প্রবাসীদের ‘বড়দিন’ উদযাপন

রাহমান মনি
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মানুষ ধর্মভীরু কিন্তু ধর্মান্ধ নয়। হাজার বছর ধরে এই ভূখ-ে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান পাশাপাশি সহাবস্থান করছে। প্রবাসে এই সহাবস্থান আরো দৃঢ় হয়েছে। প্রবাসে যে কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজনে সব ধর্মের লোক শুধু অংশগ্রহণই করে না, আর্থিক, কায়িক সব ধরনের সহযোগিতা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই করে থাকে। তাই সংখ্যাতত্ত্বেও প্রবাসের কোনো অনুষ্ঠান সাফল্যের মুখ দেখে না। দেখে সকলের সহযোগিতায়।

জাপানে প্রবাসী বাংলাদেশি খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরা এই প্রথমবারের মতো বড়সড় আনুষ্ঠানিকভাবে একমাত্র ধর্মীয় অনুষ্ঠান ‘বড়দিন’ জাঁকজমকভাবে পালনের আয়োজন করেছিল।

২৬ ডিসেম্বর ২০১০ টোকিওর পার্শ্ববর্তী শহর সাইতামা কেন-এর সোকা শহরের সেজাকি কমিউনিটি সেন্টারে প্রবাসী খ্রিস্টানরা সম্মিলিতভাবে এই মহতী এবং পবিত্র ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলাদেশ-জাপান খ্রিস্টান সোসাইটি (ইঔঈঝ) নামের সংগঠন থেকে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাপানস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত এ কে এম মজিবুর রহমান ভূঁইয়া। বিশেষ অতিথির আসন অলংকৃত করেছিলেন ঝধরহঃ ঊমহবংযরধং ঈযঁৎপয এর প্রধান পুরোহিত ইতালিয়ান বংশোভূত জবা. ঋধঃযবৎ উড়সরহরপড় ঠরঃধষ।
ক্রিসমাস ট্রি আলোকসজ্জা, আলোচনা সভা (শুভেচ্ছা বক্তব্য), কেক কাটা এবং চিয়ার্স, গীতিনকসার মাধ্যমে খ্রিস্টীয় সঙ্গীত পরিবেশন, সাঙ্গ্যভোজ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং সবশেষে সমাপ্তি ঘোষণা।

ইঔঈঝ এর আহ্বায়ক জেরোম গোমেজ-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত শুভেচ্ছা বক্তব্য পর্ব পরিচালনা করেন মেরিলিন তুলি গোমেজ। শুভেচ্ছা বক্তব্যে রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশ গণতন্ত্র, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ, সকল ধর্ম মতের মানুষের আচার-অনুষ্ঠান, কৃষ্টি-সংস্কৃতি পালন করার স্বাধীনতা বাংলাদেশে সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত। এ দেশের মানুষ আবহমান কাল ধরেই ঈদ, পূজা, বড়দিন, বুদ্ধ পূর্ণিমাসহ সকল ধর্মীয় উৎসব পারস্পরিক অংশগ্রহণের ভিত্তিতে পালন করে আসছে। দেশীয় সংস্কৃতির এই বলিষ্ঠ ধারা জাপান প্রবাসী বাঙালি সম্প্রদায়ের মাঝেও সমভাবে বিরাজমান। আমি আশা করি আগামী দিনগুলোতে আমাদের পারস্পরিক সহনশীলতা, সহযোগিতা এবং শ্রদ্ধাবোধের চেতনা আরো শক্তিশালী হবে। দূতাবাস আপনাদের এই ধরনের যে কোনো আয়োজন সবসময় সহযোগিতা করবে।

শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন জবা. ঋধঃযবৎ উড়সরহরপড় ঠরঃধষ। তিনি বলেন, ২০০০ বছরেরও আগে বণি ইসরাইল সম্প্রদায়ের লোকজন ঈশ্বরের উপাসনার বদলে পাপাচারে লিপ্ত হয়ে অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েছে। তখন সুপথ দেখাতে এমন দিনে শীতের রাতে বেথেলহেমে জীর্ণ এক গোশালায় ত্রাতা হিসেবে জন্ম নেন যিশু। যিশুখ্রিস্ট মানবজাতিকে পাপাচার থেকে মুক্ত করতে আমৃত্যু মানুষের মাঝে শান্তির বাণী ছড়িয়ে দিয়েছেন। শত অত্যাচারে ঈশ্বরের বাণী প্রচারে বিরত হননি। তিনি বিশ্ব মানবতায় শান্তির জন্য সবাইকে যিশুখ্রিস্টের আদর্শ অনুসরণের আহ্বান জানান।

