দারিদ্র্য বিমোচনে শিক্ষা ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

জয়নুল আবেদীন
যেকোনো দেশের উন্নয়নের অন্তরায় হচ্ছে সে দেশের অশিক্ষা, দারিদ্র্য ও সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর অভাব। জাতীয় উন্নয়নের প্রথম শর্ত হচ্ছে, দেশের জনগণকে গুণগত, পরিমাণগত ও মেধাসম্পন্ন শিক্ষার পাশাপাশি দেশকে দ্রুত নিরক্ষরতামুক্ত করা। এবং জীবনমুখী শিক্ষার মাধ্যমে বিশাল জনগোষ্ঠীকে মানবসম্পদে পরিণত করে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলা। বিশ্বখ্যাত জার্মান শিক্ষা দার্শনিক উনবিংশ শতাব্দীতে শিক্ষা সম্পর্কে যে কথা বলেছেন, তা সর্বকালে গ্রহণযোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘To prepare us for complete living is the function that education has to perfrom’. তাঁর উক্তির সরল অর্থ হচ্ছে, ‘শিক্ষা জীবিকা অর্জনে এবং স্বাধীনভাবে সুখী ও সমৃদ্ধ জীবনযাপনে সাহায্য করে।’ বিগত দুই বছর শিক্ষার প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল, ‘সুন্দর জীবনের জন্য সাক্ষরতা’ আর স্লোগান ছিল, ‘শিক্ষা আনে কল্যাণ, সুখ অফুরান।’ আর মহাজোট সরকারের অঙ্গীকার হচ্ছে, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে দিনবদলের শিক্ষা কার্যকর করতে ২০১১ সালের মধ্যে সব শিশুকে স্কুলগামী করা এবং ২০১৪ সালের মধ্যে নিরক্ষরতামুক্ত বাংলাদেশ গড়া। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্লোগান কার্যকর করতে হলে বিশ্বের সব উন্নত দেশের মতো জনগণকে যুগোপযোগী, আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষাদান এবং শিক্ষাকে অসাম্প্রদায়িক, গণমুখী ও জীবনসম্পৃক্ত করা, যাতে জনশক্তিকে মানবসম্পদে রূপান্তরিত করা যায়। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার ড. খুদা কমিশনের সচিব এবং বর্তমান শিক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক কবীর চৌধুরীসহ বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠনের প্রতিনিধি ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে ড. খুদা কমিশন ও শামসুল হক কমিশনের সুপারিশমালা আরো সমৃদ্ধ ও আধুনিকায়ন করে এবং বাংলাদেশ আমলের সব শিক্ষা কমিশন পর্যালোচনা করে বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার উপযোগী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক, গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক এবং সবার জন্য এক ও অভিন্ন গণমুখী, সুলভ ও সুষম শিক্ষা প্রবর্তন ও মানবসম্পদ সৃষ্টির লক্ষ্যে একটি দিনবদলের শিক্ষানীতি জাতির সামনে তুলে ধরেছে বলে দাবি করছে।

আমরা যারা ‘৬২-এর শিক্ষা আন্দোলনে যুক্ত ছিলাম, তারা ৪৮ বছর আগের গণমুখী, বিজ্ঞানমনস্ক ও অসাম্প্রদায়িক শিক্ষানীতির দাবি করেছিলাম। বর্তমান শিক্ষানীতির মধ্যে শতভাগ না হলেও বহুলাংশে আমাদের সেই দাবির প্রতিফলন দেখতে পেয়ে খুশি হয়েছি। এবং আমরা মানবসম্পদ উন্নয়নে যে সুপারিশমালা দিয়েছি, তাও বহুলাংশে গৃহীত হয়েছে। ৯৮ পৃষ্ঠার ২৯টি অধ্যায়সংবলিত সুবিশাল ও সুবিস্তৃত বিবরণ একটি লেখার সীমিত পরিসরে উল্লেখ করা সম্ভব নয়। তিন স্তরবিশিষ্ট শিক্ষানীতির সারসংক্ষেপ হচ্ছে, অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক, নবম থেকে দ্বাদশ পর্যন্ত মাধ্যমিকের পর উচ্চশিক্ষা এবং ডিগ্রি পাস কোর্স থাকছে না। শিক্ষার সব ধারায় স্কুল, মাদ্রাসা, কিন্ডারগার্টেন ও কারিগরি স্কুলে একই বই পড়ানো বাধ্যতামূলক। শিক্ষার ২৪টি উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের মধ্যে শিক্ষার সর্বস্তরের সাংবিধানিক নিশ্চয়তার প্রতিফলন ঘটানো এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি শিক্ষার্থীদের সচেতন করে তোলা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অনুপ্রাণিত করা এবং তাদের চিন্তা ও চেতনায় দেশাত্মবোধ, জাতীয়তাবোধ ও চরিত্রে সুনাগরিকের গুণাবলির বিকাশ ঘটানো। আমার প্রবন্ধের মূল কথা হচ্ছে, দারিদ্র্য বিমোচনে শিক্ষার বিকল্প নেই। বঙ্গবন্ধু স্বয়ং সদ্য স্বাধীন দেশের দারিদ্র্য দূরীকরণের প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, ‘সুষ্ঠু সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য শিক্ষা খাতে পুঁজি বিনিয়োগের চেয়ে উৎকৃষ্ট বিনিয়োগ আর হতে পারে না।’ তিনি জাতীয় উৎপাদনের ৪ শতাংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তরিত করার জন্য বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষার ওপর বঙ্গবন্ধু জোর দিয়েছিলেন। বর্তমানে আমাদের ১৫ কোটি মানুষকে জনশক্তিতে রূপান্তরিত করার প্রধান উপায় হচ্ছে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সর্বক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার।

