শাহজালাল বিমানবন্দরের নাম বদলে করা

বদরুদ্দীন উমর
দরকার ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’ আওয়ামী লীগ সরকার ঢাকায় একটি নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এর জন্য জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। প্রথমে এর জন্য ময়মনসিংহের ত্রিশালে স্থান নির্বাচন করা হলেও এখন মুন্সীগঞ্জের আড়িয়াল বিল অঞ্চলে এ স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে।

যেভাবে এ বিমানবন্দরের প্রকল্প তৈরি হয়েছে তাতে একে বলা চলে এক মহাপ্রকল্প। এ প্রস্তাবিত প্রকল্পের বিমানবন্দরের জন্য প্রয়োজন হবে ১০ হাজার একর এবং উপশহরের জন্য ১৫ হাজার একর অর্থাৎ মোট ২৫ হাজার একর জমি। বর্তমানে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জমির পরিমাণ হল ২ হাজার একর। নতুন বিমানবন্দরের জন্য জমির প্রয়োজন হবে এর পাঁচগুণ। তাছাড়া বিমানবন্দরের পার্শ্ববর্তী উপশহরের জন্য যুক্ত হবে আরও ১৫ হাজার একর জমি। এ থেকেই বোঝা যায় কী বিশাল আকারে এই নতুন বিমানবন্দরের পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে।

এই বিশাল বিমানবন্দরের জন্য ব্যয়ও যে হবে অতি বিশাল পরিমাণ, এটাই স্বাভাবিক। এর ব্যয় ধরা হয়েছে ৫০ হাজার কোটি টাকা। আমরা সবাই জানি, এদেশে প্রাথমিক পর্যায়ে কোন প্রকল্পের জন্য যে ব্যয় হিসাব করা হয়, পরবর্তী পর্যায়ে তার ব্যয় বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। পদ্মা সেতুর যে ব্যয় কয়েক বছর আগে নির্ধারণ করা হয়েছিল, এখন তা বৃদ্ধি পেয়ে দ্বিগুণ হয়েছে। বিমানবন্দরের কাজ যেহেতু পদ্মা সেতুর থেকে অনেক বেশি সময় পর্যন্ত চলবে, সে কারণে এ ব্যয় দুই-তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়ে এক থেকে দেড় লাখ কোটি টাকায় দাঁড়ানোর কথা। এ ব্যয় যে বাংলাদেশের মতো একটি দেশের জন্য কত বিশাল এবং অস্বাভাবিক, এটা বোঝায় অসুবিধা নেই।

নতুন বিমানবন্দরের জন্য মুন্সীগঞ্জের যে আড়িয়াল বিল এলাকায় স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে, সে বিলের দৈর্ঘ্য ২৬ মাইল ও প্রস্থ ১০ মাইল অর্থাৎ এর আয়তন ২৬০ বর্গমাইল। এখানে আছে বড় জনবসতি, শস্যক্ষেত, জলাশয়। কাজেই মানুষ, মাছ, বহু প্রজাতির পাখি সব কিছুই আছে এই বিল এলাকায়। বিমানবন্দরের জন্য এই বিলের জমি অধিগ্রহণ করলে এসবই বিপন্ন হবে। অসংখ্য পরিবার তাদের জমিজমা, ভিটেবাড়ি থেকে উচ্ছেদ হয়ে কোথায় যাবে ঠিক নেই। জলাশয়ে যে মাছ আছে, তার ধারণ ক্ষেত্র ধ্বংস হওয়ায় তারাও ধ্বংস হবে। বিভিন্ন প্রজাতির যেসব পাখির আশ্রয়স্থল এই বিল, সে পক্ষীকুলও অন্য কোথাও আশ্রয় পাবে এমন সম্ভাবনা কম। কাজেই তারাও প্রায় সবই ধ্বংস হবে। অর্থাৎ বিমানবন্দর তৈরির জন্য এই গোটা এলাকায় বড় আকারে এক পরিবেশ বিপর্যয় ঘটবে। মানুষ থেকে নিয়ে মাছ, পাখি সব ধরনের জীবনই বিপন্ন হবে।

