দুই যাত্রায় এক যাত্রী স্বাগত কালের পর্যটক

শু চি সৈ য় দ
অধ্যাপক ইমেরিটাস ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর জাদুমাখা ‘গদ্যে আমার পিতার মুখ’, ‘বšু¬র মুখচ্ছবি’, ‘আমার মা’ এসব আÍজৈবনিক রচনা যারা পড়েছেন তাদের কাছে ‘দুই যাত্রায় এক যাত্রী’ আরেকটি অনন্য অভিজ্ঞতাপূর্ণ গ্রন্থ। এক আশ্চর্য নির্মোহতায় ড. চৌধুরী তার সময়, তার দেশ, তার মানুষের মুখচ্ছবি খোদাই করেছেন একজন ভাস্করের কুশলতায়। অসাধারণ কুশলী এক গদ্যশৈলীর অধিকারী এই লেখক তার বর্ণনায়, বিশ্লেষণে পরম মমতায় তুলে ধরেছেন এই দেশ, সমাজ ও তার মানুষকে। জীবনী তো বটেই এর বাইরেও সাধারণত আÍজৈবনিক রচনাতেও আÍপ্রতিষ্ঠারই যৎপরোনাস্তি একটা প্রয়াস বেশ তীক্ষœভাবেই প্রতিভাত হয়। ফলে শেষ পর্যন্ত তা হয়ে ওঠে ব্যক্তিবন্দনার কিংবা ব্যক্তি প্রশস্তির নামান্তর। অনেক রাজনৈতিক নেতার আÍজীবনীতেও দেখেছি ব্যক্তি বড় হয়ে উঠছে সমষ্টি তো বহুদূরের কথা বন্ধুরাও হয়ে যাচ্ছেন ক্ষুদ্র। ড. চৌধুরীর রচনায় ঘটেছে ঠিক তার উল্টো। অপরিমেয় এক ভালোবাসাপূর্ণ হƒদয় যার কলমের কালি তিনি তার গুণে সমষ্টিকে যেমন দেন ঔজ্জ্বল্য তেমনই ব্যক্তিকেও করে তোলেন জীবন্ত। আমরা তার প্রাণবান বন্ধু, সহকর্মী এবং অগ্রজদের উপস্থিতি উপভোগ করি এই আÍজৈবনিক রচনায় একদিকে তার শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক অধ্যাপক সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন অপর দিকে আরেক শিক্ষক ড. খান সারওয়ার মুরশিদ দু’জনের কথাই তিনি যথার্থ নির্মোহতায় তুলে ধরেন সমান এবং সঠিক অন্বেষায়। আবার সহপাঠী আবিদ হোসেন তার কলমের প্রাণবন্ত বর্ণনায় মূর্ত হয়ে ওঠেন। কোন ঈর্ষাকাতরতা কিংবা অসূয়াবোধ ছাড়াই। সবাইকে তিনি একটা ক্যানভাসে সুন্দর এবং নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারেন বড় একজন কথাশিল্পী বলেই।

দুইশ’ বছরের পরাধীনতা থেকে স্বাধীনতা পাওয়া একটি খণ্ডিত ভূখণ্ডের নাগরিকত্বের মধ্যদিয়ে শুরু লেখকের শৈশব। তারুণ্যে আরেকটি স্বাধীনতার সংগ্রাম প্রত্যক্ষ করেছেন। প্রত্যক্ষ করেছেন দুই স্বাধীনতার প্রবঞ্চনাও। তার সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে অগোচর থাকেনি এ প্রবঞ্চনায় নেপথ্যের কারণও। ‘স্বাধীনতার স্পৃহা, সাম্যের ভয়’ কেন? কেন স্বাধীনতা অর্থবহ হয়ে ওঠে না স্বাধীনতার জন্য লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে দেয়া জনগোষ্ঠীর জীবনে? তার আনুপূর্বিক ইতিহাস উঠে এসেছে এই লেখায়।

