ধ্বংসের মুখে শ্যামসিদ্ধির মঠ

বিক্রমপুরকে নিয়ে আমরা গর্ববোধ করি। মূলত এর কারণ অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান, বিজ্ঞানাচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, দেশবন্ধু সি আর দাস, বিদুষী নারী সরোজিনী নাইডু প্রমুখ মহা মনীষীর পৈতৃক ভূমি এই বিক্রমপুর। এ ছাড়া বিক্রমপুরকে নিয়ে আমাদের গর্বের অনেক জায়গা আছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হলো_বিক্রমপুরের পুরাকীর্তি ও স্থাপত্যশিল্প। এ তালিকায় প্রথম সারিতে যে নামটি ভেসে আসে তা হলো, ঐতিহাসিক শ্যামসিদ্ধির মঠ। অনিন্দ্যসুন্দর এ পুরাকীর্তিটি যেন বিক্রমপুরের ইতিহাস-ঐতিহ্য শিরে ধারণ করে আকাশছোঁয়া উচ্চতায় দাঁড়িয়ে আছে।

শম্ভুনাথ মজুমদার তাঁর স্বর্গগত পিতার স্বপ্নাদেশ পেয়ে তাঁর স্মৃতিতে নির্মাণ করেন এই মঠ। ১৭৫৮ শকাব্দ অর্থাৎ ১২৪৩ বঙ্গাব্দে (১৮৩৬) মঠটি নির্মিত হয়। মঠের মন্দিরের মধ্যে খুব সমারোহ করে শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। ১৩৩৬ বঙ্গাব্দের (১৯২৯ খ্রি.) ১৯ আষাঢ় এই মঠের দেয়ালে একটি বিজ্ঞপ্তি উৎকীর্ণ করে দেওয়া হয়, যা এখনো ভগ্ন অবস্থায় মঠের সঙ্গে আছে। বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়, মঠের উচ্চতা ছিল প্রায় ২৪০-২৪২ ফুট, বাইরের দিক থেকে অষ্টভুজাকার। প্রত্যেক দিকের বর্গাকার ভূমির দৈর্ঘ্য ২১ ফুট, মঠের ভেতরের ক্ষেত্রফল ৩২৪ বর্গফুট। প্রবেশদ্বারের উচ্চতা ২৭ ফুট। শঙ্কু আকৃতির এই মঠ তিনটি ধাপে বিভক্ত, এর গায়ে বেশ কিছু সোনারং অঞ্চলের স্থাপত্যকর্মের নমুনা আছে। সবচেয়ে নিচের ধাপটি বর্গাকার। মঠের দ্বিতীয় ধাপটি অষ্টভুজাকার এবং এর দেয়ালে প্লাস্টার করা অনেক অলংকৃত প্যানেল আছে। অষ্টভুজাকার দেয়ালের প্রতিটিতেই জানালার মধ্যে প্যানেল আছে, সেগুলো বন্ধই থাকে, খোলা যায় না। জানালার প্যানেলের ওপরের অংশ সাতটি ফণাবিশিষ্ট সর্পমূর্তি লতাপাতার অলংকরণের নকশা দিয়ে সজ্জিত। আটটি দিকেই একটি করে অর্ধবৃত্তাকার চাল বা খিলান আছে, সেখান থেকেই ক্রমেই সরু হয়ে শিখরটি ঊধর্ে্ব উঠে গেছে। একেবারে শেষে চূড়ার অংশে কলসটি এখন ভেঙে গেছে, কিন্তু লোহার ত্রিশূলটি এখনো আছে। ছোট ছোট সাইজের লাল ইটের তৈরি মঠটির নির্মাণকৌশল নান্দনিক। মঠের ভেতরের এবং বাইরের দুই দিকের দেয়ালেই অলংকরণ ছিল চমৎকার, প্রচুর ভালো কাঠের কাজও ছিল। প্রতিবছর বৈশাখ মাসের দ্বিতীয় দিন থেকে মঠের পাশের বিশাল মাঠে বসত গোলইয়ার মেলা। মন্দিরের মধ্যে গৌরীপট্টের ওপর মূল্যবান কালোপাথরের শিবলিঙ্গ স্থাপিত ছিল। গ্রামের লোকে এই শিবের পূজা করত সারা বছর ধরেই, তবে বিশেষ ঘটা করে হতো শিবরাত্রির সময়।

দিলি্লর সুবিখ্যাত কুতুবমিনারের (উচ্চতা ২৪০ ফুটের কম) চেয়ে উঁচু এই মঠ। বিক্রমপুরের বহু লোক মনে করে, শ্যামসিদ্ধির মঠ কুতুবমিনারের চেয়ে উঁচু তো বটেই, এটি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার উপমহাদেশের সর্বাপেক্ষা উঁচু মঠ। একদা ১০-১২ কিলোমিটার দূর থেকে চোখে পড়ত এই মঠ। দিগন্ত বিস্তৃত মঠের মধ্য দিয়ে গ্রামবাসী যখন গ্রামে ফিরে আসত তখন এই মঠ যেন ধ্রুবতারার মতো তাদের দিক নির্ণয়ে সাহায্য করত, পথ চিনিয়ে দিত। বিক্রমপুরের ঐতিহ্যবাহী এই পুরাকীর্তি ও স্থাপত্যশিল্পটি দিন দিন ধ্বংসের মুখে পতিত হচ্ছে। ইতিমধ্যে নিচের দিকের ইট খসে পড়তে শুরু করেছে। অতিদ্রুত এই মঠের সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন। তা না হলে বিক্রমপুরের ঐতিহ্যকে ধারণ করা এ পুরাকীর্তিটি এক দিন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে। পর্যটকদের জন্য এটি একটি আকর্ষণীয় স্থান।

সুমন্ত রায়

[ad#bottom]