বিমানবন্দরের নামে ভূমি আগ্রাসন : সমীক্ষা ছাড়াই আড়িয়ল বিলে আঞ্চলিকতাদুষ্ট প্রকল্প

জিয়াউদ্দিন সাইমুম
জাতীয় পানিনীতি-১৯৯৯ ও জাতীয় পানি আইন-২০১০ উপেক্ষা করে মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রীনগর ও সিরাজদিখান এবং ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ ও দোহারের আড়িয়াল বিলের জমি অধিগ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে সরকার। বিশেষজ্ঞরা সরকারের এই অবিবেচক সিদ্ধান্তকে রাষ্ট্রীয় ভূমি আগ্রাসনের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

তারা বলেছেন, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সক্ষমতার বেশিরভাগই অব্যবহৃত রেখে, কোনো ধরনের সম্ভাব্যতা যাচাই ও পরিবেশগত সমীক্ষা না চালিয়েই জলাভূমির ওপর নির্ভরশীল জনগণের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষতির তোয়াক্কা না করে দেশের অন্যতম আড়িয়াল বিলের মূল্যবান জলাভূমি নষ্ট করে নতুন একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর স্থাপন করার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

জানা গেছে, থাইল্যান্ডের সুবর্ণভূমি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আদলেই আড়িয়াল বিলে বঙ্গবন্ধু বিমানবন্দর ও বঙ্গবন্ধু নগরী নির্মাণের উদ্দেশে সরকার গত ১৩ ডিসেম্বর আড়িয়াল বিলের জমি অধিগ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে। এতে মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার ১৪ মৌজার মোট ১০ হাজার ৮৯৫ দশমিক ১৩ একর ভূমি অধিগ্রহণের আদেশ জারি করা হয়।

জাতীয় পানিনীতি-১৯৯৯-এর আর্টিক্যাল ৪.১৩তে বলা হয়েছে—‘হাওর, বাঁওড় এবং বিলের মতো জলাভূমি তাদের বিশেষ আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছাড়াও অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগত বিবেচনায় এগুলোর মূল্য অনেক। অতীতে প্রকৌশলগত হস্তক্ষেপের মাধ্যমে অনেক বিলকে শুকিয়ে ফেলা হয়েছে। পরিবেশের ওপর এর ফলাফল হয়েছে ভয়াবহ। এলাকার দরিদ্র জনগণের প্রয়োজনীয় মাছ এবং জলজ সবজির উত্স ধ্বংস হয়ে গেছে। এ কারণে সরকার নিম্নলিখিত নীতিমালা গ্রহণ করেছে : ক. বিল, হাওর এবং বাঁওড়ের মতো জলাভূমিগুলোকে পানি নিষ্কাশন এবং জলজ পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে সংরক্ষণ করা হবে। খ. শুধু সেসব প্রকল্পই বাস্তবায়ন করা হবে যেগুলো এ সব জলাভূমির জলজ বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে না। গ. এসব জলাভূমির মত্স্য উত্পাদন বাড়ানোর জন্য সমন্বিত প্রকল্প হাতে নেয়া হবে।’

১৯৯৯ সালে এই পানিনীতি চূড়ান্ত করার সময় এর ভূমিকায় সেই সময়ের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘এ ধরনের নীতিমালার অভাবে এরই মধ্যে দেশের জীববৈচিত্র্য এবং পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হয়ে গেছে।’ উল্লেখ্য, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আড়িয়াল বিলে প্রস্তাবিত বিমানবন্দর নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছেন। অথচ তিনিই জাতীয় পানিনীতি-১৯৯৯তে স্বাক্ষর করেছিলেন, যেখানে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমি সংশ্লিষ্ট সকলকে এই নীতি অতিসত্বর বাস্তবায়ন করার নির্দেশ দিচ্ছি।’

