমাগারের মধ্যে ২০০৯ সালে চালু ছিল ৫৯টি। আর বর্তমানে চালু আছে ৬৬টি।
এদিকে হিমাগারের ধারণক্ষমতা থেকে প্রায় তিনগুণ বেশি আলু উত্পাদন করে সব সময় বিপাকে পড়তে হয় কৃষকদের। এ বিষয়ে আলু উত্পাদনকারী কৃষক নিয়াজ হোসেন আমার দেশকে জানান, প্রতিবছরই তাকে আলু নিয়ে শঙ্কার মধ্যে থাকতে হয়। উত্পাদন মৌসুমের শুরুতেই হিমাগারগুলোর কোটা বিক্রি হয়ে যায়। পরে বেশি টাকা দিয়ে আলু রাখার জন্য কোটা কিনতে হয়। আবার দালাল ধরেও অনেক সময় কোটা পাওয়া যায় না। ফলে মৌসুমে উত্পাদন খরচের তুলনায় অর্ধেক দরেই ক্ষেতের আলু বিক্রি করে দিতে হয়। তিনি জানান, তার মতো অবস্থা অন্যদেরও।

এদিকে কৃষকরা মাঠ থেকে কম দামেই আলু বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। আর সেই আলু কিনে নিচ্ছেন মধ্যস্বত্বভোগীরা। তারা হিমাগার মালিকদের অগ্রিম টাকা দিয়ে আগে থেকেই জায়গা দখল করে নেন। ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকরা চাইলেও হিমাগারে আলু রাখতে পারছেন না।

কেন কৃষকদের আলু রাখা হয় না জানতে চাইলে গতকাল টেলিফোনে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ার একজন হিমাগার মালিক জানান, আগে আলু রাখার জন্য শুধু কৃষকই আসত। এখন রাজনৈতিক দলগুলোর স্থানীয় নেতা ও এলাকার মাস্তানদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে এ ব্যবসা। ফলে কৃষকের আলুর স্থান না হলেও এলাকার মাস্তান ও রাজনৈতিক দলগুলোর স্থানীয় নেতাদের নামে কোটা দিতে হয়।

এছাড়া হিমাগার মালিকদের অভিযোগ, বিদ্যুতের ঘন ঘন যাওয়া-আসার কারণে তাদের ধারণক্ষমতা পুরোপুরি কাজে আসছে না। এতে হিমাগার ফাঁকা থাকলেও কৃষকদের আলু রাখা যাচ্ছে না। ফলে যেমন বাড়তি ভাড়া নিচ্ছেন অনেক হিমাগার মালিক, আবার কৃষকদের আলুও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, আলু সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত হিমাগার থাকলে সংরক্ষণ করা আলু বিক্রি করে কৃষকরা লাভের মুখ দেখত আর মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যও কমে আসত। জানা গেছে, এরই মধ্যে বাজারে নতুন আলু উঠতে শুরু করেছে। এর মধ্যেই দাম কমছে আলুর। সরকারি বাজার তদারকি প্রতিষ্ঠান টিসিবি জানিয়েছে, বর্তমানে বাজারে প্রতিকেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ১০ থেকে ১২ টাকায়। ৩-৪ মাস আগে অবশ্য দর ছিল প্রায় দ্বিগুণ। আলু উত্পাদনের ভরা মৌসুমে দর আরও কমতে পারে বলে মনে করছেন কৃষকরা।

[ad#bottom]