মেহেরজান

গল্পের শুরুটা হতে পারে সুদূর আমেরিকার পেনসিলভানিয়া থেকে। ২০০৫ সালের ঘটনা সেটা। পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশি ছাত্রী রুবাইয়াত হোসেন তাঁর গবেষণার বিষয় হিসেবে বেছে নিলেন’একাত্তরের বীরাঙ্গনা’। একাত্তরের বীর নারীদের বিষয়ে খোঁজ-খবর করতে গিয়ে শুরুতেই একটা ধাক্কা।

‘আমরা মননে-ইতিহাসে বীরাঙ্গনাদের কথা স্মরণ করলেও দুঃখজনকভাবে সত্যি যে, তাঁদের যন্ত্রণা, দুর্দশা ও আত্মত্যাগ মাত্র এক লাইনে সরলীকৃত—লাখো মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে স্বাধীনতা।’ রুবাইয়াত বলছিলেন তাঁর স্নাতক পর্যায়ের লেখাপড়ার সময়কার কথা। কিন্তু তাই বলে পিছিয়ে আসার কোনো মানে হয় না।

একসময় হাতে পেলেন নীলিমা ইব্রাহিমের লেখা বই আমি বীরাঙ্গনা বলছি ও নারীর একাত্তর। সাক্ষাৎ পেলেন একাত্তরে নির্যাতিত ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর। চোখের সামনে যেন খুলে গেল অনেকগুলো অজানা দুয়ার।
স্নাতক পর্যায়ে লেখাপড়ার পাট চুকেছে, কিন্তু রুবাইয়াতের চেতনাজুড়ে ছিলেন সেই সব বীর নারী। তার প্রমাণ রুবাইয়াত বছর চারেক পর নিজের ছায়াছবির বিষয় হিসেবে বেছে নিলেন সেই সব নারীকেই। সিনেমার পোকা অবশ্য মাথায় ঢুকেছিল ঢের আগেই। সত্যজিৎ রায়ের বই বিষয়: চলচ্চিত্র প্রথম দারুণভাবে আগ্রহী করে তুলেছিল ছায়াছবির বর্ণিল দুনিয়া সম্পর্কে। সেই আগ্রহ আর ভালোবাসার টানেই নিউইয়র্ক ফিল্ম অ্যাকাডেমি থেকে চলচ্চিত্র পরিচালনা বিষয়ে সম্পন্ন করেছেন ডিপ্লোমা। হাত পাকিয়েছেন ১৬ মিলিমিটার ফরম্যাটে চারটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি বানিয়ে। মেহেরজান প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি।

মেহেরজান শুধু কি একাত্তরে নারীদের আত্মত্যাগের গল্প? পরিচালক রুবাইয়াত জানাচ্ছেন, না। মেহেরজান-এ আছে একজন ধর্ষিতা নারীর গল্প, যে সেনাশিবির থেকে ফিরে এসে আত্মগ্লানিতে না ভুগে প্রতিশোধ নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে। অন্যদিকে আছে এক উঠতিবয়সী নারীর গল্প, যে তার ভালোবাসার জন্য যুদ্ধকে অস্বীকার করে।
আগামীকাল দেশজুড়ে মুক্তি পাচ্ছে মেহেরজান। বক্স অফিস সাফল্যের বাইরেও মেহেরজান আলোচনায় উঠে আসতে পারে বেশ কয়েকটি কারণে। এর একটি কারণ, মেহেরজান এক অর্থে শুধু বাংলাদেশের ছবি নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার ছবি। পরিচালক নিজেও একে দেখছেন দক্ষিণ এশিয়ার সিনেমা হিসেবে। এ ছবিতে কাজ করেছেন ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ—এসব দেশের অভিনেতা-অভিনেত্রীরাই। আছেন ভারতের জয়া বচ্চন ও ভিক্টর ব্যানার্জির মতো শক্তিমান অভিনয়শিল্পী। দলত্যাগী বেলুচ সেনা ওয়াসিমের ভূমিকায় আছেন নিউইয়র্কভিত্তিক পাকিস্তানি অভিনেতা ওমর রহিম। দেশভাগের সময় কলকাতা থেকে চলে আসা বনেদি মুসলিম পরিবারের প্রতিভূ খাজা সাহেবের ভূমিকায় অভিয়ন করেছেন ভিক্টর ব্যানার্জি। মাস ছয়েক আগে এই ছবিতে অভিনয়ের জন্য ঢাকা এসেছিলেন জয়া বচ্চন। মেহেরজান ছবিতে এত বড় মাপের একজন অভিনেত্রীকে অভিনয়ে রাজি করানোর কঠিন কাজটা সম্ভব হলো কীভাবে?

