পাপে, পরাজয়ে, প্রতিরোধে

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
জীবনের সর্বস্তরে বাংলা প্রচলন যে হয়নি এখনো সে সম্পর্কে তিন ধরনের মনোভাব কার্যকর রয়েছে সমাজে_পাপের, পরাজয়ের ও প্রতিরোধের। একুশে ফেব্রুয়ারিতে যেসব বিত্তবান মানুষ খালি পায়ে আসেন কিংবা আসতে চান, যোগ দেন নানা অনুষ্ঠান, পহেলা বৈশাখেও তাঁরা জানুন না জানুন, একটা তাড়া যে খেয়েছেন সেটা ঠিক। বিবেকের তাড়া। ‘বাংলা বলার মাস’_একটি পত্রিকা বলেছিল, ফেব্রুয়ারি মাসকে। এক দিন কিংবা এক মাস বাঙালির হয়ে বাকি ৩৬৪ দিন কিংবা ১১ মাস, অবাঙালি থাকার ক্ষতিপূরণ করবেন ভাবেন হয়তো, হয়তো আশা করেন বিবেক পরিষ্কার হবে। তবে এটি বিত্তবানদের একাংশ মাত্র, অপরাংশ আছেন, যাঁরা আদৌ ভাবেন না এ বিষয়ে, যথেষ্ট দূরে সরে গেছেন ইতিমধ্যে, আরো সরবেন ক্রমান্বয়ে। তাঁদের পাপ আছে, তবে তাঁদের মধ্যে পাপের কোনো বোধ নেই।

বাংলা প্রচলন চান, কিন্তু যা অবস্থা দেখছেন, তাতে প্রচলন সম্ভব হবে না বলে মনে করেন এমন দেশপ্রেমিক মানুষও বিরল নয় বাংলাদেশে। দেখেশুনে এঁরা হতাশ হয়ে পড়েছেন, হতাশা বাড়ছে, হতাশাবাদীর সংখ্যাও বাড়ছে। আস্থা রাখবেন কার ওপর? অন্যরা তো গেছে চলে, তারা সবাই বড়লোক হয়েছে। সব দেখেশুনে আস্থা নেই এখন, এমনকি নিজের ওপরও। তৃতীয় একটি গোষ্ঠী আছে। ছোট নয় তাদের সংখ্যা। যাঁরা আশা রাখেন, হবে। অবশ্যই হতে হবে। না হলে চলবে কেন? এঁরা আন্দোলন করেন, আন্দোলনে আস্থা রাখেন। ভবিষ্যৎ দেখেন সমষ্টিগত উদ্যোগের মধ্যে। প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চান সেই শক্তির বিরুদ্ধে যে শক্তি বাংলা প্রচলনে বাধা দেয়। বাধা দিচ্ছে।