এ বিষয়ে প্রাসঙ্গিকভাবে আলোচনার অনেক কিছু আছে, কিন্তু এখানে আমরা এ সমস্যার মাত্র কয়েকটি দিক আলোচনা করব। প্রথমত, দেখা দরকার, বর্তমানে একটি নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রয়োজন আদৌ আছে কিনা। এ প্রয়োজন দেখা দিতে পারে এজন্য যে, বর্তমানে ঢাকায় যে বিমানবন্দর আছে সেটি বিদ্যমান চাহিদা মেটাতে সক্ষম হচ্ছে না অথবা দু’চার বছরের মধ্যে এর অবস্থা এমন দাঁড়াবে যাতে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের সংখ্যা এত বৃদ্ধি পাবে যে তা সামাল দেয়া বর্তমান বিমানবন্দরটির দ্বারা সম্ভব হবে না। এরকম কোন সমস্যা কিন্তু একেবারেই নেই। সাবেক বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী আবদুল মান্নান তার এক লেখায় (আমার দেশ ১৪-১-২০১১) বর্তমান বিমানবন্দরের ধারণ ক্ষমতার যে হিসাব দিয়েছেন, অন্যান্য হিসাবের সঙ্গে এর কোন তফাৎ নেই। এই বিমানবন্দরের জমির পরিমাণ ২০০০ একর এবং এর রানওয়ের দৈর্ঘ্য ১০৫০০ ফুট। এর সঙ্গে রয়েছে প্রয়োজনীয় ফ্যাসিলিটিজের ব্যবস্থা। এখানে এখন যে সংখ্যক বিমান ওঠানামা করে এবং বিমানবন্দর যে পরিমাণ ব্যস্ত থাকে, তাতে ভবিষ্যতে এর সম্প্রসারণের হিসাব নিলে দেখা যায়, আগামী ২০ বছরে যাত্রীসংখ্যা ও বিমান ওঠানামা তিনগুণ হতে পারে। কিন্তু যে ফ্যাসিলিটিজ বর্তমানে আছে তাতে ২০৩০ সাল পর্যন্ত এর কাজ চালিয়ে নেয়া যায়। অর্থাৎ পাঁচ, দশ, পনের বছর পর্যন্ত বিদ্যমান বিমানবন্দরটি আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের চাপ সহজেই বহন করতে পারে।

এক্ষেত্রেও কথা আছে। যদি এ ব্যবস্থা সম্প্রসারণেরও প্রয়োজন হয় তাহলে ট্যাক্সিওয়েকে দ্বিতীয় রানওয়েতে পরিবর্তন করা যেতে পারে। তা না হলে বর্তমান রানওয়ের পশ্চিম দিকে যে জায়গা আছে সেখানেও একটি নতুন রানওয়ে নির্মাণ করা যেতে পারে। বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকায় সামরিক বাহিনীর যে গলফ ক্লাব আছে, তার জায়গাতেও রানওয়ের সম্প্রসারণ হতে পারে। মোট কথা বর্তমান বিমানবন্দরটি যেভাবে আছে সেভাবেই। তাতে আগামী কয়েক বছর পর্যন্ত কোন অসুবিধা সৃষ্টি হওয়ার কথা নয়। তাছাড়া প্রয়োজন হলে বিমানবন্দর সংলগ্ন যে জায়গা আছে, সেখানেই নতুন রানওয়ে তৈরি করে অতিরিক্ত প্রয়োজন মেটানো সহজেই সম্ভব। এ পরিস্থিতিতে ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকায় একটি নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের বিন্দুমাত্র কোন প্রয়োজন যে নেই, এটা যে কোন সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন এবং জনগণের ও দেশের স্বার্থ রক্ষার জন্য সচেষ্ট ব্যক্তির পক্ষে বোঝার অসুবিধা নেই। তা সত্ত্বেও বর্তমান সরকার জনগণের বিপুল সমর্থন লাভ করে ক্ষমতায় বসে নতুন একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের কর্মসূচি তৈরি করে যা করতে যাচ্ছে, তাতে দেশের সর্বনাশ ও জনগণের অসীম দুর্গতি ছাড়া আর কিছুই হওয়ার নয়।

তেজগাঁওয়ে ঢাকার পুরনো বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে তৈরি হয়নি। কাজেই সে বিমানবন্দর বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রয়োজন মেটাতে অক্ষম হওয়ার কারণে জিয়াউর রহমানের আমলে বর্তমান স্থানে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের কাজ শুরু হয়। এর কাজ শেষ হয় জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর। আগে থেকে এর কোন নাম নির্ধারিত না হওয়ায় এই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নামকরণ করা হয়েছিল জিয়াউর রহমানের নামে।
এই নামকরণ আওয়ামী লীগের পছন্দ ছিল না। তাদের, বিশেষত তাদের নেত্রীর, ইচ্ছা অনুযায়ী বাংলাদেশে যত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠান আছে সেগুলোর নাম শেখ মুজিবুর রহমানের নাম অনুসারেই হওয়া দরকার। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ জাতীয় সংসদে তার প্রান্তিক সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে এ ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হয়নি। কিন্তু ২০০৮ সালের নির্বাচনে তারা ক্ষমতায় আসার পর ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি থেকে জিয়াউর রহমানের নাম মুছে দিয়ে তা পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত নেন এবং তা কার্যকর করেন। জিয়া বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তন করে সরাসরি তার নাম শেখ মুজিবের নাম অনুসারে রাখা খুব বেশি দৃষ্টিকটু হতে পারে এ চিন্তা থেকে তারা স্থির করেন যে, বিমানবন্দরের নাম থেকে জিয়াউর রহমানের নাম বাদ দিয়ে এমন এক নাম রাখা হবে, পরবর্তী সময়ে বিএনপি ক্ষমতায় এসে আবার যাতে জিয়াউর রহমানের নাম অনুযায়ী বিমানবন্দরের নাম ফিরিয়ে আনতে না পারে। আওয়ামী লীগের নেত্রীসহ অন্যদের ধারণা, এ ধরনের নামকরণ কোন পীরের নাম অনুযায়ী করলে বাংলাদেশের অন্ধ ধর্মভীরু লোকদের বিরোধিতার ভয়ে সেই নাম পরিবর্তন কোনভাবেই আর সম্ভব হবে না। কাজেই বিমানবন্দরটি থেকে চিরতরে জিয়াউর রহমানের নাম সেভাবে মুছে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে তারা সেটাই কার্যকর করেন।