আড়িয়াল বিল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় তিনটি জলাভূমির একটি। এখানে বর্ষা মৌসুমে প্রচুর মাছ ও আমন ধানের চাষ হয়। শুকনো মৌসুমে রবিশস্য ও বোরো ধান ফলে। এ বিলকে কেন্দ্র করে লাখ লাখ কৃষক, জেলে ও দিনমজুরের জীবিকা নির্বাহ হয়। ফলে পরিবেশগত বিবেচনা ছাড়াও অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবেও এই বিমানবন্দর ও বঙ্গবন্ধু নগরী স্থানীয় জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে। এলাকাবাসী দাবি করেছেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় ১০ লাখ ও বহিরাগত এক লাখ মানুষের জীবিকা ধ্বংস হবে এবং বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১০ লাখ টন ধান ও ১০ কোটি টাকার মাছ থেকে বঞ্চিত হবে, যা জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ বিপর্যয়েরকালে গোটা দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকিতে ফেলবে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, জাতীয় পানিনীতি-১৯৯৯ কিংবা জাতীয় পানি আইন-২০১০, কোনোটার আলোকেই আড়িয়াল বিলে প্রস্তাবিত বিমানবন্দর নির্মাণ বৈধতা পাবার কথা নয়। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ প্রকল্পে বিনিয়োগকারীরাই এনভায়রনমেন্ট ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্টসহ (ইআইএ) সব ধরনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করবে।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, জলাভূমিতে বিমানবন্দর নির্মাণে নানা সমস্যা রয়েছে। থাইল্যান্ডের সুবর্ণভূমি বিমানবন্দরের আদলে সরকার বঙ্গবন্ধু বিমানবন্দর বানানোর প্রস্তুতি নিলেও থাই বিমানবন্দরের দুঃখজনক অভিজ্ঞতাগুলো বর্তমান সরকার বিবেচনায় আনেনি। তাছাড়া পরিবেশগত দিক ছাড়াও জলাভূমিতে বিমানবন্দর নির্মাণ কারিগরি বিবেচনাতেও বিপদজনক ও ব্যয়বহুল। সুবর্ণভূমি বিমানবন্দরটি কোবরা সোয়াম্প নামের একটা জলাভূমির ওপর ৩৯০ কোটি ডলার ব্যয়ে তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বরে বিমানবন্দরটি চালু হওয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যেই রানওয়ের ট্যাক্সিওয়েতে ফাটল দেখা দেয় এবং ফাটলগুলো বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে ১০০ পয়েন্টে ফাটল দেখা দেয়। এমনকি ৭টি স্থান দেবেও যায়।

বিমানবন্দরটি বানাতে সরকার একাধিক জায়গা প্রাথমিকভাবে বাছাই করেছিল। সর্বশেষ ময়মনসিংহের ত্রিশালে এটি বানানোর পরিকল্পনা নেয়া হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় পরিমাণ ভূমি না পাওয়ায় এবং ঢাকা থেকে বেশি দূরে হওয়ায় শেষ পর্যন্ত আড়িয়াল বিলের ২৫ হাজার একর বা ১০১ দশমিক ১৭ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে এই বিমানবন্দর বানানোর মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করে। এখানে ৬ হাজার একর (২৪.২৮ বর্গ কিমি) জুড়ে তৈরি হবে বিমানবন্দর। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর প্রকল্পের জন্য এরই মধ্যে মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরের ১০,৮৯৫ একর, ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জের ৭ হাজার ১৭ একর ও দোহারের ৭ হাজার ১৮৮ একর ভূমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু হয়েছে।

সূত্র মতে, অনুমোদিত বিমানবন্দরটিতে ৯ হাজার ফুট দৈর্ঘ্যের ২টি রানওয়ে থাকবে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে বিল্ড ওন অপারেট ট্রান্সফারের (বিওওটি) ভিত্তিতে বিমানবন্দরটি নির্মিত হবে। ৭০০ কোটি ডলার বা ৫০ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পটি আগামী ৫ বছরের মধ্যেই শেষ করতে চায় সরকার। এই ব্যয়বহুল বিমানবন্দর প্রকল্পে বিনিয়োগ করার জন্য অনানুষ্ঠানিকভাবে সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে ইতালিয়ান-থাই ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন, দক্ষিণ আফ্রিকার মুরে অ্যান্ড রবার্টস কর্পোরেশন, পেন্টা ওশান কনস্ট্রাকশন ও ওবায়াশি কর্পোরেশনের মতো বহুজাতিক নির্মাণ সংস্থা।