পাপীতে-পরাজিতে মৌলিক ব্যবধান আছে, সন্দেহ কী; কিন্তু তাঁরা এক জায়গাতেই এসে দাঁড়ান শেষ পর্যন্ত, সব ভেদাভেদ ভুলে, বিশ্বাস করেন সর্বস্তরে বাংলা কখনো প্রচলিত হবে না এ দেশে। এ না হওয়ার তাৎপর্যটি যে কি তা এরা সবাই হয়তো সমানভাবে বোঝেন না। যাঁরা বোঝেন তাঁরা বলেন, এ তো কেবল ভাষার প্রশ্ন নয়, বাঁচার প্রশ্ন বটে। মানুষের মতো বাঁচার। সে জন্যই তো আন্দোলন হয়েছে। ইংরেজ আমলে বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষা হবে এটা অসম্ভব কল্পনা ছিল। অখণ্ড পাকিস্তানে শেষ পর্যন্ত বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছিল বটে; কিন্তু কে না জানতেন যে সেটা ছিল কাগুজে কথা মাত্র, বাস্তবে সত্য নয়, বাস্তবে পাকিস্তানিরা কখনো বাংলার সর্বত্র প্রচলন সহ্য করত না। বাংলা ভাষার জন্যই বাংলাভাষীদের স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা দরকার হয়েছিল। কথাটা বাড়িয়ে বলা হলো কি? মোটেই নয়। বাংলা ভাষা প্রচলিত হবে, তার অর্থ কী? অর্থ হলো সব মানুষ স্বাধীন হবে। সব মানুষের মর্যাদা থাকবে। অধিকার থাকবে মানুষের মতো বাঁচার। বাংলা ভাষা তাই আমাদের স্বাধীনতার প্রতীক। বাংলাদেশের নিশানকে পদদলিত করা যেমন জাতির অপমান, বাংলা ভাষার লাঞ্ছনাও তেমনি অপমান বটে; সমগ্র জাতিরই। আমাদের জীবনে বাংলা ভাষা যতটা জীবন্ত, জাতি হিসেবে আমরাও ততটাই জীবন্ত_তার বেশি নয়। কমও নয়। যে পরিমাণে আমরা বাংলা ভাষা ব্যবহার করি, ঠিক সেই পরিমাণেই আমরা স্বাধীন_বেশিও নয়, কমও নয়। জাতিগতভাবে আজ আমরা যতদূরই বিদেশনির্ভর, ততদূরই বাংলা ভাষা থেকে দূরবর্তী। এ বড় সোজা হিসাব। আবার নির্মম হিসাবও। কথা ছিল বাংলা ভাষা সব বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ করবে। করেছিলও; বায়ান্নতে করেছে, পরে সেই ঐক্য দৃঢ়তর ও বিস্তৃততর হয়েছে। বায়ান্নর আন্দোলনের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য ছিল এখানে যে তা সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে আক্রমণ করেছিল। তখন থেকে বাঙালি আর হিন্দু-মুসলমান রইল না, বাঙালি হয়ে উঠল।

অবশ্যই বাড়িয়ে বলা হলো কথাটা। অসত্য নয়, অর্ধ-সত্যও নয়, অতিরঞ্জিত সত্য। কেননা সাম্প্রদায়িকতা সক্সগে সক্সগে চলে যায়নি, এখনো তা রয়ে গেছে। কারণ কী টিকে থাকার? কারণ সোজা, সেটা হলো রোগের অর্থনৈতিক ভিত এবং তাকে উসকে দেওয়ার, সে-ও বস্তুগত স্বার্থেই, স্বার্থবাদী শক্তির কর্মতৎপরতা। অর্থনৈতিক ভিতের চেয়েও অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থে উসকানি দেওয়াটাই অধিকতর কুফলপ্রসূ হয়েছে এ ক্ষেত্রে। আর এই যে স্বার্থবাদীদের তৎপরতা সম্ভব হয়েছে এ জন্য যে আন্দোলন সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে যেভাবে আক্রমণ করেছে শ্রেণী বিভাজনকে সেভাবে আক্রমণ করতে পারেনি।

এ কথা আজ অস্বীকার করার কোনো উপায়ই নেই যে ধনী বাঙালি এখন আর বাঙালি নয়। যত বেশি ধনী তত বেশি অবাঙালি, তা তার পৈতৃক পরিচয় কিংবা পিতৃদত্ত চেহারা যাই হোক না কেন, আত্মীয়স্বজন যারাই হোক না কেন। তার নতুন আচার-আচরণ, জামা-কাপড়, আসবাবপত্র_এসব তো তার অবাঙালি হয়ে যাওয়ার কথা বলবেই, অর্জিত অবাঙালিত্ব আরো বেশি ধরা পড়বে তার আকাক্সক্ষায়। কোথায় যেতে চায়? কী স্বপ্ন দেখে? ছেলেমেয়েদের কোথায় পাঠাবে ভাবে? ছেলেমেয়ে নিজেরা কী আশা করে? কী চায়? এসবের খবর নিলে যে সত্য অনিবার্যরূপে বেরিয়ে আসবে, তাতে ধরা পড়বে প্রকৃত ঘটনা। ধনী হয়ে এবং ধনী হওয়ার প্রক্রিয়ার ভেতরে তারা বাঙালিত্ব হারিয়ে ফেলেছে। স্বেচ্ছায়। লেজ হারানো নয়, পরিচয় হারানো।