সভাপতির শুভেচ্ছা বক্তব্যে জেরোম গোমেজ বলেন, জাপান প্রবাসীদের মধ্যে খ্রিস্টানদের সংখ্যা খুবই কম, তবুও আমরা হতাশ হইনি। কারণ আমাদের প্রবাসী বাংলাদেশি বন্ধুরা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আমাদের সব ধরনের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। তাদের এই সহযোগিতায় আমরা অতিশয় আনন্দিত এবং কৃতজ্ঞ। আগামীতেও যেন আমরা সবার সঙ্গে সুখ-দুঃখে ভাগিদার হতে পারি সেই কামনা করি। শুভেচ্ছা বক্তব্য পর্বে ইঔঈঝ-এর সম্মানিত সদস্যদের পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলো সজল ডি ক্রজ, অপি গোমেজ, গিলবার্ট গোমেজ, জনশংকর গোমেজ, ইনোউয়ে নোরিকো, লিনা গোমেজ, আন্তনী ফ্রান্সিস গোমেজ সজল, জুলিয়ান গোমেজ রকি, মেরিলিন তুলি গোমেজ প্রমুখ।

আলোচনা শেষে গীতিনকসার মাধ্যমে খ্রিস্টীয় ধর্মীয় সঙ্গীত পরিবেশন করা হয়। ধর্মীয় সঙ্গীতে সার্বিক সহযোগিতা এবং অংশগ্রহণে ছিল প্রবাসীদের প্রিয় স্থানীয় ‘উত্তরণ’ বাংলাদেশি কালচারাল গ্রুপ।

ধর্মীয় সঙ্গীতানুষ্ঠান শেষে আমন্ত্রিত অতিথিদের নৈশভোজে আপ্যায়ন করা হয়। হরেক রকমের সুস্বাদু খাবার, পানীয় এবং ডেজার্টের স্বাদে সকলেই আড্ডায় মেতে থাকে।

নৈশভোজের পর বিভিন্ন শিল্পীদের অংশগ্রহণে এবং উত্তরণের সহযোগিতায় এক মনোজ্ঞ সঙ্গীতানুষ্ঠান উপহার দেয়া হয়। এতদিন যারা পর্দার আড়ালে থেকে কাজ করে থাকতেন তাদেরকে মঞ্চে ডেকে গান গাওয়ানোর দুরূহ কাজটি করেন উপস্থাপক নিয়াজ আহমেদ জুয়েল। দর্শকদের আনন্দে উল্লাসে শেখ ওয়াজির আহমেদ এবং সঞ্জয় দত্তের সঙ্গীতানুষ্ঠানটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।

‘বড়দিন’ ২০১০ উদ্যাপনকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য বিশ্বজিত দত্ত বাপ্পার সম্পাদনায় একটি ব্রশিয়র বের করা হয়। ব্রশিয়রটিতে বিভিন্ন সহযোগিতায় যারা হাত বাড়িয়েছেন তাদের নাম উল্লেখ করে কৃতজ্ঞতা জানানোতে নতুনত্ব ছিল। ছিল রাষ্ট্রদূত এ কে এম মজিবুর রহমান ভূঁইয়া এবং ঢাকার আর্চবিশপ পৌলিনুস কস্তার শুভেচ্ছা বাণী।
ধর্মীয় আচারে যিশু খ্রিস্টের জন্মঘর গোশালা তৈরি করে সেখানে যিশু খ্রিস্টসহ বিভিন্ন মূর্তি রাখা হয়। গোশালাটি তৈরি করে সাপ্তাহিক টোকিও প্রতিনিধি রাহমান মনি এবং বাপ্পা দত্ত।

rahmanmoni@gmail.com

[ad#bottom]