তোমাকে ধন্যবাদ মুহামেদ বুআজিজি

মনজুরুল হক
মুহামেদ বুআজিজির প্রত্যাশা তেমন বেশি কিছু ছিল না। তবে তার পরও সামান্য সেই প্রত্যাশা তার পূরণ হয়নি। গরিবের প্রত্যাশা বরাবরই সামান্যতেই সীমাবদ্ধ থাকলেও সমাজ ও রাষ্ট্র অনেক ক্ষেত্রেই সেই সীমিত প্রত্যাশার সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট শেষ করা তিউনিসীয় সেই যুবক ছোটখাটো এক চাকরির সন্ধানে ছিল, যা থেকে পাওয়া মাসিক বেতন বেঁচে থাকার কোনো একটা পথ তার জন্য হয়তো করে দিতে পারত। তবে মাসের পর মাস অপেক্ষায় থেকেও সে রকম ছোটখাটো কোনো চাকরিও যখন তার ভাগ্যে জোটেনি, সেই অবস্থায় একসময় হতাশ হয়েই পথে সে নেমেছিল ফল আর সবজির বোঝা ফেরি করে সামান্য কিছু উপার্জনের একেবারে ন্যূনতম প্রত্যাশা নিয়ে। সেই উপার্জন আক্ষরিক অর্থেই অনাহারের কষ্ট থেকে সাময়িক মুক্তি তার জন্য অন্তত এনে দিতে পারত।

মাস খানেক আগের ঘটনা এটা। বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে পারার চিন্তায় এক যুবক পথে নেমেছে পরিশ্রম করে যাওয়ার মধ্য দিয়ে সৎপথের সামান্য উপার্জন নিশ্চিত করে নিতে। তবে সেখানেও রাষ্ট্রীয় প্রশাসন তার সামনে হঠাৎ করেই বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তিউনিসিয়ার শান্ত এক মফস্বল শহর সিদি বুজিদের বেকার সেই শিক্ষিত তরুণের জন্য এমনকি ফলমূল আর সবজি বিক্রি করে সামান্য উপার্জনের পথ বন্ধ করে দিতে পুলিশ পিছপা হয় না। মুহামেদ বুআজিজির অপরাধ, পণ্য বিক্রির অনুমোদনপত্র তার নেই। ফলে সেই অজুহাতে পেশার পথই পুলিশ কেবল তার জন্য বন্ধ করে দেয় না, সেই সঙ্গে সামান্য যে পণ্য শেষ সঞ্চয়ের অর্থে বিক্রি করতে পারার আশায় সে কিনে এনেছিল, তার পুরোটাও পুলিশ তার কাছ থেকে নিয়ে নেয়। ফলে একেবারে পথে পড়তে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া শেষ করা ২৬ বছর বয়সী যুবককে। শিক্ষিত যুবক হওয়ার কল্যাণে দেশের সাম্প্রতিক হালচাল সম্পর্কে অবগত হওয়ায় এটাও তার জানা ছিল যে প্রয়োজনীয় অনুমোদন লাভের কাগজ হাতে পেতে হলে যে পরিমাণ অর্থ বিভিন্ন সরকারি অফিসে ঘুষ হিসেবে তাকে দিতে হবে, তার সামান্য অংশবিশেষও তার কাছে নেই। ফলে অন্য কোনো পথ খুঁজে না পেয়ে সিদি বুজিদের নগরকেন্দ্রে শরীরে পেট্রল ঢেলে নিজের গায়ে সে আগুন ধরিয়ে দেয়। মুহামেদ বুআজিজির তখন নিশ্চয়ই জানা ছিল না যে সেই আগুন কেবল তার জীবনই হরণ করবে না, সেই সঙ্গে দেশজুড়ে এর লেলিহান শিখা ছড়িয়ে দিয়ে আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত এক সরকারের বেদিকেও তা করে দেবে লন্ডভন্ড।

মুহামেদ বুআজিজি সেদিন অবশ্য তাৎক্ষণিকভাবে মারা যায়নি। পুড়ে যাওয়া দেহ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় কয়েক দিন পর সে প্রাণ ত্যাগ করে। তবে তত দিনে তার দেহের উত্তপ্ত আগুন ছড়িয়ে পড়ে দেশের মানুষের হূদয়জুড়ে, বঞ্চনা আর অবহেলার স্বৈরাচারী শাসনের শৃঙ্খল থেকে দেশকে মুক্ত করতে পারার সাহস যে আগুন কিনা একই সঙ্গে তাদের মনে এনে দেয়।