ঔপনিবেশিক একটি সামন্ত সমাজ থেকে মুৎসুদ্দী পুঁজির বুর্জোয়া বিকাশকাল, সে সমাজের দ্বন্দ্ব, তার টানাপোড়েন সামন্ত সংস্কৃতির সঙ্গে মুৎসুদ্দী সংস্কৃতির যে সংঘাত তারও সাক্ষী তিনি এবং এসব সংকট-সংঘাতকে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন তার শ্রেণী, তার সহকর্মীদের জীবনেও। এই প্রত্যক্ষণে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অনেকেই ভুল মূল্যায়ন এবং ভুল শত্র“র মুখ খুঁজে পান। ড. চৌধুরী তা করেননি। কারণ তিনি এক স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী। ব্যক্তির সীমাবদ্ধতা লোভ-লিপ্সা আর সমষ্টির নিষ্ক্রিয়তা কোনও কিছুই দৃষ্টি এড়ায়নি তার।

তার দৃষ্টির এই স্বচ্ছতা বিধৃত হয়েছে নিচের ঘটনাটির বর্ণনায় ‘ঃআশির দশকের মাঝামাঝি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরেছেন ততদিনে দেশের অনেক কিছুই বদলে গেছে। তার কামরায় বসে কথোপকথনের সময় তিনি ছোট্ট করে একদিন বলেছিলেন, ‘উই হ্যাভ বিন বিট্রেড’, তারপর একটু থেমে শুনি যোগ করছেন, ‘উই হ্যাভ অলসো বিট্রেড’।

দুটিই নির্মম সত্য। আমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে এবং আমরা নিজেরাও বিশ্বাসঘাতকতা করেছি। কিন্তু আসলে কে করল বিশ্বাসঘাতকতা? মূল শত্র“টা কে? ব্যক্তির নাম বলা যাবে, বিভিন্ন প্রকারের তালিকা প্রস্তুত করতে পারব। ষড়যন্ত্র খুঁজে পাওয়াও অসম্ভব হবে না। কিন্তু আমার ধারণা মূল সত্যের কাছাকাছিও যেতে পারব না, যদি না আমরা স্বীকার করি যে কাজটা করেছে পুঁজিবাদী বিকাশের অব্যাহত ধারা। দেশের স্বাধীনতা শ্রমজীবী মানুষের জন্য আসেনি, এসেছে পুঁজিবাদের জন্য, তার অগ্রগতির জন্য পথটা খুলে দেয়া হয়েছে। অর্থনীতিতে, সমাজে, মানুষের ব্যক্তিগত অবস্থান, রুচি ও দৃষ্টিভঙ্গিতে পুঁজিবাদ আগের তুলনায় অনেক অধিক মাত্রায় ও প্রবলতায় প্রবেশ করেছে। আমাদের সমষ্টিগত মুক্তির স্বপ্নটা ভেঙে খান খান হয়ে গেছে, এখন আমরা নিজ নিজ মুক্তির স্বপ্ন দেখি, সবার মুক্তির মধ্যেই যে আমার মুক্তির সম্ভাবনা নিহিত রয়েছে সেই সোজাসাপটা সত্যটাকে ভুলে গিয়ে। হিসাবটা তাই গড়ায় ব্যক্তিগত লাভ লোকসানের এবং মনে হয়, তাই তো, এত যে করলাম, বিনিময়ে পেলামটা কী? আর ওই যে কেবলই নিজের মুনাফার বিষয়টার কথা ভাবছি, ওইখানেই তো আমি নিজেই একজন বিশ্বাসঘাতক। আমাদের ধারাবাহিক আন্দোলনগুলো তো ছিল সবার জন্য মুক্তি অর্জনের লক্ষ্যে পরিচিালিত; সেখানে ব্যক্তিগত মুনাফার বিবেচনাটাকে প্রধান করে তোলার অর্থ তো একটাই, সমষ্টির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা। সত্য তাই দুটিই; আমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে এবং আমরা নিজেরাও বিশ্বাসঘাতকতা করেছি। আর দুটি কাজের সঙ্গেই জড়িত আমাদের অভিন্ন শত্র“, পুঁজিবাদ।’ (দুই যাত্রায় এক যাত্রী। পৃ. ১১৩, ১১৪)

দুই যাত্রায় এক যাত্রী ।। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ।। পার্ল পাবলিকেশন্স, ঢাকা।। প্রচ্ছদ ধ্র“ব এষ। মূল্য ২০০ টাকা।

[ad#bottom]