বাংলা চালু না হওয়ার দায় নানা কাঁধে চাপানো যায়, অন্তত চেষ্টা তো করা হচ্ছে। বাংলা ভাষার অনেক দুর্বলতা এ প্রসক্সগে খুঁজে বের করা সম্ভব। বলা সহজ, সে যথেষ্ট চটপটে নয়, কেমন যেন এলিয়ে এলিয়ে পড়ে, ধরো ধরো দশা তার। বানান জটিল, বর্ণমালার সংস্কার অত্যাবশ্যক। পরিশব্দ, কোথায় পর্যাপ্ত? অনেক অজুহাত। যাঁরা আরো একটু পরিষ্কারভাবে দেখেন বা দেখেন বলে মনে করেন, তাঁরা বলেন, আসল অপরাধী অন্য কেউ নয়, অপরাধী আমাদের চেতনা। এ বক্তব্যটাকে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। চেতনাই তো! অবশ্যই। কিন্তু কার চেতনা? সেটাই বলতে হবে পরিষ্কারভাবে। গরিবের চেতনা নয়। ধনীর চেতনা। তাঁরাই কর্তা, তাঁরাই শাসক, তাঁরাই নেতা। ধনীর মনোভাব, মূল্যবোধ, দৃষ্টিভক্সগি_এসবই দায়ী বাংলা প্রচলিত না হওয়ার জন্য। আর চেতনা যেহেতু অবস্থান থেকেই আসে, তাই শেষ পর্যন্ত দায়িত্ব গিয়ে পড়ে যে অবস্থানে দেশীয় ধনীরা দাঁড়িয়ে আছেন তার ওপর। এই অধিপতি শ্রেণী, রাষ্ট্রযন্ত্র যাঁদের হুকুমে চলে, তাঁরা তাঁদের আদর্শ জনগণের ওপর চাপিয়ে দেন। ফলে গরিব মরবে দুই বার করে। একবার মরে সে শোষিত হয়ে, দ্বিতীয়বার মরতে হয় যারা তাকে মারছে সেই শোষকদেরই আদর্শ জ্ঞান করে। পরাজয়বাদী বলা যায় যাদেরকে, দোদুল্যমান যারা, তারা যে হতাশ হয়েছে তার কারণ জনগণ নয়, কারণ ধনীক শ্রেণী। ধনীদের দেখছে এবং সেখানে আশাবাদী হওয়ার মতো কিছুই দেখতে পাচ্ছে না, না পেয়ে হতাশার লেপ-কম্বল মুড়ি দিয়ে বিছানা নিয়েছে। জনগণ যদি ডাক দেয়, তবে অবশ্য সাড়া দেবে, তবে ডাক যাতে দিতে পারে সেদিকে কোনো পদক্ষেপ নেবে না। বলবে, করব কি, সাধ্য নেই।

ভরসা পরাজয়বাদীরা নয়। ভরসা শেষ পর্যন্ত ওই গরিব জনসাধারণই। বাংলা তাদেরই ভাষা। তারাই ওকে রক্ষা করেছে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মূল শক্তি ছিল তারাই এবং আগামী দিনে বাংলা ভাষা যখন সর্বস্তরে চালু হবে, অবশ্যই তা হবে_তখনো তারাই থাকবে সামনে। ধনীরা আসতে পারে, যদি তারা শ্রেণীচ্যুত হয়। পরাজয়বাদীরা উঠে আসবে লেপ-কম্বল ফেলে দিয়ে, মনে করবে প্রত্যাশিত ডাকটি এসে গেছে। এখন আর শুয়ে থাকা নয়, স্বাধীনতাযুদ্ধে যে মুক্তির পথে একটি পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভবপর হয়েছে, সেই পথেই আরেকটি পদক্ষেপ এটি। অপরিহার্য এবং অনিবার্য। শ্রম যে পরিমাণে ও যত দ্রুত জয়ী হবে ততই আমরা বাংলা ভাষার দিকে এবং বাংলা ভাষা আমাদের দিকে এগোবে। সাদা কথায়, বাংলা ভাষা প্রকৃত অর্থে চালু হবে যখন একটি নতুন ও সত্যিকারের শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে বাংলাদেশে।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও সমাজবিশ্লেষক

[ad#bottom]