বেকারত্বের অভিশাপ দেশটি জুড়ে এতটাই প্রকট হয়ে উঠেছিল যে বুআজিজি যেদিন শরীরে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়ায় নিয়োজিত হয়েছিল, তার ঠিক পাঁচ দিন পর গণ-অসন্তোষ দানা বেঁধে ওঠার মুখে ২২ বছর বয়সী আরেক বেকার যুবক সেই সিদি বুজিদ শহরে দেহে বিদ্যুতের তার পেঁচিয়ে নিয়ে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিল। দুই যুবকের আত্মহনন শেষ পর্যন্ত দেশবাসীর বিবেককে জাগ্রত করে তোলে এবং দলমত-নির্বিশেষে তিউনিসিয়ার অপামর জনসাধারণ প্রতিবাদে রাজপথে নেমে আসে।

তিউনিসিয়ার সমস্যা কেবল বেকারত্বে সীমিত নেই, বিশ্ব অর্থনীতির মোড়লদের তুষ্ট করতে নিজেকে আজীবনের রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করতে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া রাষ্ট্রপ্রধান জায়নাল আবেদিন বেন আলী দেশে যে তথাকথিত উদার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন, তা একসময় অবশ্যম্ভাবী পথে এগিয়ে গিয়ে ধনী আর দরিদ্রের মোটা দাগের বিভাজনে দেশটিকে ভাগ করে দেয়। এর একদিকে অবস্থানকারী সুবিধাভোগী মুষ্টিমেয় ধনিক শ্রেণী অসম্ভব বিলাসবহুল জীবন যাপন করতে থাকলেও দরিদ্র আর মধ্যবিত্তের জন্য সীমিত আয়ে জীবনধারণ হয়ে ওঠে খুবই কষ্টকর। ফলে দৃষ্টিকটু সেই বিভাজনও অজান্তে ছড়িয়ে দিতে থাকে ঘৃণার আগুন, হালকা যে আগুনের উত্তাপ দেশের শাসক গোষ্ঠী একেবারে শেষ মুহূর্তে তা দাবানলে রূপ নেওয়ার আগ পর্যন্ত মোটেও অনুভব করতে পারেনি।
এক কোটির কিছু কম জনসংখ্যার দেশ তিউনিসিয়ায় ৫০ শতাংশের বেশি নাগরিকের বয়স ২৫ বছর কিংবা তারও কম। জনসংখ্যার কাঠামোগত হিসাবের দিক থেকে দেশটি তাই হচ্ছে আমাদের বাংলাদেশের মতোই তরুণ টগবগে রক্তে পরিপূর্ণ এক দেশ। ফলে দেশের সেই সংখ্যাগরিষ্ঠ তরুণদের জন্য চাকরির সুযোগ করে দিতে না পারলে সামাজিক অশান্তির পথই কেবল তা আরও কিছুটা প্রশস্ত করে দিতে বাধ্য। তিউনিসিয়ার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি আবারও সেই প্রমাণ নিয়ে আমাদের সামনে এখন উপস্থিত।