নতুন বিমানবন্দর নির্মাণের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন সচিব শফিক আলম মেহেদি বলেছেন, ‘বিমান চলাচল দ্রুত বেড়ে আগামী ৫ থেকে ৬ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন বিমানবন্দর লাগবে।’ কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, শাহজালাল বিমানবন্দরের শীর্ষভাগ ক্ষমতাই অব্যবহৃত রয়ে গেছে। তাছাড়া চট্টগ্রাম ও সিলেটে দুটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রয়েছে। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচলের জন্য সৈয়দপুর, রাজশাহী, যশোর, বরিশাল ও কক্সবাজারে বিমানবন্দর রয়েছে। এই বিমানবন্দরগুলোকে আপগ্রেড না করে এবং শাহজালাল বিমানবন্দরের পুরো ক্ষমতা ব্যবহার না করে ৫০ হাজার কোটি টাকা খরচ করে সম্পূর্ণ নতুন একটি বিমানবন্দর তৈরির যুক্তি কোথায়। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রয়েছে একটি রানওয়ে, যেখানে প্রতি ঘণ্টায় মাত্র ৬টি বিমান ওঠানামা করে। অথচ এক রানওয়ের বিমানবন্দরে ঘণ্টায় সাধারণত ৬০টির মতো বিমান ওঠানামা করতে সক্ষম। কারণ একটি বিমান ল্যান্ডিং করার জন্য ৪৫ থেকে ৭০ সেকেন্ড রানওয়েতে থাকে। আবার ওয়েক ভোরটেক্স সেপারেশান ডিসটেন্স, ইন্টার অ্যারাইভাল সেপারেশান ডিসটেন্স ইত্যাদি বিবেচনায় নিয়ে যদি হিসাব করা হয় তাহলে প্রতি ঘণ্টায় এক রানওয়ের এক বিমানবন্দরে অন্ততপক্ষে ৩১টি বিমান ওঠানামা করতে পারে। এ বিবেচনায় শাহজালাল বিমানবন্দর বর্তমানে তার সর্বোচ্চ ক্ষমতার মাত্র ৫ ভাগের এক ভাগ ব্যবহার করছে। এছাড়া সমপ্রতি বিমানবন্দরে ২ লাখ বর্গফুট ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি কার্গো ভিলেজ তৈরি করা হয়েছে এবং টার্মিনাল ভবনেরও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। ফলে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইট অনুসারেই বর্তমান বিমানবন্দরটি আগামী বিশ বছর বা তারও বেশি সময়ের চাহিদা মেটাতে পারবে।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এরপরও বাড়তি ক্যাপাসিটি দরকার হলে বর্তমান বিমানবন্দরটি সমপ্রসারণ করে এক রানওয়ের বদলে দুই রানওয়ের বিমানবন্দরে পরিণত করাই তো যৌক্তিক এবং আর্থসামজিক ও পরিবেশগত দিক থেকে লাখজনক। উত্তরা, নিকুঞ্জ অথবা বিমানবন্দরের পার্শ্ববর্তী ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের বিশাল এলাকা থেকে কিছু জায়গা অধিগ্রহণ করে বিমানবন্দর সম্প্রসারণের কাজটি করা যেতে পারে।

ওদিকে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পানিসম্পদ পরিচালনা সংস্থার সাবেক মহাপরিচালক প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক বলেছেন, আড়িয়াল বিলটি প্রতি বছর বন্যায় ১৫-২৫ ফুট পানিতে তলিয়ে যায়। তাই এখানে বিমানবন্দর ও বঙ্গবন্ধু নগরী বানাতে হলে পুরো এলাকা ২০-৩০ ফুট বালু দিয়ে ভরাট করতে হবে। তাছাড়া স্যাটেলাইটের ছবিতে এই এলাকার মাটিতে পিট কয়লার স্তর দেখা যায়। তাই এখানে বিমানবন্দরসহ নির্মিত যে কোনো স্থাপনাই দেবে যাওয়ার সার্বক্ষণিক হুমকিতে থাকবে। ল্যান্ডিং বা টেক অব ওয়েট ৪০০ থেকে ৮০০ মেট্রিক টনসম্পন্ন আন্তর্জাতিক রুটে চলাচলকারী বিমানগুলোর ওঠানামার জন্য পিট কয়লার গভীর স্তরের ওপর বিমানবন্দর নির্মাণ ভাবাই যায় না।

উল্লেখ্য, আড়িয়াল বিলের জলাভূমি ও আবাদি জমি অধিগ্রহণের এই তত্পরতার বিরুদ্ধে গত ২৭ ডিসেম্বর ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত অবরোধ করে রাখে মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর এবং ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ ও দোহারের হাজার হাজার অধিবাসী।

[ad#bottom]