যোগাযোগের শুরুটা হয় অমিতাভ বচ্চন করপোরেশন লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী রমেশ পুলাপাকার মাধ্যমে। তিনি চিত্রনাট্য পছন্দ করার পরই সুযোগ আসে জয়া বচ্চনের সঙ্গে সাক্ষাতের। সুযোগটা ফসকাতে দেননি রুবাইয়াত। ছবির চিত্রনাট্য, স্কেচ, কস্টিউম—সব নিয়ে আটঘাট বেঁধেই গিয়েছিলেন তিনি। আর বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম নিয়ে আগে থেকেই দারুণ আগ্রহী ছিলেন জয়া। আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধ নিয়ে আছে তাঁর গভীর আবেগের জায়গাও। সব মিলিয়ে সম্মতি দিতে দেরি করেননি জয়া। ঢাকায় টানা এক সপ্তাহ শুটিং করেছেন তিনি। অভিনয়টা করেছেন নিজের সবটুকু ঢেলে দিয়ে। তিন দেশের এত বিশালসংখ্যক কলাকুশলী নিয়ে কাজ করতে সমস্যা হয়নি? পরিচালক জানাচ্ছেন, কঠিন নয়, ব্যাপারটা উল্টো উপভোগই করেছেন তিনি। আর মনে হবেই বা কেন, ‘ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ অন্তত সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে তো খুব দূরের নয়।’ মেহেরজান নির্মাতার যুক্তি।

মেহেরজান ছবি দিয়েই সংগীতপরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন নীল মুখার্জি। অনেকের জানার কথা নয়, প্রচারবিমুখ এই শিল্পী মহীনের ঘোড়াগুলি ব্যান্ডের বহু জনপ্রিয় গানের সুরকার। মেহেরজান ছবির শীর্ষসংগীত ‘কী আনন্দ জাগে রে প্রাণে’ গেয়েছেন অরূপ রাহী। লালনের একটি গান ছাড়াও ছবিতে ব্যবহূত হয়েছে ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের গজল ‘ঢাকা সে ওয়াপসি পার’ বা ‘ঢাকা থেকে ফেরার পথে’।

‘বাংলাদেশের সঙ্গে আমার নাড়ির সম্পর্ক, যেহেতু এখানেই আমার মায়ের জন্ম। এখানেই সযত্নে লালিত আমার প্রিয় বাংলা ভাষা। সেই দেশের প্রেক্ষাপটে নির্মিত মেহেরজান ছবিতে কাজ করার প্রস্তাব পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে লুফে নিয়েছি।’ নীল বলছিলেন।

একটি ছবি তৈরির চেয়েও বেশি কঠিন ছবিটি সিনেমা হল পর্যন্ত নিয়ে আসা। মেহেরজান-এর বাণিজ্যিক প্রদর্শনের পর্যায়ে এসে অনেকবারই আশাহত হয়েছেন, কিন্তু হাল ছাড়েননি তাঁরা। লড়াই চালিয়ে গেছে মেহেরজান ছবির পুরো দল। কোনো বিশেষ অভিজ্ঞতা নয়, ছবির প্রযোজক আশিক মোস্তফা, চিত্রনাট্যকার এবাদুর রহমান, চিত্রগ্রাহক সমীরণ দত্ত, সুভাষ সাহু, ইশতিয়াক জিকো, ভিক্টর ব্যানার্জি, জয়া বচ্চন, ঋতু সাত্তার—এমন সব উদ্যমী আর সৃষ্টিশীল মানুষের সঙ্গে কাজ করতে পারাটাই ছিল দারুণ উপভোগ্য আর স্মরণীয় এক অভিজ্ঞতা। টানা দুই বছরের বেশি সময় নিজের অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে ছিল যে ছবি, সেটি অবশেষে প্রেক্ষাগৃহে আসছে আগামীকাল। হাজারো চিন্তা-ভাবনা, ছুটোছুটি, উত্তেজনা, নির্ঘুম রাত কাটানো, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা—সবকিছুর ফল কী হলো, সেই ফয়সালা দর্শকদের হাতেই। কারণ, রুবাইয়াত তাঁর এই ছবিটি তৈরি করেছেন আগাগোড়া দর্শকদের কথা মাথায় রেখেই। বলছিলেন, ‘আমি বলতে চাই না দর্শক কী কারণে মেহেরজান দেখবে। বরং দর্শকই বিচার করবে কেন তারা ছবিটা দেখবে অথবা দেখবে না।’

কাহিনি

কিশোরী মেহের ১৯৭১ সালে যুদ্ধের কবল থেকে রেহাই পেতে শহর থেকে পালিয়ে নানাবাড়িতে আশ্রয় নেয়। নানাজান খাজা সাহেব সাতচল্লিশের দেশভাগের সময় কলকাতা থেকে চলে আসা একজন বনেদি মুসলিম। যেকোনো মূল্যে গ্রামে রক্তপাত ঠেকাতে চান তিনি। এদিকে খাজা পরিবারের অন্দরমহলে ঢুকেছে যুদ্ধের প্রভাব। খাজা সাহেবের বড় নাতনি নীলা আর্মি ক্যাম্পে ধর্ষণের শিকার হয়ে যুদ্ধে যায়। এদিকে কিশোরী মেহের সবকিছু ছাপিয়ে প্রেমে পড়ে দলত্যাগী বেলুচ সেনা ওয়াসিমের।
অভিনয়: জয়া বচ্চন, ভিক্টর ব্যানার্জি, হুমায়ুন ফরীদি, খায়রুল আলম সবুজ, শর্মিলী আহমেদ, আজাদ আবুল কালাম, রীতু সাত্তার, নাসিমা সেলিম, শতাব্দী ওয়াদুদ, মনিরা মিঠু, ইকবাল সুলতান, ওমর রহিম ও শায়না আমিন।

ইকবাল হোসাইন চৌধুরী

[ad#bottom]