সেই সঙ্গে মনে হয় দেশের জনগণকে বঞ্চিত রেখে বিলাসবহুল জীবনযাপনে শাসক গোষ্ঠী আর ধনিক শ্রেণী মত্ত থাকলে এর পরিণতিতে যে ছালাসহ আম হারিয়ে ফেলার পরিস্থিতি তাদের সামনে দেখা দিতে পারে, সেই সত্যতাও অন্যদিকে আবার তিউনিসিয়া তুলে ধরছে। লাগামহীনভাবে ক্ষমতা ভোগ করতে পারার অবস্থা তিউনিসিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানের দ্বিতীয় স্ত্রীকে অনেকটাই ঠেলে দিয়েছিল ইমেলদা মার্কোস আর মাদাম সুহার্তোর পথে, বিত্তের পাহাড় গড়ে নেওয়ার স্বপ্নে যে অবস্থায় তিনি থেকেছেন বিভোর। তবে মাদম বেন আলীর আসক্তি শুধু জুতা কিংবা ১০ শতাংশের ভাগবাটোয়ারা পাওয়ার হিসাবে সীমিত থাকেনি। দেশজুড়ে বিলাসবহুল বিভিন্ন বাড়িঘর আর ভূসম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়ায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন সিদ্ধহস্ত। ফলে স্বাভাবিকভাবে বঞ্চনার একেবারে শেষ প্রান্ত থেকে উঠে আসা জনগণের ঘৃণার আগুন ধাবিত হয়েছিল সেই পরিবারটির দিকে, নাগরিকদের বঞ্চিত করার অর্থ দিয়ে যাঁরা গড়ে তুলেছিলেন নিজেদের সম্পদের পাহাড়। ক্ষমতার নেশা আর মোহ অবশ্য সে রকম কোনো চিন্তা ঘুণাক্ষরেও তাঁদের মনে জায়গা করে দিতে পারেনি যে জনতার তাৎক্ষণিক বিচার একদিন এর পুরোটা থেকেই তাদের ন্যায়সংগতভাবে বঞ্চিত করবে। রাতের অন্ধকারে প্রাণের ভয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় সম্পদ হারানোর অশ্রু তাদের চোখে দেখা দিয়েছিল কি না, তা অবশ্য বলার কোনো উপায় নেই। তবে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ প্রাণটি বেঁচে যাওয়ায় তারা হয়তো বাড়িঘর আর অন্যান্য সম্পদের শোকে শোকাহত হতে পারার অবস্থায় তখন ছিল না।

জনতার রুদ্ররোষ বরাবরই এতটা প্রবল। সেই রুদ্ররোষ জাগিয়ে তোলার অনুঘটকের ভূমিকা তিউনিসিয়ায় পালন করে গেছে আত্মাহুতি দেওয়া এক বেকার যুবক। নিজের প্রাণের বিনিময়ে সে আবারও দেখিয়ে দিয়ে গেছে, মানুষ চূড়ান্ত অসহায় কখনোই নয়। হতে পারে, আজ হয়তো তারা সমানে পিছু হেঁটে চলেছে। তবে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে ঘুরে দাঁড়াতেও মানুষ কালক্ষেপণ করে না। অতীতে আমাদের জীবদ্দশায়ও এটা আমরা একাধিকবার লক্ষ করছি। তবে তার পরও মনে হয় সে রকম অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া শিক্ষা সব সময় কেন যেন থেকে গেছে ক্ষণস্থায়ী। সবকিছু ভুলে গিয়ে আবারও আমরা হেঁটে গেছি সেই একই পথে, যখন কিনা বিদ্যুৎ যে একদিন আসবে, সেই প্রতিশ্রুতিকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার ভাঁওতাবাজির খেলা দেখিয়ে শুধু খাম্বা বসিয়ে কোটি কোটি টাকা লুটপুটে খেয়েছে ক্ষমতার রজ্জু হাতে ধরে বসে থাকা লোকজন।

তবে তিউনিসিয়ায় এবারের ঘটনা মনে হয় এ কারণে ব্যতিক্রমী হয়ে দেখা দেবে যে আমাদের সময় এখন অজান্তেই হয়ে উঠৈছে এমন এক ডিজিটাল সময়, যখন কিনা চারদিকে কী হচ্ছে তা জানতে পারার জন্য সরকারি ভাষ্যের অপেক্ষায় থাকার আর প্রয়োজন নেই। ডিজিটাল বিপ্লব এখন বিশ্বজুড়ে প্রতিটি দেশেই নিজ থেকে ছড়িয়ে পড়েছে, যার কল্যাণে আমরাও তাৎক্ষণিকভাবে জেনে যাচ্ছি, কে লাগাচ্ছে খাম্বা আর কে-ই বা পাঁয়তারা করছে পুকুর চুরির। ফলে ডিজিটাল বিপ্লবকে প্রকৃত অর্থে অর্থবহ করে তুলতে হলে যেকোনো দেশেই সবচেয়ে বেশি যা প্রয়োজন তা হলো, সম্পদের বণ্টন যেন দৃষ্টিকটু রকম বৈষম্যময় পরিবেশ গড়ে না তোলে, সেদিকে সচেতন থাকা। কেননা, ডিজিটাল দেশই কিন্তু নাগরিকদের চোখে আঙুল দিয়ে আরও ভালো করে দেখিয়ে দেবে, কে বা কারা বেকার আর অভুক্ত জনগণকে বঞ্চিত করে গড়ে নিচ্ছে নিজেদের সম্পদের পাহাড়।

টোকিও
মনজুরুল হক: শিক্ষক ও সাংবাদিক।

[ad#bottom]