এর পর বিমানবন্দর সম্পর্কে তাদের সিদ্ধান্ত হয়, যেহেতু ঢাকার বর্তমান বিমানবন্দরের নাম শেখ মুজিবের নাম অনুযায়ী রাখা হল না অথচ তার নামে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর অবশ্যই থাকা দরকার, কাজেই দ্বিতীয় একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছাড়া এ উদ্দেশ্য সিদ্ধ হওয়া সম্ভব নয়। কাজেই তারা বিমানবন্দরের কাজ শুরু হওয়া এবং এ ব্যাপারে প্রকল্প চূড়ান্ত হওয়ার আগেই এর নামকরণ করে ফেলেছেন! শুধু তাই নয়, এই দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হওয়া দরকার এত বড় আকারের, যার তুলনায় বর্তমান বিমানবন্দরটি হয়ে পড়ে গুরুত্বহীন।
এক্ষেত্রে মূল ব্যাপার হল, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর পিতার নামে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণ করা। এ কাজ করতে গিয়ে দেশের যে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে, বিশাল পরিমাণ জমি অধিগ্রহণের ফলে যে মানুষ, জীবজন্তু ও পক্ষীকুল বিপন্ন হবে, এ নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের কোন মাথাব্যথা নেই। সরকারি ক্ষমতা হাতে পেয়ে তারা যেভাবে বেপরোয়া হয়ে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও দলীয় স্বার্থে কাজ করছেন, তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণভাবেই তারা এই নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।

আমাদের বক্তব্য হল, নিছক বক্তব্য নয়, সরকারের কাছে আমাদের আবেদন, তারা যেন দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সিদ্ধান্ত বাতিল করে শাহজালাল বিমানবন্দরের নাম রাখেন ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। একজন পীরের নামে নতুন নামকরণ হলেও সেটা পরিবর্তন করলে দেশের পীরভক্ত মুসলমানদের মনে যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে বলে তারা মনে করছেন, সে রকম কিছুই হবে না। এ ব্যাপারে তাদের ভয় অহেতুক। ঢাকায় যে নভোথিয়েটার নির্মিত হয়েছিল, তার নাম শেখ হাসিনার প্রথম আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাখা হয়েছিল ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটার’। আওয়ামী লীগের মতো একই ধরনের ‘উচ্চ চিন্তার’ দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে খালেদা জিয়ার সরকারের আমলে তার নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছিল ‘মওলানা ভাসানী নভোথিয়েটার’। ভাসানীর নামে এর নামকরণের কারণ এই ছিল যে, তারা মনে করেছিলেন ভাসানীর নামে নামকরণ হলে পরে আওয়ামী লীগ আর সেটা পরিবর্তন করে আবার শেখ মুজিবের নামে তার নামকরণ করতে পারবে না। কিন্তু আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে খালেদা জিয়ার সে চিন্তাকে ভ্রান্ত প্রমাণিত করে নভোথিয়েটারের নাম আবার শেখ মুজিবের নামেই রেখেছে। এর ফলে ভাসানীভক্তদের এমন কোন বিরোধিতা হয়নি যাতে আওয়ামী লীগের সরকার সংকটাপন্ন হয়েছে।

বর্তমান শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তন করে তার নাম ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’ রাখলেও অবস্থা একই রকম হবে জনগণের মধ্যে। এর এমন কোন প্রতিক্রিয়া হবে না, যার ফলে আওয়ামী লীগ সরকার সংকটাপন্ন হবে। কাজেই আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে আমাদের দাবি ও সেই সঙ্গে সনির্বন্ধ অনুরোধ, আপনারা দেশের অপরিসীম ক্ষতি এবং জনগণের ও পরিবেশের চরম দুর্দশা সৃষ্টি না করে বর্তমান শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তন করে তার নাম রাখুন ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিমানবন্দর’।

১৫.১.২০১১

[ad#bottom]