মানবসম্পদ সৃষ্টির লক্ষ্যে সর্বক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিজ্ঞান, কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটানো ও বিদেশে দক্ষ মানবসম্পদ রপ্তানি এবং কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি বর্তমান শিক্ষানীতির লক্ষ্য। কর্মমুখী শিক্ষা যাতে শিক্ষার্জনের সঙ্গে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মানিত হয়, তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষার ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে বৃত্তিমূলক শিক্ষা শুরু হবে এবং এ ক্ষেত্রে অষ্টম শ্রেণী সমাপ্ত করলে তাকে দক্ষতা মান ১ সনদ দেওয়া হবে। বৃত্তিমূলক এবং কারিগরি শিক্ষার নবম, দশম ও দ্বাদশ শ্রেণী সমাপ্ত করলে দক্ষতা মান ২, ৩ ও ৪ অর্জন করবে। অষ্টম শ্রেণী শেষ করার পর যদি কারো প্রান্তিক শিক্ষা হয় সে শিল্প-কারখানার ছোটখাটো চাকরি কিংবা বিদেশে গিয়ে দক্ষ শ্রমিক হিসেবে অর্থোপার্জন করতে পারবে। অথবা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে স্থাপিত সরকারি টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট বা বেসরকারি বৃত্তিমূলক প্রতিষ্ঠানে এক, দুই, তিন ও চার বছরের বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ নিয়ে জাতীয় দক্ষতা মান ২, ৩ ও ৪ অর্জন করবে। দশম শ্রেণী উত্তীর্ণ জাতীয় দক্ষতা মান ৪ সনদধারী শিক্ষার্থী ক্রেডিট সমন্বয়ের মাধ্যমে ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি হতে পারবে এবং ডিপ্লোমা অর্জনকারীরা যোগ্যতানুসারে ইঞ্জিনিয়ারিং, কৃষি ও টেঙ্টাইল বিষয়ে পড়তে পারবে। মোটকথা, আমাদের শিক্ষানীতিকে বিশ্বমানের করার লক্ষ্যে এবং আমাদের গরিব দেশের বিশাল জনশক্তি জনসম্পদে পরিণত করে দেশকে সমৃদ্ধ করে দ্রুত দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব হবে। শিক্ষা প্রবৃদ্ধি অর্জনের শক্তিশালী হাতিয়ার।

দেশীয় শিল্পে নিয়োগ এবং বিভিন্ন দেশের চাহিদা অনুযায়ী টেকনিশিয়ান, চিকিৎসক, নার্স, দক্ষ জনশক্তি তৈরি করলে বিদেশে তাঁদের কর্মসংস্থান বাড়বে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হবে। এতক্ষণ আলোচনায় দেখা গেল বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষাসহ মানবসম্পদ সৃষ্টির জীবনমুখী শিক্ষানীতির যে খসড়া তৈরি হয়েছে, যত শিগগির তা কার্যকর করা যায় ততই দেশের মঙ্গল। শিক্ষা বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে শহর ও গ্রামের বৈষম্য দূর করে শিক্ষা সবার জন্য সুলভ ও সুষম করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। মানসম্পন্ন শিক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যে বেসরকারি শিক্ষক নির্বাচন ও উন্নয়ন কমিশন গঠনের প্রস্তাব বাস্তবায়ন এবং মেধাবী শিক্ষকদের শিক্ষালয়ে ধরে রাখার জন্য উপযুক্ত পারিশ্রমিক ও মর্যাদা দিতে হবে। বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা না করে সব দল ও ব্যক্তিকে শিক্ষার মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণে ভূমিকা রাখতে হবে। সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতা পরিহার করে অগ্রগতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর মতো বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে আমরা যদি দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে পারি, তা হলে আমরাও দ্রুত দারিদ্র্য দূর করে দক্ষিণ এশিয়ার টাইগারদের পাশে দাঁড়াতে পারব।

লেখক : শিক্ষা গবেষক

[ad#bottom]